
পটভূমি
সরকারি চাকরিতে ৫৬% কোটা সংস্কারের দাবীতে মূল আন্দোলন শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ালে আন্দোলন থেমে গিয়েছিল। পরে আদালতের এক রায়ের পরে দ্বিতীয় দফা আন্দোলন শুরু হয় জুন ২০২৪ থেকে। এরপর তা ক্রমান্বয়ে সহিংস রূপ নেয়। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গঠিত হয়।
সমাধানযোগ্য একটি সমস্যাকে শুধু চরম অসহিষ্ণুতা, ক্ষমতার দম্ভ, নাগরিকদের প্রতি তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও জবাবদিহিহীন শাসনব্যবস্থা কীভাবে ভয়ংকর পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে, তার চেহারা দেখলাম আমরা।
দেশের সর্বত্র একটি দম বন্ধ অবস্থা ছিল; কারণ ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে ভিন্নমতের প্রতি কোনো সম্মান ছিল না। আমরা দেখেছি, সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে আনসার পর্যন্ত সব বাহিনীকে সরকার তার দমন-পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত। যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জনগণকে নিরাপত্তা দেবে; অবৈধ বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে; সেখানে তারাই অবৈধ আটক তো হরদম করে গেছে। তারা অপহরণ, গুম, খুনের মতো অপরাধও নির্বিচারে করে গেছে শুধু একটি নির্দিষ্ট সরকারকে ক্ষমতায় রাখতে। তা ছাড়া অন্য যেসব জায়গায় মানুষ যাবে সরকারের অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিকার চাইতে, যেমন বিচার বিভাগ, সংবাদমাধ্যম, সেসব জায়গায়ও সরকার আধিপত্য বিস্তার করেছিল।
বাংলাদেশে স্বাধীনতার আগে-পরে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য বহু আন্দোলন হয়েছে। স্বৈরাচারের দাপট আমাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে বারবার, গণতন্ত্রের লড়াই আমাদের শেষও হয়নি। কিন্তু আর কোনো আন্দোলনে এত প্রাণহানি হয়নি। এবারের আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানের রূপ নিয়েছিল। এ রকম জনবিদ্রোহের রূপ আমরা আগেও দেখেছি। কিন্তু এবারের মতো রক্তাক্ত হয়নি কখনো।
শুধু আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী নয়, বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা শিশু, কারখানা থেকে বের হয়ে শ্রমিক, গ্যারেজ থেকে বের হয়ে রিকশাচালক, রাস্তা পার হতে গিয়ে কিশোর, বাসার গেটে বৃদ্ধ নারী—কেউই স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার দোসরদের নির্বিচার গুলি থেকে বাঁচেনি। হাসপাতালে পা, হাত, চোখ হারানো মানুষের সংখ্যা অনেক। তাদের আহাজারিতে বাংলার আকাশ বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত ৯ দফা এবং এক দফার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন হয়।
২০০৯-২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনামলে মৃত্যুদণ্ড, নির্যাতন, জোরপূর্বক গুম এবং শিক্ষিত ও রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের নির্বিচারে গ্রেপ্তারের কারণে বাংলাদেশ একটি অন্ধকার সময় পার করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও ভারতের সমর্থনপুষ্ট এই স্বৈরশাসকের পতন বাংলাদেশের জনগণের সহনশীলতা ও সাহসিকতার প্রমাণ।
সারসংক্ষেপ
বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে ২০২৪ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। তখন শিক্ষার্থীদের ওপর সরকারি বাহিনীর হামলার প্রতিবাদ, মামলা তুলে নেওয়া ও কোটা সংস্কারের একদফা বাস্তবায়নের দাবিতে ক্যাম্পাসের আন্দোলন ক্রমান্বয়ে রাজপথে ছড়িয়ে পড়ে। এ আন্দোলনে দেশের ৭-৩০ বছর বয়সের জেন-জি দের উপর অমানবিক দমন পিড়ন চালানো হয়। বাংলাদেশে যা কখনো হয়নি, তা-ই হলো; বিপুল সংখ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থীদের গুলি করে মারা হলো, কলেজ ও স্কুলশিক্ষার্থীদের গুলি করে মারা হলো। মায়েরা কাঁদলেন, বাবারা কাঁদলেন, সহপাঠীরা কাঁদলেন। ক্ষোভে ফুঁসে উঠল দেশ। একে একে শিক্ষক, অভিভাবক, আইনজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী, সাংবাদিক, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সমর্থন জানাতে শুরু করলেন শিক্ষার্থী ও তরুণদের আন্দোলনে।
শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কেরা ৯ দফা দাবি জানিয়েছিলেন। সেই দাবি পূরণের বদলে বেছে নেওয়া হয় নির্যাতন ও গণগ্রেপ্তারের পুরোনো পথ, যা শেখ হাসিনা তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ১৫ বছর ধরে প্রয়োগ করেছেন। কয়েক দিনের মধ্যে ১০ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। বাদ যায়নি এইচএসসি পরীক্ষার্থীরাও। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদার ও নুসরাত তাবাসসুমকে তুলে নিয়ে আটকে রাখা হয় ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) কার্যালয়ে। সেখান থেকে জোর করে আন্দোলন প্রত্যাহারের ভিডিও বার্তা দেওয়ানো হয়। মানুষের প্রতিবাদ এবং সমন্বয়কদের অনশনের মুখে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। ২ আগস্ট ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে ৯ দফা দাবিকে সরকার পতনের এক দফায় রূপান্তর করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিন বাহিনীর প্রধানদের সাথে জরুরী বৈঠক করেন। কিন্তু বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে অস্বীকৃতি জানায়। পুলিশ আর গুলি করতে রাজি ছিল না। শেখ হাসিনা শেষ চেষ্টা হিসেবে নামিয়ে দেন তাঁর রাজনৈতিক শক্তিকে। ৪ আগস্ট ঢাকার রাস্তায় এবং দেশজুড়ে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা করেন। তাঁদের কারও কারও হাতে ছিল আগ্নেয়াস্ত্র, অনেকের হাতে ছিল দেশীয় অস্ত্র। ওই দিন সংঘর্ষে নিহত হন অন্তত ১১৪ জন মানুষ। অসংখ্য ছাত্র-জনতার জীবনের বিনিময়ে অবশেষে ৫ আগস্ট সৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়।
যেসব অকুতোভয় জেন-জিদের বিচক্ষণ ও কৌশলী পরিকল্পনা এবং সাহসী পদক্ষেপের ফলশ্রুতিতে একটি নিরস্ত্র আন্দোলন সরকারকে পতনের দিকে নিয়ে যায় সেই সমন্বয়কদের বীরত্বগাথা ও আত্মত্যাগের মর্মান্তিক কাহিনীই এ পুস্তকের উপজীব্য বিষয়।
এ কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায় যে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এর নেতৃত্বে গণ অভ্যুত্থান ২০২৪ বাংলা বসন্তের সূচনা করেছে ।
আন্দোলনের প্রথম পর্যায়: ২০১৮ সাল
৩১.১.২০১৮
সরকারি চাকরিতে কোটাপ্রথা বাতিল করে পুনর্মূল্যায়ন চেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র ও দুই সাংবাদিকের পক্ষে রিট দায়ের। রিট দায়ের করে আইনজীবী এখলাছ উদ্দিন বলেছিলেন, ১৯৭২ সালে এক নির্বাহী আদেশে সরকারি, বেসরকারি, প্রতিরক্ষা, আধা সরকারি এবং জাতীয়করণ করা প্রতিষ্ঠানে জেলা ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা ও ১০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের জন্য কোটা প্রবর্তন করা হয়। পরে বিভিন্ন সময়ে কোটায় সংস্কার ও পরিবর্তন করা হয়। বর্তমানে সব মিলিয়ে ৫৬ শতাংশ কোটা বিদ্যমান। ফলে যাঁরা কোনো কোটায় পড়েন না, তাঁদের প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে বাকি ৪৪ শতাংশের জন্য।
১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮
সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটাব্যবস্থা সংস্কারের পক্ষে-বিপক্ষে শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালন করেছে দুটি পক্ষ। ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র সংরক্ষণ পরিষদের’ ব্যানারে কয়েক শ চাকরিপ্রার্থী কোটা সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভ করেন। আর সংস্কার প্রস্তাবের নামে ‘মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের’ প্রতিবাদে মানববন্ধন করেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের নেতা-কর্মীরা। তবে পুলিশ সেখানে কাউকেই দাঁড়াতে দেয়নি।
আন্দোলন চালিয়ে নিতে সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ৭১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়।
৯ এপ্রিল, ২০১৮
সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটাব্যবস্থার বিরুদ্ধে চাকরিপ্রার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গত ১৭ ও ২৫ ফেব্রুয়ারি মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। এরপর ৪ মার্চ মানববন্ধন কর্মসূচি শেষে আন্দোলনকারীরা ১৩ মার্চ পর্যন্ত সরকারকে কোটা সংস্কারের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন। আন্দোলনকারীদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে কোটাব্যবস্থা সংস্কার করে ৫৬ ভাগ থেকে ১০ ভাগে নিয়ে আসা, কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে শূন্য থাকা পদগুলোতে মেধায় নিয়োগ দেওয়া, কোটায় কোনো ধরনের বিশেষ নিয়োগ পরীক্ষা না রাখা, সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সবার জন্য অভিন্ন বয়সসীমা নির্ধারণ এবং চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা-সুবিধা একাধিকবার ব্যবহার না করা।
এদিন কেন্দ্রীয় কর্মসূচি হিসেবে বেলা দুইটার পরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে হাজারো শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থী গণপদযাত্রা করে বিভিন্ন রাস্তা ঘুরে বেলা তিনটায় শাহবাগ মোড়ে এসে অবস্থান নেন। আন্দোলনকারীরা ঘোষণা দেন, জাতীয় সংসদের অধিবেশন থেকে ঘোষণা না আসা পর্যন্ত অবরোধ চালিয়ে যাবেন। রাত পৌনে আটটায় আকস্মিকভাবে শিশুপার্কের দিক থেকে ১৫-২০ প্লাটুন দাঙ্গা পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করতে করতে শাহবাগ মোড়ের দিকে আসতে থাকে। তারা আন্দোলনকারীদের লাঠিপেটা শুরু করে। পুলিশের আকস্মিক হামলায় আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে দুই ভাগ হয়ে যান।
এরপর থেকেই মূলত আন্দোলন ঘিরে সহিংসতা শুরু। বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র সংরক্ষণ পরিষদের নেতাদের ওপর বারবার হামলা করে ছাত্রলীগ। আন্দোলনের একপর্যায়ে ২০১৮ সালের জুনে জাতীয় সংসদে কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। আর এ নিয়ে সরকার পরিপত্র জারি করে ৪ অক্টোবর। এরপর ২০২১ সালে এই পরিপত্র বাতিল চেয়ে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান রিট দায়ের করেন। রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০২১ সালের ৬ ডিসেম্বর হাইকোর্ট রুল দেন। রুলে ওই পরিপত্র কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়।
আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়: ২০২৪ সাল
৫ জুন– সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে (৯ম থেকে ১৩তম গ্রেড) মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়।
৬ জুন– কোটা পুনর্বহালে আদালতের দেওয়া রায় বাতিলের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ।
৯ জুন– কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের প্রতিবাদে আবারও বিক্ষোভ সমাবেশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। দাবি মানতে সরকারকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়। অ্যাটর্নি জেনারেলকে স্মারকলিপি। এ সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে সর্বাত্মক আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হয়। একই দাবিতে চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলন কর্মসূচি পালন করেন।
১ জুলাই– ২০১৮ সালের পরিপত্র পুনর্বহালের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে থেকে মিছিল নিয়ে রাজু ভাস্কর্যের সমাবেশ করে লাগাতার কর্মসূচি ঘোষণা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ আর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ।
২ জুলাই– লাইব্রেরির সামনে থেকে সাড়ে চার কি.মি. গণপদযাত্রা করে নীলক্ষেত-সায়েন্সল্যাব ঘুরে এক ঘণ্টা শাহবাগ অবরোধ।
৩ জুলাই– লাইব্রেরির সামনে থেকে পদযাত্রা করে দোয়েল চত্বর-মৎস্য ভবন ঘুরে দুই ঘণ্টা শাহবাগ অবরোধ। ২০১৮ সালের পরিপত্র আইনে পরিণত করার দাবিসহ চার দফা দাবি।
৪ জুলাই– সারাদেশে সড়ক-মহাসড়ক-রেলপথ অবরোধ; শাহবাগে ৬ ঘণ্টা অবরোধ। পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা বিষয়ে হাইকোর্টের রায় আপিল বিভাগে স্থগিত না করে প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের আপিল বিভাগ ‘নট টুডে’ বলে আদেশ দেন।
৫ জুলাই– সারাদেশে শিক্ষার্থীদের ক্লাস বর্জন, সকল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন এবং অফলাইনে জনসংযোগ ও সমন্বয়– চট্টগ্রাম, খুলনা ও গোপালগঞ্জে সড়ক অবরোধ।
৬ জুলাই– দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ ও অবরোধ কর্মসূচি। ছাত্র ধর্মঘট এবং সারাদেশে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধের ডাক দিয়ে ‘বাংলা ব্লকেড’।
৭ জুলাই– বাংলা ব্লকেডে স্থবির রাজধানী। অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা। দেশের বিভিন্ন স্থানে অবরোধ।
৮ জুলাই– বাংলা ব্লকেডের দ্বিতীয় দিন রাজধানীতে। দেশের বিভিন্ন স্থানে মহাসড়ক, রেলপথ অবরোধ। নাহিদ ইসলাম এক দফা ঘোষণা করেন। সরকারি চাকরিতে সব গ্রেডে অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করে শুধু সংবিধান অনুযায়ী অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যূনতম কোটা রেখে সংসদে আইন পাস করতে হবে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নামে ৬৫ সদস্যের সমন্বয়ক টিম গঠন।
৯ জুলাই, মঙ্গলবার
তৃতীয় দিনে চার ঘণ্টা ব্লকেড রাজধানীতে। হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে দুই শিক্ষার্থীর আবেদন। শুনানি পরের দিন। অবশ্য ওই দুই শিক্ষার্থীর আবেদনের সঙ্গে সম্পর্ক নেই জানিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীদের।
আন্দোলনের অংশ হিসেবে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা চার ঘণ্টা পর অবরোধ তুলে নেন। আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে পরদিন সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা ‘বাংলা ব্লকেড’ নামে অবরোধ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়।
১০ জুলাই, বুধবার
সরকারি চাকরিতে সরাসরি নিয়োগে (৯ম থেকে ১৩তম গ্রেড) কোটার বিষয়ে পক্ষগুলোকে চার সপ্তাহের জন্য স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে নির্দেশ আপিল বিভাগের। প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের আপিল বিভাগ এ আদেশ দেন। শুনানির জন্য আগামী ৭ আগস্ট দিন রাখা হয়।
শুনানির একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, ‘আমরা এই সমাজের মানুষ, কিছু কথা বলতেই হয়। সেটি হচ্ছে যে একটা রায় হাইকোর্টে হয়ে গেছে। ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলন করছে। সেখানে তারা যেটা করেছে, এটা অ্যাপ্রিশিয়েট (প্রশংসা) করার মতো না। মনে হয়, তারা ভুল বুঝেই করেছে। যা-ই হোক যেটিই করেছে, তারা আমাদেরই ছেলে-মেয়ে।’
প্রধান বিচারপতি আরও বলেন, ‘আমি প্রথম দিনই বলেছিলাম, রাস্তায় স্লোগান দিয়ে রায় পরিবর্তন হয় না। এটা আজকে না, আমি যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ছিলাম, তখন একটি মামলায় বলেছিলাম, রাস্তায় স্লোগান দিয়ে রায় পরিবর্তন করা যায় না। এটি সঠিক পদক্ষেপ না।’
অন্যদিকে সরকারি চাকরির সব পদে কোটা সংস্কারের দাবি করেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা। তাঁরা মনে করছেন, এটি সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়।
১১ জুলাই, বৃহস্পতিবার
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীরা সর্বোচ্চ আদালতের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শন করছেন। এটি অনভিপ্রেত ও সম্পূর্ণ বেআইনি। ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন ওবায়দুল কাদের।
সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, শিক্ষার্থীরা ‘লিমিট ক্রস’ করে যাচ্ছেন।
এ দিন পুলিশের বাধার মুখেই দেশের বিভিন্ন স্থানে অবরোধ পালন করেন আন্দোলনকারীরা।
১২ জুলাই, শুক্রবার
কোটা সংস্কারের দাবিতে শুক্রবার ছুটির দিনেও দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল শেষে শিক্ষার্থীরা শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন। রেলপথ অবরোধ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
১৩ জুলাই, শনিবার
সব গ্রেডে কোটার যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা। পরের দিন রোববার গণপদযাত্রা করে রাষ্ট্রপতি বরাবর এ স্মারকলিপি দেবেন আন্দোলনকারীরা।
তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত বলেন, বিচারাধীন বিষয়ে সরকারের এখন কিছু করার নেই।
১৪ জুলাই, রোববার
গণভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বললেন, ‘কোটা বিষয়ে আমার কিছু করার নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘মামলার পর আদালত যে রায় দেন, এতে নির্বাহী বিভাগের কিছু করার নেই। আদালতেই সমাধান করতে হবে।’ শেখ হাসিনা আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরা পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা চাকরি পাবে?’
২০১৮ সালের আন্দোলন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, সে সময়ে তিনি বিরক্ত হয়ে কোটা বাতিল করে দিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল কোটা বাতিল হলে কী হয় সেটি দেখা। এ সময় বিসিএসে নারীরা বাদ পড়েছেন, ২৩টি জেলার কেউ পুলিশে চাকরি পাননি।
একই দিনে পদযাত্রা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দিয়ে আন্দোলনকারীরা জাতীয় সংসদে জরুরি অধিবেশন ডেকে সরকারি চাকরির সব গ্রেডের কোটার যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে সরকারকে ২৪ ঘণ্টার সময় বেঁধে দেন।
পরে মধ্যরাতে সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের অবমাননা করা হয়েছে দাবি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করলে হামলা চালায় ছাত্রলীগ। মিছিল হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও।
রাত ১০টা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হলে বিক্ষোভের পর মধ্যরাতে শিক্ষার্থীরা জড়ো হন টিএসসির রাজু ভাস্কর্যে। জমায়েতে শিক্ষার্থীরা ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’সহ নানা ধরনের স্লোগান দেন।
বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে যা বললেন কোটাবিরোধী শিক্ষার্থীরা
যুগান্তর প্রতিবেদন, প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৪, ০৩:৫০ পিএম
কোটাবিরোধী শিক্ষার্থীরা। ছবি: সংগৃহীত
কোটাবিরোধী আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ, মামলা তুলে নেওয়া ও কোটা সংস্কারের একদফা বাস্তবায়নের দাবিতে রাষ্ট্রপতিকে স্মারকলিপি দিতে বঙ্গভবনে যাওয়া শিক্ষার্থীরা বের হয়েছেন।
রোববার দুপুর ২টা ৫২মিনিটে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা বঙ্গভবন থেকে বের হন। এর আগে দুপুর আড়াইটার দিকে তারা বঙ্গভবনে প্রবেশ করেন।
রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি দেন তারা এবং সেটি রাষ্ট্রপ্রতির সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আদিল চৌধুরী স্মারকলিপি গ্রহণ করেন।
বঙ্গভবন থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের শিক্ষার্থীরা বলেন, শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। পাশাপাশি কোটা বাতিল করে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তবে, কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ লেলিয়ে দেবেন না।
তারা আরও বলেন, সরকার থেকে এখনো আশ্বাস পাচ্ছি না। কোটা সংস্কারের এখতিয়ার সরকারের। কিন্ত সরকার এড়িয়ে যাচ্ছে।
এদিন শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদলে ছিলেন নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, সার্জিস আলম, আরিফ হোসেন, হাসিব আল ইসলাম, উমামা ফাতেমা, রিফাত রশিদ, সুমাইয়া, আব্দুল হান্নান মাসুদ, মো. মাহিন সরকার, আব্দুল কাদের ও মেহেরান নিসা।
দুপুরে রাষ্ট্রপতিকে স্মারকলিপি দিতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের গণপদযাত্রা জিরো পয়েন্টে আটকে দেয় পুলিশ। তবে সেই ব্যারিকেড ভেঙে বঙ্গভবনের দিকে চলে যায় শিক্ষার্থীদের একাংশ। এরপর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে তাদের আটকে দেয় পুলিশ। সেখানে পুলিশ ও শিক্ষার্থীরা মুখোমুখি অবস্থান নেন।
১৫ জুলাই, সোমবার
বেলা দুইটায় রাজধানীর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দুপুর দুইটায় কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ স্লোগানের জবাব ছাত্রলীগই দেবে বলে মন্তব্য করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, আন্দোলন থেকে আত্মস্বীকৃত রাজাকার ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ মানসিকতা বা আচরণের প্রকাশ ঘটেছে। এর জবাব দেওয়ার জন্য ছাত্রলীগ প্রস্তুত।
এর পরে দুপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলনে যাঁরা ‘আমি রাজাকার’ স্লোগান দিচ্ছেন, তাঁদের শেষ দেখিয়ে ছাড়বেন বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন। এরপরই ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর ব্যাপকভাবে হামলা চালায়। দফায় দফায় ছাত্রীদেরও ধরে ধরে পেটানো হয়। গুলি করা হয় শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে।
বেলা তিনটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দফায় দফায় ছাত্রলীগ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় আন্দোলনকারীদের মারধর করা হয়। গুলি করতেও দেখা যায়। দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা হয়। আহত ২৯৭ জন ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নেন।
হামলার প্রতিবাদে আন্দোলনকারী ও ছাত্রলীগ উভয়েরই সমাবেশ করার ঘোষণা। অহিংস এই আন্দোলন সহিংস হয় ১৫ জুলাই থেকেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫ জুলাইয়ের ঘটনা:
কাজী মোহাম্মাদ মাহবুবুর রাহমান
আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২৪, ১৩: ১৬
নারী শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীদের হামলা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, ১৫ জুলাই ২০২৪প্রথম আলো
শিক্ষার্থী-জনতার বিপ্লবপূর্ববর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে খুব বেশি প্রয়োজনীয় মনে হত না। বরং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে বেশি সময় দেওয়াকে বিপজ্জনক কাজ বলে নিরুৎসাহিত করতাম। কিন্তু শিক্ষার্থী-জনতার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এই মাধ্যমগুলোর ভূমিকা আমার আগের অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও এ ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীকে পরিমিতিবোধের দিকেও দৃষ্টি রাখতে হবে।
সম্ভবত ১৬ সেপ্টেম্বর, ফেসবুক ঘাঁটতে গিয়ে এক শিক্ষার্থীর প্রোফাইল পিকচার পরিবর্তন নজরে এল। ছবিটি সেই ছবিগুলোর একটি, যা ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ছবিতে দেখা যাচ্ছে যে ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন ছাত্রীকে কোনো একজন যুবক মারধর করেছে অথবা করতে উদ্যত হয়েছে। এ ঘটনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী, সাবেক শিক্ষার্থী ও বর্তমান শিক্ষকদের কাছে যতটা মর্মান্তিক, তার চেয়ে লজ্জার। মনে হয়েছিল নিজের বাড়িতে নিজের মেয়েদের বাইরের লোকজন এসে মেরে চলে গেল। আর আমরা কাপুরুষের মতো তা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম।
এটা বেদনার এই জন্য যে নিজের মেয়েদেরও আমরা নিজেদের ঘরে—এই বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপত্তা দিতে পারলাম না। ছাত্রীদের ওপরে আক্রমণ, আক্রমণের চরিত্র ও ধরন এবং আক্রমণকারীদের পরিচয় (যতটুকু পত্রিকায় এসেছিল), তা দেখে ঘরে থাকা কারও কারও জন্য প্রায় অসম্ভব ছিল। সেদিন গুটিকয় শিক্ষক সেই পীড়ন অনুভব করে বের হয়েছিলেন। শিক্ষার্থী-জনতার আন্দোলনে সেই ছবিটা অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছিল, অন্তত আমার ক্ষেত্রে।
এই ছবিটাসহ আর কতগুলো ছবির কারণেই আমরা কেউ কেউ ঝুঁকি সত্ত্বেও শিক্ষার্থী আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণ করি। ১৬ সেপ্টেম্বর সেই পীড়নের কথা মনে হতেই নিজের ফেসবুকে একটি কমিশন গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করি। এক শিক্ষার্থী সেদিন মেসেজ করে জানিয়েছিল যে তারা একটি আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কমিশন গঠনের দাবিও করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর এই হামলার ঘটনা তদন্তের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গত প্রশাসনও একটা কমিটি করেছিল। সেই কমিটির কাজ কতটুকও এগিয়েছে জানা নেই। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপ্লব–পরবর্তী প্রশাসন গত ২৯ সেপ্টেম্বর একটি নতুন কমিটি গঠন করেছে।
ছাত্রীদের ওপরে আক্রমণ, আক্রমণের চরিত্র ও ধরন এবং আক্রমণকারীদের পরিচয় (যতটুকু পত্রিকায় এসেছিল), তা দেখে ঘরে থাকা কারও কারও জন্য প্রায় অসম্ভব ছিল। সেদিন গুটিকয় শিক্ষক সেই পীড়ন অনুভব করে বের হয়েছিলেন। শিক্ষার্থী–জনতার আন্দোলনে সেই ছবিটা অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছিেল।
১৫ তারিখের ঘটনা এতটা গুরুত্বপূর্ণ কেন? এ ঘটনা আওয়ামী সরকার পতনের আন্দোলন তরান্বিত করেছিল। গত ১৫ বছর রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের শত অত্যাচার সত্ত্বেও সামাজিক জনমত তৈরি করতে পারেনি। সরকার–সমর্থক গোষ্ঠীর আক্রমণে ১৫ তারিখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, বিশেষ করে মেয়ে শিক্ষার্থীরা নির্মম অত্যাচারের শিকার না হলে সরকার পতনের বিষয় সামনে আসতে পারত কি না, আমার সন্দেহ হয়।
১৫ তারিখ পর্যন্ত এই আন্দোলন ছিল কোটাসংশ্লিষ্ট বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন। ১৫ তারিখের পরে এটা হয়ে গেল ‘নিরাপদ ক্যাম্পাসে আমার মেয়েদের মারবে কেন’—সরকারবিরোধী আন্দোলন। সরকার হত্যাযজ্ঞে সেই সময় লিপ্ত না হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মেয়ে শিক্ষার্থীদের লাঞ্ছিত করার জন্য যে সামাজিক ক্ষোভ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল, তা সামাল দিতে পারত না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা পরিচয়ের কারণে এই আন্দোলনের মানসিক ও সামাজিক আবেগ দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আবেদনের সঙ্গে মিশে গিয়ে এক নতুন ক্ষোভের বাংলাদেশ তৈরি করত। ভাগ্য ভালো যে এত দিন অপেক্ষা করতে হয়নি। আবার ভাগ্য খারাপ, কারণ এই আন্দোলনের পরিক্রমায় সরকারের দ্রুত পতনের জন্য অনেক রক্ত দিতে হলো।
১৫ জুলাইয়ের ঘটনার সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ের তোফাজ্জল হত্যা যুক্ত হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডটি অত্যন্ত নির্মম, পীড়াদায়ক ও মর্মান্তিক। বৈষম্যবিরোধীদের ব্যাপক সাফল্যের পর এই ক্যাম্পাসে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড সবাইকে মর্মাহত করেছে। এ ক্ষেত্রে বিচারের আহ্বান এড়িয়ে না গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ সবার মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি করেছে। আশা করছি, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই দ্রুত বিচারের মুখোমুখি হবে। তবে নিপীড়নের শিকার এই ব্যক্তিকে কেন আহত অবস্থায় উদ্ধার করা গেল না—এই প্রশ্নটা এখনো গুরুত্বপূর্ণ। এটা কি ক্রিমিনালাইজেশন অব পলিটিকসের মাধ্যমে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা কি না, সেটাও খতিয়ে দেখা দরকার।
আমাদের রাজনৈতিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক ও সামাজিক স্বাস্থ্যও যে ব্যাধিগ্রস্ত, এই হত্যাকাণ্ড আমাদের এটা আবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। এ জন্য ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ে টেকসই শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে হলে যেকোনো নির্যাতন ও নিপীড়নের ক্ষেত্রে প্রিএমটিভ মেজারস কীভাবে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে বেশ ভাবতে হবে। হত্যাকাণ্ড ঘটার পর বিচারের ব্যবস্থা যেন প্রয়োজন না হয়, আগেই যেন তাকে উদ্ধার করা যায়, সেইটাই এখন দরকার।
অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। অথচ প্রথমে দরকার ক্ষত সারানোর। ক্ষত সারিয়ে নিরাপদে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়ায় কীভাবে শিক্ষার্থীরা টেকসইভাবে শ্রেণিকক্ষে থাকতে পারে এবং নিজেদের লেখাপড়ায় মনোযোগ দিতে পারে, সেই মানসিক ও সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। অন্যথায় তোফাজ্জল হত্যাকাণ্ড ছাড়াও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি হওয়া নতুন মোমেন্টাম নতুন সংকট নিয়ে আসতে পারে। শিক্ষার্থীদের মানসিক পীড়ার মধ্যে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা কঠিন। আর ইতিবাচক পরিবেশ ছাড়া পড়াশোনার টেকসই পরিবেশ তৈরি যাবে—এটা ভাবা ভুল। আশা করি, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালকেরা আমাদের সবার আন্তরিক সহযোগিতায় দ্রুত শিক্ষাবান্ধব একটা পরিবেশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিশ্চিত করতে পারবেন।
১৫ জুলাই থেকে আজকে পর্যন্ত প্রায় আড়াই মাসের বেশি অতিবাহিত হয়েছে। নতুন কমিটি গঠিত হয়েছে। এই কমিটির কার্যকর সুপারিশের ওপর নির্ভর করবে আগামীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্র। কমিটির বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য থাকলেও তাদের অনেক সময় দেওয়ার সুযোগ নেই। ১৫ জুলাই থেকে ঘটা ঘটনাগুলো উদ্ঘাটন করে, দ্রুত সত্যিকারের দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে বিচারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে এই কমিটিকে রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন—উভয়কেই সহযোগিতা করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় এক সামাজিক সত্ত্বা। এখানে জাতি, ধর্ম ও জেন্ডার পরিচয়ের বিস্তৃত অবয়বের স্থান থাকতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে নতুন রাজনৈতিক সমাজ নির্মাণের সহযোগি করে গড়ে তুলতে হবে। সমাজে রাজনৈতিক স্বপ্নের জন্য মানসিক তাড়না তৈরি না করলে সবই ব্যর্থ হতে পারে। বর্তমান রাজনৈতিক ভাবনাগুলো যাঁচাই করে তা বাস্তবায়নে যথার্থ কর্মসূচি আর তা তদারকের চৌকস কাঠামো এখনো প্রত্যক্ষভাবে সামনে আসেনি। সময় এত নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এত সময় থাকেও না।
কাজী মোহাম্মাদ মাহবুবুর রাহমান, সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৬ জুলাই, মঙ্গলবার
সারা দেশে দিনভর ব্যাপক বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ। আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করে ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ সরকার সমর্থকেরা। এতে নিহত হন ছয়জন। রংপুরে আন্দোলনকারী বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের বুলেটে নিহত হওয়ার সচিত্র ছবি প্রকাশ পায়।
রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ ছিলেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক। শিক্ষার্থীদের মিছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পার্কের মোড়ে এলে তিনি ছিলেন সবার আগে। গত মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) একপর্যায়ে পুলিশ রাবার বুলেট ছুড়তে শুরু করলেও সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকেন। ছবি: যমুনা টেলিভিশনের ভিডিও চিত্র থেকে নেওয়া
সত্যিই গুলি করা হবে, তা হয়তো ভাবতে পারেননি বিক্ষোভকারীরা। সাধারণ মানুষও ভাবতে পারেননি, কয়েক দিনেই ২০০ জনের বেশি শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে মেরে ফেলা হবে। কেউ হয়তো ভাবতে পারেননি, ঘরের মধ্যে থাকা শিশু, ছাদে থাকা কিশোরী, বারান্দায় থাকা মানুষ গুলিতে নিহত হবেন।
রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে খুব কাছ থেকে গুলি করে খুন করে পুলিশ। সেই ভিডিও চিত্রই কাজ করেছে বারুদে একটি দেশলাইয়ের কাঠির মতো। এরপর দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। স্লোগান দেওয়া হয় এই বলে যে ‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি, গুলি কর।’
এ অবস্থায় সরকার সব ধরনের ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয় ১৭ জুলাই। ফলে বন্ধ থাকে অনলাইন সংবাদমাধ্যম।
বিকেলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘আন্দোলন যাবে, আন্দোলন আসবে। কিন্তু ছাত্রলীগ থাকবে। সবকিছুই মনে রাখা হবে এবং জবাব দেওয়া হবে। একটি ঘটনাও জবাব ছাড়া যাবে না। রাজাকারদের ফাঁদে পড়ে ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করলে ভবিষ্যতে আমরা দেখে নেব, কত ধানে কত চাল হয়।’
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের নতুন কর্মসূচি। নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে বুধবার ১৭ জুলাই গায়েবানা জানাজা ও কফিন মিছিল করবেন তাঁরা।
১৭ জুলাই, বুধবার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের বিতাড়ন করে ‘রাজনীতিমুক্ত’ ঘোষণা।
ছুটির দিনেও ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছাত্র বিক্ষোভ, সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ, গায়েবানা জানাজা, কফিন মিছিল এবং দফায় দফায় সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা। পুলিশের কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের মুখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের কফিন মিছিল পণ্ড হয়ে যায়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হল বন্ধের ঘোষণা ও পুলিশের তৎপরতার মুখে অনেক শিক্ষার্থী সন্ধ্যা নাগাদ ক্যাম্পাস ছেড়ে যান। তবে হল বন্ধের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে রাতেও অনেক ছাত্রছাত্রী হল ও ক্যাম্পাসে অবস্থান করছিলেন।
রাত সাড়ে সাতটায় জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ। ছয়জন নিহত হওয়ার ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ। একই সঙ্গে তিনি আন্দোলনকারীদের সর্বোচ্চ আদালতের রায় আসা পর্যন্ত ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান।
প্রায় আট মিনিটের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, আমাদের ছাত্রসমাজ উচ্চ আদালত থেকে ন্যায়বিচারই পাবে, তাদের হতাশ হতে হবে না।’
১৮ জুলাই, বৃহস্পতিবার
দেশব্যাপী প্রতিরোধ, সহিংসতা, সংঘর্ষ ও গুলি। মোট নিহত ২৭ জন। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ঢাকাসহ সারা দেশ ছিল প্রায় অচল। রাজধানী ছাড়াও দেশের ৪৭টি জেলায় দিনভর বিক্ষোভ, অবরোধ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, পুলিশের হামলা-গুলি ও সংঘাতের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত দেড় হাজার। কোথাও কোথাও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের, আবার কোথাও সরকার-সমর্থক বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষ হয়।
‘শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও সোয়াটের ন্যক্কারজনক হামলা, খুনের প্রতিবাদ, খুনিদের বিচার, সন্ত্রাসমুক্ত ক্যাম্পাস নিশ্চিত করা এবং কোটাব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে’ দলে দলে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে এলে সংঘর্ষের এসব ঘটনা ঘটে।
সারা দেশে বিজিবি মোতায়েন করা হয়।
১৯ জুলাই, শুক্রবার
কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ বা সর্বাত্মক অবরোধের কর্মসূচি ঘিরে রাজধানী ঢাকায় ব্যাপক সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর, গুলি, অগ্নিসংযোগ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। রাজধানী ঢাকা ছিল কার্যত অচল, পরিস্থিতি ছিল থমথমে। দেশের বিভিন্ন জেলাতেও ব্যাপক বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও সহিংসতা হয়।
এদিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গুলি ও সংঘর্ষে অন্তত ৪৪ জন নিহত হন। আর সারা দেশে নিহতের সংখ্যা ছিল ৫৬ জন। আহত হন শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, পুলিশ, সাংবাদিক, পথচারীসহ কয়েকশ। শুরু থেকে এ আন্দোলনে ছিলেন শুধু শিক্ষার্থীরা। তবে ১৮ জুলাই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় লোকজনকেও অংশ নিতে দেখা গেছে।
সর্বাত্মক অবরোধের কর্মসূচি ঘিরে গত তিন দিনে সারা দেশে নিহত হন ১০৩ জন। এর মধ্যে মঙ্গলবার নিহত হন ৬ জন, বৃহস্পতিবার ৪১ জন এবং শুক্রবার নিহত হন ৫৬ জন।
১৯ জুলাই কারফিউ জারি করার বিষয়টি জানিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘শুট অন সাইট’ বা দেখামাত্র গুলির নির্দেশ জারি করা হয়েছে।
৯ দফা দাবি পূরণ করতে হবে : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন
নয়া দিগন্ত অনলাইন, ২৪ জুলাই ২০২৪, ১৯:৪৭
৯ দফা দাবি পূরণ করতে হবে : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন – ছবি : সংগৃহীত
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে ৯ দফা দাবি জানানো হয়েছে। আজ বুধবার দেশের বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৫২ সমন্বয়কের যৌথ বিবৃতিতে দাবিগুলো জানানো হয়।
বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘দেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সরকার সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর নির্যাতনের স্ট্রিম রোলার চালিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে তিন শতাধিক ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হয়েছে। কয়েকজন সমন্বয়ক ও সহ-সমন্বয়ককে গুম করে ফেলা হয়েছে। অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদের বাবা ছেলেকে ফিরে পেতে হাসপাতালের মর্গে পর্যন্ত ঘুরতে হচ্ছে৷ জানালার পাশে পড়ার সময় কোমলমতি শিশু সামিরকে হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এ অবস্থায় আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই, শুধুমাত্র আদালতের রায় ও প্রজ্ঞাপন দিয়ে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার করে সরকার দেশব্যাপী চালানো গণহত্যার দায় এড়াতে পারে না। আমাদের ৯ দফা দাবি এখন গণমানুষের দাবিতে পরিণত হয়ছে। এটি এখন গোটা বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির সনদ৷’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসুদের পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, ৯ দফা দাবি আদায়ে তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
তাদের ৯ দফা দাবি হলো :
১. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ছাত্র হত্যার দায় নিয়ে জাতির কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে ।
২. আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী সন্ত্রাসী কর্তৃক ছাত্র হত্যার দায় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে মন্ত্রীপরিষদ এবং দল থেকে পদত্যাগ করতে হবে।
৩. ঢাকাসহ যত জায়গায় শহিদ হয়েছে সেখানকার ডিআইজি, পুলিশ কমিশনার ও পুলিশ সুপারদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে হবে।
৪. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও প্রক্টরদের পদত্যাগ করতে হবে।
৫. যে পুলিশ সদস্যরা শিক্ষার্থীদের উপর গুলি করেছে, ছাত্রলীগ-যুবলীগসহ যে সকল সন্ত্রাসীরা শিক্ষার্থীদের উপর নৃশংস হামলা পরিচালনা করেছে এবং পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে তাদেরকে আটক করে এবং হত্যা মামলা দায়ের করে দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেফতার দেখাতে হবে।
৬. দেশব্যাপী যে সকল শিক্ষার্থী ও নাগরিক শহিদ ও আহত হয়েছে তাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে ।
৭. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগ নামক সন্ত্রাসী সংগঠনসহ সকল দলীয় লেজুড়ভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে ছাত্রসংসদকে কার্যকর করতে হবে।
৮. অবিলম্বে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হলগুলো খুলে দিতে হবে।
৯. কোটা আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কোনো ধরনের হয়রানি করা হবে না মর্মে অঙ্গীকার করতে হবে।
প্রেস বিজ্ঞপ্তি: আন্দোলনকারীরা জানান, ৯ দফা দাবি না মানা পর্যন্ত চলবে ‘শাটডাউন’।
রাতে সারা দেশে কারফিউ জারি, সেনাবাহিনী মোতায়েন। ইন্টারনেট সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ।
২০ জুলাই, শনিবার
দেশজুড়ে কারফিউ, সেনা মোতায়েন। সাধারণ ছুটি ঘোষণা। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, ধাওয়া ও গুলি। উল্লেখযোগ্য স্থান হচ্ছে, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, বাড্ডা ও মিরপুর। এ ছাড়া মোহাম্মদপুরেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে শনিবার নিহত ২৬। সব মিলিয়ে চার দিনে নিহত ১৪৮। এর মধ্যে মঙ্গলবার ৬ জন, বৃহস্পতিবার ৪১ জন, শুক্রবার ৭৫ জন এবং শনিবার ২৬ জন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কারফিউ চলবে। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের’ অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে আইন শৃঙ্খলা বহিনী কর্তৃক তুলে নেওয়ার অভিযোগ করা হয়।
আন্দোলনের তিন সমন্বয়ক (হাসনাত আব্দুল্লাহ, সার্জিস আলম ও আবু বাকের মজুমদার)রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় তিন মন্ত্রীর (মহিবুল হাসান নওফেল, আলী আরাফাত ও আনিসুল হক) সঙ্গে দেখা করে ৯ দফাকে সংকুচিত করে আট দফা দাবি পেশ করেন।
কাজীপাড়া ও মিরপুর-১০ নম্বর মেট্রো স্টেশনে বিপুল ক্ষতি। গত শুক্রবার সরকারি তিন স্থাপনায় আগুনে ১১৩ যানবাহন পুড়ে ছাই হওয়ার খবর।
২১ জুলাই, রোববার
সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা পুনর্বহাল-সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় সামগ্রিকভাবে বাতিল (রদ ও রহিত) করে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় প্রদান। রায়ে বলা হয়, কোটাপ্রথা হিসেবে মেধাভিত্তিক ৯৩ শতাংশ; মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ; ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ১ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হলো। তবে নির্ধারিত কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কোটার শূন্য পদগুলো সাধারণ মেধাতালিকা থেকে পূরণ করতে হবে। এই নির্দেশনার আলোকে সরকারের নির্বাহী বিভাগকে অনতিবিলম্বে প্রজ্ঞাপন জারি করতে নির্দেশ দেন আপিল বিভাগ।
প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ সর্বসম্মতিতে এ রায় দেন। রায়ে বলা হয়, এই নির্দেশনা ও আদেশ সত্ত্বেও সরকার প্রয়োজনে ও সার্বিক বিবেচনায় নির্ধারিত কোটা বাতিল, সংশোধন বা সংস্কার করতে পারবে।
এদিকে পাঁচ দিনে মৃত্যু বেড়ে হয়েছে ১৭৪। আহত কয়েকজনের মৃত্যু হওয়ায় এবং আগের মৃত্যুর সংবাদ নিশ্চিত হওয়ার কারণে নিহতের সংখ্যা বাড়ছে। এর মধ্যে মঙ্গলবার নিহত হন ৬ জন, বৃহস্পতিবার ৪১ জন, শুক্রবার ৭৫ জন, শনিবার ২৬ জন এবং রোববার ১৯ জন।
আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। ৩০ ঘন্টা পর অচেতন অবস্থায় তাকে পূর্বাচল ৩০০ফিট রাস্তার পাশে ফেলে রাখা হয়। সেখানে জ্ঞান ফেরর পর তিনি রিক্সাযোগে হাসপাতালে ভর্তি হন।
চার দফা দাবি পূরণের জন্য বৈষম্যবারোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কেরা ৪৮ ঘন্টা সময় বেঁধে দিলেন। চার দফা দাবির মধ্যে রয়েছে, ইন্টারনেট সংযোগ চালু করা, শিক্ষার্থীদের আসার ব্যবস্থা করে দিয়ে হল খুলে দেওয়া, আন্দোলনের সমন্বয়কদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কারফিউ তুলে দেওয়া। এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন চারজন সমন্বয়ক।
একই দিনে বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৫৬ সমন্বয়কের যৌথ বিবৃতি’ শিরোনামে একটি খুদে বার্তা গণমাধ্যমকর্মীদের মুঠোফোনে পাঠানো হয়। যৌথ বিবৃতিতে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ (সর্বাত্মক অবরোধ) কর্মসূচি আরও জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়। এতে বলা হয়, শুধু আদালতের রায়ের মাধ্যমে হত্যার দায় এড়াতে পারে না সরকার। বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সরকার সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। ‘তিন শতাধিক’ ছাত্র-জনতাকে হত্যা করার অভিযোগ করা হয়েছে বিবৃতিতে।
এ ছাড়া বিবৃতিতে বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রথম সারির কয়েকজন সমন্বয়ককে পুলিশি হেফাজতে নিয়ে মনগড়া বক্তব্য আদায়ের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালানো হয়েছে। এ ছাড়া সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদারসহ কয়েকজনের সন্ধান দাবি করা হয়েছে।
২২ জুলাই, সোমবার
কোটাপ্রথা সংস্কার করে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তৈরি করা প্রজ্ঞাপন অনুমোদন দেন প্রধানমন্ত্রী। এ দিন সংঘর্ষে আরও ১৩ জন নিহতের খোঁজ পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন সোমবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। নারায়ণগঞ্জে তিনজন গত শনিবার মারা যান, যাঁদের লাশ উদ্ধার করা হয় সোমবার। আর রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে (মিটফোর্ড হাসপাতাল) গত শুক্রবার চারটি মরদেহ নেওয়া হয়েছিল বলে সোমবার খবর পাওয়া যায়। এর বাইরে একজন পুলিশ সদস্যের মৃত্যুর তথ্য এদিন জানা যায়। সব মিলিয়ে ছয় দিনে মোট ১৮৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেল। তাঁদের মধ্যে মঙ্গলবার ৬, বৃহস্পতিবার ৪১, শুক্রবার ৭৯, শনিবার ৩৬, রোববার ২০ ও সোমবার ৫ জন নিহত হয়েছেন।
২৩ জুলাই, মঙ্গলবার
কোটাপ্রথা সংস্কার করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সর্বশেষ মঙ্গলবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ছাত্র হৃদয় চন্দ্র তরুয়া (২২)। তিনি গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে গুলিবিদ্ধ হন।
মঙ্গলবার নতুন করে খোঁজ পাওয়া যায় আরও আটটি মৃত্যুর। এর মধ্যে ঢাকার ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালে পাঁচজন এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুজনের মৃত্যু হয়। সাভারে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খোঁজ পাওয়া গেছে নিহত আরেক ব্যক্তির। এ দিন পর্যন্ত ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষে ১৯৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। মৃত্যুর এই হিসাব কিছু হাসপাতাল, মরদেহ নিয়ে আসা ব্যক্তি ও স্বজনদের সূত্রে পাওয়া।
২৪ জুলাই–বুধবার
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদার ও রিফাত রশীদের খোঁজ পাওয়া যায়। নিখোঁজ থাকার পাঁচ দিন পর আসিফ ও বাকেরকে চোখ বাঁধা অবস্থায় ফেলে যাওয়া হয়েছে বলে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে দু’জনই জানিয়েছেন। রিফাত আত্মগোপনে। এদিন পর্যন্ত ২০১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।
২৫ জুলাই– বৃহস্পতিবার
ছুটির দুই দিন শুক্র ও শনিবার কারফিউ শিথিল থাকবে ৯ ঘণ্টা। শেখ হাসিনার মেট্রোস্টেশন পরিদর্শন। আইন পাস না হওয়ায় দাবি আদায় হয়নি বলে মন্তব্য আন্দোলনকারীদের; তারা রাজপথে থাকার ঘোষণা দেন। এদিন পর্যন্ত মোট ২০৪ জনের মৃত্যুর খবর।
২৬ জুলাই– শুক্রবার
সারাদেশে অভিযান, ব্লক রেইড; অন্তত ৫৫৫টি মামলা। গ্রেপ্তারের সংখ্যা ৬ হাজার ২৬৪। বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসারত আরও তিনজনসহ পাঁচজনের মৃত্যু। গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল থেকে নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদারকে জোর করে তুলে নিয়ে ডিবি হেফাজতে রাখা হয়। (নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক প্রথম আলো)
নাহিদ ইসলামসহ কোটা সংস্কার আন্দোলনের তিন সমন্বয়ককে রাজধানীর গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল থেকে তুলে নিয়ে গেছেন সাদাপোশাকের এক দল ব্যক্তি। তাঁরা নিজেদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়েছেন বলে সেখানে উপস্থিত এক সমন্বয়কের স্বজন ও হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।
আজ শুক্রবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে তিনজনকে তুলে নেওয়া হয়। অপর দুই সমন্বয়ক হলেন আসিফ মাহমুদ ও আবু বাকের মজুমদার। তাঁদেরকে কারা নিয়েছেন বা কোথায় নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য জানা যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ওই ব্যক্তিদের কেউ কেউ নিজেদের গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), আবার কেউ পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সদস্য পরিচয় দিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) প্রধান মো. আসাদুজ্জামান রাত সাড়ে আটটার দিকে প্রথম আলোকে বলেন, নাহিদ ইসলামসহ কোটা সংস্কার আন্দোলনের তিন সমন্বয়কের কাউকে তাঁরা নেননি। রাত সোয়া ৯টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ঢাকা মহানগর পুলিশের অন্য কোনো ইউনিট থেকেও তিন সমন্বয়ককে তুলে নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করা হয়নি।
নাহিদ, আসিফ ও আবু বাকের—তিনজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা দাবি আদায়ে সারা দেশে কমপ্লিট শাটডাউন (সর্বাত্মক অবরোধ) কর্মসূচি দেওয়ার পর ১৯ জুলাই মধ্যরাতে খিলগাঁওয়ের নন্দীপাড়ায় এক বন্ধুর বাসা থেকে নাহিদকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। এক দিন পর পূর্বাচল এলাকায় তাঁকে ফেলে যাওয়া হয়। নাহিদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছিল আঘাতের চিহ্ন। এরপর থেকে তিনি এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অপর দুই সমন্বয়ক আসিফ ও বাকেরকেও এর মধ্যে ১৯ জুলাই তুলে নেওয়া হয়েছিল। পাঁচ দিন পর তাঁদের দুজনকে চোখ বাঁধা অবস্থায় যেখান থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল, সেখানে ফেলে যাওয়া হয়। এরপর থেকে আসিফও এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর সঙ্গে থাকছিলেন বাকের।
তিনজনকে তুলে নেওয়ার খবর জানাজানি হলে গণমাধ্যমকর্মীরা বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে যায়। নাহিদ হাসপাতালের ৭০৩ নম্বর কক্ষে এবং আসিফ ৩১১ নম্বর কক্ষে ভর্তি ছিলেন। নাহিদের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী আর আসিফের সঙ্গে বাকের ছিলেন। হাসপাতালে উপস্থিত নাহিদের স্বজনেরা জানান, বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে একদল লোক এসে প্রথমে নাহিদকে তুলে নিয়ে যান। পরে আসিফ ও বাকেরকে নিয়ে যান।
নাহিদকে তুলে নেওয়ার বিষয়টি জানতে পেরে তাঁর স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তিনি এখন ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সঙ্গে থাকা তাঁদের স্বজন ফাতিমা তাসনীম প্রথম আলোকে বলেন, বিকেলে তিনি নাহিদের কক্ষেই ছিলেন। হাসপাতালের যে ছেলেটি খাবার দিত, তাকে আটক করা হয়েছে, এমন খবর শুনে তিনি নাহিদের কক্ষ থেকে আসিফের কক্ষে যান। তখন চারজন ব্যক্তি আসিফ ও বাকেরকে ধমকাচ্ছিলেন।
ফাতিমা তাসনীম বলেন, ‘ওই ব্যক্তিরা আসিফ ও বাকেরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য টানাহেঁচড়া শুরু করলে আমি ও হাসপাতালের নার্সরা তাঁদের বলি, রোগীদের ডিসচার্জ করা হয়নি। তখন ওই ব্যক্তিরা নার্সদের ইনচার্জকে বলেন, “আমাদের চেনেন? কাউন্টার টেররিজম সম্পর্কে আপনাদের ধারণা আছে?” এরপর কোনো কথা না শুনে তাঁরা আসিফ ও বাকেরকে নিয়ে যান। দুজনের মুঠোফোনও নিয়ে যান। এরপর জানতে পারি, নাহিদকেও তুলে নেওয়া হয়েছে।’
ঘটনার বিষয়ে আসিফ মাহমুদের চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, আজ সকাল সাতটার দিকে হাসপাতালে এসে আসিফ মাহমুদের কক্ষের সামনে গিয়ে অপরিচিত তিনজন মানুষকে দেখতে পান। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষও বাড়তে থাকে। ওই ব্যক্তিদের কেউ কেউ তাঁর পরিচয় জানতে চান। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে ডিবি ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কয়েকজন এসে আসিফকে তাঁদের সঙ্গে যেতে বলেন জানিয়ে ওই চিকিৎসক বলেন, ‘আমাকেও তাঁরা সরে যেতে বলেন। কিন্তু রোগীর প্রতি দায়িত্বের জায়গা থেকে সরিনি। তাঁরা রোগীকে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার কথা বলছিলেন। আমি তাঁদের বলি, ডিসচার্জ না করে কোনো রোগীকে আমরা ছাড়তে পারি না। আসিফের শারীরিক অবস্থা এতই খারাপ ছিল যে তিনি ডিসচার্জের উপযোগী ছিলেন না। তাঁর শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন না থাকলেও কিছু একটা ইনজেক্ট করা হয়েছিল। তিনি হাসপাতাল থেকে যেতে চাননি। আমরাও ছাড়তে চাইনি। কিন্তু তাঁদের চাপাচাপির কারণে বাধ্য হয়ে তাঁকে ডিসচার্জ অন রিস্ক বন্ড করতে হয়।’
চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা হাসপাতালের একজন শিক্ষানবিশ চিকিৎসক প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বাস্থ্যকর্মীরা আমাকে জানান যে কাউন্টার টেররিজমের কর্মকর্তারা এসেছেন রোগী আসিফ মাহমুদকে নিয়ে যেতে। রোগী যেতে চাইছিলেন না, আমরাও ছাড়তে চাইনি। তাঁদের জোর করেই নিয়ে যাওয়া হয়।’ পরে রাতে ডিবির পক্ষ থেকে তাঁদের হেফাজতে নেওয়ার কথা জানানো হয়। নাহিদ, আসিফ ও বাকের এখনো ডিবির হেফাজতে আছেন।
২৭ জুলাই– শনিবার
সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহকে ডিবি হেফাজতে নেয়া হয়। ১১ দিনে গ্রেপ্তার ৯ হাজার ১২১ জন। এর মধ্যে রাজধানীতে গ্রেপ্তার ২ হাজার ৫৩৬ জন। অন্যদিকে হাসপাতালে আরেক মৃত্যু। সব মিলিয়ে সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ২১০ জন। ঢাকায় কারফিউ শিথিল ১১ ঘণ্টা। শেখ হাসিনার পঙ্গু হাসপাতাল, সেতু ভবনসহ কয়েকটি স্থাপনা পরিদর্শন। [নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক প্রথম আলো]
কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আরও দুই সমন্বয়ককে হেফাজতে নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। তাঁরা হলেন সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহ।
শনিবার সন্ধ্যায় সারজিস ও হাসনাতকে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে বলে প্রথম আলোকে জানান ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. জুনায়েদ আলম সরকার। রাত পৌনে নয়টার দিকে তিনি বলেন, আজ সন্ধ্যায় সারজিস ও হাসনাতকে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এই দুজনকেও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দিতে ও সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সম্পর্কে তথ্য জানতে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
ডিবির হেফাজতে থাকা কোটা সংস্কার আন্দোলনের এই পাঁচ সমন্বয়কই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে নাহিদ ইসলাম সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র। আসিফ মাহমুদ ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের আর আবু বাকের মজুমদার ভূতত্ত্ব বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র। নতুন করে হেফাজতে নেওয়া সারজিস আলম প্রাণিবিদ্যা বিভাগের আর হাসনাত আবদুল্লাহ ইংরেজি বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র।
২৮ জুলাই– ২০২৪
কোটা সংস্কার আন্দোলনে ঢাবির শামসুন্নাহার হলের সমন্বয়ক নুসরাত তাবাসসুমকে ডিবি হেফাজতে নিয়ে যাওয়া হয়। ডিবি কার্যালয়ে থেকে ছয়জন সমন্বয়কের কর্মসূচি প্রত্যাহারের মিথ্যা ভিডিও প্রকাশ করা হয়। কিন্তু উক্ত ঘোষণায় বিভ্রান্ত না হয়ে বাকি সমন্বয়কদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়া হয়। মোবাইলে ইন্টারনেট সচল করা হয়।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্লাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলের সমন্বয়ক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নুসরাত তাবাসসুমকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নুসরাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলের আবাসিক শিক্ষার্থী তিনি। রোববার ভোর পাঁচটায় মিরপুরের রূপনগর আবাসিক এলাকার এক আত্মীয়ের বাসা থেকে ডিবি পরিচয়ে তাকে তুলে নেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আব্দুল হান্নান মাসউদ। এছাড়া আরেক সহ-সমন্বয়ক রশিদুল ইসলাম রিফাতও ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি জানিয়েছেন।
আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেন, ‘নুসরাত তাবাসসুম আপুকে আজ (রোববার) ভোরে সাদা পোশাকধারী আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নিয়ে গিয়েছে। অবিলম্বে তাদের সন্ধান ও মুক্তি চাই। এ নৈরাজ্য আর মেনে নেওয়া যায় না, দলমত নির্বিশেষে সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ এখন সময়ের দাবি।’
এদিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে এয়ারপোর্ট থানার মামলায় কারান্তরীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র শামসুজ্জামান অমির মুক্তি চেয়ে বিবৃতি দিয়েছে ইনস্টিটিউটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
গত ২৭ জুলাই দেওয়া এই বিবৃতিতে বলা হয়, ‘শামসুজ্জামান অমি কোটা সংস্কার আন্দোলনে শান্তিপূর্ণভাবে অংশ নিয়েছে। সে কোনোরূপ ভাঙচুর বা অরাজকতার সঙ্গে জড়িত নয়। কোনো ধরনের ছাত্ররাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিল না। আমরা অমির নিঃশর্ত মুক্তি চাই, অনতিবিলম্বে অমির বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে তাকে ছেড়ে দিতে হবে।’
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলির সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুই সমন্বয়ক নুসরাত তাবাসসুম ও আরিফ সোহেলের রোববার দেখা করার কথা ছিল। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি জানতে রাষ্ট্রদূত তাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তাই তাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক মো. আব্দুল হান্নান মাসউদ। রোববার দুপুরে ফোনে তিনি এই অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ডিবি পরিচয়ে মিরপুরের একটি বাসা থেকে ভোর পাঁচটায় নুসরাত তাবাসসুমকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ নেই। এর আগে রাত সাড়ে তিনটার দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থী ও বৈষম্য-বিরোধী ছাত্র আন্দোলন জাবি শাখার অন্যতম সমন্বয়ক আরিফ সোহেলকে তুলে নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের পরিস্থিতি জানতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলি তাদেরকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আমাদের প্রতিনিধি হিসেবে আজ রোববার তাদের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার কথা ছিল। তারা যেন বিশ্বের কাছে দেশের পরিস্থিতি তুলে ধরতে না পারেন, এই কারণে তাদের তুলে নেওয়া হয়েছে।
রোববারের কর্মসূচি সম্পর্কে তিনি বলেন, সারাদেশে গ্রেপ্তার আতঙ্ক এবং পুলিশ ও ছাত্রলীগের চোখ ফাঁকি দিয়ে শিক্ষার্থীরা দেয়াল লিখন ও গ্রাফিতি আঁকছেন। অনলাইন-অফলাইনে প্রচারণা চলছে। এছাড়া হত্যাকাণ্ডের শিকার মানুষদের তথ্য সংগ্রহের কাজও চলছে।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নুসরাত তাবাসসুম ও বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক আসিফ মাহতাবকে শনিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে রাজধানীর উত্তরার বাসা থেকে ডিবি হেফাজতে নেওয়ার কথা জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।
আজ রোববার রাজধানীর মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। তিনি বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে আজ আরও দুজনকে ডিবির হেফাজতে আনা হয়েছে। তাঁদের পরিবারকে উদ্বিগ্ন না হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তাঁদেরও নিরাপত্তার কারণে হেফাজতে নেওয়া হয় বলে শুক্রবার রাতে ডিবি জানায়। ডিবির হেফাজতে থাকা এই পাঁচ সমন্বয়কই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
২৯ জুলাই–২০২৪
জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত হয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের বৈঠকে। ৬ সমন্বয়ক ডিবি হেফাজতে। রাজধানীসহ দেশের বেশ কিছু স্থানে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ কর্মসূচিতে বাধা ও হামলার ঘটনা ছাত্রলীগ ও পুলিশের। সরকার ঘোষিত মঙ্গলবারের রাষ্ট্রীয় শোক প্রত্যাখ্যান করে একক বা ঐক্যবদ্ধভাবে লাল কাপড় মুখে ও চোখ বেঁধে ছবি তোলা এবং অনলাইনে প্রচার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
২৯ জুলাই শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ । ফাইল ছবি
দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে উল্লেখ করে সারা দেশে সোমবার ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ কর্মসূচি ও প্রতিবাদ সমাবেশ ঘোষণা করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। রোববার রাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আব্দুল কাদেরের গণমাধ্যমে পাঠানো বার্তায় এ কর্মসূচির কথা জানানো হয়।
এর আগে ডিবি কার্যালয়ে হেফাজতে থাকা আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ক কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরে বাকি সমন্বয়কদের পক্ষ থেকে পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ও ছাত্রলীগের আক্রমনে নিহত শত শত শহীদের আত্মত্যাগ তিরস্কার করে ডিবি কার্যালয়ে বন্দুকের নলের মুখে জিম্মি করে সমন্বয়কদের মাধ্যমে জোরপূর্বক স্ক্রিপ্টেড বিবৃতি আদায়ের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। আমাদের দাবি আদায়ে আমরা অবিচল ছিলাম, রয়েছি এবং থাকব। প্রিয় দেশবাসী ও ছাত্রসমাজ, বিগত কয়েকদিন যাবৎ গণহত্যা, গণগ্রেপ্তারের পর সরকার এখন এক নতুন নাটকের সৃষ্টি করেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের তুলে নিয়ে ডিবি কার্যালয়ে জিম্মি করে অস্ত্রের মুখে স্ক্রিপ্টেড বিবৃতি দিয়ে, ছাত্রসমাজের দাবিগুলোর প্রতি সরকার চরম ধৃষ্টতা প্রদর্শন করেছে।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘শুধু তাই নয়, সারা দেশে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত শহীদদের পরিবারকে হুমকি-ধমকি ও ভয়ভীতি দেখিয়ে, আর্মড ফোর্সকে ব্যবহার করে ঢাকায় এনে সরকার তাদের থেকে মিথ্যা জবানবন্দি নেওয়া ও সমস্ত দায় আন্দোলনকারীদের ওপর চাপিয়ে শহীদের রক্তের সঙ্গে তামাশা করেছে। আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে ভাই, জীবনের শেষনিশ্বাস পর্যন্ত ছাত্রসমাজ শহীদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করতে পারে না।’
বার্তায় আরও বলা হয়, ‘দেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সরকার সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের স্ট্রিম রোলার চালিয়ে যাচ্ছে। ব্যাপক হত্যাযজ্ঞের পর সরকার সারা দেশে রেইড করে গণগ্রেপ্তার করেছে। হাজার হাজার মামলা ও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। জানালার পাশে পড়ার সময় কোমলমতি শিশু সামিরকে হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর স্মরণকালের সবচেয়ে বড় বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়েছে। এমনকি স্কুল ও কলেজের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর ন্যক্কারজনক হামলা চালিয়ে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে আহত ও শহীদ করা হয়েছে। এই অবস্থায় আমরা কঠোর ভাষায় বলতে চাই, আমাদের দাবি আদায় না হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ছাত্রসমাজের আন্দোলন চলবে। আগামীকাল (সোমবার) সারা দেশে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ কর্মসূচি এবং প্রতিবাদ সমাবেশ। আমাদের দাবি আদায়ের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করতে বাংলাদেশের সব নাগরিককে অনুরোধ করছি। ‘
এর আগে ছয় সমন্বয়কের পক্ষে রেকর্ড করা এক ভিডিও বার্তায় রোববার লিখিত বক্তব্য পড়ে কর্মসূচি প্রত্যাহারের কথা জানান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। লিখিত বক্তব্যে নাহিদ ছাড়াও সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ, আবু বাকের মজুমদার, আসিফ মাহমুদ, নুসরাত তাবাসসুমের সই ছিল।
৬ সমন্বয়ককে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মুক্তি দিতে ‘বিক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজের’ আলটিমেটাম
ডিবি হেফাজতে থাকা কোটা সংস্কার আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ক। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) হেফাজতে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়ার আলটিমেটাম দিয়েছে বিক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজ। আজ মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) এক সংবাদ সম্মেলনে নাগরিক সমাজের পক্ষে এ ঘোষণা দেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। ‘হত্যা, অবৈধ আটক ও নির্যাতনের বিচার চাই’ ব্যানারে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ছয় সমন্বয়ককে মুক্তি দেওয়া না হলে বিক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজ ডিবি কার্যালয়ের সামনে কর্মসূচি পালন করবে বলে জানিয়েছেন ইফতেখারুজ্জামান।
সংবাদ সম্মেলনে বিক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে ১১ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। প্রতিটি হতাহতের ঘটনা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অস্ত্র ব্যবহার ও বলপ্রয়োগের ঘটনা জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে তদন্তের দাবি জানানো হয় এই সংবাদ সম্মেলনে। সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল, মানবাধিকারকর্মী শিরীন হক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
কোটা সংস্কার, নাকি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন: একটি পর্যালোচনা
কোটা নিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্মের আনুষ্ঠানিক নাম ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’। ‘বৈষম্যবিরোধী’ কথাটা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। দেশে যখন এত এত খাতে বৈষম্য তৈরি হয়েছে, ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন’ সংগত কারণেই সরকারকে চিন্তায় ফেলেছে।
‘বাবুমশাই, জীবন গুরুত্বপূর্ণ হতে হবে, কেবল লম্বা নয়!’
‘আনন্দ’ সিনেমার বিখ্যাত এই ডায়ালগ লেখা ছিল তাঁর শেষ ছবিতে। মুগ্ধ নামের ছেলেটির নাতিদীর্ঘ জীবন আজ গুরুত্বপূর্ণ বটে। কারণ, তাঁর বেঁচে থাকাকে বিপদ মনে করা হয়েছে। মুগ্ধর মতো অনেককে নির্বিচারে মারা হয়েছে। কয়েক দিনে এ তালিকা দীর্ঘ হয়েছে কেবল।
দেশ ঠিকঠাক মতোই চলছিল (মানে এমনিতে যেমনটা চলে, সবার কাছে ঠিক লাগে)—এ অভিনয় নাগরিকদের দীর্ঘকালের। এর মধ্যে কিনা ছাত্রছাত্রীরা বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছেন; তাঁরা বৈষম্য দূর করার দাবি তোলেন। ‘রাজাকারের বাচ্চা, নাতি’—এসব খেতাব জুটে যায় তাঁদের কপালে।
এটা অবশ্য নতুন নয়। ২০১৮ সালে যখন সরকারি চাকরির কোটাপ্রথা সংস্কারের জন্য ছাত্ররা আন্দোলন করেছিলেন, তখনো সংসদে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, ‘মুক্তিযোদ্ধার সন্তানেরা সুযোগ পাবে না, রাজাকারের বাচ্চারা সুযোগ পাবে? তাদের জন্য মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংকুচিত হবে?’
অনেকে অবাক হয়েছেন, একটা দেশে এতগুলো মানুষ শুধু সরকারি চাকরির জন্য এতটা মোহগ্রস্ত হতে পারে! তাঁদের কথার সুর এমন, এ আন্দোলন তো হচ্ছে বেশি বেশি সরকারি চাকরি পাওয়ার জন্য। সরকারি চাকরিতে ক্ষমতা আছে, দুর্নীতি করার লাইসেন্স মেলে আর তা দিয়ে বানানো যায় অঢেল সম্পদ। এ জন্যই সরকারি চাকরির কোটা নিয়ে এত চেঁচামেচি।
আরেকবার ভেবে দেখুন, ছাত্রদের আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ল, সেটা কি শুধু এ কারণেই? বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, সরকারি চাকরির প্রতি যাঁরা তুলনামূলকভাবে কম আগ্রহী কিংবা বিসিএস না দিয়ে যাঁরা আইইএলটিএস বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, তাঁরাও কেন এক স্বরে কথা বলতে লাগলেন? কেবল চাকরিপ্রার্থীরা নন, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা পর্যন্ত কোন মন্ত্রে আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেল? এ কি কেবল কোটা সংস্কারের আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল?
কোটা নিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্মের আনুষ্ঠানিক নাম ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’। ‘বৈষম্যবিরোধী’ কথাটা বেশ তাৎপর্যপূণ। সরকারি চাকরিতে অসামঞ্জস্যপূর্ণ অগ্রাধিকারসহ কথিত দুর্নীতির মাধ্যমে দেশের মানুষের মধ্যে আয়-ব্যয়ের বিপুল ব্যবধান তৈরি করা হয়েছে। অর্থ পাচারের মাধ্যমে কিছু ব্যাংক প্রায় অচল হয়ে গেছে।
দেশে যখন এত এত খাতে বৈষম্য তৈরি হয়েছে, ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন’ সংগত কারণেই সরকারকে চিন্তায় ফেলেছে। আন্দোলনকারীদের দমাতে সরকার তাই তার অনুগত বাহিনীগুলো দিয়ে সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছে।
৩০ জুলাই–২০২৪
হত্যার বিচার চেয়ে মুখে লাল কাপড় বেঁধে মিছিল। জাতিসংঘ মহাসচিবের বিবৃতি, স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান। কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের প্রোফাইল লাল রঙের ফ্রেমে রাঙিয়েছেন অনেকে।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে অনেকের ফেসবুক প্রোফাইলে লাল ফ্রেম
আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২৪, ১৮: ০৯
শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে এভাবে ফেসবুক প্রোফাইলে লাল রঙের ফ্রেম দিয়েছেন একজন সংস্কৃতিকর্মী। ছবি: সংগৃহীত
কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের প্রোফাইল লাল রঙের ফ্রেমে রাঙিয়েছেন অনেকে। এসব ব্যক্তির মধ্যে শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী, সাংবাদিক, লেখক, শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ আছেন। অন্যদিকে সরকার–সমর্থকদের অনেকে ফেসবুক প্রোফাইলে কালো রঙের ফ্রেম জুড়েছেন।
কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত ২১১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে আজ মঙ্গলবার সারা দেশে শোক পালনের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর রাতে শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবির পক্ষে রাষ্ট্রীয় শোক প্রত্যাখ্যান করে আজ মুখ ও চোখে লাল কাপড় বেঁধে ছবি তোলার কর্মসূচি ঘোষণা করেন কোটা আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন সমন্বয়ক।
শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে ফেসবুক প্রোফাইলে লাল রঙের ফ্রেম জুড়ে নানা প্রশ্ন করছেন অনেকে। ছবি: সংগৃহীত
এই কর্মসূচি ঘোষণার পর গতকাল রাত থেকেই ফেসবুকের প্রোফাইলে লাল রঙের ফ্রেম সাঁটাতে থাকেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা তাঁদের ফেসবুক প্রোফাইলে লাল ফ্রেম সাঁটিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল, কামরুল হাসান, সামিনা লুৎফা, রুশাদ ফরিদী, কাজলী সেহরীন ইসলাম, সাইফুল আলম চৌধুরী, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক জামিল খান প্রমুখের ফেসবুক প্রোফাইলে লাল রঙের ফ্রেম দেখা গেছে।
লেখকদের মধ্যে জাকির তালুকদার, চঞ্চল আশরাফ, মাহবুব মোর্শেদ, সালাহউদ্দিন শুভ্রসহ অনেকেই রয়েছেন এই দলে।
শিক্ষকদের মধ্যে সাইফুল আলম চৌধুরী লিখেছেন, ‘এত মানুষের মৃত্যুর পরও কেন মানুষ কালোকে বেছে না নিয়ে লালকে বেছে নিল? আপনাদের ধ্বংসযজ্ঞ, ষড়যন্ত্র, তৃতীয় শক্তি, পানি ছিটানো, গুজব রোধ, নিরাপত্তা হেফাজত—এসব তত্ত্ব আর ন্যারেটিভের বিরুদ্ধে এটা যে কত বড় শক্ত প্রতিবাদ, সেটা আপনাদের মতো বড় বড় ন্যারেটিভের জন্মদাতা ও প্রচারকের বোঝার ক্ষমতা নেই। কালো যেখানে শোকের প্রতীক, লাল সেখানে বিপ্লব আর ভালোবাসার রং। লাল শৌর্যবীর্য আর সাহসিকতার প্রতীক।’
আরও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীও ফেসবুক প্রোফাইলে লাল ফ্রেম জুড়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ফেসবুক পেজে লাল ফ্রেম দেখা গেছে। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীরাও তাঁদের প্রোফাইলে লাল ফ্রেম সাঁটিয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় শোকের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে ফেসবুক প্রোফাইল কালো রঙের ফ্রেম দিয়েছেন ছাত্রলীগের অনেক নেতাছবি: সংগৃহীত
অপর দিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতারা রাষ্ট্রীয় শোক হিসেবে নিজেদের ফেসবুক প্রোফাইলে কালো ফ্রেম সাঁটিয়েছেন। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান, কেন্দ্রীয় নেতা বরিকুল ইসলাম, আবদুল আলীম খান, মুনেম শাহরিয়ার, রফিকুল ইসলাম, জাহিদুল ইসলাম, রিয়াজুল ইসলামসহ অনেকের প্রোফাইলেই কালো ফ্রেম দেখা গেছে।
ছাত্রলীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম লিখেছেন, ‘শিবির-ছাত্রদল, বিএনপি-জামায়াত সবাই দেখি আজ কমরেড হয়ে গেছে। তাদের ডিপি (ডিসপ্লে পিকচার) আজ লাল আর লাল। এমন কেন ওরা?’
শিক্ষক–শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ
কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে হত্যাকাণ্ডের পর দেশব্যাপী আটক ও নির্যাতনের প্রতিবাদে মুখে লাল কাপড় বেঁধে মৌন মিছিল করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা।
আজ বেলা সাড়ে ১২টার দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে জড়ো হন বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকেরা। তাঁদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে চোখে–মুখে লাল কাপড় বেঁধে সংহতি জানান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। পরে সেখান থেকে তাঁরা মৌন মিছিল বের করেন। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ঘুরে পুরোনো ফজিলাতুন্নেসা হল–সংলগ্ন কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে নবনির্মিত ছাত্র-জনতা শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের সামনে যায়। সেখানে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। পরে সেখান থেকে পুনরায় মিছিল একই পথে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এসে শেষে হয়। এরপর সেখানে সমাবেশ করেন তাঁরা।
কাছাকাছি সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের সামনে থেকে মাথায় ও মুখে লাল কাপড় বেঁধে শিক্ষকেরা শোভাযাত্রা বের করেন। কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে শিক্ষার্থীদের সব দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে এই শোভাযাত্রা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনের মহাসড়কে সমাবেশ করেন তাঁরা। এই কর্মসূচিতে প্রায় ২০০ শিক্ষক অংশ নেন।
এর বাইরে খুলনাসহ বিভিন্ন জেলায় শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে।
হত্যার বিচার চেয়ে মুখে লাল কাপড় বেঁধে মিছিল
নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রথম আলো, ঢাকা
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৪, ০০: ৪৭
দেশব্যাপী ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা মুখে লাল কাপড় বেঁধে র্যালি করেন। মঙ্গলবার দুপুরে ক্যাম্পাসে। ছবি: শহীদুল ইসলাম
কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষ-সংঘাতে নিহতদের স্মরণ করে এবং এসব ঘটনার বিচার চেয়ে গতকাল মঙ্গলবার অনেকে ফেসবুকে নিজের প্রোফাইলে লাল রঙের ফ্রেম ব্যবহার করেছেন। দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা নিজেদের ক্যাম্পাস ও সড়কে মিছিলও করেছেন।
রাজধানী ঢাকায় বেসরকারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকার বাইরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ সাতটি স্থানে গতকাল প্রতিবাদ কর্মসূচি হয়েছে। এর মধ্যে একটি স্থানে পুলিশ বাধা দিয়েছে।
কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষ-সংঘাতে এখন পর্যন্ত দুই শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে মঙ্গলবার (গতকাল) সারা দেশে শোক পালনের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর রাতে কোটা আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন সমন্বয়ক মুখ ও চোখে লাল কাপড় বেঁধে ছবি তোলা এবং তা অনলাইনে প্রচারের কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণার পরপরই গত সোমবার রাত থেকে ফেসবুকের প্রোফাইলে লাল রঙের ফ্রেম ব্যবহার শুরু হতে দেখা যায়। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী, লেখক, সাংবাদিক, চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অনেক মানুষ নিজেদের ফেসবুক প্রোফাইলে শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানান।
জাহাঙ্গীরনগর ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদ
ঘোষিত কর্মসূচি অনলাইনকেন্দ্রিক হলেও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে বিভিন্ন স্থানে গতকাল মিছিল হয়েছে। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে জড়ো হন ‘নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর ব্যানারে’ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকেরা। তাঁদের সঙ্গে চোখেমুখে
লাল কাপড় বেঁধে সংহতি জানান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। পরে সেখান থেকে তাঁরা মৌন মিছিল বের করেন। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ঘুরে পুরোনো ফজিলাতুন্নেসা হলসংলগ্ন কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে নবনির্মিত ছাত্র-জনতা শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের সামনে যায়। সেখানে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। পরে সেখান থেকে পুনরায় মিছিল একই পথে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এসে শেষে হয়। এরপর সেখানে সমাবেশ করেন তাঁরা।
সমাবেশে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহমুদা আকন্দ, আনোয়ারুল্লাহ ভূঁইয়া, মোহাম্মদ মাফরুহী সাত্তার, রায়হান রাইন, সাঈদ ফেরদৌস, আদিল মুহাম্মদ খান, মো. মাসউদ ইমরান প্রমুখ বক্তব্য দেন। শিক্ষকেরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষদের হত্যা, তাঁদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও আটকের ঘটনার প্রতিবাদ জানান।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে ‘নিপীড়নবিরোধী শিক্ষকসমাজ’ ব্যানারে গতকাল দুপুর পৌনে ১২টার দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের সামনে থেকে মাথায় ও মুখে লাল কাপড় বেঁধে মিছিল করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের দিকে যায়।
দেশব্যাপী ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মুখে লাল কাপড় বেঁধে র্যালি করেন নিপীড়ন বিরোধী শিক্ষকবৃন্দ। মঙ্গলবার দুপুরে। ছবি: শহীদুল ইসলাম
ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কে প্রধান ফটকের সামনে আগে থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য উপস্থিত ছিলেন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকও ছিল তালাবদ্ধ। শিক্ষকেরা তালা খোলার অনুরোধ করলে পুলিশ তালা খুলতে বারণ করে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মী তালা খুলে দিলে শিক্ষকেরা প্রধান ফটকের সামনে সারিবদ্ধভাবে সমাবেশে মিলিত হতে থাকেন। এ সময় পুলিশের কর্মকর্তারা দ্রুত কর্মসূচি শেষ করার অনুরোধ করেন।
পরে শিক্ষকেরা সেখানে সমাবেশ করেন। শিক্ষকদের মধ্যে বক্তব্য দেন সালেহ হাসান নকীব, রায়হানা শামস ইসলাম, রেজাউল করিম, সাইফুল ইসলাম ফারুকী, ইসমত আরা, ফরিদ উদ্দিন খান, ইফতিখারুল আলম মাসউদ, ফরিদুল ইসলাম প্রমুখ।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বুধবার ৩১শে জুলাই দুপুরে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি পালন করার নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে। অনলাইনে বার্তা আদান–প্রদানের অ্যাপ টেলিগ্রামে মঙ্গলবার রাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের গ্রুপে এই কর্মসূচির কথা জানানো হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবদুল কাদের মঙ্গলবার রাত সোয়া ১১টার দিকে এই ঘোষণা দেন। কর্মসূচির ঘোষণায় বলা হয়েছে, ‘সারা দেশে ছাত্র-জনতার ওপর গণহত্যা, গণগ্রেপ্তার, হামলা, মামলা, গুম–খুনের প্রতিবাদে এবং জাতিসংঘ কর্তৃক তদন্তপূর্বক বিচারের দাবিতে, ছাত্রসমাজের ৯ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে দেশের সব আদালত, ক্যাম্পাস ও রাজপথে আগামীকাল বুধবার “মার্চ ফর জাস্টিস” কর্মসূচি পালন করা হবে।’ দুপুর সাড়ে ১২টায় এ কর্মসূচি পালন করা হবে বলে ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘোষণায় আরও বলা হয়, ‘আমরা সারা দেশের শিক্ষক, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী, পেশাজীবী, শ্রমজীবী ও সব নাগরিককে আমাদের কর্মসূচি পালনে সর্বাত্মক সহযোগিতা এবং আমাদের দাবি আদায়ের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করতে বিশেষভাবে অনুরোধ করছি।’
৩১ জুলাই ২০২৪ বুধবার
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি
কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনায় সারা দেশে গ্রেপ্তার, হামলা, মামলা, হত্যা এবং ৯ দফা দাবি আদায়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি পালন করেছেন আন্দোলনকারীরা। এদিন বুধবার তাঁরা বিভিন্ন সড়ক, ক্যাম্পাস ও আদালতের সামনে বিক্ষোভ করেন এবং অবস্থান নেন। এ সময় বিভিন্ন স্থানে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন আন্দোলনকারীরা। কোথাও কোথাও টিয়ার শেল নিক্ষেপ ও লাঠিপেটার ঘটনাও ঘটে। ব্যারিকেড ভেঙে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে ঢুকে পড়েন আন্দোলনকারীরা। শতাধিক আটক হয়।
‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ব্যানারে শিক্ষার্থীরা শাহবাগে কর্মসূচি পালন করেন। ফাইল ছবি
মার্চ ফর জাস্টিস ঘিরে উত্তেজনা [বিশেষ প্রতিনিধি ও ঢাবি প্রতিনিধি দৈনিক যুগান্তর
(০১ আগস্ট, ২০২৪ ০৮:২০শেয়ার)
বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ এবং লাঠিপেটার ঘটনা ঘটে। এ সময় কয়েকজন আন্দোলনকারী আহত হন, আবার কাউকে কাউকে আটকও করে পুলিশ। তবে বেশির ভাগ স্থানে আটকদের ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ।
‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি পালনে দুপুর ১২টার দিকে আন্দোলনকারীরা মিছিল নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গা থেকে হাইকোর্ট এলাকায় জড়ো হতে শুরু করলে পুলিশের বাধার মুখে প্রথমে পিছু হটেন।
প্রেস ক্লাবসংলগ্ন কদম ফোয়ারার সামনে আন্দোলনকারীরা পৌঁছালে পুলিশ তাঁদের পেছনে হটিয়ে দেয়। দুপুর পৌনে ১টার দিকে কার্জন হলের দিক থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের শিক্ষক, অভিভাবক এবং বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে হাইকোর্ট মোড়ের দিকে এগোলে তাঁদের শিশু একাডেমির সামনে আটকে দেয় পুলিশ। একটু পর বুয়েট থেকে বুয়েট শিক্ষার্থীদের একটি দল মিছিল নিয়ে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেয়। পরে সেখানেই বক্তব্য দেন সাদা দলের শিক্ষকরা।
অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের একটি দল কদম ফোয়ারার দিক থেকে এসে হাইকোর্ট মোড়ের সামনে অবস্থান নিয়ে নানা স্লোগান দিতে থাকেন।
‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি পালন করেছে আন্দোলনকারীরা। ঢাকায় হাইকোর্টের সামনে। ছবি : কালের কণ্ঠ
দুপুর সোয়া ১টার দিকে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগান দিতে দিতে ব্যারিকেড ভেঙে সুপ্রিম কোর্ট আঙিনার ভেতরে ঢুকে পড়েন আন্দোলনকারীরা। এ সময় সুপ্রিম কোর্টের সাধারণ আইনজীবীরাও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগ দেন। পরে তাঁরা সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবন ও সুপ্রিম কোর্টের পুরনো ভবনের মাঝখানে চলাচলের জায়গায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। প্রায় আধাঘণ্টা সেখানে অবস্থান করে বিভিন্ন স্লোগান দেন তাঁরা।
পরে আন্দোলনকারীরা দুপুর ২টার দিকে সুপ্রিম কোর্ট আঙিনা থেকে বের হয়ে যান। বের হওয়ার সময় মাজার গেটের মূল ফটক খুলে দেয় পুলিশ। পরে তাঁরা শিক্ষা ভবনের সামনে শিক্ষা অধিকার চত্বরে আগে থেকে অবস্থান নেওয়া আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগ দেন। আন্দোলনকারীদের মধ্যে ছিলেন শিক্ষার্থী, আইনজীবী, শিক্ষক, অভিভাবক, সাংস্কৃতিককর্মী।
দুপুর দেড়টার দিকে রাজধানীর মিরপুর বেনারসি পল্লীর একটি সড়কে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ শুরু করেন আন্দোলনকারীরা। স্লোগান দিতে দিতে তাঁরা মিরপুর-১০ নম্বর মূল সড়কের দিকে আসতে থাকেন। তবে পুলিশ তাঁদের বাধা দিলে মিছিলটি মূল সড়কে এসে গোলচত্বরের দিকে যেতে চাইলে ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাকর্মীদের বাধার মুখে পড়ে। এ সময় আন্দোলনকারীরা ১১ নম্বরের দিকে যেতে চাইলে সেখানেও বাধা দেওয়া হয়। পরে পুলিশ ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাকর্মীদের সরিয়ে দিলে আন্দোলনকারীদের মিছিলটি বেনারসি পল্লীর সড়কে চলে যায়। পরে তাঁদের বুঝিয়ে বাসায় ফেরত পাঠানো হয়।
সিলেটে আন্দোলনকারীরা কর্মসূচি পালন শুরু করলে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন। গতকাল সকাল ১১টার দিকে আন্দোলনকারীরা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জড়ো হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে অবস্থান নেন। পুলিশ তাঁদের সেখান থেকে সরে যেতে বললেও দুপুর ১২টার দিকে তাঁরা সিলেট নগরের উদ্দেশে পদযাত্রা শুরু করেন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নগরের সুবিদবাজার পয়েন্টে পৌঁছালে সেখানে তাঁরা পুলিশের ব্যারিকেডের মুখে পড়েন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের বাগবিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কির এক পর্যায়ে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে তাঁরা সামনে এগোতে শুরু করলে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। এ সময় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান নিয়ে আন্দোলনকারীরা ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। এক পর্যায়ে আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান।
বরিশালে গতকাল ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করলে আন্দোলনকারীদের লাঠিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। এতে চার সাংবাদিকসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। এ সময় কয়েকজন আন্দোলনকারীকে আটক করে পুলিশ। গতকাল দুপুরে নগরের সদর রোডের অশ্বিনীকুমার হল ও ফজলুল হক এভিনিউ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, সকাল ১১টার পর নগরের সদর রোডসংলগ্ন কাঠপট্টি সড়কের মুখে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ প্রতিবাদ মিছিল বের করে। পুলিশ আন্দোলনকারীদের প্রথমে বাধা দেয়। এক পর্যায়ে বাধার মুখে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তি হয়। পরে সিটি কলেজের গলির মুখে আন্দোলনকারীদের আটকে দেওয়া হয়। পরে আন্দোলনকারীরা একজোট হয়ে সদর রোডে অবস্থান নিলে ধাওয়া দিয়ে তাঁদের ফকিরবাড়ির রোডে আটকে দেয় পুলিশ। পরে পুলিশ লাঠিপেটা করে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
ঠাকুরগাঁওয়ে আন্দোলনকারীদের কর্মসুচিতে বাধা ও লাঠিপেটা করেছে পুলিশ। এতে বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী আহত হয়েছেন। গতকাল সদর উপজেলা পৌর শহরের আর্ট গ্যালারি অপরাজেয় ৭১ চত্বর থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল কোর্ট চত্বরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। মিছিলটি জেলা দায়রা জজ আদালতের প্রধান ফটকের সামনের সড়কে এলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়।
গতকাল ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের কয়েকজন শিক্ষকও কর্মসূচিতে অংশ নেন। দুপুর ১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও মানবিক অনুষদ ভবনসংলগ্ন মহুয়া মঞ্চের সামনে থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসংলগ্ন সড়ক, নতুন প্রশাসনিক ভবন প্রদক্ষিণ করে একই স্থানে এসে শেষ হয়। পরে সেখানে সমাবেশ করেন তাঁরা। এরপর একই স্থানে গ্রেপ্তার করা শিক্ষার্থীদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি পালন করা হয়।
১ আগস্ট–২০২৪
জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। ডিবি কার্যালয়ে তাদের ৩২ ঘণ্টা অনশন থাকর পর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে ছেড়ে দেওয়া হয়। রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ কর্মসূচি পালন করার ঘোষণা দেয়া হয়। বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচিতে পুলিশের বাধা ও হামলা।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’
যুগান্তর প্রতিবেদন
নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। নতুন এই কর্মসূচির নাম ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’(আমাদের নায়কদের স্মরণ)। সব শ্রেণিপেশার মানুষকে আগামীকাল বৃহস্পতিবার ১ আগস্ট অনলাইন ও অফলাইনে এই কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বুধবার সন্ধ্যায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে প্ল্যাটফর্মের অন্যতম সহসমন্বয়ক রিফাত রশীদ এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। পরে গণমাধ্যমে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, ‘সারা দেশে ছাত্র-জনতার ওপর গণহত্যা, গণগ্রেপ্তার, হামলা-মামলা, গুম-খুন ও শিক্ষকদের ওপর ন্যক্কারজনক হামলার প্রতিবাদ, জাতিসংঘের মাধ্যমে তদন্ত করে বিচার এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৯ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে এ কর্মসূচি।’
রিফাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের স্নাতক তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
কর্মসূচিগুলো হলো নির্যাতনের ভয়ংকর দিন-রাতের স্মৃতিচারণা, হতাহত ব্যক্তিদের নিয়ে পরিবার ও সহপাঠীদের স্মৃতিচারণা এবং আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে চিত্রাঙ্কন বা গ্রাফিতি, দেয়াললিখন, ফেস্টুন ও ডিজিটাল পোর্ট্রেট তৈরি প্রভৃতি।
নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে এ ধরনের যেকোনো কনটেন্ট বা লেখা দুটি হ্যাশট্যাগ (#JulyMassacre ও #RememberingOurHeroes) ব্যবহার করে অনলাইন ও অফলাইনে প্রচার করার আহ্বান জানানো হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, শ্রমজীবী, ব্যবসায়ীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে এই কর্মসূচি পালনে সর্বাত্মক অংশ নিতে বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
অন্যদিকে এদিন দলীয় নেতাদের তোপের মুখে কাদের ও রাজ্জাক বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে দলীয় কার্যালয়ের সভা ত্যাগ করেন।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংহতি
রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ক্যাম্পাসের বাইরে দাঁড়িয়ে কর্মসূচি পালন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শিক্ষকদের হাতে প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘নিরস্ত্র ছাত্র হত্যার বিচার চাই’, ‘শিক্ষার্থীদের পাশে শিক্ষক’ প্রভৃতি। শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের হয়রানি ও নিপীড়ন বন্ধের দাবি জানান। এই কর্মসূচিতে অন্যদের মধ্যে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নোভা আহমেদ, সাইফুল ইসলাম, মুশাররাত শর্মি হোসেন, সাকিব রহমান প্রমুখ অংশ নেন।
পাঁচ জেলায় প্রতিবাদ
আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত-বিচারসহ ৯ দফা দাবিতে গতকাল সকাল ৩০শে জুলাই থেকে খুলনার শিববাড়ী মোড় ও এর আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে শুরু করেন। তবে পুলিশ তাঁদের সরিয়ে দেয়। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে শিক্ষার্থীদের একটি মিছিল শিববাড়ী মোড়ে আসে। পরে মোড়ের চারটি সড়ক অবরোধ করে বেলা দুইটা পর্যন্ত বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা।
একই দাবিতে গতকাল দুপুর ১২টির দিকে পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতাল চত্বর থেকে মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে কিছুটা এগোলেও পঞ্চগড়-বাংলাবান্ধা মহাসড়কে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কার্যালয়ের সামনে মিছিলটি থামিয়ে দেয় পুলিশ। পরে মহাসড়কে পুলিশ বেষ্টনীর মধ্যে বক্তব্য দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পঞ্চগড় জেলার অন্যতম সমন্বয়ক ফজলে রাব্বি। তাঁর বক্তব্যের পরপরই পুলিশের বাধায় সরে যান শিক্ষার্থীরা। এই কর্মসূচির আগে-পরে পাঁচজনকে আটক করে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ।
পঞ্চগড়ের পুলিশ সুপার এস এম সিরাজুল হুদা প্রথম আলোকে বলেন, পাঁচজনকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাঁদের অভিভাবকদের ডেকে কথা বলা হবে। তাঁদের মধ্যে নেতিবাচক কিছু পাওয়া না গেলে ছেড়ে দেওয়া হবে। আর নেতিবাচক কিছু পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সারা দেশে শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনার সুষ্ঠু বিচার, মুক্ত ক্যাম্পাসসহ বিভিন্ন দাবিতে বেলা ১১টার দিকে কিশোরগঞ্জের পুরোনো থানা এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের মাথায় লাল কাপড় বাঁধা ছিল, হাতে ছিল লাল রঙের প্ল্যাকার্ড। কর্মসূচিস্থলে বিপুলসংখ্যক পুলিশের অবস্থান ছিল। আধা ঘণ্টা পর শিক্ষার্থীরা রাস্তা ছেড়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
ডিবি হেফাজতে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়কের মুক্তিসহ বিভিন্ন দাবিতে গতকাল দুপুরে হবিগঞ্জ শহরের বসন্ত কুমারী গোপাল চন্দ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে নিজেদের মুখে লাল কাপড় বেঁধে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে জড়ো হন হবিগঞ্জ সরকারি বৃন্দাবন কলেজ, হবিগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ ও শচীন্দ্র ডিগ্রি কলেজসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রীরা। আধা ঘণ্টা অবস্থান করার পর পুলিশ এলে ছাত্রীরা কর্মসূচি শেষ করে চলে যান।
শিক্ষার্থী হত্যার প্রতিবাদ ও ৯ দফা দাবি আদায়ে গতকাল বিকেলে যশোরের কেশবপুরে সরকারি ডিগ্রি কলেজ মাঠে জড়ো হন শিক্ষার্থীরা। পরে বিকেল চারটা থেকে সাড়ে চারটা পর্যন্ত যশোর-সাতক্ষীরা সড়ক অবরোধ করেন তাঁরা। পরে কলেজের মাঠে গিয়ে তাঁরা কর্মসূচি শেষ করেন। এই কর্মসূচির সময় পুলিশের বিপুল সদস্যের অবস্থান ছিল।
শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তার ও ‘গণহত্যার’ প্রতিবাদে চবি শিক্ষকদের মানববন্ধন
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, ‘গণহত্যা’ ও গণ-গ্রেফতারের প্রতিবাদ জানিয়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শিক্ষকরা। দুটি আলাদা ব্যানারে এই কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষকরা। ‘নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক সমাজ’ ও ‘নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক ঐক্য’ এই দুই ব্যানারে কর্মসূচি পালন করেন তারা। এ সময় নিহত ছাত্র ও জনগণের হত্যার যথাযথ বিচার দাবি করেন তারা।
বুধবার ৩১শে জুলাই দুপুর ১১ টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে ‘নিপীড়ন বিরোধী শিক্ষক ঐক্য’ এর ব্যানারে মানববন্ধন করেন প্রায় অর্ধশত শিক্ষক। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীদেরকে হত্যা, গ্রেফতার ও হয়রানির প্রতিবাদ জানান তারা। এসময় আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্র ‘গণহত্যা’ চালিয়েছে দাবি করেন শিক্ষকরা। গ্রেফতারকৃত সকল শিক্ষার্থীর মুক্তি ও হয়রানি বন্ধের দাবি জানান তারা। আন্দোলন শেষে র্যালি নিয়ে প্রশাসনিক ভবনে উপাচার্যের সাথে সাক্ষাৎ করেন শিক্ষকরা।
আন্দোলনে সঞ্চালনা বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. তানভীর মোহাম্মদ হায়দার আরিফ বলেন, শিক্ষার্থীদের এমন শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে সর্বস্তরের মানুষ মানবিক হয়ে উঠেছিল। আর সেই আন্দোলনে এভাবে নির্বিচারে গুলি করেছে কারা? তাদের বিচার এই বাংলার মাটিতে করতে হবে। এই আন্দোলনে এই শিক্ষার্থীদের বুদ্ধি-ভিত্তিক পদক্ষেপ দেখে আমি অভিভূত। এখন থেকে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আমরা শিক্ষকরা শিখবো।
যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শহীদুল হক বলেন, নিরাপত্তা শুধু পুলিশ বাহিনীর জন্য নয়, একজন রিকশাওয়ালার জীবনও সাংবিধানিকভাবে সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের ছাত্ররা তো মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ নিয়ে আন্দোলনে নেমেছিল। তাহলে কেন তাদের ‘রাজাকার’ ডাকা হলো। কেন তাদের গুলি করা হলো। তারা তো এই প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীন দেশের প্রতিটি নাগরিকের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, মৌলিক অধিকার ও সাংবিধানিক অধিকার অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।
রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক জয়নুল আবেদীন সিদ্দিকী বলেন, যে বর্বরতা হয়েছে সেটি এই প্রজন্মও দেখেনি এর আগের প্রজন্মও দেখেনি। আমাদের আয়করের পয়সায় পরিচালিত বাহিনীকে গুলি চালানোর হুকুম কারা দিয়েছে আমরা শিক্ষক সমাজ এর উত্তর চায়। হাজার হাজার শিক্ষার্থী মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। রাষ্ট্রের প্রধান সেখানে গিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হলো কার নির্দেশে আমার সন্তান আজ নেই। প্রতিটি হত্যার নিরপেক্ষ বিচার করতে হবে।
ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক তানভীর মোহাম্মদ হায়দার আরিফের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. এনায়েত উল্যা পাটওয়ারী, মোহাম্মদ আবুল বশর প্রমুখ। মানববন্ধন শেষে ওই শিক্ষকেরা একটি মৌন মিছিল করেন। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার থেকে প্রশাসনিক ভবনের সামনে গিয়ে শেষ হয়।
এদিকে দুপুর ১২টায় মানববন্ধন করেন ‘নিপীড়ন বিরোধী শিক্ষক সমাজ’। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন বন্ধ ও গ্রেফতারকৃত সকল শিক্ষার্থীদের মুক্তি দাবি করে প্রতিবাদ জানান তারা।
আন্দোলনে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক সহকারী অধ্যাপক জি এইচ হাবীব বলেন, স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর একটি দেশে শিক্ষার্থীদের ছোট একটি দাবিকে রাষ্ট্র এতো মর্মান্তিক ও ভয়ানক পর্যায়ে কীভাবে টেনে নিল। রাষ্ট্রের এই হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে যে পরিণতি হল তার কারণে আমাদের এখানে দাঁড়াতে হয়েছে। আমাদের ছাত্র ও গণমানুষকে হত্যা করা হয়েছে, গণ-গ্রেফতার চলছে এসব হয়রানির প্রতিবাদ জানাতে দাঁড়িয়েছি।
যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সায়মা আলম বলেন, এতগুলো প্রাণ যে ঝরে গেল কোনো মূল্যেই তাদের ফিরিয়ে আনা যাবে না। তাই এই হত্যাকাণ্ডের কোনো ক্ষমা নাই। এখন যে গণ-গ্রেফতার চলছে, বিনা অভিযোগে বেআইনিভাবে ছাত্রদের আটক করা হচ্ছে, আমরা তার প্রতিবাদ জানাই। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মুক্তি দাবি করছি।
প্রাণরসয়ান ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, ২১১টি প্রাণের ক্ষতি স্থাপনা ধ্বংসের ক্ষতির চেয়ে অনেক বেশি। রাষ্ট্রের স্থাপনা নিয়ে কথা বললে আমরা প্রাণের বিষয়ে কথা বলছি না। এখনো যারা নিরাপত্তা হেফজতে রয়েছে, জেলে রয়েছে, নজরদারিতে রয়েছে সবাইকে রাষ্ট্রীয় আইন মেনে সসম্মানে মুক্তি দেওয়া উচিত। স্বাভাবিক নিয়মে নিরাপত্তার সহিত শিক্ষাঙ্গন খুলে দেওয়া উচিত
এছাড়াও এই কর্মসূচিতে অংশ নেন কর্মসূচিতে আরও উপস্থিত ছিলেন শিক্ষক শামীমা ফেরদৌসী, মো. ইমাম হোসাইন, মো. কামাল উদ্দিন, খাদিজা মিতু, মো. শফিকুল ইসলাম, মুনমুন নেছা চোধুরী, ফারজানা আহমেদ, ও স্থানীয় বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হক।
আন্দোলন মোকাবিলায় নতুন কৌশল পুলিশের
যুগান্তর প্রতিবেদন ০১ আগস্ট ২০২৪
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা আন্দোলনের তীব্রতা এই মুহূর্তে কিছুটা কমলেও যে কোনো সময় ফের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে-এমন আশঙ্কা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসংশ্লিষ্টদের। তাদের মতে, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবির নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তে দলটির নেতাকর্মীরা মরণ কামড় দিয়ে মাঠে নামতে পারেন। এসব বিষয় মাথায় রেখে নিরাপত্তা ছক তৈরি করেছে পুলিশ। নিজ নিজ এলাকাকে নিরাপদ রাখতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) সদর দপ্তর থেকে কোন ধরনের সাপোর্ট প্রয়োজন, তা দ্রুত জানাতে আটটি অপরাধ বিভাগের উপকমিশনারকে (ডিসি) নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই নির্দেশ পাওয়ার পর ইতোমধ্যেই ডিসিরা নিরাপত্তাসংক্রান্ত তাদের চাহিদার কথা ডিএমপির অপারেশন বিভাগকে জানিয়েছেন। সে অনুযায়ী কার্যক্রম শুরু করেছে ডিএমপি সদর দপ্তর। এক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে, আন্দোলনের সময় তারা যেন অলিগলিতে না ঢোকেন। সর্বশক্তি দিয়ে যেন মূল রাস্তা সচল রাখার চেষ্টা করেন। সাম্প্রতিক সহিংসতার সময় দেখা গেছে, মূল রাস্তার একপাশ দখলমুক্ত করতে গেলে আন্দোলনকারীরা অন্য পাশ (যে অংশ পুলিশের দখলে ছিল) দখল করে ফেলে। তাই কোনো অংশ নতুন করে দখলমুক্ত করতে গেলে সব পুলিশ সদস্য যেন একসঙ্গে মুভ না করেন। আগে থেকেই পুলিশের দখলে থাকা অংশে যেন কিছু পুলিশ সদস্য পাহারায় থাকেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে যে ভয়াবহ নাশকতা হয়েছে, তা ছিল তাদের কল্পনার বাইরে। সেতু ভবনের চারতলায় ঢুকে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ করা হবে, বিটিভি ভবন দখল করে সম্প্রচার বন্ধ করে দেবে, মেট্রোরেল-এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ধ্বংস করবে, আইডি কার্ড চেক করে করে পুলিশকে হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে রাখা হবে-এসব বিষয় আমরা ভাবতেই পারিনি। তারা যে একযোগে ঢাকার ৪২টি স্পট দখল করে নেবে সেটাও সংশ্লিষ্ট কারও ভাবনায় ছিল না। কারণ, অতীতে ঢাকার আন্দোলন হয়েছে পল্টন এবং রমনা এলাকায়। সে অনুযায়ী আমাদের প্রস্তুতি ছিল। আমাদের ধারণা ছিল, তারা আওয়ামী লীগ অফিসে ভাঙচুর চালাতে পারে। সর্বোচ্চ থানায় থানায় গিয়ে ঢিল ছুড়তে পারে। আমরা সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। আমাদের প্রস্তুতির চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুতি নিয়ে নাশকতাকারীরা মাঠে নেমেছিল। তাই দ্রুততম সময়ে আন্দোলন চলে যায় পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ছাত্র আন্দোলন শেষের দিকে ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সেটি চলে যায় জামায়াত-শিবিরের দখলে। সুযোগ সন্ধানী মহল এখনো বসে নেই। তারা যে কোনো সময় অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে তৎপর। কিন্তু এবার মাঠে নামলে তারা সুবিধা করতে পারবে না। সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনা থেকে আমরা শিক্ষা নিয়েছি। সে অনুযায়ী নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। ওই কর্মকর্তা জানান, চলমান ছাত্র অন্দোলনে প্রথম হত্যার ঘটনা ঘটে ১৭ জুলাই। ওইদিন সায়েন্স ল্যাব এলাকায় দুজন নিহত হন। একজন ছাত্রলীগ কর্মী এবং অন্যজন পাপোশ ব্যবসায়ী। ওই দুজনকে পিটিয়ে খুন করে আন্দোলনকারীরা। ১৮ জুলাই পর্যন্ত পুলিশ একটি গুলিও করেনি। ওইদিন উত্তরায় অমীত নামে একজন র্যাব সদস্যকে বেধড়ক পেটানো হয়। সে এখনো মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। অমীতের ওপর হামলার পর র্যাবের পক্ষ থেকে গুলি ছোড়া হয়। এতে ৪-৫ জন নিহত হন। এর পরদিন অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা মাঠে নামলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সব বাহিনীর সদস্যরাই কম-বেশি গুলি করেন।
পুলিশ সহজেই গুলি করে না-এমন মন্তব্য করে ঊর্ধ্বতন এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ২৮ অক্টোবরের ঘটনায় একজন পুলিশ সদস্য নিহত হন। আরেকজন পুলিশ সদস্য এখনো চিকিৎসাধীন। ওই সময়ও পুলিশ কোনো গুলি করেনি। এবার বাধ্য হয়েই গুলি ছুড়েছে পুলিশ। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা পুলিশকে উত্তেজিত করেছিল। বোবা পুলিশ, কোটা পুলিশ বলে ব্যঙ্গ করছে। তখনও পুলিশ চুপ ছিল। যখন থানায় আক্রমণ করা হয়েছিল তখনও পুলিশ শটগান নিয়ে বসেছিল। জানতে চেয়েছে, ‘স্যার, কী করব’? যখন দেখে তারা মারা যাবে তখনই গুলি করেছে। পদস্থ ওই কর্মকর্তা বলেন, যাত্রাবাড়ী খালি করতে ১০ রাউন্ড গুলিই পুলিশের জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু চরম ধৈর্য ধরে ৪ দিন অপেক্ষা করেছিলাম। ৪৮ ঘণ্টা চেষ্টার পরও মূল স্থানে আমরা ঢুকতে পারিনি। তবুও গুলি করিনি।
জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার হাবিুবর রহমান যুগান্তরকে বলেন, নাশকতাকারী জামায়াত-শিবির চক্র যতই অপচেষ্টা চালাক না কেন, তারা আর সফল হতে পারবে না। নগরবাসীকে নিরাপত্তা দিতে আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছি।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, আমরা মনে করি ছাত্রদের কোটার দাবি পূরণ হয়েছে। অনেক ছাত্রকে ধরার পরও আমরা ছেড়ে দিয়েছি। তারা না বুঝে আন্দোলনে এসেছিল। কোমালমতি বাচ্চাদের কেউ যেন আর ঢাল বানাতে না পারে সেজন্য আমরা তৎপর আছি। আমরা চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছি। ১৮ জুলাই পর্যন্ত অনেক সহ্য করেছি। এখন আর ধৈর্য ধারণ করব না। এরই মধ্যে প্রযুক্তিগত সহযোগিতাসহ আমরা নানা প্রস্তুতি নিয়েছি। যারা নাশকতাকারী তাদের বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। সবাইকে একে একে আইনের আওতায় আনব।
সব হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে রাস্তায় নামলেন সংস্কৃতিকর্মীরা
০১ আগস্ট ২০২৪ | ১৪:২৪
রাস্তায় সংস্কৃতি কর্মীরা। ছবি: সংগৃহীত
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশে হত্যা-সহিংসতা-গণগ্রেপ্তার-হয়রানির প্রতিবাদে প্রতিবাদে রাস্তায় নামবেন গতকালই জানিয়েছিলেন সংস্কৃতিকর্মীরা। পূর্বঘোষণামতে সকাল ১১টায় ‘দৃশ্যমাধ্যম শিল্পীসমাজ’-এর ব্যানারে যুক্ত হয়ে আজ মানিক মিয়া এভিনিউয়ের জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে দাঁড়াবেন তারা। সেখানে দাঁড়িয়ে দেশের চলমান পরিস্থিতিতে সকল হত্যার হিসাব ও বিচার করা, গুলি ও সহিংসতা বন্ধ, গণ-গ্রেফতার ও হয়রানি বন্ধ, আটক শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবি জানাবেন। নাহ, মানিক মিয়া এভিনিউয়েতে দাঁড়াতে পারেনি। পুলিশ তাদের দাঁড়াতে দেননি।
এদিকে চরম বৈরিতে করছিল প্রকৃতিও। নামল তুমুল বৃষ্টি। সংসদ ভবনের সামনে যাওয়ার পথে বাধা পাওয়ায় খামারবাড়ি মোড় থেকে বৃষ্টিতে ভিজে উপস্থিত শিল্পীরা ব্যানার হাতে শ্লোগান দিতে দিতে এসে দাঁড়ান ফার্মগেট সেজান পয়েন্টের সামনে। সেখানে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রাষ্ট্রের প্রতি দাবি জানালেন- ভয়হীন, ন্যায্য ও মানবিক মর্যাদার বাংলাদেশ গড়ার, সব হত্যার বিচার করার এবং চলমান হত্যা, সহিংসতা, গণগ্রেফতার আর হয়রানি বন্ধের জন্য।
‘দৃশ্যমাধ্যম শিল্পীসমাজ’-এর ব্যানারে যুক্ত হওয়া এই সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে এদিন সরাসরি হাজির ছিলেন, মামুনুর রশিদ মোশাররফ করিম, আজমেরী হক বাঁধন, সাবিলা নূর, আশফাক নিপুণ, নুরুল আলম আতিক, অমিতাভ রেজা, পিপলু আর খান, শিবু কুমার শীল, রেদওয়ান রনি, জাকিয়া বারী মম, সোহেল মণ্ডল, সিয়াম আহমেদসহ অসংখ্য সংস্কৃতিকর্মী।
প্রায় প্রত্যেকেরই একই দাবি, হত্যার বিচার এবং হত্যা বন্ধ করা। সঙ্গে সংহতি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবির প্রতিও।
এই জোটের অন্যতম কণ্ঠস্বর অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। তিনি এই আন্দোলনে প্রকাশ্য একাত্মটা ঘোষণা করে রাজপথে দাঁড়িয়ে বললেন, যে হত্যাকাণ্ড ঘটে গেলো এবং ঘটছে, সেটির বিচার কি আমি চাইবো না? যদি না চাই, তাহলে তো আমি এই রাষ্ট্রের কেউ না। অথবা বোধশূন্য অমানুষ। আমার মনে হয়েছে, এর প্রতিবাদ করা উচিত। না করলে কাল যখন আমার মেয়েটা গুলি খেয়ে মরে পড়ে থাকবে, তখন অন্য কেউ আমার পাশে দাঁড়াবে না।
অনেকটা একই কথা ভিন্ন ভিন্ন সুরে বলেছেন জমায়েতে উপস্থিত শিল্পীরা।
বৃহত্তর চলচ্চিত্র, আলোকচিত্র, থিয়েটার, গণমাধ্যমসহ দৃশ্যমাধ্যমের নানা শাখার কর্মীরা ‘দৃশ্যমাধ্যম শিল্পীসমাজ’-এর ব্যানারে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশে হত্যা-সহিংসতা-গণগ্রেফতার-হয়রানির প্রতিবাদে এবং সব হত্যার হিসাব ও বিচার করা, গুলি ও সহিংসতা বন্ধ, গণগ্রেফতার ও হয়রানি বন্ধ, আটক শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবিতে এদিন সড়কে জমায়েত হয়েছেন।
তাদের দাবি, অবিলম্বে সব হত্যাকাণ্ডের বিচার ও হত্যা, সহিংসতা, গণগ্রেফতার ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে।
শিল্পীরা বলেন, ‘যেই ন্যায্যতা, সমতা ও মানবিক মর্যাদার অঙ্গীকার নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ঘটেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়, সেই বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার আমাদের সাংবিধানিক অধিকার। সেই অধিকার নিয়েই আমরা রাজপথে দাঁড়ানোর প্রয়োজন মনে করেছি।’
২ আগস্ট–২০২৪
‘গণহত্যা ও গণগ্রেপ্তারের প্রতিবাদে এবং শিক্ষার্থীদের ৯দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে’ সারাদেশে মসজিদে জুমার নামাজ শেষে দোয়া মোনাজাত, মন্দির, গির্জাসহ সব প্রার্থনালয়ে প্রার্থনার আয়োজন, এবং জুমার নামাজ শেষে শহীদদের কবর জিয়ারত ও ছাত্র-জনতার গণমিছিল কর্মসূচি পালন আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার এবং তাতে আওয়ামী লীগপন্থিদের সন্ত্রাসী হামলা; বিভিন্ন স্থানে নিহত ২; গুলিবিদ্ধসহ আহত দুই শতাধিক। অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা।
৩ আগস্ট–২০২৪
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে সরকার পতনের এক দফা ঘোষণা করেন সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন এবং অসহযোগের রূপরেখা ঘোষণা। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ১৫৮ সদস্যের বর্ধিত সমন্বয়ক কমিটির তথ্য প্রদান। ছাত্র নাগরিকের অভ্যুত্থানের ঘোষণা নাহিদ ইসলামের।
অসহযোগ কর্মসূচি: কী চলবে, কী বন্ধ থাকবে, জানাল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন
প্রতিবেদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৪, ২২: ১৬
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমন্বয়কেরা। ঢাকা, ৩ আগস্ট। ছবি: প্রথম আলো
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে আগামীকাল রোববার শুরু হতে যাওয়া সর্বাত্মক অসহযোগে কী চলবে, কী চলবে না—তা জানানো হয়েছে। আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ আজ শনিবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এ বিষয়ে জরুরি নির্দেশনা তুলে ধরেন। এর আগে সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে রোববার থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আরেক সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে হাজার হাজার মানুষের সমাবেশে এই ঘোষণা দেওয়া হয়।
নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের পর আসিফ মাহমুদ এই কর্মসূচি ঘিরে কিছু জরুরি নির্দেশনা দেন। আসিফ মাহমুদ জানান, অসহযোগ কর্মসূচির মধ্যেও হাসপাতাল, ওষুধের দোকান, জরুরি পরিবহন সেবা (ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম পরিবহন), অ্যাম্বুলেন্স সেবা, ফায়ার সার্ভিস, গণমাধ্যম, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য পরিবহন, জরুরি ইন্টারনেট-সেবা, জরুরি ত্রাণসহায়তা ও এ খাতে কর্তব্যরত কর্মকর্তা-কর্মচারীর পরিবহন সেবা চালু থাকবে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জরুরি নির্দেশনায় আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘বাংলাদেশের কোনো নাগরিক কোনো কর বা খাজনা দেবেন না। বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, পানির বিলসহ কোনো ধরনের বিল পরিশোধ করবেন না। সব ধরনের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত ও কলকারখানা বন্ধ থাকবে। কেউ অফিসে যাবেন না, মাস শেষে বেতন তুলবেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে কোনো ধরনের রেমিট্যান্স দেশে পাঠাবেন না। সব ধরনের সরকারি সভা-সেমিনার ও আয়োজন বর্জন করবেন। বন্দরের কর্মীরা কাজে যোগ দেবেন না। কোনো ধরনের পণ্য খালাস করবেন না।’
আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘দেশের কোনো কলকারখানা চলবে না, গার্মেন্টসকর্মী ভাই-বোনেরা কাজে যাবেন না। গণপরিবহন বন্ধ থাকবে। শ্রমিকেরা কেউ কাজে যাবেন না। জরুরি ব্যক্তিগত লেনদেনের জন্য প্রতি সপ্তাহের রোববার ব্যাংকগুলো খোলা থাকবে। পুলিশ সদস্যরা রুটিন দায়িত্ব ছাড়া কোনো ধরনের প্রটোকল ডিউটি, রায়ট ডিউটি ও প্রটেস্ট ডিউটিতে যাবেন না। শুধু থানা-পুলিশ নিয়মিত থানার রুটিন দায়িত্ব পালন করবে। বিজিবি ও নৌবাহিনী ছাড়া অন্যান্য বাহিনী ক্যান্টনমেন্টের বাইরে দায়িত্ব পালন করবে না। বিজিবি ও নৌবাহিনী ব্যারাক ও উপকূলীয় এলাকায় থাকবে।’
আসিফ আরও বলেন, ‘আমলারা সচিবালয়ে যাবেন না। জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা নিজ নিজ কার্যালয়ে যাবেন না। দেশ থেকে যেন একটি টাকাও পাচার না হয়, তার জন্য সব অফশোর লেনদেন বন্ধ থাকবে। বিলাসদ্রব্যের দোকান, শোরুম, বিপণিবিতান, হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দোকানপাট বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।’
পাবলিকের ভয় কি ভেঙে গেল
সারফুদ্দিন আহমেদ, আপডেট: ০৩ আগস্ট ২০২৪, ১১: ৩৯
মানুষ ভূতকে ভয় পায়। কারণ, ভূতকে সে দেখেনি।
পিস্তল-বন্দুক আর ক্ষমতা হলো ভূতের মতো জিনিস। এগুলো আড়ালে রাখতে হয়। পাবলিককে আকারে ইঙ্গিতে বোঝাতে হয়, ‘সাবধান! পিস্তল কিন্তু আছে!’
অমুক লোক অনেক ক্ষমতাধর এবং তার কোমরে সব সময় পিস্তল থাকে, এটি যদি সাধারণ লোক জানে বা অনুমান করতে পারে, তাহলে তারা সেই লোককে ভয় পায়। যদি দেখে, সেই লোক কোমরে লুকানো পিস্তল বের করে না; অযথা হম্বিতম্বি করে ক্ষমতা জাহির করে না; তাহলে তাদের কাছে তার পিস্তল আর ক্ষমতা একটা ভীতিকর রহস্য হয়ে থাকে।
ক্ষমতা আর পিস্তলের অহেতুক ব্যবহার না থাকলে ভয়ের সঙ্গে সমীহ, এমনকি শ্রদ্ধাও যোগ হতে পারে। কিন্তু পিস্তল যদি বাড়াবাড়ি রকমের ক্ষমতার ফুটানিতে ফটাফট গুলি ফুটাতে থাকে, তাহলে আর পাবলিকের ভয় থাকে না। গুলিতে মানুষ মরলে প্রথমে জনতা আকস্মিক আতঙ্কে ভ্যাবাচ্যাকা খায় বটে, কিন্তু খুব শিগগিরই সেই আতঙ্ক কেটে যায়। ভয় চলে যায়। ভয়ের জায়গায় ক্ষোভ আর প্রতিবাদ-প্রতিশোধের স্পৃহা জুড়ে বসে।
ছাত্রদের আন্দোলনে সেই জিনিস দেখা গেল। পুলিশের কোমরের পিস্তল-বন্দুক শুধু হাতে উঠে এল না, সেই পিস্তল-বন্দুক থেকে নির্বিচারে গুলি বের হলো।
নিজের ঘরের বারান্দায় এসে দাঁড়ানো নারী থেকে শুরু করে বাবার কোলে থাকা বাচ্চাকেও সেই গুলি গিলে খেল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে বেড়ানো ভিডিও ফুটেজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যেভাবে গুলি করতে দেখা গেছে, যেভাবে দুই হাত প্রসারিত করা আবু সাঈদকে গুলি করতে দেখা গেছে; যেভাবে কিশোর ও যুবা বয়সীর চোখ ছররা গুলিতে নষ্ট হয়ে যাওয়ার খবর পত্র-পত্রিকায় এসেছে, তা নির্বিকার দলান্ধ ছাড়া দেশের সব স্তরের সব মানুষকে হকচকিত, বিস্মিত ও আতঙ্কিত করেছে।
হাসপাতালগুলোতে একের পর এক গুলিবিদ্ধ হয়ে আসা লোক (যাঁদের বেশির ভাগই তরুণ যুবা) দেখে চিকিৎসকেরা পর্যন্ত ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন। কিন্তু সেই ভীতি কর্পূরের মতো উবে গেছে। গতকাল শুক্রবারও দেশের বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া হয়েছে। বহু আন্দোলনকর্মী গুলিতে আহত হয়েছেন। নিহতের ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু আন্দোলনকারীদের মধ্যে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
কয়েক দিন আগে ইন্টারনেটের ‘নিজ থেকে চলে যাওয়ার’ কারণে সারা দেশ যখন তথ্যের আলো না পেয়ে অন্ধকারে ডুবে ছিল; টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর স্ক্রলে যখন ‘ভূরুঙ্গামারীতে বাতাবিলেবুর বাম্পার ফলন’মার্কা নিউজ ছাড়া তেমন কিছু পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন বিভিন্ন সরকারি বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ (যদিও ‘সংঘর্ষ’ শব্দটি এখানে হয়তো খাটছে না; কারণ দুটি সমান শক্তির লড়াইয়ের ক্ষেত্রে শব্দটি ব্যবহার করা উচিত) হচ্ছিল। আন্দোলনে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, ধ্বংসযজ্ঞ সবই হলো। মানুষের ক্ষোভ দমাতে প্রাণঘাতী বুলেট ও অন্যান্য মারণাস্ত্র ব্যবহার করা হলো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা ভিডিওতে তাঁদের ওপর গুলি ছোড়ার যে দৃশ্য আমরা দেখলাম, তা আমাদের কল্পনার বাইরে ছিল। সারা দেশ যেন ভয় পেয়ে গেল। সবাই যেন অবিশ্বাস্য আতঙ্কে দুকদম পিছিয়ে গেল। কিন্তু পরে দেখলাম, কোত্থেকে যেন আবার সবাই সাহসী হয়ে উঠলেন।
গতকাল ০২ আগস্ট জাতীয় প্রেসক্লাব, শহীদ মিনার, শাহবাগ এলাকায় ছাত্রছাত্রীদের বিক্ষোভ দেখতে গিয়ে খেয়াল করছিলাম, তাঁদের মধ্যে কোনো ভীতি বা আতঙ্ক কাজ করছে কি না। তাঁদের চোখে যেন সবকিছু ভেঙেচুরে ফেলার সাহস দেখেছি। ‘এত সাহস যে আর ভয় করে না।…না ভয় করে না। ভয়ের ফ্যাকাশে মুখ কেমন অচেনা’ লাগল। মাসখানেক আগেও প্রকাশ্য রাজপথে যেসব স্লোগান দেওয়া সাধারণ মানুষের কল্পনার অতীত ছিল, সেসব স্লোগান এখন সুতীব্র ও উচ্চকিত কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে। যে পুলিশ-বিডিআর মাত্র কয়েক দিন আগেই আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে, গতকাল যুদ্ধের সাজে থাকা সেই বাহিনীর সদস্যদের সামনে তাঁদের অকুতোভয় অবস্থায় দেখলাম।
মনে হলো যেন তাঁরা একযোগে বলছেন, ‘আমাকে হত্যা করলে বাংলার সব কটি মাটির প্রদীপে শিখা হয়ে ছড়িয়ে যাব; আমার বিনাশ নেই। বছর বছর মাটির মধ্য হতে সবুজ আশ্বাস হয়ে ফিরে আসব। আমার বিনাশ নেই।’ এখন রাস্তায় যে আন্দোলনকারীদের দেখবেন, তাঁদের চোখেমুখে আপনি দুঃখ, বেদনা, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, রাগ, ক্ষোভ, ক্রোধ—সব পাবেন। কিন্তু ভয় পাবেন না। কারণ, পিস্তল পকেট থেকে হাতে উঠে এসেছে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি, এমন অনেকেই আছেন, যাঁরা এই আন্দোলনের আগেও সরকারের হাজার অন্যায্য কাজকে ‘স্নেহের চোখে’ দেখতেন। ‘সাত খুন মাফ’ করার সুরে ‘ধুর, বাদ দেন’ বলে হাজার অন্যায় উড়িয়ে দিতেন। সেই তাঁদেরই অনেককে এখন আন্দোলনরত ছাত্রদের পাশে দাঁড়াতে এবং সরকারের পদত্যাগ দাবি করতে দেখছি।
বন্দুকের মারণক্ষমতা নিয়ে আন্দোলনকারীদের মনে যে ভীতিজাগানিয়া রহস্যময়তার পর্দা ছিল, গুলি ছোড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই পর্দা ছিন্ন হয়ে গেছে। এতগুলো গুলিবিদ্ধ লাশ দেখে পাবলিকের মনের সেই ভয়ের আস্তরণ খসে পড়েছে।
এটি এখন পরিষ্কার, মানুষের মধ্যে এখন আর আগের মতো পুলিশভীতি নেই। ছাত্রলীগ বা যুবলীগকে, বিশেষত আন্দোলনকারীরা এখন আর ভয় করেন না।
গত কয়েক বছরে আমরা যেভাবে হেলমেটধারীদের লাঠিপেটা করে আন্দোলনকারীদের বাড়ি পাঠিয়ে দিতে দেখেছি, এখন সেটি খুব কঠিন হবে বলে ধারণা করি। কারণ, সাধারণ মানুষের ভয় ভেঙে গেছে।
গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগকে কখনো এতটা জনবিচ্ছিন্ন দল মনে হয়নি। গতকাল ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ পলক তাঁর নিজের এলাকায় একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, আওয়ামী লীগের যেসব নেতা-কর্মী তাঁর মাধ্যমে নানা সময়ে সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন, তাঁদের কেউ কেউ এখন চুপ রয়েছেন। এমনকি অনেকে তাঁর ফোনও ধরছেন না; অর্থাৎ মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীরা গা বাঁচিয়ে চলা শুরু করেছেন। এটি আওয়ামী লীগের জন্য একটি ভয়ংকর বার্তা দিচ্ছে।
রাস্তায় সরকারের বিরুদ্ধে এখন যাঁরা বিক্ষোভ করছেন, তাঁদের মধ্যে একটি উল্লেখ করার মতো অংশ মাসখানেক আগেও আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ সমর্থক ছিল। আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি, এমন অনেকেই আছেন, যাঁরা এই আন্দোলনের আগেও সরকারের হাজার অন্যায্য কাজকে ‘স্নেহের চোখে’ দেখতেন। ‘সাত খুন মাফ’ করার সুরে ‘ধুর, বাদ দেন’ বলে হাজার অন্যায় উড়িয়ে দিতেন। সেই তাঁদেরই অনেককে এখন আন্দোলনরত ছাত্রদের পাশে দাঁড়াতে এবং সরকারের পদত্যাগ দাবি করতে দেখছি।
একসময় যাঁরা বিএনপি ও জামায়াতকে সহ্য করতে পারতেন না, তাঁদের কাউকে কাউকে এখন সরকারের কঠোর সমালোচনা করতে দেখছি।
এই পটভূমি এক দিনে তৈরি হয়নি। গত ১৫ বছরে সরকারের প্রতিটি স্তরে সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছে। সেই সিন্ডিকেটের মধ্যে সুস্থ রাজনীতির প্রতি প্রতিশ্রুতিশীল লোকদের যতটা না ঠাঁই দেওয়া হয়েছে, তার চেয়ে বেশি দেওয়া হয়েছে টাকার জোরে পদবি কেনা লোকদের। ফলে দুর্নীতি তলা থেকে মাথা পর্যন্ত ছেয়ে গেছে। সাধারণ মানুষ বছরের পর বছর দুর্নীতিবাজদের জুলুম সহ্য করতে করতে অস্থির হয়ে উঠেছে। যাঁরা আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ সমর্থক, তাঁরা মুখে হয়তো সরকারের সব কাজ সমর্থন করছেন, কিন্তু মনে তাঁদের অভিমানের পাহাড় জমা হয়েছে।
রাজধানীর রামপুরা, বাড্ডা, শনির আখড়াসহ যেসব জায়গায় সংঘর্ষ হয়েছে, সেসব জায়গায় ছাত্রদের সঙ্গে লুঙ্গি পরা কিংবা শ্রমজীবী মানুষকে যোগ দিতে দেখা গেছে। অনেকে বলছেন, এঁরা কারা? এঁরা তো ছাত্র নন! এঁরা এখানে কেন?
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি, এসব লোক হলেন এমন সব শ্রমজীবী মানুষ, যাঁরা পুলিশকে এবং পুলিশের সঙ্গে লাঠি হাতে আসা শ্রমিক লীগ, যুবলীগকে শত্রুর চোখে দেখেন। লেগুনা চালিয়ে খায়, এমন এক কিশোর বলল, ট্রাফিক পুলিশ তাদের কাছ থেকে চাঁদা নেয়। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের এক নেতার লোকজন আসেন। তাঁদেরও টাকা দিতে হয়। দিনের পর দিন টাকা দিয়ে যেতে হয়।
মহল্লায় রাস্তার পাশে যে লোকটা সবজি বেচে সংসার চালান, তাঁকে নিয়মিত সরকারি দলের লোকদের একবার এবং পুলিশকে একবার চাঁদা দিতে হয়।
পুলিশের ওপর সবচেয়ে বিরক্ত মনে হয়েছে, রিকশাওয়ালাদের। নানা সময়ে ট্রাফিক পুলিশের হাতে নিগৃহীত হওয়ায় তাঁদের মনে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ।
এর মধ্যে কোটি কোটি ডলার পাচারের ঘটনাকে যখন সরকারের দিক থেকে পাত্তা দেওয়া হয় না; যখন শত শত কোটি টাকা মেরে দেওয়া কর্মকর্তাদের নিরাপদে দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যেতে সুযোগ করে দেওয়া হয়, তখন সবার মধ্যে নাগরিক হিসেবে অমর্যাদার অনুভূতি হয়। এই অমর্যাদার অনুভূতি মূলত এসব লোককে ছাত্র আন্দোলনে জড়িয়েছে।
আর রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের সেখানে থাকাটাই স্বাভাবিক। তাঁরা এই আন্দোলন থেকে তাঁদের রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চাইবেনই।
গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হওয়া মানুষদের দেখে মনে হয়েছে, সেখানে সব মতের, সব শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতি ছিল। মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত, দরিদ্র, আস্তিক-নাস্তিক, হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান—সব শ্রেণির মানুষ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, এসব মানুষের একটি বিরাট অংশ কোটাবিরোধী আন্দোলন শুরু হওয়ার আগপর্যন্ত এই সরকারের সমর্থক ছিল।
কিন্তু সবকিছুর ওপরে, দলমতের ওপরে প্রত্যেক ব্যক্তি যেহেতু দিন শেষে একজন মানুষ; যেহেতু তাঁর সাধারণ মৌলিক মানবিক বোধ আছে; সেহেতু আওয়ামী লীগের বহু সমর্থকসহ অধিকাংশ নাগরিক বিভিন্ন বাহিনীর গুলিতে দুই শতাধিক মানুষ হত্যার ঘটনায় ক্ষুব্ধ। ক্রুদ্ধ। বিচারপ্রার্থী এবং অবশ্যই ভয়হীন।
সারফুদ্দিন আহমেদ , প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক
শহীদ মিনারে স্লোগান দিচ্ছেন রিকশাচালকেরাও
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা, প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৪, ১৭: ০৩
রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে স্লোগান দিচ্ছেন রিকশাচালকেরা। আজ ৩ আগস্ট শনিবার। ছবি: প্রথম আলো
রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে রিকশাচালকেরাও অংশ নিয়ে স্লোগান দিচ্ছেন। আজ শনিবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে এ দৃশ্য দেখা যায়।
শহীদ মিনারের পাশে বেশ কিছু রিকশা নিয়ে অবস্থান করছেন চালকেরা। নিজের রিকশার ওপর বসেই তাঁরা নানা ধরনের স্লোগান দিচ্ছেন। তাদের স্লোগানের মধ্যে রয়েছে ‘গুলি করে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না’, ‘দিয়েছি তো রক্ত, আরও দেব রক্ত’, ‘রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়’, ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছে স্বৈরাচার’, ‘আমার ভাইয়ের রক্ত, বৃথা যেতে দেব না’ ইত্যাদি স্লোগান দিচ্ছেন রিকশাচালকেরা।
সরকার পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের
প্রথম আলো নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা, আপডেট: ০৩ আগস্ট ২০২৪, ২১: ০০
সরকার পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। আজ শনিবার রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে হাজার হাজার মানুষের সমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম এ ঘোষণা দেন।
বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে নাহিদ ইসলাম মাইকে সমবেত মানুষের উদ্দেশে বলেন, ‘মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা এক দফা দাবির সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি। এক দফাটি হলো, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ এই সরকারের পতন ও ফ্যাসিবাদের বিলোপ।’
নাহিদ আরও বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে আমরা খুব দ্রুতই ছাত্র-নাগরিক অভ্যুত্থানের জন্য সর্বস্তরের নাগরিক, ছাত্রসংগঠন ও সব পেশাজীবী মানুষের সঙ্গে মিলে সম্মিলিত মোর্চা ঘোষণা করব। সবার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জাতীয় রূপরেখা আমরা সবার সামনে হাজির করব৷’
‘শুধু শেখ হাসিনা নন, মন্ত্রিসভাসহ পুরো সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে৷ এই ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার বিলোপ করতে হবে৷ আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গঠন করতে চাই, এমন একটি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি করতে চাই, যেখানে আর কখনো কোনো ধরনের স্বৈরতন্ত্র-ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে না পারে৷’—বলেন নাহিদ।
যে স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র-নাগরিক অভ্যুত্থান শুরু হয়ে গেছে, তার সঙ্গে মানুষকে যোগ দেওয়া এবং পাড়ায়-পাড়ায়, মহল্লায়-মহল্লায় সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানান নাহিদ। তিনি কাল থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণাটিও তুলে ধরেন।
শহীদ মিনারে আসা অনেকের হাতে ছিল পোস্টার, প্ল্যাকার্ড। ছবি: প্রথম আলো
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ১ জুলাই থেকে লাগাতার আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। ১৬ জুলাই সংঘর্ষে ৬ জনের মৃত্যু হয়। এরপর আন্দোলন আরও বেগবান হয়। পরবর্তী সময়ে সংঘর্ষ ও সংঘাতে এখন পর্যন্ত ২১৬ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন বহু মানুষ।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন হতাহতের ঘটনায় ৯ দফা দাবি দিয়েছিল। এবার এক দফা দাবি তুলে ধরা হলো। আজ শহীদ মিনারে সামনের সারিতে অন্তত ছয়জন সমন্বয়ক উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা হলেন নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদার ও আবদুল কাদের। তাঁদের মধ্যে নাহিদসহ তিনজন বক্তব্য দেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আজ শনিবার সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচি পালন করে। রোববার থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে। আজকের কর্মসূচিতে অংশ নিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শহীদ মিনার এলাকায় একত্র হয়েছেন শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ।
আজকের কর্মসূচিতে অংশ নিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শহীদ মিনার এলাকায় একত্র হয়েছেন শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষছবি: প্রথম আলো
শহীদ মিনার এলাকায় উপস্থিত প্রথম আলোর তিনজন প্রতিবেদক জানান, আজ শনিবার বেলা আড়াইটার পর থেকে দলে দলে শহীদ মিনারে জড়ো হতে শুরু করেন বিক্ষোভকারীরা। সময় যত গড়াতে থাকে আন্দোলনকারীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। হাজারো মানুষের ভিড়ে শহীদ মিনার চত্বর ও এর আশপাশের এলাকার পা ফেলার জায়গা নেই।
শহীদ মিনার ছাড়াও ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ সমবেত হয়েছেন। ঢাকার বাইরে কয়েকটি জেলায় সংঘর্ষ হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ হয়েছে।
এর আগে সকালে জানা যায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চান আওয়ামী লীগ ও ১৪-দলীয় জোটের নেতারা।
আওয়ামী লীগ নেতারা জানিয়েছেন, দলের পক্ষ থেকে তিনজনকে আলোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁরা হলেন দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম ও মাহবুব উল আলম হানিফ।
দলীয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনুকেও আলোচনায় থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
জানতে চাইলে মাহবুব উল আলম হানিফ প্রথম আলোকে বলেন, সমন্বয়কদের সঙ্গে তাঁদের এখনো যোগাযোগ হয়নি। যোগাযোগ করা হবে।
তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘এখন আর আলোচনার সুযোগ নেই। সিদ্ধান্ত আসবে রাজপথ থেকে।’
স্লোগানে উত্তাল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা, আপডেট: ০৩ আগস্ট ২০২৪, ১৭: ৫২
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হয়েছেন হাজারো মানুষ। ঢাকা, ৩ আগস্ট। ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় একত্র হয়েছেন শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। কোটা সংস্কারের দাবি ঘিরে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন সরকার পতনের স্লোগানে উত্তাল। বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে এই প্রতিবেদন লেখার সময়ও বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে আন্দোলনকারীরা আসছিলেন।
শহীদ মিনার এলাকায় উপস্থিত প্রথম আলোর তিনজন প্রতিবেদক জানান, আজ শনিবার বেলা আড়াইটার পর থেকে দলে দলে শহীদ মিনারে জড়ো হতে শুরু করেন বিক্ষোভকারীরা। সময় যত গড়াতে থাকে, আন্দোলনকারীদের সংখ্যা তত বাড়তে থাকে। হাজারো মানুষের ভিড়ে শহীদ মিনার চত্বর ও এর আশপাশের এলাকার পা ফেলার জায়গা নেই।
শহীদ মিনার এলাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে,’ ‘জাস্টিস জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস,’ ‘দিয়েছি তো রক্ত, আরও দেব রক্ত,’ ‘স্বৈরাচারের গদিতে আগুন জ্বালো একসাথে,’ ‘জ্বালো রে জ্বালো, আগুন জ্বালো,’ ‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’, ‘ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান, অভ্যুত্থান’, ‘পদত্যাগ পদত্যাগ, শেখ হাসিনার পদত্যাগ’ এমন নানা স্লোগান দিচ্ছেন।
‘সারা দেশে ছাত্র-নাগরিকের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে হামলা করে খুনের প্রতিবাদ ও ৯ দফা’ দাবিতে গতকাল নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। তারা আজ সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিল ও কাল রোববার থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়।
আজকের কর্মসূচির অংশ হিসেবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড়ে দুপুর ১২টার দিকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন আন্দোলনকারীরা। বেলা আড়াইটার দিকে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড় থেকে আন্দোলনকারীরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দিকে রওনা হন। বেলা তিনটার দিকে সায়েন্স ল্যাব থেকে কয়েক হাজার মানুষ মিছিল নিয়ে শহীদ মিনার এলাকায় উপস্থিত হন।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষ। ঢাকা, ৩ আগস্ট। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় নিহত, গণগ্রেপ্তার ও হয়রানির প্রতিবাদে ব্যান্ড সংগীতশিল্পীরা আজ বেলা তিনটায় ধানমন্ডির রবীন্দ্রসরোবরে জড়ো হন। সেখান থেকে শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানাতে সংগীতশিল্পীরা শহীদ মিনারে রওনা দেন। মিছিল নিয়ে বিকেল পৌনে চারটার দিকে তাঁরা শহীদ মিনার এলাকায় পৌঁছান।
বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে এই প্রতিবেদন লেখার সময় হাজারো মানুষের মুহুর্মুহু স্লোগানে প্রকম্পিত হচ্ছে পুরো এলাকা। একদিকে জগন্নাথ হল, অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু টাওয়ার, আরেক দিকে দোয়েল চত্বর ছাড়িয়ে গেছে জনতার ঢল। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে আরও লোকজন শহীদ মিনারের দিকে আসছেন।
আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়কের আজ সশরীর শহীদ মিনার এলাকায় আসার কথা রয়েছে। ২৬ জুলাই ঢাকার গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল থেকে তিন সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও আবু বাকের মজুমদারকে ডিবি জোর করে তুলে মিন্টো রোডের কার্যালয়ে নিয়ে যায়। নাহিদ ও আসিফ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরদিন ২৭ জুলাই সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহকে সায়েন্স ল্যাব এলাকা থেকে জোর করে তুলে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ২৮ জুলাই ভোররাতে বাসা ভেঙে জোর করে নুসরাত তাবাসসুমকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
এ ছয়জন গত বৃহস্পতিবার বেলা দেড়টার দিকে ডিবির হেফাজত থেকে ছাড়া পান। ছাড়া পেয়ে তাঁরা বলেছেন, ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) হেফাজতে থাকাকালে গত ২৮ জুলাই রাতে এক ভিডিও বার্তায় আন্দোলন প্রত্যাহারের যে ঘোষণা তাঁরা দিয়েছিলেন, সেটা স্বেচ্ছায় দেননি। তাঁরা বলেন, ছাত্র-নাগরিক হত্যার বিচার ও আটক নিরপরাধ ব্যক্তিদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলনের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
৪ আগস্ট– ২০২৪
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বিক্ষোভ ও গণসমাবেশ কর্মসূচি পালন; কেন্দ্রীয়ভাবে শাহবাগে বিক্ষোভ অবরোধ।
দিনভর বিক্ষোভ, বিকেলে ‘এক দফা’
ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমাবেশে উপস্থিত হন লাখো মানুষ। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে তাঁরা উপস্থিত হন সেখানে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষেরাও এ কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করে। উপস্থিত অনেকের হাতে ছিল প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড, পোস্টার। মাথায় অনেকে পরে এসেছে লাল-সবুজের পতাকা। এই আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবর ও গুলশানে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন পার্কে জড়ো হন শিল্পী ও ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন অঙ্গনের মানুষ। দিনভর বিক্ষোভ প্রতিবাদের পর বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আন্দোলনের সমন্বয়কেরা ‘এক দফা’র ঘোষণা দেন।
আপডেট: ০৪ আগস্ট ২০২৪, ০৫: ২৯
১ / ১২
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দিকে যাচ্ছে আন্দোলনকারীরা। দুপুরে বাড্ডায়। ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ
২ / ১২
প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড হাতে এক শিক্ষার্থী। দুপুরে সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে। ছবি: আশরাফুল আলম
৩ / ১২
বিভিন্ন প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড-পোস্টার হাতে আন্দোলনে সংহতি জানাতে আসে বিভিন্ন পেশার মানুষ। রবীন্দ্র সরোবর, ধানমন্ডি। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন
৪ / ১২
সংগীত শিল্পী শায়ন চৌধুরী অর্ণব (বাঁ থেকে তৃতীয়) সহ ব্যান্ডদলের শিল্পীরা সংহতি জানাতে প্রতিবাদী পোস্টার নিয়ে দাঁড়ায়। রবীন্দ্র সরোবর, ধানমন্ডি। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন
৫ / ১২
সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় অবরোধ করে আন্দোলনকারীরা। ছবি: আশরাফুল আলম
৬ / ১২
কোটা সংস্কারের দাবি ঘিরে শুরু হওয়া আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে গুলশানে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন পার্কে সমাবেশ করেন বিভিন্ন পেশার মানুষ। ছবি: খালেদ সরকার
৭ / ১২
আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে গুলশানে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন পার্ক থেকে বিক্ষোভ মিছিল করে বিভিন্ন পেশার মানুষ।
৮ / ১২
জাতীয় পতাকা গায়ে জড়িয়ে উপস্থিত হয়েছেন ওরা তিনজন। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা। ছবি: আশরাফুল আলম
৯ / ১২
হাতে প্রতীকী প্রতিবাদী কাপড় নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন একদল সংস্কৃতি কর্মী। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা।ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন
১০ / ১২
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা কানায় কানায় ভরা প্রতিবাদী মানুষে। ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ
১১ / ১২
প্রতিবাদী ব্যানার-পোস্টার হাতে বিক্ষোভে উপস্থিত হয়েছে অগণিত মানুষ। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা। ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ
১২ / ১২
সমাবেশ শেষে আন্দোলনের সমন্বয়কেরা ‘এক দফা’র কর্মসূচি ঘোষণা করে।
সংঘাত–সংঘর্ষ গুলি, সারা দেশে পুলিশ সদস্যসহ নিহত ৯৮
আগস্ট ০৪, ১০: ৩২
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সর্বাত্মক অসহযোগের ডাক দেওয়া হয় আজ রোববার। আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ গতকাল শনিবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এ বিষয়ে জরুরি নির্দেশনা তুলে ধরেন। এর আগে সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে রোববার থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আরেক সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এই ঘোষণা দেওয়া হয়।
সর্বাত্মক অসহযোগ চলছে, প্রভাব রাজধানীর সড়কে
এক দফা দাবিতে আজ রোববার (৪ আগস্ট) সারা দেশে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। ঘোষিত এ কর্মসূচির প্রভাব রাজধানীর সড়কে দেখা গেছে। তবে স্বাভাবিকের চেয়ে কম দেখা গেছে যানবাহন। যানবাহনের মধ্য রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা বেশি দেখা গেছে।
গণপরিবহন স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন অফিসগামী অনেক যাত্রী। বিপাকে হাসপাতালগামী রোগী ও স্বজনেরা।
শাহবাগে আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের ধাওয়া, ব্যাপক ভাঙচুর
এক দফা দাবিতে আজ রোববার সারা দেশে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এ সময় বেলা ১১টার দিকে শাহবাগ এলাকায় বিক্ষোভকারীরা আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের ধাওয়া দেন।
রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে লাঠিসোঁটা হাতে শত শত লোক জড়ো হয়েছেন। সকালে সাড়ে ১০টার পরে তাঁরা পুরান ঢাকার দিক থেকে মিছিল নিয়ে শাহবাগে আসেন। সে সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সামনের দিকে আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীরা স্লোগান দিচ্ছিলেন। তবে পুরান ঢাকার দিক থেকে আসা মিছিল থেকে তাঁদের ধাওয়া দেওয়া হয়। তাঁরা হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে যান। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বেলা ১১টার দিকে সেখানে সংঘর্ষ চলছিল।
সংঘর্ষের সময় হাসপাতালের প্রাঙ্গণে রাখা কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। সে সময় হাসপাতালের ভেতরে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীরা ইটপাটকেল ছুড়ছিলেন।
মিছিলের সময় এক দফা দাবিতে স্লোগান দেওয়া হয়। আরও বলা হয়, ‘আমার ভাই মরল কেন, প্রশাসন জবাব চাই’।
এর আগে সকালে শাহবাগ এলাকা দিয়ে দু–তিনজন করে বিক্ষোভকারী যাওয়ার সময় ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীরা তাঁদের মারধর করেন। পরে বিক্ষোভকারীরা সংগঠিত হয়ে আসেন। এ সময় শাহবাগ এলাকায় কোনো পুলিশ দেখা যায়নি।
শাহবাগ থানা এলাকায় একটি পুলিশের গাড়িকে বিক্ষোভকারীদের আসতে দেখে সরে যেতে দেখা যায়।
মুন্সিগঞ্জ শহরের সুপারমার্কেট এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি ঘিরে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। আজ রোববার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ছবিটি তোলা। ছবি: প্রথম আলো
মুন্সিগঞ্জের সুপারমার্কেট এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংঘর্ষ
মুন্সিগঞ্জ শহরে আজ রোববার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি ঘিরে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। সকাল পৌনে ১০টার দিকে শহরের সুপারমার্কেট এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। কয়েকটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাদাঁনে গ্যাসের শেল ছোড়ে। এ প্রতিবেদন লেখার সময় বেলা সোয়া ১১টা পর্যন্ত সংঘর্ষ চলছিল। আগস্ট ০৪, ১১: ২৯
সিএমএম কোর্টের সামনে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে এক দফা দাবিতে চলা অসহযোগ আন্দোলনে রাজধানীর পুরান ঢাকায় পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ চলছে। এ সময় ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের সামনে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। আজ রোববার সকাল ১১টার পর এ ঘটনা ঘটে।
১১: ৪৮ , আগস্ট ০৪
জয়পুরহাট শহরের নতুনহাট এলাকায় বিক্ষোভ
জয়পুরহাট শহরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি চলছে। রোববার বেলা ১১টার দিকে আন্দোলনকারীরা শহরের নতুনহাট এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন। সেখান থেকে তাঁর আধা কিলোমিটার দূরে জিরো পয়েন্ট পাচুর মোড়ে অবস্থান নেন। বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত আন্দোলনকারীরা সেখানে ছিলেন। তাঁরা সরকার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে স্লোগান দেন। এ সময় পাশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে ছিলেন। ১১: ৫২ , আগস্ট ০৪
মুন্সিগঞ্জে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত ২
মুন্সিগঞ্জে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচি চলাকালে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ নেতা–কর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছে। এতে দুজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। আজ রোববার সকাল পৌনে ১০টা থেকে দুপুর পৌনে ১২টা পর্যন্ত দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ১২: ০১ , আগস্ট ০৪
নারায়ণগঞ্জে কারখানা ভাঙচুর, বিসিকে ছুটি
নারায়ণগঞ্জের কায়েমপুর এলাকায় সকাল নয়টার দিকে অন্তত তিনটি তৈরি পোশাক কারখানায় ভাঙচুর করেছে আন্দোলনকারীরা। পরে এসব কারখানার পাশাপাশি আশপাশের সব কারখানা ছুটি দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। বেলা ১১টার দিকে বিসিক শিল্পনগরে দিকে আন্দোলনকারীরা গেলে সেখানকার সব পোশাক কারখানা ছুটি ঘোষণা করে সেখানকার মালিক সমিতি।
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম প্রথম আলোকে বলেন, কায়েমপুর এলাকায় সকালে বহিরাগত লোকজন প্রথমে ইউরোটেক্স কারখানায় হামলা করে শ্রমিকদের বের করে দেয়। পরে শ্রমিকদের একটি অংশ তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়। পরে পরিস্থিতি অবনতি হতে থাকলে আমরা বিসিকের সব কারখানা শ্রমিকদের ছুটি দিয়ে দিয়েছি। বিসিকে আড়াই লাখ শ্রমিক কাজ করেন। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা পুলিশের সহায়তা চেয়েছি। তবে সেভাবে সহায়তা না পাওয়ায় বিসিকের সব কারখানা ছুটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ১২: ০৮ , আগস্ট ০৪
মিরপুরে সংসদ সদস্য মাইনুলের নেতৃত্বে সমাবেশ
মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে মিরপুর–১৪ নম্বরের সংসদ সদস্য মাইনুল হোসেন নিখিলকে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সমাবেশ করতে দেখা গেছে। রোববার বেলা ১১টার আগে এ সমাবেশ দেখা গেছে। এ সময় তাঁদের অনেকের হাতে লাঠি দেখা যায়। মিরপুর–১০ নম্বরে রাস্তাঘাটে যানবাহন কম চলতে দেখা গেছে। ১২: ১১ , আগস্ট ০৪
গাজীপুরে মহাসড়ক অবরোধ, আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে আগুন
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে এক দফা দাবিতে ‘অসহযোগ আন্দোলন’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীরা জড়ো হচ্ছেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর বাজার থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শত শত শিক্ষার্থী চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় যায় এবং মহাসড়কে অবরোধ সৃষ্টি করে। চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীরা চন্দ্রা দলীয় কার্যালয়ে সামনে অবস্থান করলে তাদের ধাওয়া দেওয়া হয়। একপর্যায়ে দলীয় কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়। চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় পুলিশ বক্স ভাঙচুর করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরের নিউমার্কেট এলাকায় সংঘর্ষ
চট্টগ্রাম নগরের নিউমার্কেট এলাকায় বিক্ষোভকারী–পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সংঘর্ষ চলছে। সকাল থেকে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ চললেও সোয়া ১১টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মীদের ওপর সিটি কলেজের দিক থেকে হামলা করেন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতা–কর্মীরা। এরপর দুপুর ১২টার দিকে পুলিশও বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষে অন্তত আট জন আহত হন বলে খবর পাওয়া গেছে।
একই স্থানে আজ বেলা একটায় অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন। বেলা ১১টা পর্যন্ত বিক্ষোভকারীরা শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করেন। তবে সোয়া ১১টার দিকে সিটি কলেজের সামনের এলাকা থেকে সরকার-সমর্থক একদল যুবক হঠাৎ বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা শুরু করেন। এ সময় গুলির শব্দ শোনা যায়। বেলা ১২টার দিকে ঘটনাস্থলে পুলিশ আসে। এ সময় পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল ছুড়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। ১২: ২০ , আগস্ট ০৪
১১ ঘণ্টা পর চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কে যান চলাচল শুরু
১১ ঘণ্টারও বেশি সময় পর চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে যান চলাচল শুরু হয়েছে। গতকাল শনিবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে মহাসড়কে যান চলাচল শুরু হয়। এর আগে গতকাল বেলা দুইটার দিকে মহাসড়ক অবরোধ করা হয়।
দোহাজারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মুহাম্মদ এরফান বলেন, রাত দুইটার পর থেকে মহাসড়কে যান চলাচল শুরু হয়েছে।
লোহাগাড়া উপজেলার অন্তত পাঁচটি জায়গায় দীর্ঘসময় ধরে মহাসড়ক অবরোধ করে রেখেছিলেন আন্দোলনকারীরা। এ সময় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের এই অংশে অন্তত ১১ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
রাজধানীর উত্তরায় বিক্ষোভকারীরা। ছবি: খালেদ সরকার
শাহবাগে বিপুলসংখ্যক বিক্ষোভকারীর অবস্থান, মিছিল আরও আসছে
রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছেন বিক্ষোভকারীরা। দুপুর ১২টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সেখানে হাজার বিক্ষোভকারী ছিলেন। আরও মিছিল আসছিল। তাঁরা সরকারের পদত্যাগের দাবিতে নানা স্লোগান দিচ্ছিলেন।
শাহবাগ থানার সামনে পুলিশ অবস্থান নিয়ে আছে। থানার সামনে বিক্ষোভকারীদের একাংশ সেখানে অবস্থান থানার দিকে কাউকে না যাওয়ার অনুরোধ করছেন। মিছিল অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এর আগে আজ রোববার বেলা ১১টার দিকে শাহবাগ এলাকায় বিক্ষোভকারীরা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ধাওয়া দেন। সকাল সাড়ে ১০টার পরে তাঁরা পুরান ঢাকার দিক থেকে মিছিল নিয়ে শাহবাগে আসেন।
সে সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সামনের দিকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা স্লোগান দিচ্ছিলেন। তবে পুরান ঢাকার দিক থেকে আসা মিছিল থেকে তাঁদের ধাওয়া দেওয়া হয়। তাঁরা হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে যান। সেখান থেকে ইটপাটকেল ছোড়া হচ্ছিল। তখন বিক্ষোভকারীরা হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের খুঁজতে থাকেন। এ সময় হাসপাতালের প্রাঙ্গণে থাকা প্রায় ২০টি গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স এবং ১৫টির মতো মোটরসাইকেলে ভাঙচুর করা হয়। কয়েকটি মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়।
বেলা সোয়া ১১টার দিকে বিক্ষোভকারীরা হাসপাতালের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসার সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। তখন আবার তাঁরা ভাঙচুর শুরু করেন। সাড়ে ১১টার দিকে হাসপাতালের প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে যান বিক্ষোভকারীরা। তাঁরা শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেন। সেখানে বিক্ষোভে এক দফা দাবিতে স্লোগান দেওয়া হয়। আরও বলা হয়, ‘আমার ভাই মরল কেন, প্রশাসন জবাব চাই’।
রাজধানীর উত্তরায় শিক্ষার্থী ও বিক্ষোভকারীরা। ছবি: খালেদ সরকার, আগস্ট ০৪, ১২: ২৬
২১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলরের কার্যালয়ে আগুন
রাজধানীর পরিবাগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. আসাদুজ্জামানের কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়েছে। আজ রোববার বেলা ১২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। ১২: ২৭ , আগস্ট ০৪
ফরিদপুরে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কার্যালয়ে আগুন
ফরিদপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অসহযোগ কর্মসূচির প্রথম দিনে আগুন দেওয়া হয়েছে জেলা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কার্যালয়ে। রোববার বেলা ১১টার দিকে শহরের হাসিবুল হাসান লাবলু সড়কে অবস্থিত জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে হামলা করা হয়। হামলার মুখে ওই কার্যালয়ের সামনে অবস্থানকারী আওয়ামী লীগের কর্মীরা পালিয়ে যায়। পরে বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে অবস্থিত আটটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে কার্যালয়ের ভেতরে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিক্ষুব্ধরা সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের ছাত্র সংসদের ভবন দখল করে বানানো জেলা ছাত্রলীগের কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে।
এরপর বিক্ষোভকারীরা ফরিদ শাহ সড়ক ধরে কোট এলাকার দিকে যেতে চাইলে রাজেন্দ্র কলেজ ও জেলখানার মোড়ে বাধা দেয় পুলিশ। এ সময় পুলিশ রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। পৌনে ১২টার দিকে বিক্ষোভকারীরা থানা রোডে অবস্থিত শহর আওয়ামী লীগে কার্যালয়ে হামলা করে।
উত্তরা আজমপুরে বিক্ষোভকারী, পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ, মহাসড়কে আগুন
রাজধানী উত্তরার আজমপুরে বিক্ষোভকারী, পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ চলছে। আজ রোববার দুপুর ১২টার দিকে এই সংঘর্ষ শুরু হয়।
এর আগে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের ধাওয়া দেয় বিক্ষোভকারীরা। তাঁরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে। বিক্ষোভকারীরা বিএনএস থেকে আজমপুর পর্যন্ত সড়কে অবস্থান করছেন। রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
দুপুর ১২টার দিকে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য হাবিব হাসান আজমপুরের একটি ক্যাম্পে বক্তব্য দিচ্ছিলেন। বিক্ষোভকারীরা ছিলেন সড়কে। পরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। একপর্যায়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী, পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।
সংঘর্ষের একপর্যায়ে মহাসড়কে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ১২: ৪৮ , আগস্ট ০৪
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১৩, কয়েকজন গুলিবিদ্ধ
রাজধানীর শাহবাগ, শনির আখড়া, নয়াবাজারসহ বিভিন্ন স্থান থেকে আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন ১৩ জন। এর মধ্যে কয়েকজন গুলিবিদ্ধ রয়েছেন। ১২: ৫৭ , আগস্ট ০৪
মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ, বন্ধ ফেসবুক–হোয়াটসঅ্যাপও, সচল ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট
মেটার প্ল্যাটফর্ম ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রাম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে সরকারি একটি সংস্থা। রোববার বেলা ১টার পর ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ নির্দেশ দেওয়া হয়।
সরকার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে আজ থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এই আন্দোলনে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষে সারা দেশে বেলা আড়াই পর্যন্ত ৫ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
এ পরিস্থিতিতে আজ বেলা ১২টার দিকে মোবাইল অপারেটরদের ফোর-জি ইন্টারনেট সেবা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। ফোর-জি বন্ধ থাকলে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করা যায় না। তখন শুধু টু-জির মাধ্যমে কথা বলা যায়। দেশে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১২ কোটির বেশি।
ঘণ্টাখানেক পর বেলা ১টার দিকে আইআইজি প্রতিষ্ঠানগুলোকে মেটার ক্যাশ সার্ভার বন্ধের জন্য মৌখিকভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট এখনো সচল রয়েছে।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৭ জুলাই রাত থেকে মোবাইল ইন্টারনেট এবং ১৮ জুলাই রাতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যায়। পাঁচ দিন পর ২৩ জুলাই ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত পরিসরে ফেরে। ১০ দিন পর ২৮ জুলাই মোবাইল ইন্টারনেট চালু হয়। কিন্তু বন্ধ ছিল মেটার প্ল্যাটফর্ম ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রাম। এ ছাড়া টিকটকও বন্ধ রাখা হয়। অন্যদিকে ব্রডব্যান্ড সংযোগে ইউটিউব চালু থাকলেও মোবাইল ডেটায় তা বন্ধ ছিল। গত ৩১ জুলাই ফেসবুকও চালু করা হয়েছিল।
এক দফা দাবিতে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এ অসহযোগ আন্দোলনে রাজধানীর শাহবাগসহ কয়েক জায়গায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ১৩: ১২ , আগস্ট ০৪
সায়েন্স ল্যাবে পুলিশ বক্স ভাঙচুর
রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব এলাকায় আজ রোববার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে বিক্ষোভ করছেন বিক্ষোভকারীরা। দুপুরে সায়েন্স ল্যাব মোড়ের পুলিশ বক্স ভাঙচুর করা হয়েছে। পরে ভাঙা লোহালক্কড় একজনকে রিকশায় করে নিয়ে চলে যেতে দেখা যায়।
বিক্ষোভকারীরা সরকারবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছেন। সায়েন্স ল্যাব হয়ে কোনো যানবাহন চলাচল করছে না। আশপাশ এলাকায় পুলিশের অবস্থান দেখা যায়নি। ওই এলাকার সড়ক বিভাজক ভাঙচুর করা হয়েছে। সড়কে ইটের ভাঙা অংশ ছড়িয়েছিটিয়ে আছে।
সরিষাবাড়ীতে সড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলায় আরামনগর বাজার এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করেছে। প্রায় দুই ঘন্টা জামালপুর-সরিষাবাড়ী সড়ক অবরোধ করে চলে এই বিক্ষোভ। এতে সড়কের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ১৩: ১৫ , আগস্ট ০৪
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক অবরোধ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলা সদরের কুট্টাপাড়া মোড় থেকে বিশ্বরোড মোড় পর্যন্ত এক কিলোমিটারে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী অবস্থান নিয়েছে। সকাল নয়টা থেকে শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে থাকে। বেলা ১১টার দিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে সব ধরনের যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
গণতন্ত্রহীন রাজনীতির অনিবার্য পরিণতি
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৪, ০৯: ২৬
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
বাঙালি চিরকালই বিদ্রোহী। ইতিহাসের কোনো পর্বে সে কোনো পরাধীনতাকে বেশি দিন মেনে নেয়নি। উপমহাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্র দিল্লি থেকে দূরে হওয়ায় এবং সাড়ে তিন শ নদী ও রাজমহল পাহাড় দিয়ে বিচ্ছিন্ন থাকায় বাংলা কেন্দ্রের বিরুদ্ধে প্রায় সব সময় বিদ্রোহ বজায় রেখেছে। সেদিনের ব্রিটিশ আমলেও ফকির বিদ্রোহ, সন্ন্যাস বিদ্রোহ, তিতুমীরের বিদ্রোহ, বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন, অনুশীলন সমিতি, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন এবং পরবর্তী সময়ে বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, নকশাল আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান এসব তার প্রমাণ। ব্রিটিশকে প্রথমত কলকাতা-ছাড়া ও পরে ভারতছাড়া করেছিল মুখ্যত বাঙালিরাই।
বাঙালির বিদ্রোহী মনোভাবের আরও একটি কারণ আছে। বাইরে থেকে যত নিরীহ আর শান্তই মনে হোক, বাঙালির ভেতরে রয়েছে এক জ্বলিত ইস্পাত। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে সে তার স্বাক্ষর রেখেছে। এরশাদের পতনের সময় আমি এক বন্ধুকে রসিকতা করে বলেছিলাম, কোনো একনায়কতন্ত্রী শাসনকে বাঙালি ১০ বছরের বেশি সহ্য করতে পারে না। আইয়ুব খানকে ১০ বছরের বেশি সহ্য করেনি। এরশাদকে ৯ বছরের মাথায় বিদায় করেছে। পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীনকে (রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে ছাত্র হত্যার দায়ে) ৭ বছরের মধ্যে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করেছে।
যে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের নৈতিক মান এমন প্রশ্নবিদ্ধ, সে দেশের কোনো দলীয় সরকারের নেতৃত্বে সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ভাবাও কঠিন।
১৯৯১ সালে আমরা গণতন্ত্রের যোগ্যতা ছাড়াই গণতন্ত্র পেয়ে যাই। এর ফল যা হওয়ার তা-ই হয়। দেশের প্রধান দুটি দল পালাক্রমে অতীতের একনায়কতন্ত্রীদের ধারায়, নিখাদ স্বৈরাচারীদের মতো, দেশ শাসন শুরু করে। ফলে সেই উদগ্র ক্ষমতালিপ্সার মুখে গণতন্ত্রের মহান স্বপ্ন উল্টে ‘রাষ্ট্রের চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে ব্যক্তি বড়’তে পরিণত হয়। পরিস্থিতির ক্রমাবনতির মুখে বাংলাদেশ প্রায় দুটি দেশে বিভক্ত হয়ে যায় ও দেশ গৃহযুদ্ধের মতো অবস্থায় এসে পড়ে।
সামরিক বাহিনী-সমর্থিত সরকারের পর ২০০৮ সালে বর্তমান সরকার বিপুল ভোটে জয়লাভ করলে দেশবাসীর দ্বারা ব্যাপকভাবে অভিনন্দিত হয়। কিন্তু এরপরই তাদের ভেতর উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেখা দিতে শুরু করে। বছর দশেক আগে কোনো এক অনুষ্ঠানে বর্তমান সরকারপ্রধানের শিক্ষক ও অতি নিকটজন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান জানিয়েছিলেন, ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধের নৈতিক স্বপ্ন অর্জিত হয়নি।’ খুব সম্ভব সে সময় দেশে অব্যাহত দুর্নীতির চক্রবৃদ্ধি দেখে গভীর দুঃখ থেকেই তিনি কথাগুলো বলেছিলেন। শুধু একালে নয়, বাঙালির নৈতিকতার খুব একটা সুনাম কোনো সময়েই ছিল না। জৈনধর্মের প্রবর্তক মহাবীরের জীবনীতে, ইবনে বতুতার ভ্রমণবৃত্তান্তে, ব্রিটিশ লেখক ও অফিসারদের রচনায় বা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এই অনৈতিকতার হাজারো চিত্র আমরা অহরহ পাই। যে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের নৈতিক মান এমন প্রশ্নবিদ্ধ, সে দেশের কোনো দলীয় সরকারের নেতৃত্বে সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ভাবাও কঠিন।
এ কারণে ১৯৯১-এর নির্বাচনের সময় থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সব রাজনৈতিক দলই ঐকমত্যে আসে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারকেই সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ার একমাত্র নিশ্চয়তা মনে করায় ১৯৯৬ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে তৎকালীন সরকারের দ্বারা পদ্ধতিটিকে সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করিয়ে নেন।
যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিকে সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ব্যাপক আন্দোলন করেছিলেন, তিনিই স্বয়ং উদ্যোগী হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বিলুপ্ত করে ২০১৪ সালে ক্ষমতাসীন সরকারের হাতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব অর্পণ করেন।
এতে একটা ব্যাপার নিশ্চিত হয় যে চাইলে ক্ষমতাসীন সরকার কারচুপির মাধ্যমে প্রতিটি নির্বাচনে জিততে ও যত দিন খুশি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার সুযোগ নিতে পারবে। হলোও তাই। একের পর এক অবিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের ভেতর দিয়ে বর্তমান সরকার নির্বিঘ্নে একচ্ছত্র ক্ষমতায় দেশ শাসন করে চলল। অনন্তকাল ক্ষমতায় থাকার সুযোগ একদিক থেকে গভীর স্বস্তির ব্যাপার হলেও আরেক দিক থেকে খুবই বিপজ্জনক। অ্যাবসলিউট পাওয়ার করাপ্টস অ্যাবসলিউটলি। তাই এই ক্ষমতা যেন চিরস্থায়ী হয়, এমনই একটা দুরপনেয় আকাঙ্ক্ষা, শেক্সপিয়ারের ম্যাকবেথ-এর মতো, ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের হৃদয়কে লুব্ধ করে তুলতে থাকে। হয়েছেও তা-ই। ধীরে ধীরে, নিপুণ কৌশলে, বিপুল জবাবদিহিহীন সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে রাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি অঙ্গকে (সামরিক বাহিনী, পুলিশ বাহিনী, আমলাতন্ত্র ও অনেকাংশে বিচার বিভাগকে) তারা সম্পূর্ণভাবে বশীভূত করে ফেলেছে। দলের লাখ লাখ কর্মীকে নির্বিচার সন্ত্রাস, লুণ্ঠন, ছিনতাই—এসবের সুযোগ দিয়ে দেশকে অপ্রতিহত লুণ্ঠনের সাম্রাজ্য করে ফেলা হয়েছে।
শুধু একালে নয়, বাঙালির নৈতিকতার খুব একটা সুনাম কোনো সময়েই ছিল না। জৈনধর্মের প্রবর্তক মহাবীরের জীবনীতে, ইবনে বতুতার ভ্রমণবৃত্তান্তে, ব্রিটিশ লেখক ও অফিসারদের রচনায় বা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এই অনৈতিকতার হাজারো চিত্র আমরা অহরহ পাই।
আজ দেশে এমন মানুষ খুব কমই আছে, যারা প্রতিমুহূর্তে এসব দুর্নীতি আর নিগ্রহে নিষ্পেষিত হচ্ছে না। সাধারণ মানুষ তাদের নিরাপত্তা ও আশ্রয়স্থল হারিয়ে অসহায়ের মতো ইতিউতি ত্রাণকর্তা খুঁজছে। শুধু গড়পড়তা মানুষ নয়, যারা লুণ্ঠনকারী, তারাও অন্য লুণ্ঠনকারীদের হাতে লুণ্ঠিত হচ্ছে।
এমন মাৎস্যন্যায়ের ভেতর দেশের ছাত্রসমাজ বৈষম্যমূলক কোটা সংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূচনা ঘটাল। তাদের দাবি আদৌ অযৌক্তিক ছিল না।
সরকার যে তাদের দাবি এত চটজলদি এবং প্রায় পুরোপুরি মেনে নিল, এটাই প্রমাণ করেছে ছাত্রসম্প্রদায়ের দাবি কতটা যৌক্তিক ছিল। সরকার প্রথমেই ছাত্রদের সঙ্গে আন্তরিকভাবে আলাপ-আলোচনা করে এর একটা সমাধান অনায়াসে বের করতে পারত। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই, মহাভারতের কর্ণের মতো, জীবনের সঙিনতম মুহূর্তে নিজের সবচেয়ে অমোঘ অস্ত্রটির কথা ভুলে যায়। দীর্ঘদিনের ক্ষমতার প্রতাপ, শক্তির দম্ভ ও অহমিকার কারণে তাঁরা সম্ভবত সে পথ নেননি। তাঁরা বেছে নিলেন শক্তি ও বলপ্রয়োগের মাধ্যম।
কনফুসিয়াস বলেছিলেন, কোনো রাজা ‘যদি তার নাগরিকদের ভালোবাসে’, তবে তিনি তাঁর নাগরিকদের সঙ্গে যে আচরণ করবেন, তা-ই হলো রাজোচিত আচরণ। সরকারের সেই রাজোচিত আচরণ কোথায়?
হঠাৎ একপর্যায়ে সাংবাদিকদের সামনে সরকারপ্রধান এমন একটি কটূক্তি করেন, যাতে ছাত্রছাত্রীরা অনুভব করে সরকারপ্রধান আন্দোলনকারীদের ‘অস্তিত্বকে অসম্মান’ করেছেন। প্রতিবাদে দুপুররাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা রাজপথে বেরিয়ে আসেন। সেই সঙ্গে ছাত্ররা। চলতে থাকে ছাত্রছাত্রীদের শান্তিপূর্ণ তুলকালাম শোভাযাত্রা।
তারপর সশস্ত্র ছাত্রলীগের বিপুলসংখ্যক কর্মী, পুলিশ, বিজিবি, সামরিক বাহিনীকে দিয়ে নিরস্ত্র ছাত্র ও সাধারণ মানুষের ওপর যে অকথ্য নিগ্রহ চালানো হলো, যে পরিমাণ হত্যা, মৃত্যু, গ্রেপ্তার ও নির্যাতন চলল, তা আমাদের জাতির ইতিহাসের অন্যতম দুঃখময় অধ্যায়। আজও সেই সরকারি নিগ্রহ ও জনগণের নিরস্ত্র প্রতিরোধ চলমান রয়েছে। ঘটনাটি গোটা বিশ্বের কাছে আমাদের ভাবমূর্তিকে টেনেহিঁচড়ে কাদায় নামিয়ে দিয়েছে।
কোটার বৈষম্যবিরোধিতা নিয়ে এ আন্দোলন শুরু হয়েছিল। কিন্তু সেখান থেকে এ আন্দোলন আজ সরে এসেছে সমাজ ও রাষ্ট্রের বৈষম্য ও মানবিক অসাম্যের বিরুদ্ধে। হ্যাভস আর হ্যাভ নটসের সংঘাতে। যে দুই দলের মধ্যে বিরোধ চলছে, তার একটি মূলত হ্যাভস, একটি হ্যাভ নটস।
সরকার বিরোধী দলগুলোর ওপর এ দুর্ঘটনার পুরো দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কোথায় এ দেশে বিরোধী দল? তারা তো বহু আগেই নিশ্চিহ্ন। যে সোয়া দুই শ মানুষ নিহত হয়েছেন, তাঁদের কজন বিরোধী দলের? যে ১০ হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন, তার মধ্যে হিসাবমতে মাত্র ২০০ জন বিএনপি ও ৬৩ জন জামায়াত। কোথায় এখানে বিরোধী দল? মৃত বা গ্রেপ্তার—সবই তো হয় ছাত্র, নয় সাধারণ মানুষ।
একটা আধুনিক রাষ্ট্রে পুলিশ, সীমান্তরক্ষী, সেনাবাহিনীÑএমন অনেক কিছুই থাকে। এদের শক্তিও অনেক। কিন্তু এদের চেয়েও শক্তিমান একটা জিনিস থাকে প্রতিটি জাতির জীবনে। তার নাম জনগণ। এর চেয়ে শক্তিমান কেউ নয়। আজ আমেরিকার দুর্জয় সেনাবাহিনী পৃথিবীকে ৯০০ বার ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু তার নিজের দেশে মার্শাল ল দিতে পারে না। এ জন্য পারে না যে ওই জনগণের মধ্যে এমন কিছু শক্তি আছে, যা ওই সেনাবাহিনীর ক্ষমতার চেয়ে বেশি।
সাময়িকভাবে এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও দেশজোড়া দুর্নীতি আর লুণ্ঠনের ফলে মানুষের বুকের ভেতর দীর্ঘদিন ধরে যে ক্ষোভ, বেদনা, ঘৃণা ও আক্রোশ পুঞ্জীভূত হয়ে আছে, তাকে মুছবে কে? জাতীয় কল্যাণকে আর অহমের দাস করে রাখবেন না। গণতন্ত্র চিরকালই সহযোগিতার, সৌহার্দ্যের—তার এই মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখুন। নমনীয় হোন।
কনফুসিয়াস বলেছিলেন, কোনো রাজা ‘যদি তার নাগরিকদের ভালোবাসে’, তবে তিনি তাঁর নাগরিকদের সঙ্গে যে আচরণ করবেন, তা-ই হলো রাজোচিত আচরণ। সরকারের সেই রাজোচিত আচরণ কোথায়?
আমরা যেন না ভুলি যে স্বৈরাচারীরা ক্ষমতা দেখাতে গিয়ে ধ্বংস হন আর গণতন্ত্রী সবাইকে ভালোবাসা দিয়ে জয়লাভ করেন।
ধৈর্যের ‘শেষ সীমায়’ আ.লীগ, প্রতিরোধ করতে বললেন নানক
বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা
আপডেট: ০৪ আগস্ট ২০২৪, ১৭: ৫০
ধৈর্যের শেষ সীমায় আওয়ামী লীগ পৌঁছে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক। তিনি বলেছেন, ধৈর্য ধরা মানে দুর্বলতা নয়।
সরকারের পদত্যাগের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম দিনে আজ রোববার রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ হচ্ছে। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত ৩৮ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে।
এর মধ্যে বিকেলে ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ বরেন জাহাঙ্গীর কবির নানক। তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াত জঙ্গিগোষ্ঠী যে অরাজকতা করছে, তা প্রতিহত করতে হবে। এ জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সাম্প্রতিক সময়ে দলের পক্ষ হয়ে সংবাদ সম্মেলন কিংবা ব্রিফিং করে আসছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তবে আজ প্রথম সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ব্রিফিং করলেন। এ সময় দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রাজ্জাকসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান চায় সরকার, অশান্তি করলে শক্ত হাতে দমন: তথ্য প্রতিমন্ত্রী
বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকা
আপডেট: ০৫ আগস্ট ২০২৪, ০০: ১৮
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত।
সরকার আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে উদ্ভূত পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধান করতে চায় বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত। তিনি বলেন, কিন্তু অশান্তি সৃষ্টি করা হলে তা শক্ত হাতে দমন করা হবে। আইনের প্রয়োগ করা হবে।
আজ রোববার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের টানেলে জরুরি এক সংবাদ সম্মেলনে তথ্য প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব নাঈমুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন। পরে মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সংঘাত এড়ানোর জন্য আলোচনার দরজা খোলা রেখেছি। আমরা সংঘাতে যেতে চাচ্ছি না। কিন্তু একই সঙ্গে বলতে চাই, সন্ত্রাসীরা সন্ত্রাস করলে আইনের প্রয়োগও ঘটাতে হবে। অশান্তি সৃষ্টি করা হলে তা শক্ত হাতে দমন করা হবে। আমরা সন্ত্রাসকে দমন করব।’
আন্দোলন আর আন্দোলনের জায়গায় নেই উল্লেখ করে তথ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এখন সন্ত্রাস-সহিংসতায় চলে গেছে। আমাদের অবস্থান শান্তির পক্ষে ছিল। আলোচনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলাম। সহিংসতার ফলে যে হতাহতের ঘটনা ঘটেছিল, তার বিচারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলাম। যাঁরা আহত-নিহত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অনেকে শিশু ছিল। এই মৃত্যুগুলোর জন্য বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষ কাঁদছে। এই মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী, তাদের বিচার করতে হবে। তদন্ত করে জানতে হবে কারা এই হত্যাগুলো করেছে। এই শিশুরা সরকার পতনের আন্দোলন করছিল না।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই মৃত্যুগুলো, এই লাশের ওপর দাঁড়িয়ে কারা এর সুবিধা নিয়েছে, মানুষকে উসকে দিয়েছে? কারা মানুষকে উসকে দিয়ে বিপথে পরিচালিত করেছে এবং তাদের বিভিন্ন ধরনের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার চেষ্টা করেছে?
এ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা সবাই বিচার চাই। কিন্তু রায় দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তার মানে বিচার চাওয়া হচ্ছে না। সরকার বিচার চায়, সে জন্য বিচার বিভাগীয় কমিশন করা হয়েছে। বিচার বিভাগীয় কমিশন কাজ শুরু করেছে। তারা বিদেশি বিশেষজ্ঞদের আনছে। তারাও এ তদন্তে ঢুকবে। তারাও বলবে তদন্তে কী পাচ্ছে, না পাচ্ছে। একবারে স্বচ্ছতার সঙ্গে। তদন্তের পর জানা যাবে কে, কীভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিএনপি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেনি। আন্দোলনকারীরা বিএনপির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। এখন আর তারা আলাদা থাকল না। এটা বিএনপি–জামায়াতই হয়ে গেল। তিনি বলেন, ‘২৮ অক্টোবর যাদের মোকাবিলা করেছিলাম, তারাই সামনে চলে এসেছে। এটা এখন জনগণ আর ছাত্রদের অধিকারের জায়গায় থাকল না। এখন যদি তারা সন্ত্রাস করে, সেটা আমরা রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করব।’
সাধারণ মানুষ সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করতে শুরু করেছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আন্দোলনের নামে যে সন্ত্রাসীরা ঢুকেছে, তারা প্রতিহতের শিকার হয়েছে। সাধারণ মানুষ এটা প্রতিহত করেছে।
শিক্ষার্থীদের এক দফা: বিক্ষোভে উত্তাল বাংলাদেশ
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
আপডেট: ০৪ আগস্ট ২০২৪, ১০: ১৮
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জনতার মহাসম্মিলন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিল্পী, কবি-সাহিত্যিকসহ বিভিন্ন অঙ্গনের মানুষ জড়ো হন ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায়। ব্যানার, ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড, পোস্টারে বিভিন্ন প্রতিবাদী কথা লিখে আনেন তাঁরা। থেমে থেমে চলে বিক্ষুব্ধ স্লোগান।
ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদি থেকে সামনের গোটা চত্বর, সড়ক। এক পাশের মূল সড়কটি ধরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনের সড়ক। কোনাকুনি দোয়েল চত্বরের দিকে চলে যাওয়া সড়ক। আরেক পাশে পলাশীর দিকে গেছে যে সড়ক—সর্বত্র মানুষ আর মানুষ। কানায় কানায় পূর্ণ। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে ভিজে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের স্রোত মিশেছে শহীদ মিনারে।
গতকাল শনিবার বেলা দেড়টার পর ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শহীদ মিনারে আসতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। বিপুল মানুষের পুরো জমায়েতে তরুণ উপস্থিতি ছিল সবচেয়ে বেশি। স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে শুধু রাজধানী নয়, পুরো বাংলাদেশ। নারী-পুরুষ সবার কণ্ঠে একই সুর। সরকার পতনের এক দফা দাবির স্লোগান ওঠে চারপাশে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল ঢাকার পাশাপাশি অন্তত ৩৩টি জেলা ও মহানগরে বিক্ষোভ হয়েছে। শিক্ষার্থী ছাড়াও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এসব কর্মসূচিতে অংশ নেন। গাজীপুরে ও চট্টগ্রামে কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ-সংঘাতে দুজন নিহত হয়েছেন। কুমিল্লায় শিক্ষার্থীদের মিছিলে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের হামলায় ৭ জন গুলিবিদ্ধ হন। এ ছাড়া সাতটি জেলায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৩০ জন।
জমায়েতের মূল কেন্দ্র শহীদ মিনার
স্লোগানে প্রকম্পিত ছাত্র-জনতার জমায়েতের কেন্দ্র শহীদ মিনারে বেলা সাড়ে তিনটার দিকে উপস্থিত হন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ক। সবার দাবি জানতে চান তাঁরা। সবাই সমস্বরে এক দফা দাবির কথা জানান। ‘ছাত্র-জনতা অভ্যুত্থান, অভ্যুত্থান’, ‘পদত্যাগ পদত্যাগ, শেখ হাসিনার পদত্যাগ’ এমন স্লোগান ওঠে চারপাশে।
বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে এক দফার নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা এক দফা দাবির সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি। দফাটি হলো, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ এই সরকারের পতন ও ফ্যাসিবাদের বিলোপ। ’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে এক দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। ঢাকা, ৩ আগস্ট। ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ
নাহিদ আরও বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে আমরা খুব দ্রুতই ছাত্র-নাগরিক অভ্যুত্থানের জন্য সর্বস্তরের নাগরিক, ছাত্রসংগঠন ও সব পেশাজীবী মানুষের সঙ্গে মিলে সম্মিলিত মোর্চা ঘোষণা করব। সবার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জাতীয় রূপরেখা আমরা সবার সামনে হাজির করব।’
‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গঠন করতে চাই, এমন একটি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি করতে চাই, যেখানে আর কখনো কোনো ধরনের স্বৈরতন্ত্র-ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে না পারে।’ বলেন নাহিদ। যে স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র-নাগরিক অভ্যুত্থান শুরু হয়ে গেছে, তার সঙ্গে মানুষকে যোগ দেওয়া এবং পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানান নাহিদ। তিনি আজ রোববার থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণাও তুলে ধরেন।
নাহিদের বক্তব্যের পর আরেক সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি ঘিরে কিছু জরুরি নির্দেশনা দেন। তিনি জানান, অসহযোগ কর্মসূচির মধ্যে হাসপাতাল, ওষুধের দোকান, জরুরি পরিবহন সেবা (ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম পরিবহন), অ্যাম্বুলেন্স সেবা, ফায়ার সার্ভিস, গণমাধ্যম, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য পরিবহন, জরুরি ইন্টারনেট-সেবা, জরুরি ত্রাণসহায়তা এবং এ খাতে কর্তব্যরত কর্মকর্তা-কর্মচারীর পরিবহন সেবা চালু থাকবে।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ছাত্র-জনতার প্রচণ্ড ক্ষোভ থেকেই এক দফার কর্মসূচি এসেছে। মানুষের বুকের ওপর গুলি করা হয়েছে। প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সব মানুষ নেমে এসেছেন। জনদ্রোহের মাধ্যমেই এমন সরকারের শেষ পরিণতি নির্ধারিত হয়।
এক দফা দাবিতে কর্মসূচি ঘোষণার পরও ঘণ্টাখানেক শহীদ মিনারে অবস্থান করেন আন্দোলনকারীরা। এ সময় শহীদ মিনারের সামনের সড়কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তিনটি কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়। সবাই স্বৈরাচার স্বৈরাচার বলে স্লোগান দিতে থাকেন। সাড়ে ছয়টা থেকে শহীদ মিনার ছাড়তে শুরু করেন আন্দোলনকারীরা। সেখান থেকে মিছিল নিয়ে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ সন্ধ্যায় শাহবাগ মোড়ে অবরোধ করে।
আরেকটি অংশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে। এর বাইরে আরেকটি অংশ সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত শহীদ মিনার থেকে শাহবাগ এলাকায় মিছিল নিয়ে প্রদক্ষিণ করতে থাকে।
সন্তান–শিশু নিয়ে মা–বাবা
আন্দোলনকারীদের পানি সরবরাহ করতে গিয়ে গত ১৮ জুলাই গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। তাঁর স্মরণে গতকাল শিক্ষার্থীরা অনেকে ‘পানি লাগবে, পানি লাগবে’ বলে বিনা মূল্যে সবার মধ্যে পানি বিতরণ করেন। কেউ কেউ নিজ খরচে পেয়ারা খেতে দেন বিক্ষোভকারীদের।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আন্দোলনে স্বামী, দুই মেয়ে ও চার ভাগনিকে নিয়ে আসেন খুরশিদা শিরিন। এসেছেন রাজধানীর আফতাবনগর থেকে। তাঁদের মাথায় বাঁধা পতাকা, মুখে স্লোগান। শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে খুরশিদা শিরিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওরা একা কেন আন্দোলন করবে, তাই আমরা সবাই এসেছি। ’
দুপুরের পর সময় যত গড়াতে থাকে, আন্দোলনকারীদের সংখ্যা তত বাড়তে থাকে। বিপুল মানুষের ভিড়ে শহীদ মিনার চত্বর ও এর আশপাশের এলাকায় পা ফেলার জায়গা ছিল না। ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে’; ‘জাস্টিস জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস’; ‘দিয়েছি তো রক্ত, আরও দেব রক্ত’; ‘স্বৈরাচারের গদিতে আগুন জ্বালো একসাথে’; ‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’; ‘পদত্যাগ পদত্যাগ, শেখ হাসিনার পদত্যাগ’ এমন নানা স্লোগান দিতে থাকেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
এসেছিলেন রিকশাচালকেরাও
শহীদ মিনারের পাশে বেশ কিছু রিকশা নিয়ে অবস্থান নেন চালকেরা। নিজের রিকশার ওপর বসেই তাঁরা নানা ধরনের স্লোগান দিতে থাকেন। তাঁদের স্লোগানের মধ্যে রয়েছে ‘গুলি করে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না’, ‘দিয়েছি তো রক্ত, আরও দেব রক্ত’, ‘রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়’ ইত্যাদি।
মিরপুর ১০ নম্বর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তিন মেয়েকে নিয়ে শহীদ মিনারে আসেন দুই মা। মেয়েদের স্লোগানের জমায়েতে পাঠিয়ে তাঁরা দুজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্রে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তাঁরা বলেন, ক্ষোভের কথা বলে শেষ করা যাবে না। যেভাবে শিক্ষার্থীদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, সেই দৃশ্য দেখার পর ঘরে থাকা যায় না। শহীদ মিনারে আসার আগে মিরপুর-১০ এলাকার বিক্ষোভেও অংশ নেন তাঁরা।
সব মিছিল মিশেছে শহীদ মিনারে
সায়েন্স ল্যাব মোড়ে গতকাল দুপুর ১২টার দিকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন আন্দোলনকারীরা। বেলা তিনটার দিকে সেখান থেকে কয়েক হাজার মানুষ মিছিল নিয়ে শহীদ মিনার এলাকায় উপস্থিত হন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় নিহত, গণগ্রেপ্তার ও হয়রানির প্রতিবাদে ব্যান্ডসংগীতশিল্পীরা বেলা তিনটায় ধানমন্ডির রবীন্দ্রসরোবরে জড়ো হন। সেখান থেকে শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানাতে সংগীতশিল্পীরা যান শহীদ মিনারে।
বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরাও যোগ দেন শহীদ মিনারে। ‘একাত্তরের রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা’ ব্যানারেও অংশ নেন কয়েকজন। কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো মাইকের ব্যবস্থা ছিল না শহীদ মিনারে। তাই ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত আন্দোলনকারীরা নিজেদের মতো স্লোগান দিতে থাকেন। সব স্লোগানের ভাষা একই।
এক দফার কর্মসূচি ঘোষণা করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কেরা। গতকাল বিকেলে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। ছবি: সংগৃহীত
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ
রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। উত্তরায় সকালে জড়ো হন শিক্ষার্থীরা। পুলিশ ও সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের বাধায় মূল সড়কে আসতে পারেননি। কিছুক্ষণ পর চলে যান বিক্ষোভকারীরা। যাত্রাবাড়ী, শান্তিনগর মোড় এলাকাতেও বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। এসব বিক্ষোভ থেকেও পরে মিছিল নিয়ে অনেকে যোগ দেন শহীদ মিনারে। মিরপুর ডিওএইচএস এলাকায়ও বিক্ষোভ হয়। গুলশানের সাহাবুদ্দীন পার্কে বিক্ষোভ করেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় বেলা ২টা থেকে তিন ঘণ্টা বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। যোগ দেন অভিভাবকেরাও। ওই সময় ১০ নম্বর গোলচত্বরে বিপুলসংখ্যক পুলিশ অবস্থান নিয়েছিল। দলে দলে শিক্ষার্থীরা আসতে থাকলে পুলিশ সেখান থেকে সরে মিরপুর ২ নম্বরে শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সামনে অবস্থান নেয়। এ সময় গোলচত্বর এলাকায় দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়।
বিক্ষোভকালে মিরপুর ১০ নম্বর থেকে পল্লবী, আগারগাঁও, মিরপুর ১ ও ১৪ নম্বরগামী যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিকেল পাঁচটার দিকে শিক্ষার্থীরা কর্মসূচি শেষ করে এলাকা ছেড়ে চলে যান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল সাড়ে ১০টার পর থেকে ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আন্দোলনকারীরা জড়ো হতে শুরু করেন। বেলা ১১টার দিকে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের রাস্তার এক পাশ বন্ধ করে বিক্ষোভ করেন।
দুপুর সাড়ে ১২টার পর থেকে রামপুরা, বনশ্রী, বাড্ডা এলাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ ছোট ছোট মিছিল নিয়ে ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আসেন। শিক্ষার্থীদের গলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র ছিল। সকাল থেকে আফতাবনগর গেটে অনেক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। তবে দুপুরের পর পুলিশ সদস্যরা সরে যান।
বেলা দেড়টার দিকে বিক্ষোভকারীরা মিছিল নিয়ে প্রগতি সরণির মূল সড়কে আসেন। এরপর মিছিল নিয়ে মেরুল বাড্ডা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে যান। সেখানে প্রায় আধা ঘণ্টা অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন তাঁরা। সেখানে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ধাওয়া দেন শিক্ষার্থীরা। সেখানে বনশ্রী সড়কে অবস্থান নেন। সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত রামপুরা থেকে বনশ্রী যাওয়ার সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন তাঁরা।
পুলিশ দেখে কিছুটা উত্তেজনা
শহীদ মিনারের আশপাশে কোথাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি চোখে পড়েনি। তবে শাহবাগ থানার সামনে পুলিশের উপস্থিতি ছিল। শহীদ মিনার থেকে সন্ধ্যায় বিক্ষোভকারীদের মিছিলটি শাহবাগ থানার সামনে পৌঁছালে বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ পুলিশকে লক্ষ্য করে পানির বোতল ছোড়েন। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশের ওপর আক্রমণ ঠেকাতে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ শাহবাগ থানার সামনে মানব ঢাল তৈরি করে।
এর আগে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব এলাকা থেকে কয়েক হাজার আন্দোলনকারীর একটি মিছিল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দিকে যাচ্ছিল। নীলক্ষেত হয়ে মিছিলটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের সামনে এলে কয়েকজন উপাচার্যের বাসভবনের সামনে থাকা পুলিশ সদস্যদের দিকে তেড়ে যান। তখন আন্দোলনকারীদের একটি অংশ মানব ঢাল তৈরি করেন এবং পুলিশ সদস্যদের সরে যেতে সহযোগিতা করেন।
সায়েন্স ল্যাব মোড়ে বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশ সদস্যরা মিরপুর সড়কের বাইতুল মামুর জামে মসজিদ মার্কেটের সামনের সড়কে অবস্থান নেন। দুপুর সাড়ে ১২টার পর আন্দোলনকারীদের কয়েকজন পানি ও বিস্কুট নিয়ে পুলিশের কাছে যান। পুলিশ সদস্যদের অনেকে তা গ্রহণ করেন।
কোটা সংস্কারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে বিক্ষোভ শুরু হয় ৫ জুন। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার পর সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। ১৬ জুলাই সংঘর্ষে ৬ জনের মৃত্যু হয়। এরপর আন্দোলন আরও বেগবান হয়। এরপর একে একে আরও মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষ ও সংঘাতে এখন পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১৮। এরপর ব্লক রেইড দিয়ে গ্রেপ্তার অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
‘সর্বাত্মক অসহযোগ’
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সমাবেশ থেকে ‘সর্বাত্মক অসহযোগ’ সম্পর্কে কিছু নির্দেশনা পড়ে শোনান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, অসহযোগ কর্মসূচির মধ্যে হাসপাতাল, ওষুধের দোকান, জরুরি পরিবহনসেবা (ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম পরিবহন), অ্যাম্বুলেন্স–সেবা, ফায়ার সার্ভিস, গণমাধ্যম, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য পরিবহন, জরুরি ইন্টারনেট-সেবা, জরুরি ত্রাণসহায়তা এবং এ খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীর পরিবহনসেবা চালু থাকবে।
নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে কর বা খাজনা না দেওয়া। বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, পানির বিলসহ কোনো ধরনের বিল পরিশোধ না করা। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত ও কলকারখানা বন্ধ রাখা। অফিসে না যাওয়া, মাস শেষে বেতন তোলা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা। প্রবাসীরা যাতে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স দেশে না পাঠান, সেই আহ্বানও রয়েছে নির্দেশনায়।
নির্দেশনায় আরও রয়েছে গণপরিবহন বন্ধ রাখা। জরুরি ব্যক্তিগত লেনদেনের জন্য সপ্তাহের শুধু রোববার ব্যাংক খোলা রাখা। পুলিশ সদস্যদের রুটিন দায়িত্ব ছাড়া অন্য কোনো দায়িত্ব পালন না করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ছাড়া বিজিবি ও নৌবাহিনী ছাড়া অন্যান্য বাহিনী ক্যান্টনমেন্টের বাইরে দায়িত্ব পালন করবে না বলেও নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এই নির্দেশনায় বিলাসদ্রব্যের দোকান, শোরুম, বিপণিবিতান, হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দোকানপাট বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত খোলা থাকবে বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ। [প্রথম আলোর খবর ]
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা, প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৪, ২০: ৫২
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির তারিখ পরিবর্তন করেছে। ০৬ই আগস্ট মঙ্গলবারের পরিবর্তে আগামীকাল ০৫ই আগস্ট সোমবার এ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে তারা। এতে সারা দেশ থেকে আন্দোলনকারীদের ঢাকায় আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। আজ রোববার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানান।
আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘পরিস্থিতি পর্যালোচনায় এক জরুরি সিদ্ধান্তে আমাদের “মার্চ টু ঢাকা” কর্মসূচি আগমী মঙ্গলবার থেকে পরিবর্তন করে আগামীকাল সোমবার করা হলো। অর্থাৎ আগামীকালই সারা দেশের ছাত্র-জনতাকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করার আহ্বান জানাচ্ছি।’
বিবৃতিতে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আজ অসংখ্য ছাত্র-জনতাকে খুন করেছে সরকার। চূড়ান্ত জবাব দেওয়ার সময় এসে গেছে। বিশেষ করে আশপাশের জেলাগুলো থেকে সবাই ঢাকায় আসবেন। যাঁরা পারবেন, আজই ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়ে যান। ঢাকায় এসে মুক্তিকামী ছাত্র-জনতা রাজপথগুলোতে অবস্থান নিন।’
আসিফ মাহমুদ আরও বলেন, ‘এই ছাত্র-নাগরিক অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত স্বাক্ষর রাখার সময় এসে গেছে। ইতিহাসের অংশ হতে ঢাকায় আসুন সকলে। যে যেভাবে পারেন, কালকের মধ্যে ঢাকায় চলে আসুন। ছাত্র-জনতা এক নতুন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটাবে।’
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনসহ গণতান্ত্রিক রুপান্তরের ৫ দফা প্রস্তাব দি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা, প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৪, ১৫: ৫০
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে অবিলম্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। প্রস্তাব অনুসারে, এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে শেখ হাসিনা সরকার পদত্যাগ করবে।
আজ রোববার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে ‘বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে রূপান্তরের রূপরেখা প্রস্তাব’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ৫ দফা প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। বলা হয়, এটি প্রাথমিক প্রস্তাব। এ প্রস্তাবকে আরও বিস্তৃত করতে কাজ করবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক।
সূচনা বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, বাংলাদেশের পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মোর্চা এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। ২০১৫ সাল থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করছে তারা। বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রূপান্তরের সময় উপস্থিত। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের এক দফার সঙ্গে একমত হয়ে শিক্ষকদের পক্ষ থেকে এ প্রস্তাব উপস্থাপন করা হচ্ছে।
এরপর লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন, অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী, অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান ও মোশাহিদা সুলতানা। এতে বলা হয়, তাঁরা একটা ভয়ংকর সময় পার করছেন। একই সঙ্গে তাঁরা একটা অসাধারণ সৃষ্টিশীল সম্ভাবনাময় সময়ও পার করছেন। তাঁরা ভয়ংকর দমন–পীড়ন দেখছেন। তাঁরা অসাধারণ প্রতিরোধও দেখছেন। গণ-অভ্যুত্থান অনেক দেখেছেন, কিন্তু মাত্র ২-৩ সপ্তাহের মধ্যে এত প্রাণহানি বাংলাদেশ আর কখনো দেখেনি। বর্তমান আন্দোলন কেবল কোটা সংস্কারের প্রশ্নে আটকে নেই। জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থী-জনতার আন্দোলন এক গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি এখন শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের এক দফায় এসে ঠেকেছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে এই সরকারের অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ ‘রূপান্তরের রূপরেখা’ প্রস্তাব তুলে ধরেন। প্রস্তাবে বলা হয়, অবিলম্বে শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যুত্থানের মূল শক্তিগুলোর সম্মতিক্রমে নাগরিক-রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মতামতের ভিত্তিতে শিক্ষক, বিচারপতি, আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের অংশীজনদের নিয়ে একটি জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ-শ্রেণির অন্তর্ভুক্তিমূলক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করতে হবে। এই সরকারের সদস্য নির্বাচনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা মুখ্য ভূমিকা পালন করবেন। এই সরকারের কাছে শেখ হাসিনা সরকার পদত্যাগ করবে।
রূপান্তরের প্রস্তাবে আরও বলা হয়, শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যুত্থানের মূল শক্তিগুলোর অংশীজনদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে সর্বদলীয় নাগরিকদের নেতৃত্বে একটি ছায়া সরকার গঠিত হবে। তারা এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে, যেন দেশে একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত হয়। এ ধরনের ছায়া সরকার নির্বাচিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়ও অব্যাহত থাকতে পারে।
প্রস্তাবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর যে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো পালন করবে, সেগুলোও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে জুলাই হত্যাকাণ্ড ও জনগণের ওপর নৃশংস জোরজুলুমের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারে জাতিসংঘের সহযোগিতায় তদন্ত কমিটি ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন। সাম্প্রতিক সময়ে করা মিথ্যা, ষড়যন্ত্রমূলক ও হয়রানিমূলক মামলা বাতিল করা। এসব মামলায় আটক সবাইকে মুক্তি দেওয়া। সরকার গঠনের ছয় মাসের মধ্যে একটি সাংবিধানিক পরিষদ (কনস্টিটিউশনাল অ্যাসেম্বলি) গঠনের জন্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। নির্বাচিত সাংবিধানিক পরিষদ এমন এক গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রস্তাব করবে, যে সংবিধানে স্বৈরতান্ত্রিক, সাম্প্রদায়িক, জনবিদ্বেষী ও বৈষম্যমূলক কোনো ধারা থাকবে না। সেই সংবিধানের ভিত্তিতে সরকার অবিলম্বে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করা।
এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, এই সরকার ক্ষমতায় থাকলে অবস্থার পরিবর্তন হবে না, বরং অবনতি হবে। সরকার যত দ্রুত পদত্যাগ করবে, তা দেশের জন্য, তাদের নিজেদের জন্যই ভালো। গণভবন খোলা বলা হচ্ছে, এটি ১৪ জুলাই খোলা হলে এত রক্তপাত হতো না। তাঁরা আশা করেন, সরকার আর জটিলতা সৃষ্টি না করে দ্রুত পদত্যাগ করবে।
৫ আগস্ট–২০২৪
লংমার্চের ডাকে সাড়া দিয়ে সারাদেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ শাহবাগে জড়ো হয়। সকাল থেকেই কার্ফু ভাঙ্গার চেষ্টা করে ছাত্র জনতা। এক পর্যায়ে দুপুরে জাতির উদ্দেশে সেনাপ্রধানের ভাষণ দেওয়ার ঘোষণা আসে। এর মধ্যেই জানা যায়, শেখ হাসিনা দেশ ছেড়েছেন। বেলা ৩টার দিকে জনস্রোত গণভবনের দিকে এগিয়ে যায়। অবশেষে সেনাপ্রধানের ভাষণে শেখ হাসিনার পতনের খবর নিশ্চিত হয়।
অসহযোগ আন্দোলনের সমর্থনে লন্ডনে সংহতি সমাবেশ
প্রতিনিধি, লন্ডন, আপডেট: ০৫ আগস্ট ২০২৪, ০৬: ৪০
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অসহযোগ আন্দোলনের সমর্থনে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রবাসী বাংলাদেশিরা সংহতি প্রকাশ করেছেন। রোববার স্থানীয় সময় দুপুরের পর থেকে ইস্ট লন্ডনের আলতাব আলী পার্কে নানা ধরনের প্ল্যাকার্ড নিয়ে জড়ো হতে থাকেন প্রবাসীরা। তাঁরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে নানা ধরনের স্লোগান দেন। দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করা হয়, কবিতা আবৃত্তি করা হয়।
সংহতি সমাবেশে বাংলাদেশের প্রবীণ সাংবাদিক শফিক রেহমান, তাঁর স্ত্রী তালেয়া রেহমান, শামসুল আলম লিটন, এম এ মালেক, কয়সর এম আহমদ, জামান সিদ্দিকী, খন্দকার সুমন, মুখলেসুর রহমান, পারভেজ মল্লিক, নাজমুস সাকিব, ছাত্রনেতা হুমায়ুন রশিদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এ সময় উপস্থিত সবাই অসহযোগ আন্দোলনকে ঘিরে দেশব্যাপী হত্যা ও নির্যাতনের প্রতিবাদ জানান। এক দফা দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা।
সংহতি সমাবেশে বাংলাদেশ থেকে পড়তে আসা কয়েক শ শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরাও অংশ নেন।
বাংলাদেশি স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের হুমায়ুন রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, আজ সোমবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচির সঙ্গে মিল রেখে লন্ডনেও ‘লংমার্চ’ করবেন তাঁরা। স্থানীয় সময় সকাল ১১টায় ইস্ট লন্ডনের আলতাব আলী পার্ক থেকে লংমার্চ ট্রাফালগার স্কয়ার হয়ে পার্লামেন্ট স্কয়ারে গিয়ে শেষ হবে।
অসহযোগ আন্দোলন: সংঘাত–সংঘর্ষে কোথায় কতজনের মৃত্যু
প্রথম আলো ডেস্ক, প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৪, ১০: ৩০
রাজধানী উত্তরায় গতকাল রোববার দুপুর ১২টার দিকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা অসহযোগ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গতকাল রোববার সারা দেশে সংঘর্ষ, হামলা, গুলি, অগ্নিসংযোগের ঘটনায় অন্তত ৯৮ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জে ১৩ পুলিশসহ মোট ২২ জন, রাজধানীতে ১১ জন, ফেনীতে ৮ জন, লক্ষ্মীপুরে ৮ জন, নরসিংদীতে ৬ জন, কিশোরগঞ্জে ৫ জন, বগুড়ায় ৫ জন, সিলেটে ৫ জন, মাগুরায় ৪ জন, রংপুরে ৪ জন, মুন্সিগঞ্জে ৩ জন, পাবনায় ৩ জন, কুমিল্লায় পুলিশের এক সদস্যসহ ৩ জন, শেরপুরে ২ জন এবং জয়পুরহাটে ২ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ভোলা, হবিগঞ্জ, ঢাকার কেরানীগঞ্জ, সাভার, কক্সবাজার, বরিশাল ও গাজীপুরের শ্রীপুরে একজন করে নিহত হয়েছেন।
পুলিশ, হাসপাতাল ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে নিহতের এ সংখ্যা জানা গেছে। নিহত ৯৮ জনের মধ্যে বিস্তারিত নাম–পরিচয় জানা গেছে ৪৩ জনের। তাঁদের মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ১৮ জন, পুলিশ ১৪ জন, শিক্ষার্থী ৯ জন, সাংবাদিক ১ জন ও বিএনপির ১ জন আছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের নাম ও ঠিকানা জানা গেলেও পেশা বা রাজনৈতিক পরিচয় জানা যায়নি।
নিহত অন্যদের মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম জুয়েল (২৮) ও জহির উদ্দীনের নাম জানা গেছে।
রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষে আটজনের মৃত্যু হয়। তাঁদের মধ্যে শিক্ষার্থী তিনজন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একজন, অজ্ঞাতনামা দুজন। অন্য দুজনের বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়নি। শিক্ষার্থী তিনজন হলেন রাজধানীর হাবীবুল্লাহ বাহার ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ সিদ্দিকী (২৩), বেসরকারি ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রমিজ উদ্দিন রূপ (২৪) ও কবি নজরুল সরকারি কলেজ থেকে গত বছর এইচএসসি পাস করা শিক্ষার্থী তাহিদুল ইসলাম (২২)। নিহত অন্যদের মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম জুয়েল (২৮) ও জহির উদ্দীনের নাম জানা গেছে।
সিরাজগঞ্জে নিহত ২২ জনের মধ্যে ১৩ জন পুলিশ সদস্য। অন্যরা হলেন সিরাজগঞ্জ পৌর শহরের ১ নম্বর ওয়ার্ডের মাছুমপুর মহল্লার মাজেদ আলীর ছেলে রঞ্জু মিয়া (৪০), পৌর শহরের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের গয়লা মহল্লার আসু মুন্সীর ছেলে আবদুল লতিফ (২৬), একই মহল্লার গঞ্জের আলীর ছেলে মো. সুমন (২২), রায়গঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. আল আমিন সরকার, ব্রহ্মগাছা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম ছরওয়ার, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মো. মেহেদী হাসান ওরফে ইলিয়াস এবং ব্রহ্মগাছা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম হাসনায়েন, আলম নামের এক ব্যক্তি ও সাংবাদিক প্রদীপ কুমার।
শিক্ষার্থী তিনজন হলেন রাজধানীর হাবীবুল্লাহ বাহার ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ সিদ্দিকী (২৩), বেসরকারি ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রমিজ উদ্দিন রূপ (২৪) ও কবি নজরুল সরকারি কলেজ থেকে গত বছর এইচএসসি পাস করা শিক্ষার্থী তাহিদুল ইসলাম (২২)।
নরসিংদীতে ছয়জনই আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতা–কর্মী। তাঁরা হলেন চরদিঘলদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন (শাহীন), সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনের ছোট ভাই শহর মৎস্যজীবী লীগের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন (৪৮), জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সভাপতি মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া (৪২), মহিষাশুড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল জলিল (৩৫), আওয়ামী লীগের কর্মী ওমর ফারুক (৩৫) ও কামাল হোসেন (৩৫)।
ফেনীতে নিহত আটজনের মধ্যে শিক্ষার্থী দুজন। তাঁরা হলেন ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার উত্তর জায়লস্কর গ্রামের কলেজশিক্ষার্থী সরোয়ার জাহান মাসুদ, ফেনী সদর উপজেলার গাজী ক্রস রোডের বাসিন্দা ও কলেজশিক্ষার্থী ইশতিয়াক আহমেদ শ্রাবন। নিহত অন্যরা হলেন ফেনী সদরের কাশিমপুরের বাসিন্দা দোকান কর্মচারী শিহাব উদ্দিন, সোনাগাজীর মান্দারী গ্রামের বাসিন্দা পথচারী সাকিব, ফেনীর ফাজিলপুর এলাকার বাসিন্দা সাঈদ ও সাইদুল হক।
শেরপুরে নিহত দুজন হলেন সদর উপজেলার পাকুরিয়া ইউনিয়নের চৈতনখিলা গ্রামের মো. মনির (২৭) ও অজ্ঞাতনামা এক যুবক (২৫)। জয়পুরহাটে নিহত হলেন শ্রমিক লীগের সাবেক নেতা আবদুর রহিম (৫২) ও তরুণ মেহেদী হাসান (১৮)।
লক্ষ্মীপুরে নিহত আটজনের মধ্যে একজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। সে লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদ আল আফনান। তার বাড়ি লক্ষ্মীপুর শহরের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে।
কিশোরগঞ্জে নিহত ব্যক্তিরা হলেন সদর উপজেলার কর্শাকড়িয়াল এলাকার দিলু মিয়ার ছেলে ও যুবলীগের কর্মী মো. মবিন মিয়া (৩২), সদরের যশোদল বীরদাম পাড়া এলাকার অঞ্জনা বেগম (৩৫), জেলা শহরের নিউ টাউন এলাকার জুয়েল মিয়া (৩০), শহরের কালীবাড়ির একটি দোকানের মালিক মো. আবদুল্লাহ (৩৫) ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশফাকুল ইসলামের বাড়ির দারোয়ান জুলকার মিয়া।
বগুড়ায় নিহত পাঁচজনের মধ্যে দুজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। দুপচাঁচিয়ায় ঘটনাস্থলেই মারা যান মনিরুল ইসলাম (২২)। তিনি নওগাঁর বদলগাছীর বঙ্গবন্ধু সরকারি ডিগ্রি কলেজের স্নাতক (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র ছিলেন। তাঁর বাড়ি কাহালু উপজেলার বীরকেদার ইউনিয়নের বীরকেদার দক্ষিণ পাড়া গ্রামে। অন্যজনের নাম জিল্লুর রহমান (৪৫)। তাঁর বাড়ি গাবতলী উপজেলায়। অন্য দুজনের বয়স আনুমানিক ৬০ ও ৩৫ বছর।
মুন্সিগঞ্জে নিহত তিনজন হলেন শহরের উত্তর ইসলামপুর এলাকার প্রয়াত কাজী মতিন ফরাজীর ছেলে রিয়াজুল ফরাজী (৩৮), একই এলাকার মো. সজল (৩০) ও উত্তর ইসলামপুর এলাকার সিরাজ সরদারের ছেলে ডিপজল (১৯)।
মাগুরায় নিহত চারজন হলেন পৌরসভার বরুনাতৈল গ্রামের মৃত ময়েন উদ্দিনের ছেলে জেলা ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাব্বি (৩৪), শ্রীপুর উপজেলার রায়নগর গ্রামের গোলাম মোস্তফার ছেলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফরহাদ হোসেন (২৪), উপজেলা সদরের ব্যাপারী পাড়ার বাসিন্দা ইউনুস আলী বিশ্বাসের ছেলে আহাদ আলী বিশ্বাস (১৭) ও বালিদিয়া গ্রামের কান্নু শেখের ছেলে সুমন শেখ (১৮)। এর মধ্যে আহাদ আলী বিশ্বাস মহম্মদপুরের আমিনুর রহমান ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
সিলেটে নিহত পাঁচজনের মধ্যে চারজনের পরিচয় জানা গেছে। তাঁরা হলেন গোলাপগঞ্জের দত্তরাই গ্রামের মিনহাজ আহমদ (২৬) ও একই উপজেলার ঢাকা দক্ষিণ ইউনিয়নের নিশ্চিন্ত গ্রামের নাজমুল ইসলাম (২২), ঢাকা দক্ষিণের বারেকোট গ্রামের বাসিন্দা তাজউদ্দিন (৪০) ও আমুড়া ইউনিয়নের কয়ছর আহমদের ছেলে সানি আহমদ (১৮)। মিনহাজ গোলাপগঞ্জে একটি ওয়ার্কশপে কাজ করতেন। নাজমুল ঢাকা দক্ষিণ বাজারে একটি জুতার দোকানের ব্যবসায়ী ছিলেন।
রংপুরে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন রংপুর সিটি করপোরেশনের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও পরশুরাম থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি হারাধন রায় ও তাঁর ভাগনে শ্যামল রায়। নিহত অন্য দুজন হলেন জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদস্য খায়রুল ইসলাম ও জেলা যুবলীগের কর্মী মাসুম হোসেন।
পাবনায় নিহত তিনজনের মধ্যে দুজনের নাম জানা গেছে। তাঁরা হলেন জেলা সদরের চর বলরামপুর গ্রামের জাহিদ হোসেন (১৮) ও হাজির হাট এলাকার মহিবুল ইসলাম (২২)।
কুমিল্লা নিহত তিনজনের মধ্যে দুজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ের পুলিশের সদস্য এরশাদ মিয়া ও দেবীদ্বার পৌর এলাকার বারেরা গ্রামের আবদুল রাজ্জাক রুবেল (২৬)।
শেরপুরে নিহত দুজন হলেন সদর উপজেলার পাকুরিয়া ইউনিয়নের চৈতনখিলা গ্রামের মো. মনির (২৭) ও অজ্ঞাতনামা এক যুবক (২৫)। জয়পুরহাটে নিহত হলেন শ্রমিক লীগের সাবেক নেতা আবদুর রহিম (৫২) ও তরুণ মেহেদী হাসান (১৮)।
হবিগঞ্জে নিহত রিপন শীল (২৭) শহরের ইনাতাবাদ এলাকার বাসিন্দা ও পেশায় নরসুন্দর ছিলেন। ঢাকার কেরানীগঞ্জে নিহত মো. ইফতি (৩২) আওয়ামী লীগের কর্মী। বরিশালে নিহত টুটুল চৌধুরী (৬০) বরিশাল মহানগরীর ১২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি। গাজীপুরের শ্রীপুরে নিহত তোফাজ্জল হোসেন (২২) নেত্রকোনার কেন্দুয়ার পিজাহাটি গ্রামের আবদুর রশিদের ছেলে। পেশায় তিনি নির্মাণশ্রমিক ছিলেন। এ ছাড়া কক্সবাজার, ভোলা ও সাভারে নিহত দুজনের পরিচয় জানা যায়নি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা, প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৪, ০৮: ৪০
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আজ ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির তারিখ পরিবর্তন করেছে। ৬ই আগস্ট মঙ্গলবারের পরিবর্তে আজ সোমবার ০৫ই আগস্ট এ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে তারা। এতে সারা দেশ থেকে আন্দোলনকারীদের ঢাকায় আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তাদের এই ডাকে সাড়া দিয়ে ঐ রাতেই সারা দেশ থেকে লক্ষ্য লক্ষ্য ছাত্র-জনতা ঢাকা অভিমুখে রওনা করে। গভীর রাতে পথিপধ্যে তারা পুলিশ ও সেনাবাহিনীর বাধার সম্মুখীন হন। কিন্তু জনস্রোত প্রতিরোধ সদস্যদের ছাপিয়ে ঢাকা অভিমুখে অগ্রসর হয়। ০৫ আগস্ট ভোর হওয়ার আগেই তারা ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে অবস্থান নিতে থাকেন। সকাল ০৮.০০ টার সময় যাত্রাবাড়ি ও উত্তরা হতে প্রথম বিক্ষোভকারীরা কার্ফু ভেঙ্গে ঢাকার রাজপথে প্রবেশ করে। এ সময় পুলিশের সাথে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। পুলিশের গুলিতে অনেকে আহত ও নিহত হন। সংগ্রাম কর্মীদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়।
মিছিলে মিছিলে মুখর ঢাকা
বাংলাদেশে ০৫ আগস্ট সোমবার ভোর হয়েছিল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে। সকালটা ছিল মেঘলা, রাস্তাঘাট ছিল ফাঁকা। বেলা ১০টার পর থেকে যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, শহীদ মিনার, বাড্ডা, মিরপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভকারীদের জমায়েতের খবর আসতে শুরু করে। কোথাও কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষও শুরু হয়।
সকাল ৯.০০টার দিকে বিক্ষোভকারীদের মিছিল ঢাকার চারদিক থেকে রাজপথে প্রবেশ করতে শুরু করলে জনস্রোতের চাপে প্রতিরোধ বাহিনী পিছু হটতে থাকে। তখন কোন উপায়ান্তর না পেয়ে সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান, পুলিশের আইজিপি আব্দুল্লাহ আল মামুন, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর প্রধানগণ গণভবনে গিয়ে শেখ হাসিনোকে রাজপথের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তখন সেখ হাসিনা শুট করার হুকুম দিলেও তিন বাহিনীর প্রধানগণ জনগণের উপর গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানান এবং ১০.৪৫ ঘটিকার মধ্যে তাকে গণভবন ত্যাগ করার জন্য পরামর্শ দেন।
বেলা সোয়া একটার দিকে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জনগণের উদ্দেশে বক্তব্য দেবেন। তখনই মানুষ বুঝে যায়, পট বদলে যাচ্ছে। মানুষ একে একে ঘর থেকে বের হতে শুরু করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাস্তায় মানুষকে আর বাধা দেয়নি। বেলা আড়াইটায় শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার খবরের পর লাখো মানুষের মিছিল, স্লোগানে মুখর হয় ঢাকা। এ যেন শ্রাবণ মাসে ‘বসন্ত’। এই বসন্ত মানুষের মুক্তির, এই বসন্ত নতুন বাংলাদেশের।
বিকেলের দিকে জনস্রোত গণভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ঢুকে পড়ে। সেখানে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। গণভবন থেকে যে যা পেরেছেন, তা নিয়ে গেছেন। এক ব্যক্তিকে দেখা যায় একটি বড় রুই মাছ নিয়ে যেতে। একজনের হাতে ছিল একটি টেলিভিশন ও একটি হাঁস। কেউ নিয়ে যাচ্ছিলেন মুরগি ও কবুতর। কেউ কেউ গণভবনের লেকে নেমে গোসল করছিলেন, কেউ কেউ মাছ ধরছিলেন। তাঁদের একজন নাহিদ জামাল। তিনি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ‘বাংলাদেশে আর কোনো স্বৈরশাসক দেখতে চাই না।’
বিকেল চারটার দিকে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জনগণের উদ্দেশে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে কাজ পরিচালনা করব। ধৈর্য ধরেন, সময় দেন।’ তিনি সংঘাতে দেশের ক্ষতি হচ্ছে জানিয়ে সবাইকে শান্তিশৃঙ্খলার পথে ফিরে আসার আহ্বান জানান।
ওদিকে বিকেলে বঙ্গভবনে বিভিন্ন দলের নেতাদের ডাকা হয়। সেখানে নতুন সরকার কীভাবে হবে, তার কাঠামো কী হবে, তা নিয়ে মতামত নেওয়া হয়।
সন্ধ্যায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কেরা এক সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ
ইসলাম বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় সরকারের প্রস্তাব দেবেন তাঁরা।
এদিকে রাতের বেলা পুড়িয়ে দেওয়া হয় রাজধানীর ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু জাদুঘর, আওয়ামী লীগের সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়, শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত বাসভবন সুধা সদন, তেজগাঁওয়ে আওয়ামী লীগের ঢাকা জেলা কার্যালয়, বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতার বাড়ি। হামলা হয় জাতীয় সংসদে, প্রধান বিচারপতির বাড়িতে। ছয় ঘণ্টার জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয় বিমানবন্দরের কার্যক্রম। জেলায় জেলায় হামলা হয়েছে আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কার্যালয়ে। বিভিন্ন জায়গায় হামলা হয়েছে থানায়। ভাঙচুর করা হয়েছে বিভিন্ন স্থাপনা।
তখন উপায়ান্তর না দেখে জীবন বাঁচাতে প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা সামরিক হেলিকপটারে করে দেশ থেকে পালিয়ে যান। প্রথমে তিনি আগরতলা অবতরন করেন। সেখান থেকে দিল্লিতে চলে যান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আশ্রয় গ্রহণ করেন।
ভিডিও https://fb.watch/wwZsXWIYHd/
সাড়ে ১৫ বছর দেশ শাসন করার পর শেখ হাসিনাকে বিদায় নিতে হলো ‘একনায়ক’ হিসেবে। ছাত্র ও গণ–আন্দোলনের মুখে তাঁর শাসনের পতনের পেছনে একগুঁয়েমি, অহংকার ও অতি আত্মবিশ্বাস—এসব বিষয়কে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একক কর্তৃত্বের শাসনে শেখ হাসিনার সরকার সম্পূর্ণভাবে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। পশ্চিমা বিশ্বকে শত্রু বানিয়ে শেষ পর্যায়ে ভূরাজনীতিতেও প্রায় একা হয়ে পড়েছিলেন তিনি। অবশেষে গণ–আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনাকে দেশ ছাড়তে হয়। ০৫.০৮.২০২৪ তারিখ সোমবার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁর পদত্যাগ ও দেশ ছাড়ার ঘটনা ঘটে।
আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দুপুরের আগে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। সরকারি একাধিক সূত্র বলছে, পদত্যাগের আগে গতকাল দুপুরে তিনি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই সুযোগ ও সময় তাঁকে দেওয়া হয়নি। শেখ হাসিনা দুপুরের আগে বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে পদত্যাগ করেন। এরপর দুপুর আড়াইটার দিকে বঙ্গভবন থেকেই শেখ হাসিনা একটি সামরিক হেলিকপ্টারে করে ভারতের উদ্দেশে বাংলাদেশ ছাড়েন। তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা সঙ্গে ছিলেন।
শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও গণভবন অভিমুখে লাখো মানুষ। ৫ আগস্ট রাজধানীর বিজয় সরণিতে। ছবি: খালেদ সরকার
ছাত্র–জনতার বিজয়, শেখ হাসিনার বিদায়
রাজীব আহমেদ, ঢাকা
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৪, ০২: ৫০
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর লাখো মানুষ জড়ো হন সংসদ ভবন এলাকায়। তাঁদের কারও কারও হাতে ছিল জাতীয় পতাকা। গতকাল বিকেলে। ছবি: কবির হোসেন
ছাত্র ও জনতার ২৩ দিনের দেশ কাঁপানো আন্দোলনে পতন হলো আওয়ামী লীগ সরকারের। শেখ হাসিনা গতকাল সোমবার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগপত্র জমা দেন। এরপর বঙ্গভবন থেকেই হেলিকপ্টারে দেশ ছাড়েন। সে সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর বোন শেখ রেহানা।
সব মিলিয়ে ১৪ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট—শিক্ষার্থীরা শেখ হাসিনার মুখোমুখি অবস্থান নেওয়ার পর ২৩ দিনে বাংলাদেশের মানুষ মুক্তি পায় ‘অপশাসন’ থেকে।
শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার খবর শুনে যোগাযোগ করা হয় আওয়ামী লীগের এক শীর্ষস্থানীয় নেতার সঙ্গে। তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, শেখ হাসিনা কারও কথা শোনেননি। তাঁর কারণেই রোববার আওয়ামী লীগকে মাঠে নামতে হয়েছে। নিহত হয়েছেন ১১৪ জন মানুষ। শেষ পর্যন্ত তিনি দলের নেতা-কর্মীদের চরম সংকটে রেখে বিদেশ চলে গেলেন। তিনি বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শেখ হাসিনার একগুঁয়েমি ও বারবার ভুল পদক্ষেপের ফলে আওয়ামী লীগ এখন অস্তিত্বের সংকটে। নেতা-কর্মীরা হত্যার ঝুঁকিতে।
’৫২ থেকে ’২৪
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন—বাংলাদেশের মানুষ ২০২৪-এর জুলাইয়ের মতো এত মৃত্যু দেখেনি।
অতীতের আন্দোলনের মতো এবারের আন্দোলনেও সামনের সারিতে ছিলেন শিক্ষার্থীরা। এবারের বিশেষ দিক ছাত্রীদের, নারীদের বড় অংশগ্রহণ। আরেকটি দিক হলো, এবার লড়াই হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। বেশির ভাগ টেলিভিশন চ্যানেল যখন সরকারের নিয়ন্ত্রণে, অনলাইন মাধ্যমগুলো চাপে, তখন শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ ও আন্দোলনের আদর্শিক লড়াইয়ের পথ হয়ে ওঠে ফেসবুক, টুইটার। সেখানে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ, স্বজন হারানোর বেদনা, পুলিশের গুলি করার ভিডিও চিত্র। তাতে যুক্ত করা ছিল মুক্তিযুদ্ধের গান, দেশপ্রেমের গান। নতুন নতুন স্লোগান, দেয়াললিখনও তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এবারের গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে ছিল ‘জেনারেশন জেড’, যারা সংক্ষেপে ‘জেন জি’ নামে পরিচিত। তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ এই প্রজন্ম তাদের লড়াই তাদের মতো করে করেছে। তাদের ঠেকাতে বারবার ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছে। কখনো কখনো ইন্টারনেট চালু থাকলেও বন্ধ রাখা হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। তবে শিক্ষার্থীদের দমানো যায়নি। বিস্ময়করভাবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যখন আক্রান্ত হলেন, তখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে এলেন।
এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের সমন্বয়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য প্রথম আলোকে বলেন, অতীতের আন্দোলনে সভা-সমিতির মাধ্যমে সংঘবোধ তৈরি হতো। নতুন প্রজন্ম সেটা তৈরি করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মধ্য দিয়ে। মোটাদাগে দুটি বড় সমস্যায় তাঁরা ভুগছেন—গুণমানসম্পন্ন শিক্ষা ও শোভন কর্মসংস্থানের অভাব। পাশাপাশি অনলাইন জগতে তাঁরা যেহেতু বিশ্বনাগরিক, সেহেতু তাঁরা আইনের শাসন, মানবাধিকার, ন্যায়বিচারের অভাব বোধ করেন।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘একজন সরকার প্রধানের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের সমস্যাগুলো মিটে যাবে বলে আমি মনে করি না। তাই নতুন সরকারকে তরুণদের প্রত্যাশাগুলো পূরণে কাজ করতে হবে।’
তারা কি ফিরিবে আজ
গণ-অভ্যুত্থান ঘটাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত সাড়ে তিন শ মানুষ। আহত বহু। কারও পা কেটে ফেলতে হয়েছে। কারও চোখ নষ্ট হয়ে গেছে।
মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ, ফারহান ফাইয়াজ, নাইমা সুলতানারা আর ফিরবেন না। তাঁদের স্মরণে ‘ভাইরাল’ হয়েছে মোহিনী চৌধুরীর লেখা গান, মুক্তির মন্দির সোপানতলে।
গানটির তিনটি লাইন—
‘তারা কি ফিরিবে আর
তারা কি ফিরিবে এই সুপ্রভাতে
যত তরুণ অরুণ গেছে অস্তাচলে…।’
এই রক্তরঞ্জিত ভোরে
সাজ্জাদ শরিফ, প্রথম আলো, ঢাকা, প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৪, ০৯: ৪৩
আজ ভোরে যে সূর্য উদিত হয়েছে, তা এক নতুন সূর্য। চার শতাধিক ছাত্র-জনতার রক্তে সেটি রঞ্জিত। এই রক্তরঞ্জিত সূর্যের উদয় ঘটেছে এক নতুন সম্ভাবনা নিয়ে।
গত কয়েক দিনে দেশ আক্ষরিক অর্থেই এক মৃত্যু-উপত্যকা পার হয়ে এসেছে। ১ জুলাই ছাত্ররা যখন সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটার অবসানের দাবি জানিয়ে আন্দোলন শুরু করেছিলেন, সেটি তখন ছিল আপাদমস্তক অহিংস। কিন্তু প্রথমে শেখ হাসিনার দম্ভোক্তি ও একগুঁয়েমি এবং পরে নিরীহ ছাত্রদের ওপর তাঁর দল ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সহিংস আক্রমণের কারণে পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে পড়ে। ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ শহীদ হলে তা পুরো দেশের হৃদয়ে আঘাত করে। শেখ হাসিনা মুখে সংলাপের কথা বললেও ছাত্র-জনতার ওপর নিষ্ঠুর আক্রমণ চলতে থাকে। গতকাল পর্যন্ত রক্ষণশীল হিসাবেও চার শর বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। আহত মানুষের সংখ্যা সাত হাজারের বেশি। আটক করা হয়েছে প্রায় ১২ হাজার মানুষকে। মামলা করা হয়েছে প্রায় ৮০০, যার উল্লেখযোগ্য অংশই গণমামলা।
প্রথমে শেখ হাসিনার দম্ভোক্তি ও একগুঁয়েমি এবং পরে নিরীহ ছাত্রদের ওপর তাঁর দল ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সহিংস আক্রমণের কারণে পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে পড়ে।
এই চরম নিষ্পেষণের প্রেক্ষাপটে ছাত্রদের সঙ্গে দেশজুড়ে যোগ দিতে শুরু করে সাধারণ জনতা-কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী, শিক্ষক, আইনজীবী, অভিভাবক, নারীসমাজ, শিল্পী, শ্রমিক ও পেশাজীবীরা। এই জনতার কাতারে বহু আওয়ামী বা বিএনপি-অনুরাগী এবং বাম-ডান একাকার হয়ে যায়। এক অভূতপূর্ব গণজাগরণ ভাসিয়ে নিয়ে যায় দেশকে। ছাত্রদের কোটাবিরোধী ৯ দফার আন্দোলন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফার আন্দোলনে পরিণত হয়।
কিন্তু এই এক দফা আন্দোলনের পটভূমি নিছক গত ৩৬ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর উৎস শেখ হাসিনা সরকারের গত ১৫ বছরের শ্বাসরোধী স্বৈরাচারী শাসনকাল। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচনে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনা নির্বাচন ব্যবস্থাকে কুক্ষিগত করে তাঁর একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। শাসনকে কঠোর থেকে কঠোরতর করে তোলেন। তাঁর শাসনামলে বিরোধী দল ও কণ্ঠকে নিষ্ঠুরভাবে নির্বাপণ করা হয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ন্যুব্জ করা হয়, অবরুদ্ধ করা হয় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। এ সময়ে ছয় শতাধিক মানুষকে গুম করা হয়। তাঁদের মধ্যে ১৭০ জনেরও বেশি মানুষের কোনো খোঁজ আজ অব্দি পাওয়া যায়নি। গণমামলায় আটক বা দুর্বিষহ অবস্থায় ছিলেন বিরোধী দলের অসংখ্য রাজনৈতিক কর্মী। এ সময়ে দুর্নীতি, স্বজন-তোষণ, ব্যাংক লুট আর বিপুল অর্থ পাচারে দেশের অর্থনীতি পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে। অর্থনীতির প্রবল নিম্নচাপে সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে ওঠে ওষ্ঠাগত। এই গণজাগরণে তারই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে, যার অনিবার্য পরিণতি শেখ হাসিনার গত ১৫ বছরের অপশাসনের বিদায়ে।
এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা এক নতুন ছাত্রশক্তির অভ্যুদয় লক্ষ করলাম। শিক্ষার্থীরা যে প্রজ্ঞায়, সাহসে ও নেতৃত্বে এই আন্দোলনকে সফল করে তুললেন, তাকে অভিবাদন জানাই। সারা দেশের জনতা নির্ভীক চিত্তে যেভাবে এ আন্দোলন বেগবান করে তুলল, তাকেও জানাই অভিনন্দন। একটি নতুন যুগের উন্মেষ ঘটাতে এ সময়ে যাঁরা নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দিলেন, জাতি তাঁদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে। তাঁদের জন্য আমরা একই সঙ্গে শোকে আনত এবং গর্বে উন্নত–শির। বাংলাদেশের ইতিহাসে আমরা এক অসাধারণ সময়ের সাক্ষী হয়ে রইলাম।
আপামর জনতা একটি কঠিন রক্তস্নাত অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে অপশাসনের জগদ্দল পাথরকে ভেঙে চূর্ণ করেছে। ভাঙার সময়কে আমরা পেছনে ফেলে এসেছি। এখন গড়ে তোলার সময়। শেখ হাসিনার দুর্নীতি-জর্জরিত একনায়কতন্ত্রের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা বিজয় অর্জন করেছে। যে প্রতিহিংসার রাজনীতি দেশবাসীর কণ্ঠে চেপে বসেছিল, তার অবসান ঘটেছে।
রাজধানীসহ দেশের নানা অঞ্চলে আমরা বিভিন্ন হিংসাত্মক ঘটনা দেখতে পাচ্ছি। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপরও আক্রমণের ঘটনা ঘটছে। এমন একটি সফল গণ–আন্দোলনের পর এসব ঘটনা খুবই দুঃখজনক। গতকাল সেনাপ্রধান তাঁর ভাষণে সংঘর্ষ, ভাঙচুর, অরাজকতা থেকে সবাইকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। আমরাও সবাইকে সে অনুরোধ জানাই। একটি প্রতিহিংসাপরায়ণ সরকারের পতন ঘটানোর পর আর কোনো হামলা, অগ্নিসংযোগ, ধ্বংসযজ্ঞ বা মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
অর্থনীতির প্রবল নিম্নচাপে সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে ওঠে ওষ্ঠাগত। এই গণজাগরণে তারই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে, যার অনিবার্য পরিণতি শেখ হাসিনার গত ১৫ বছরের অপশাসনের বিদায়ে।
জাতি-ধর্ম-দল-নির্বিশেষে দেশের সব মানুষ আজ একই মুক্ত সমতলে দাঁড়িয়ে নতুন তাজা হাওয়ায় নিশ্বাস নিচ্ছে। নতুন সূর্যকিরণে আজ আমরা সবাই উদ্ভাসিত। সবাই সংযত থেকে সব মানুষকে আমরা অবশ্যই এই নতুন গণতান্ত্রিক সময়ের ভাগীদার করে তুলব।
মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে নানা গণ-অভ্যুত্থানে মানুষের স্বপ্ন আকাশচুম্বী হয়েছে। স্বল্প সময়ের মধ্যে সেসব স্বপ্ন ভেঙেও পড়েছে। রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের পবিত্র চুক্তি প্রতিটি সরকার চূর্ণ করেছে। এই আন্দোলন নতুন যে প্রতিশ্রুতি বয়ে এনেছে, তাকে সফল করে তুলতে হলে অভিজ্ঞতার সঙ্গে নবীনতার মিলন ঘটাতে হবে। দেশের প্রাজ্ঞ নাগরিক-সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নতুন ছাত্রশক্তির সংলাপের ভিত্তিতে সামনের দিনের পথ রচিত হোক। স্বাধীনতার পর থেকে আমরা একদলীয় সরকার, সামরিক স্বৈরাচার, নির্বাচিত স্বৈরশাসন ও একনায়কতন্ত্র দেখেছি। এবার জনগণের অংশগ্রহণ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ভিত্তিতে আমরা সার্বিক অর্থে একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পেতে চাই।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘তোমার পতাকা যারে দাও, তারে বহিবারে দাও শকতি।’ আমাদের হাতে এখন একটি সফল আন্দোলনের পতাকা উড়ছে। আমরা যেন একে ঠিকভাবে বহন করে সামনে এগিয়ে যেতে পারি।
শেখ হাসিনার পতন যেসব কারণে
কাদির কল্লোল, ঢাকা
আপডেট: ০৬ আগস্ট ২০২৪, ১৯: ৪৭
শেখ হাসিনা। ফাইল ছবি: বাসস
শক্ত অবস্থান, শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ৩৬ দিন আগে শিক্ষার্থীদের যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা সরকার পতনের আন্দোলনে রূপান্তরিত হওয়ার পরও শেখ হাসিনার সরকারের পক্ষ থেকে শক্ত অবস্থানের কথা বলা হচ্ছিল। এমনকি গত রোববার আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ সহযোগী সংগঠনগুলোকে মাঠে নামিয়ে শক্তি প্রদর্শন করে আন্দোলন প্রতিরোধের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু তাতে সারা দেশে সংঘাত–সংঘর্ষে প্রায় ১০০ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এরপরও শক্ত হাতে দমনের কথা বলা হচ্ছিল।
রোববার সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গণভবনে বসে শেখ হাসিনা তাঁর সরকারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন মন্ত্রী ও কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ একাধিক নেতা জানিয়েছেন, রোববারও সরকারের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। এরপরও পরিস্থিতি তাঁদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে তাঁরা ধারণা করেছিলেন। কিন্তু চাপ আরও বাড়তে থাকে। গতকাল সকালেই তাঁরা বুঝতে পারেন, তাঁদের সময় শেষ হয়ে গেছে। এরপর শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
কেন এমন পরিস্থিতি হলো
শিক্ষার্থীরা যখন শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছিলেন, সেই পর্যায়ে গত ১৪ জুলাই শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছিলেন। আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে তিনি ‘রাজাকার’ শব্দও ব্যবহার করেছিলেন। এতে তাঁর একগুঁয়েমি ও অহংকারের বিষয়টিই প্রকাশ পেয়েছিল। এরপর শিক্ষার্থীরা ফুঁসে ওঠেন, আন্দোলন আরও জোড়ালো হয়। সেই আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে শক্তি প্রয়োগ করায় গত ১৭ জুলাই থেকে কয়েক দিনে সারা দেশে দুই শ–এর বেশি প্রাণহানি ঘটে। এরপর সেনাবাহিনী নামিয়ে কারফিউ দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। তবে শিক্ষার্থীরা সরকার পতনের এক দফার আন্দোলনে নামেন। বিপুলসংখ্যক প্রাণহানির ঘটনায় শেষ পর্যন্ত কোনো কিছুতেই রক্ষা হলো না।
একা হয়ে পড়েছিল হাসিনা সরকার
দেশের ভেতরে আওয়ামী লীগ একা হয়ে পড়েছিল। দীর্ঘ শাসনে সবাইকে খেপিয়ে তুলেছিলেন শেখ হাসিনা। তাঁর সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্নীতি, অর্থ পাচার, ও অর্থনীতির মন্দা পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। আর রাজনৈতিক দিক থেকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪–দলীয় জোটের বাইরে অন্য সব দল সরকারবিরোধী অবস্থানে চলে যায়। এর ফলে শেখ হাসিনা রাজনৈতিক দিক থেকেও একা হয়ে পড়েন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনেও সেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে ভূরাজনীতিতে শেখ হাসিনার সরকার ভারতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পরপর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন করেও টিকে থাকে। এই আলোচনা চলছিল অনেক দিন ধরে। সরকার চীনের সঙ্গেও একটা সম্পর্ক রেখে চলছিল। গত জুলাই মাসেই ৭ তারিখ থেকে দুই দিন চীন সফর করেছিলেন শেখ হাসিনা। সর্বশেষ সেই সফরে অবশ্য ভালো ফল হয়নি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছিল অনেক দিন ধরে। বিভিন্ন সময় শেখ হাসিনাসহ তাঁর নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের কড়া সমালোচনা করেছেন। সর্বশেষ গত ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়ে যায়।
তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ দেশের মানুষ ও শিক্ষার্থীদের প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলে। এতে একেবারে একা হয়ে পড়ে তারা।
এখন শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে গেছেন। আওয়ামী লীগের নেতাদেরই কেউ কেউ মনে করছেন, শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে নিজের এত দিনের রাজনৈতিক অর্জন ধ্বংস করলেন। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া দল আওয়ামী লীগের অস্তিত্বকেও হুমকিতে ফেললেন।
‘তাঁর দম্ভ দলটাকে ধ্বংস করল’
আওয়ামী লীগের বয়স ৭৫ বছর। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলীর কে এম দাস লেন রোডের রোজ গার্ডেন প্যালেসে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। পরে বাদ দেওয়া হয় মুসলিম শব্দটি। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, দেশ স্বাধীন হয়েছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বিপথগামী কিছু সেনা কর্মকর্তার হাতে সপরিবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হলে আওয়ামী লীগ অনেকটা ছন্নছাড়া হয়ে যায়। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের হাল ধরেন। ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করেছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করেছে; ক্ষমতায় এসে সেই আওয়ামী লীগই ২০১৪ সালের নির্বাচন করেছে বিরোধী দলের বর্জনের মুখে। ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ ‘রাতের ভোট’ নামে পরিচিত পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির ভোটে মাঠের বিরোধী দল বিএনপি ছিল না। আওয়ামী লীগ নিজেদের দলের লোকদেরই ‘ডামি’ প্রার্থী করে ভোটের আয়োজন করে।
শেখ হাসিনা দলের ভেতরে নিজের ন্যূনতম বিরোধিতা এড়াতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রাজনীতি করা নেতাদের কোণঠাসা করে রেখেছিলেন। সামনে এনেছিলেন অনুগত নেতাদের। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল আওয়ামী লীগ জনগণের কাছ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন; পুলিশ ও আমলানির্ভর, দুর্নীতিবাজে ঘেরা একটি দল।
শেখ হাসিনা গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছিলেন, পরে তিনিই পরিচিত হন গণতন্ত্র হত্যাকারী হিসেবে। শেখ হাসিনা সারের জন্য কৃষক খুন নিয়ে সোচ্চার ছিলেন, তাঁর ওপর এখন ছাত্রহত্যার দায়। চার শতাধিক (৪৩৫) মানুষ হত্যার ঘটনার মধ্য দিয়ে তিনি বিদায় নিয়েছেন। গতকালই নিহত হয়েছেন অন্তত ১০৪ জন।
শেখ হাসিনার বয়স এখন ৭৬ বছর। শেখ হাসিনা আর রাজনীতি করবেন না বলে বিবিসিকে জানিয়েছেন তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এরশাদের চেয়ে শেখ হাসিনা শত গুণ বেশি খারাপ হয়ে বিদায় নিয়েছেন। এরশাদ পালিয়ে যাননি, তিনি পালিয়ে গেছেন। তিনি পালিয়ে গেছেন, কিন্তু আওয়ামী লীগ দলটাকে ধ্বংস করে দিয়ে গেলেন। তাঁর হিংসা, দম্ভ, অহংকার দলটাকে ধ্বংস করল।
চট্টগ্রামের দেয়ালে দেয়ালে আবু সাঈদ, মুগ্ধ আর আন্দোলনের গ্রাফিতি
সুজন ঘোষ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৪, ১১: ০৮
আন্দোলনের নানা স্মৃতি এখন ফুটে উঠছে বন্দরনগর চট্টগ্রামের দেয়ালে দেয়ালে। এই কাজ করেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল বিকেল সাড়ে চারটায় চট্টগ্রাম নগরের শিল্পকলা এলাকায়। ছবি: সৌরভ দাশ
শ্রাবণেই ‘বসন্ত’ নেমে এসেছে বাংলায়। তারুণ্যের রক্তে রাঙা বসন্তের ফুল আজ রঙে রঙিন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পতন হয়েছে শেখ হাসিনা সরকারের। ছাত্র-জনতার জয়ের হাসি ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। আন্দোলনের সময় গুলির সামনে বুক পেতে দেওয়া আবু সাঈদ, আলোচিত নানা স্লোগান, গুলিবিদ্ধ ছাত্রের মর্মস্পর্শী কথা আর স্মৃতি এখন ফুটে উঠছে বন্দরনগর চট্টগ্রামের দেয়ালে দেয়ালে। রংতুলির মাধ্যমে তা ফুটিয়ে তুলছেন দেশ কাঁপানো এই আন্দোলনে যুক্ত থাকা শিক্ষার্থীরা।
গতকাল বুধবার চট্টগ্রাম নগরের ২ নম্বর গেট, জিইসি মোড়, জামালখানসহ বিভিন্ন এলাকায় দেয়াল ও উড়ালসড়কের পিলারে রঙিন সব ছবি এঁকেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে চট্টগ্রাম পুনঃসংস্কার এবং বিজয়ের গ্রাফিতি কর্মসূচি নিয়ে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। এই কর্মসূচির মাধ্যমে চট্টগ্রামে পোস্টার সরানো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পুড়ে যাওয়া দেয়াল রং করার আহ্বান জানিয়ে এই পোস্ট দেওয়া হয়ে; যা ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।
চট্টগ্রাম নগরের জিইসি মোড়ে গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের দেয়াল ছিল স্যাঁতসেঁতে আর পোস্টারে ঢাকা। নিয়মিত পরিষ্কার না করায় সৌন্দর্য হারায় এই দেয়াল। শিক্ষার্থীরা শুরুতেই সাদা রং দিয়ে পরিষ্কার করেন এই দেয়াল। তারপর ছবির আঁকার মাধ্যমে আন্দোলনের দৃশ্যচিত্র ফুটিয়ে তোলেন। আঁকা হয় জাতীয় পতাকা। লেখা হয় আন্দোলনে মারা যাওয়া ছাত্রদের নাম।
দেয়ালে দেয়ালে ছিল নানা স্লোগান। ‘স্বাধীনতা এনেছি যখন, সংস্কার করি’, ‘ইতিহাসের নতুন অধ্যায় জুলাই ২৪’, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো জুলাই’, ‘আমাদের দেশের ভাগ্য আমরা পরিবর্তন করব’, ‘আমাদের দেশ আমাদেরই গড়ে নিতে হবে, পিণ্ডির গোলামি ছেড়ে দিতে হবে’।
‘ভাই কারও পানি লাগবে, পানি…,’ কোটা সংস্কার আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র মীর মাহফুজুর রহমানের (মুগ্ধ) এমন একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। আন্দোলনে মৃত্যু হলেও মুগ্ধর এমন কথা ভুলে যাননি আন্দোলনকারীরা। পরবর্তী কর্মসূচিগুলোতে বারবার ফিরে আসে ‘পানি লাগবে পানি…’। বিজয়ের পরও তা স্মৃতিতে গেঁথে রয়েছে আন্দোলনকারীদের মধ্যে। সাদা দেয়ালে রক্তে রাঙা লাল কালি দিয়ে তাই লেখা হয়েছে, ‘পানি লাগবে পানি…’।
ফেসবুকে পোস্ট দেখে জিইসি মোড়ে গ্রাফিতি আঁকতে চলে এসেছিলেন আহনাফ তাহমিদ। চট্টগ্রাম কলেজের ইংরেজি বিভাগের স্নাতকোত্তর শ্রেণির ছাত্র আহনাফ নিজেই নিয়ে এসেছিলেন রংতুলি। আহনাফ বলেন, ‘আমরা সবাই মিলে এই আন্দোলন করেছি। সাধারণ মানুষও যুক্ত হয়েছিলেন। নগরের দেয়ালগুলোতে নানা ধরনের লেখা ছিল, যা দৃষ্টিকটু ও সমীচীন নয়। তাই এসব লেখা মুছে নতুন করে রাঙানোর কাজ করছি। তুলে ধরছি আন্দোলনের নানা স্মৃতি। যাতে পথচলতি শিশু-কিশোর থেকে বয়স্ক—সবাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি ভুলে না যান, সে জন্য গ্রাফিতি আঁকছি।’
গ্রাফিতিতে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থান
ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। বিজয় উদ্যাপনে দেশজুড়ে গ্রাফিতি ও দেয়ালচিত্র আঁকেন শিক্ষার্থীরা। রংতুলির আঁচড়ে ফুটে ওঠে বিপ্লব, বিদ্রোহ ও বিজয়ের চিত্র। এর আগে জুলাই ও আগস্টের শুরুতেও চলে গ্রাফিতি আঁকা। রাজধানীতে আঁকা এমন কিছু গ্রাফিতির চিত্র নিয়ে এই ছবির গল্প।
আপডেট: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ২১: ১৬
১ / ১০
দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতি। সামনে ফুটপাতে বসে গান গাচ্ছেন একদল শিক্ষার্থী। রাজধানীর মিন্টো রোডে। ছবি: দীপু মালাকার
২ / ১০
গ্রাফিতিতে স্থান পায় বিভিন্ন বাণী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়ছবি: দীপু মালাকার
৩ / ১০
দেয়াললিখনে দেশের প্রতি দায়িত্ব পালনের আহ্বান। রাজধানীর পলাশীতেছবি: দীপু মালাকার
৪ / ১০
দেয়ালজুড়ে বিপ্লব, বিদ্রোহ আর জয়ের চিত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়ছবি: দীপু মালাকার
৫ / ১০
গ্রাফিতিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে স্বাধীনতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়ছবি: দীপু মালাকার
৬ / ১০
গ্রাফিতির ওপর আলো–ছায়ার খেলা। রাজধানীর মোহাম্মদপুরেছবি: জাহিদুল করিম
৭ / ১০
শোভা পাচ্ছে শিক্ষার্থীদের আঁকা বিভিন্ন চিত্র। রাজধানীর মোহাম্মদপুরেছবি: জাহিদুল করিম
৮ / ১০
রংতুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে প্রতিবাদ। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে। ছবি: জাহিদুল করিম
৯ / ১০
গ্রাফিতিতে প্রশ্ন—‘ফুলগুলো সব লাল হলো ক্যান?’ রাজধানীর মোহাম্মদপুরে। ছবি: জাহিদুল করিম
১০ / ১০
তুলে ধরা হয়েছে শিকল ভেঙে স্বাধীন হওয়ার চিত্র। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে। ছবি: জাহিদুল করিম
বিদ্রোহে–বিপ্লবে: অভ্যুত্থানের অব্যর্থ হাতিয়ার
লেখা: তুহিন খান, প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৪, ১২: ৫৪ প্রথম আলো
ছাত্র-জনতার সাম্প্রতিক লড়াইয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শামিল হয়েছিল কবিতা, গান, পোস্টার, কার্টুন আর গ্রাফিতি। এই বিদ্রোহ ও বিপ্লবের ভাষায় ধরা আন্দোলনের মর্মকথা নিয়ে সচিত্র দলিল বিদ্রোহে–বিপ্লবে।
২০২৪ সালের অবিস্মরণীয় জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণ–অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনাশাহির পতন ঘটেছে। বাংলাদেশ তো বটেই, গোটা বিশ্বের ইতিহাসে এই অভ্যুত্থান নানা কারণেই খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই গণ–অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান দিক হলো, এমন অংশগ্রহণমূলক অভ্যুত্থান বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বের ইতিহাসেই বিরল। বয়স, শ্রেণি, পেশা, ধর্ম, লিঙ্গ, বর্গনির্বিশেষে সব মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে এই অভ্যুত্থান হয়ে উঠেছে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের শক্তি, প্রতিরোধ ও আকাঙ্ক্ষার রঙে রঙিন।
অনেকেই এই আন্দোলনকে বলছেন জেন-জির আন্দোলন। এই আন্দোলনে ‘আই হেট পলিটিকস’ ছাপ লাগা জেন-জির বহুমাত্রিক অংশগ্রহণ ছিল এক অনন্যসাধারণ ঘটনা। আর ডিজিটাল যোগাযোগে অভ্যস্ত জেন-জির চৈতন্যে এই আন্দোলনের ভাষা ও মর্মকে মূর্ত করে তুলতে আমাদের ডিজিটাল শিল্পীরা হাতে তুলে নিয়েছেন দারুণ এক অস্ত্র—অনলাইন পোস্টার ও ফেস্টুন। জুলাই অভ্যুত্থানের গণ–আকাঙ্ক্ষাকে নতুন প্রজন্মের কাছে অর্থবহ ও সহজবোধ্য করে তুলতে এই শিল্পমাধ্যমটির অবদান অনস্বীকার্য।
এ ছাড়া ‘তুমি কে আমি কে/ বিকল্প বিকল্প’, ‘রাষ্ট্রীয় সম্পদ’ বা ‘সব স্বাভাবিক’ শিরোনামের পোস্টারগুলো হয়ে উঠেছে আওয়ামী বয়ানের বিরুদ্ধে অনলাইনমুখী জেন-জির প্রতিবাদের সুতীব্র ভাষা।
দেবাশিস চক্রবর্তী, দোয়া বিনতে রশিদ, অদ্রি রায়, জোহেব হাসান প্রমিত, দেবাশিস চক্রবর্তী, রীশাম শাহাব তীর্থ, দেবাশিস চক্রবর্তী। পোস্টারগুলো শিল্পীদের কাছ থেকে সংগৃহীত
কেবল অভ্যুত্থানের গণচেতনাই নয়, ধরা যাক শিল্পী দেবাশিস চক্রবর্তীর করা পোস্টারগুলোর কথা, যেখানে উঠে এসেছে এই অভ্যুত্থানের ধারাবাহিক সময়ক্রম, সময়োপযোগী দাবিদাওয়া ও অভ্যুত্থানের গতিপথ নির্দেশক নানা ধরনের স্লোগান। লাল, কালো ও হলুদের গভীর প্রতীকী মিশ্রণে দেবাশিস এই অভ্যুত্থানের প্রতিটি পর্যায়কে মূর্ত করে তুলেছেন অসামান্য দরদ ও দক্ষতায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলার পরিপ্রেক্ষিতেই এই আন্দোলন তীব্র গতিতে একটি সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। ১৫ বছর ধরে চলতে থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের ‘রাজাকার তকমার রাজনীতি’র মুখোশটি মুহূর্তেই খসে পড়ে ছাত্র–জনতার গভীর অর্থবহ নানা স্লোগানে। অধিকার চাইলেই যারা রাজাকার বলে, তারা আসলে স্বৈরাচার—স্লোগানে স্লোগানে এই সরল সত্যটি প্রকট হয়ে ওঠে। দেবাশিসের পোস্টার এ ক্ষেত্রে আপসহীনভাবে তুলে ধরে ছাত্র–জনতার ভাষ্য।
আন্দোলন চলাকালে হাসিনা সরকারের বহুল ব্যবহৃত বয়ানগুলোকে দারুণভাবে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে দেবাশিসের পোস্টারগুলো। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বৈরাচার পার পাবে না’ শিরোনামের একটি পোস্টার ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নামক আওয়ামী অস্ত্রটিকে ছিনিয়ে এনে জনতার হাতে তুলে দিয়েছে। ‘বাংলাদেশের জনগণ তৃতীয় পক্ষ না’ শিরোনামের পোস্টারটি ‘আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষ ঢুকে পড়েছে’ শীর্ষক ভাষ্যের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে এক কার্যকর প্রতিভাষ্য। এ ছাড়া ‘তুমি কে আমি কে/ বিকল্প বিকল্প’, ‘রাষ্ট্রীয় সম্পদ’ বা ‘সব স্বাভাবিক’ শিরোনামের পোস্টারগুলো হয়ে উঠেছে আওয়ামী বয়ানের বিরুদ্ধে অনলাইনমুখী জেন-জির প্রতিবাদের সুতীব্র ভাষা।
দেবাশিসের পোস্টারগুলোতে এই আন্দোলনের জল–মাটিলগ্ন অনুভূতির নন্দনতাত্ত্বিক উপস্থাপনাও উঠে এসেছে। ‘রক্তাক্ত জুলাই’ বা ‘অগ্নিঝরা বর্ষা’ শিরোনামের পোস্টারগুলো ছাত্র–জনতার বিপ্লবী চেতনাকে স্থান-কালের ঐতিহাসিকতার মধ্যে হাজির করেছে। তা ছাড়া এই গণ–অভ্যুত্থানের ব্যাপক অংশগ্রহণমূলকতা ও সমতাভিত্তিক বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষার দিকটিও উঠে এসেছে দেবাশিসের বিভিন্ন পোস্টারে। প্রায় প্রতিটি পোস্টারেই মুষ্টিবদ্ধ কিংবা আন্দোলনরত মানুষের ক্যারিকেচার ব্যবহার করেছেন দেবাশিস। তাতে আন্দোলনরত ছাত্র–জনতা পোস্টারগুলোর মধ্যে নিজেদের বিপ্লবী প্রতিচ্ছবিই খুঁজে পেয়েছে বারবার। এ ছাড়া পোস্টারের ক্যারিকেচারগুলোতে দেবাশিস বেশ সচেতনভাবেই সমাজের নানা শ্রেণি-পেশা-ধর্ম-বর্গের প্রতীকী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেছেন এবং এর মধ্য দিয়ে আগামীর বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি যে সবার জন্য সমান অধিকারের রাষ্ট্র হওয়া উচিত, সেই চেতনাটিও ব্যক্ত করেছেন বেশ কার্যকর উপায়ে।
‘খুনি হাসিনা’, ‘হুকুমের আসামী’সহ বেশকিছু পোস্টারে দেবাশিস সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি তাঁর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছেন। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার যে প্রবল প্রতাপশালী সত্তাটি জনগণের মনে ও চৈতন্যে সদা বিরাজমান ছিল, দেবাশিসের এই পোস্টারগুলো তা ভেঙে টুকরা টুকরা করে ফেলেছে। ‘হুকুমের আসামী’ শিরোনামের পোস্টারটিতে শেখ হাসিনার ক্যারিকেচারটি একদিকে প্রচণ্ড নির্মম, অন্যদিকে বেশ হাস্যোদ্রেককারী একটি মানবমুখকে ফুটিয়ে তুলেছে। ফলে গণচৈতন্য ফ্যাসিস্ট সরকারের নির্মমতার দিকটি বুঝলেও, তাকে নিয়ে বিদ্রূপ করতে ভয় পায়নি একচুলও।
এ ছাড়া পোস্টারের ক্যারিকেচারগুলোতে দেবাশিস বেশ সচেতনভাবেই সমাজের নানা শ্রেণি-পেশা-ধর্ম-বর্গের প্রতীকী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেছেন এবং এর মধ্য দিয়ে আগামীর বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি যে সবার জন্য সমান অধিকারের রাষ্ট্র হওয়া উচিত, সেই চেতনাটিও ব্যক্ত করেছেন বেশ কার্যকর উপায়ে।
গণ–অভ্যুত্থানের প্রাথমিক সফলতার পরেও দেবাশিস থেমে যাননি। গণ–অভ্যুত্থানকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে নানা দিকনির্দেশনা ও জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা হাজির হয়েছে তাঁর বানানো বিভিন্ন পোস্টারে। গণক্ষমতার সরকার গঠন, বিপ্লবী শক্তির অধীনে নতুন গঠনতন্ত্র তৈরি, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাবনা, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার প্রতিবাদ, ভারতের আধিপত্যবাদী আচরণকে বিদ্রূপ করা, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারসহ অভ্যুত্থানজাত আরও নানা চেতনা ও দাবি উঠে এসেছে দেবাশিসের পোস্টারগুলোতে। একটি পোস্টারে দেবাশিস ঘোষণা দিয়েছেন, ‘অভ্যুত্থান চলমান’। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত দেবাশিস পোস্টারে পোস্টারে এই অভ্যুত্থানের প্রাণ, চৈতন্য ও গণ–আকাঙ্ক্ষাকে দিয়েছেন কার্যকর, শক্তিশালী, ধারাবাহিক ও দিকনির্দেশনামূলক ভাষা।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের ফলে সৃষ্ট নতুন আশা ও ভরসার পাশাপাশি, শিল্পী রীশাম শাহাব তীর্থর পোস্টারে ফুটে উঠেছে অভ্যুত্থান-পরবর্তী অরাজকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং সবার জন্য সমতার দেশ গড়ার অঙ্গীকার। পাশাপাশি অভ্যুত্থানে আহতদের সুচিকিৎসার মানবিক দাবিটিও উঠে এসেছে এই শিল্পীর ডিজিটাল তুলিতে।
ছাত্র–জনতার ভাষা যেমন উঠে এসেছে এসব পোস্টারে, তেমনি এই পোস্টারগুলোও পরে প্রিন্ট বা গ্রাফিতি হয়ে পৌঁছে গেছে মাঠে লড়াইরত ছাত্র–জনতার কাছে। জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানে এভাবেই একাকার হয়ে গেছে অনলাইন আর অফলাইন, রাজপথ আর ডিজিটাল পরিসর।
এ ছাড়া ‘সন্তানের পাশে অভিভাবক’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রচারিত বিভিন্ন পোস্টারে উঠে এসেছে, কীভাবে অভিভাবকেরা এই লড়াইয়ে তাঁদের সন্তানদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। তাঁরা সাবেক প্রধানমন্ত্রীর স্বজন হারানোর বেদনাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘সন্তান হারানোর বেদনা আপনার নাই’ বা ‘স্বজন হারানোর বেদনা আপনার আছে, সন্তান হারানোর নাই’। নিজেদের সন্তান বা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই রাষ্ট্র যে অনিরাপদ, এই অনিরাপদ রাষ্ট্রে যে কিছুতেই সন্তানদের একা ছাড়বেন না অভিভাবকেরা—এই দীপ্ত প্রতীতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এসব পোস্টারের রঙে, নকশায় ও ভাষ্যে।
অদ্রি রায় নামের এক শিল্পীর একটি পোস্টারে ফটোজার্নালিস্ট ও সাধারণ নাগরিকদের ব্যক্তিগত ডিভাইস তল্লাশির প্রতিবাদ উঠে এসেছে সোজাসাপটা ভাষায়, ‘ফোনটা তোর বাপের না,/ ক্যামেরা তোর নেতার না!’ আন্দোলন চলাকালে লাশের মিছিলে মুক্তির আশায় বুক বেঁধে হাঁটতে থাকা ছাত্র–জনতার যন্ত্রণাদগ্ধ অনুভূতি ব্যক্ত হয়েছে অদ্রির আরেকটা পোস্টারে, ‘লাশ গুনতে গুনতেই লাশ হয়ে যাব,/ তবু জানি ফিরবার সব পথ বন্ধ।’ আগস্টের শুরুতে প্রবল বর্ষণকে উপেক্ষা করেও রাস্তায় নেমে এসেছিল হাজার হাজার ছাত্র–জনতা। বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা সেই গণমানুষের বেদনাদীপ্ত মনের অনুভূতিটি ভাষা পেয়েছে অদ্রির আরেকটি পোস্টারে, ‘সন্তানের রক্তে ভিজে আছি, ছাতার দরকার নেই!’
এ ছাড়া আন্দোলনের আরও বিভিন্ন দিককে কেন্দ্র করে শত শত পোস্টার বানিয়েছেন জানা-অজানা অনেক শিল্পী। প্রায় প্রতিটি সামাজিক গণমাধ্যমে হাজার হাজারবার প্রচারিত হয়েছে এসব পোস্টার। নানা কারণে যাঁরা মাঠে নামতে পারেননি, মোবাইল বা ল্যাপটপের স্ক্রিনে উদ্বিগ্ন মুখে যাঁরা তাকিয়ে ছিলেন ভবিষ্যতের দিকে, তাঁদের হাতেও প্রতি মুহূর্তে লড়াইয়ের অস্ত্র তুলে দিয়েছে এই পোস্টারগুলো।
স্বৈরাচারের বহুল ব্যবহৃত বয়ানগুলোকে ভেঙে দেওয়া, এই জনযুদ্ধের চেতনা ও লক্ষ্যকে গণমানুষের, বিশেষত ডিজিটাল যোগাযোগে অভ্যস্ত নতুন প্রজন্মের মনে ও মননে সদাজাগরূক রাখা ও নতুন বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত ছবিটিকে রঙে ও ভাষায় মূর্ত করে তোলার কঠিন কাজটি করেছেন এই শিল্পীরা, অনায়াস একটি শিল্পমাধ্যমকে আশ্রয় করে।
মিম আদানপ্রদানে অভ্যস্ত ডিজিটাল প্রজন্মকে খুব সহজেই আকৃষ্ট করতে পেরেছে এসব অর্থবহ পোস্টারের রং ও ভাষার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সংক্ষিপ্ত অথচ সুদৃঢ় বক্তব্য। ছাত্র–জনতার ভাষা যেমন উঠে এসেছে এসব পোস্টারে, তেমনি এই পোস্টারগুলোও পরে প্রিন্ট বা গ্রাফিতি হয়ে পৌঁছে গেছে মাঠে লড়াইরত ছাত্র–জনতার কাছে। জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানে এভাবেই একাকার হয়ে গেছে অনলাইন আর অফলাইন, রাজপথ আর ডিজিটাল পরিসর। যোগাযোগপদ্ধতির ইতিহাসে এ এক বিরলপ্রায় ঘটনা! একটি সাধারণ শিল্পমাধ্যমকে ব্যবহার করে এ রকম অসাধারণ এক ঘটনা ঘটিয়ে তুললেন যে ডিজিটাল শিল্পীরা, অগ্নিঝরা জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের ইতিহাসে তাঁরাও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
পোস্টারগুলো শিল্পীদের কাছ থেকে
৪–৬ আগস্ট: তিন দিনেই নিহত ৩২৬ জন
আহমদুল হাসান, প্রথম আলো,ঢাকা, প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৪, ০৭: ৩৬
সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবির আন্দোলন ও পরবর্তী সহিংসতায় তিন দিনেই (৪-৬ আগস্ট) অন্তত ৩২৬ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী ও সমর্থক, পুলিশের সদস্য, শিক্ষার্থী ও বিএনপির নেতা-কর্মী বেশি।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই তিন দিনে পুলিশের গুলিতে মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আবার পুলিশকেও মারধর করে হত্যা করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হামলা ও গুলিতে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যু হয়েছে। আবার বিক্ষোভকারী ও প্রতিপক্ষের হামলা এবং অগ্নিসংযোগে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
সব মিলিয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন, পরবর্তী বিক্ষোভ ও সরকারের পতনের পর সহিংসতায় ১৬ জুলাই থেকে গতকাল রোববার (১১ আগস্ট) পর্যন্ত অন্তত ৫৮০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১৬ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত ২১৭ জন নিহতের খবর পাওয়া গিয়েছিল। ৩২৬ জন নিহত হন ৪ থেকে ৬ আগস্টের (রবি থেকে মঙ্গলবার) মধ্যে। বাকি ৩৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায় ৭ থেকে ১১ আগস্টের মধ্যে।
৭-১১ আগস্ট সময়ে কেউ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। বেশির ভাগের মরদেহ পরে হাসপাতালে আনা হয়। কখন মৃত্যু হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বিক্ষোভকারী ও প্রতিপক্ষের হামলা এবং অগ্নিসংযোগে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট (সোমবার) শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। তিনি এখন ভারতে রয়েছেন। নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছে।
মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪ থেকে ৬ আগস্ট (রবি থেকে মঙ্গলবার) সময়ে নিহতদের মধ্যে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ দলটির নেতা, কর্মী ও সমর্থক রয়েছেন অন্তত ৮৭ জন। পুলিশ সদস্য রয়েছেন ৩৬ জন। বিজিবি, র্যাব ও আনসার সদস্য রয়েছেন একজন করে।
১৬ জুলাই থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত মোট ৪২ জন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন বলে গতকাল রোববার জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ময়নুল ইসলাম। তিনি জানান, ৪২ জনের মধ্যে দুজন পুলিশ সদস্য র্যাবে নিয়োজিত ছিলেন।
৪ থেকে ৬ আগস্ট সময়ে নিহতদের মধ্যে অন্তত ২৩ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। তাঁরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে পড়তেন। এ সময়ে নিহতদের মধ্যে বিএনপি ও দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের ১২ জন নেতা, কর্মী ও সমর্থক রয়েছেন।
৩২৬ জনের মধ্যে বাকি ১৬৮ জনের সরাসরি রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই অথবা জানা যায়নি। ৪২ জনের পরিচয়ই এখনো নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি। আহত হয়েছেন বহু মানুষ।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন গতকাল রাজধানীর রাজারবাগে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে আহতদের দেখতে গিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, পুলিশ ও অন্যদের গুলিতে অনেক মানুষ মারা গেছেন। পুলিশের ওপরও ব্যাপক হামলা হয়েছে। তিনি বলেন, পুলিশকে যারা ব্যবহার করেছে, তাদের বিচার হবে। হুকুমদাতাদের কঠোর শাস্তি হবে।
৪ থেকে ৬ আগস্ট সময়ে নিহতদের মধ্যে অন্তত ২৩ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। তাঁরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে পড়তেন। এ সময়ে নিহতদের মধ্যে বিএনপি ও দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের ১২ জন নেতা, কর্মী ও সমর্থক রয়েছেন।
আওয়ামী লীগের যাঁরা
৩ আগস্ট (শনিবার) ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে হাজার হাজার মানুষের জমায়েতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করে। ৪ আগস্ট (রোববার) থেকে ছিল তাদের সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সিদ্ধান্ত নেয় যে ৪ আগস্ট তারা দলের নেতা-কর্মীদের মাঠে নামিয়ে দেবে। ওই দিন ঢাকার ওয়ার্ড এবং জেলায় জেলায় তাদের জমায়েত কর্মসূচি ছিল।
৪ আগস্ট দেখা যায়, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা করছেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। যদিও প্রতিরোধের মুখে তাঁরা বেশি সময় রাস্তায় টিকতে পারেননি। ওই দিন পুলিশকে আগের মতো সক্রিয় দেখা যায়নি। যদিও কিছু জায়গায় বিক্ষোভ দমনে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ছিল পুলিশ। সেদিন গুলিতে বিক্ষোভকারীরা নিহত হয়েছেন। আবার মাঠছাড়া হওয়ার পর বিক্ষোভকারীদের হামলায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও নিহত হয়েছেন।
এদিন (৪ আগস্ট) সারা দেশে অন্তত ১১১ জন নিহতের খবর পাওয়া যায়। যার মধ্যে ২৭ জন আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী ও সমর্থক। এর মধ্যে নরসিংদীর মাধবদীতে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মিছিল থেকে গুলি করা হয়। পরে আওয়ামী লীগের ৬ নেতা-কর্মীকে মারধর করে হত্যা করা হয়। নিহতদের মধ্যে চরদিঘলদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনও রয়েছেন।
যদিও কিছু জায়গায় বিক্ষোভ দমনে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ছিল পুলিশ। সেদিন গুলিতে বিক্ষোভকারীরা নিহত হয়েছেন। আবার মাঠছাড়া হওয়ার পর বিক্ষোভকারীদের হামলায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও নিহত হয়েছেন।
৫ আগস্ট (সোমবার) দুপুরের দিকে শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর অনেক আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীর ওপর ও তাঁদের বাড়িতে হামলা হয়, আগুন দেওয়া হয়। পরদিনও সহিংসতা হয়। এতে অনেকে নিহত হন।
৫ আগস্ট সন্ধ্যায় সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি জাকির হোসেনের বাড়িতে হামলা চালানো হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ওই দিন জাকিরের করা গুলিতে হামলাকারী দুজন নিহত হন। পরে হামলাকারীরা জাকির, তাঁর ভাই জাহাঙ্গীরসহ ছয়জনকে মারধর করে হত্যা করে।
মেঘনা নদীর বালু দস্যুতার অভিযোগ থাকা চাঁদপুরের লক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সেলিম খান ও তাঁর ছেলে শান্ত খানকে ৫ আগস্ট মারধর করে হত্যা করা হয়। বরিশালের সাবেক মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হলে তিনজনের মৃত্যু হয়। পরে জানা যায়, তাঁদের দুজন যুবলীগের কর্মী।
৫ আগস্ট মোট ১০৮ জন নিহতের খবর পাওয়া যায়। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ৪৯ জন। ৬ আগস্ট (মঙ্গলবার) মোট নিহত হন ১০৭ জন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ১১ জন।
৬ আগস্টের মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিহত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের অনেকের বিরুদ্ধে নিজ এলাকায় ‘বাড়াবাড়ি’ করা ও প্রতিপক্ষের ওপর হামলার অভিযোগ ছিল। কারও কারও বিরুদ্ধে ছিল সন্ত্রাস, দখল, নির্যাতন, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসার অভিযোগ। কাউকে কাউকে খুন করা হয়েছে প্রতিশোধ নিতে।
আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, পুলিশ সদস্য ও সাধারণ মানুষের মৃত্যুতে আমি নাগরিক হিসেবে খুবই কষ্ট পাই। ভবিষ্যৎ রাজনীতির স্বার্থে সহিংসতা পরিহারের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে একটা সমঝোতায় আসা উচিত।’ তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছে। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হয়েছে। এমনকি ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা ইতিহাসের কালো অধ্যায়।
এম এ মান্নান বলেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের এখানেই ইতি ঘটা উচিত এবং প্রতিটি ঘটনার তদন্ত ও বিচার হওয়া দরকার।
শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, পুলিশ সদস্য ও সাধারণ মানুষের মৃত্যুতে আমি নাগরিক হিসেবে খুবই কষ্ট পাই। ভবিষ্যৎ রাজনীতির স্বার্থে সহিংসতা পরিহারের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে একটা সমঝোতায় আসা উচিত।
আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান ।
বিএনপির ১২ জন
৪ থেকে ৬ আগস্ট (রবি থেকে মঙ্গলবার) বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সংঘর্ষে এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় গুলিতে বিএনপি ও দলের অঙ্গসংগঠনের ১২ জন নেতা, কর্মী ও সমর্থকের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দুজন ছাত্রদল নেতা ও একজন যুবদল নেতা। বাকিরা কর্মী। ঢাকায় বিএনপির কেউ নিহত হননি। নিহত ব্যক্তিরা পাবনা, রাজশাহী, সাতক্ষীরা, মাগুরা ও সিরাজগঞ্জের।
৬ ও ৭ আগস্ট যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, শেরেবাংলা নগর, জুরাইন, বনানী, আশুলিয়া ও গাজীপুর থেকে ১৫ জন পুলিশ, ১ জন বিজিবি, ১ জন র্যাব ও ১ জন আনসার সদস্যের মরদেহ আসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এর মধ্যে ১৬ জনকে মারধর করে ও দুজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। কারও কারও মরদেহ ছিল বিকৃত।
পুলিশ ৩৬ জন
৪ থেকে ৬ আগস্টের মধ্যে পুলিশের ৩৬ সদস্য নিহত হন। একই সময়ে একজন বিজিবি, একজন র্যাব ও একজন আনসার সদস্য নিহত হয়েছেন।
৬ ও ৭ আগস্ট যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, শেরেবাংলা নগর, জুরাইন, বনানী, আশুলিয়া ও গাজীপুর থেকে ১৫ জন পুলিশ, ১ জন বিজিবি, ১ জন র্যাব ও ১ জন আনসার সদস্যের মরদেহ আসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এর মধ্যে ১৬ জনকে মারধর করে ও দুজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। কারও কারও মরদেহ ছিল বিকৃত।
ওই দিন অবশ্য যাত্রাবাড়ী থেকে আরও ৩১ জনের মরদেহ আসে। তাঁদের মৃত্যু হয়েছিল গুলিতে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ৫ আগস্ট (সোমবার) শেখ হাসিনার পদত্যাগের দিন যাত্রাবাড়ী এলাকায় ছাত্র-জনতা ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। তারা গুলি করে মানুষ হত্যার অভিযোগ তুলে পুলিশের ওপর হামলার চেষ্টা চালায়। পুলিশও নির্বিচার গুলি ছোড়ে। এতে অনেক বিক্ষোভকারী নিহত হন। শেষ পর্যন্ত পুলিশ আর রক্ষা পায়নি। থানায় হামলা হয়। পুলিশ সদস্যদের মারধর করে হত্যা করা হয় এবং থানায় আগুন দেওয়া হয়।
সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় ৪ আগস্ট (রোববার) পুলিশের ১৫ সদস্যকে হত্যা করা হয়। পুড়িয়ে দেওয়া হয় থানা। ৫ আগস্ট (সোমবার) হবিগঞ্জে গভীর রাতে পুলিশের উপপরিদর্শক সন্তোষ দাশ চৌধুরীকে ছিনিয়ে নিয়ে হত্যা করা হয়। ওই দিন পুলিশের গুলিতে হবিগঞ্জে ৬ জন নিহত হন।
ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে ব্যাপক হতাহতের ঘটনার পর পুলিশের ওপর হামলা হয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার ও কিছু কর্মকর্তার উচ্চাভিলাষের কারণে সাধারণ পুলিশ সদস্যদের প্রাণ দিতে হয়েছে।
এর আগে জুলাই মাসে নিহত ২১২ জনের মধ্যে ১৭৫ জনের মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৭৮ শতাংশের শরীরে প্রাণঘাতী গুলির (বুলেট) ক্ষতচিহ্ন ছিল। নিহতের (১৭৫) মধ্যে ৪৬ জন ছিলেন শিক্ষার্থী। সরাসরি রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গিয়েছিল ছয়জনের। তাঁদের মধ্যে তিনজন আওয়ামী লীগের, দুজন বিএনপির ও একজন ছাত্রশিবিরের। পুলিশ সদস্য ছিলেন তিনজন, একজন ছিলেন আনসার সদস্য। বাকিরা বেশির ভাগই নিম্ন আয়ের মানুষ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল ছাড়া কখনো সংঘর্ষ ও সহিংসতায় এত মানুষের মৃত্যু ঘটেনি। এবার এত মানুষ মারা যাওয়ার কারণ পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার, নাগরিকদের হত্যা করে হলেও ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরে অনাগ্রহ।
শিক্ষার্থী ২৩ জন
নিহত ২৩ শিক্ষার্থীর মধ্যে ঢাকায় বিক্ষোভে মারা গেছেন ৬ জন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির রাকিব হোসেন (২২), ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির রমিজ উদ্দিন (২৪), কবি নজরুল সরকারি কলেজের তাহিদুল ইসলাম (২২), হাবিবুল্লাহ বাহার ডিগ্রি কলেজের আবদুল্লাহ সিদ্দিকী (২৩), সরকারি তোলারাম কলেজের আবদুর রহমান (২৩) ও কুমিল্লার হামিদুর রহমান (২২)।
মাগুরায় মারা গেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফরহাদ হোসেন (২৪) এবং শেরপুরে মারা গেছেন আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তুষার (২৪), কলেজশিক্ষার্থী সৌরভ (২২), সবুজ হাসান (২০) ও কলেজছাত্রী মীম আক্তার (১৮)। শেরপুরে বিক্ষোভের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়িচাপায় দুজন ও গুলিবিদ্ধ দুজন শিক্ষার্থী মারা যান। এর বাইরে বিভিন্ন জেলায় শিক্ষার্থী মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল ছাড়া কখনো সংঘর্ষ ও সহিংসতায় এত মানুষের মৃত্যু ঘটেনি। এবার এত মানুষ মারা যাওয়ার কারণ পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার, নাগরিকদের হত্যা করে হলেও ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরে অনাগ্রহ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিক্ষোভ দমনে নির্দেশপ্রাপ্ত হয়ে মারমুখী অবস্থানে ছিল। হতাহতের বড় কারণ এটা। বিক্ষোভ দমনে সরকারি দলও মাঠে নেমেছিল। তারা ব্যর্থ হয়েছে এবং পরে ক্ষোভের কারণে হামলার শিকার হয়েছে। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের কারণে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর আর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি।
নির্দলীয় নয়, শীর্ষ নেতৃত্বে ছাত্রশক্তির নেতারা
তৈমুর তুষার,২৯ জুলাই, ২০২৪ ০৮:২৭শেয়ার
কোটা সংস্কার আন্দোলন পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়া প্ল্যাটফরম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে নির্দলীয় দাবি করা হলেও এর নেতৃত্বে রয়েছেন একাধিক ছাত্রসংগঠনের শীর্ষ নেতারা। সমন্বয়কদের নামের তালিকায় প্রথম ১০ জনের মধ্যে পাঁচজনই গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি নামের একটি ছাত্রসংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। এই সংগঠনটির নেতারাই আন্দোলনের নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
গত ৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কমিটি ঘোষণা করা হয়।
৬৫ সদস্যের ওই কমিটিতে ২৩ জন সমন্বয়ক ও ৪২ জন সহসমন্বয়ক রয়েছেন। এই কমিটির তালিকা ঘেঁটে দেখা যায়, সমন্বয়কদের প্রথম ১০ জনের মধ্যে পাঁচজনই গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তির শীর্ষ পর্যায়ের নেতা। তাঁরা হলেন ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় সদস্যসচিব নাহিদ ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির আহ্বায়ক আসিফ মাহমুদ ও যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল কাদের এবং সদস্যসচিব মো. আবু বাকের মজুমদার ও যুগ্ম সদস্যসচিব আব্দুল হান্নান মাসুদ। সমন্বয়কদের তালিকায় ১১ নম্বরে থাকা সোহাগ মিয়াও ছাত্রশক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত।
একাধিক সূত্র জানায়, ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হকের নেতৃত্বাধীন সংগঠন গণ অধিকার পরিষদ থেকে বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী বেরিয়ে গিয়ে গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি গঠন করেন। গত বছরের ৪ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসু ভবনের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে এই সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়। সংগঠনটির আহ্বায়ক হন ডাকসুর সাবেক সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন। তিনি ২০২১ সালের ১৭ মার্চ থেকে চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গণ অধিকার পরিষদের ছাত্রসংগঠন ছাত্র অধিকার পরিষদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন।
আখতার হোসেন ২০২৩ সালের ২৬ জুলাই নুরুল হকের নেতৃত্বাধীন গণ অধিকার পরিষদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে দল থেকে পদত্যাগ করেন।
গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তির যাত্রা শুরুর দিন ৩১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি ও ৩৩ সদস্যের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। কেন্দ্রীয় কমিটিতে আখতার হোসেন আহ্বায়ক ও নাহিদ ইসলাম সদস্যসচিব নির্বাচিত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটিতে আসিফ মাহমুদ আহ্বায়ক ও নাহিদ ইসলাম সদস্যসচিব নির্বাচিত হন। কমিটি দুটি এক বছরের জন্য গঠন করা হয়।
সে হিসাবে এ বছরের অক্টোবরে কমিটির মেয়াদ পূর্ণ হবে।
কমিটি ঘোষণার সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন ছাত্রশক্তির সদস্যসচিব নাহিদ ইসলাম। তিনি বর্তমানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের তালিকায় ১ নম্বরে আছেন। ছাত্রশক্তির আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘চিন্তা ও রাজনীতির সমন্বয় ছাড়া একটি জনগোষ্ঠী নিজেকে বিকশিত করতে পারে না। তাই বিদ্যমান ছাত্ররাজনীতি পর্যালোচনা ও নতুন একটি ছাত্ররাজনীতি বিকাশের লক্ষ্যে আমরা কিছু শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে নিজেদের ভেতর আড্ডা, আলাপ ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক বোঝাপড়া তৈরি করতে সচেষ্ট হই। পাশাপাশি ক্রিয়াশীল বিভিন্ন সংগঠনের সক্রিয় সদস্যরা তাদের সংগঠনের প্রতি আস্থা হারিয়ে নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের পরিকল্পনা নিচ্ছি।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক বিকাশের জন্য আমরা একটি নতুন প্ল্যাটফরমের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি। সেই লক্ষ্যে আমরা কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সক্রিয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে একটি নতুন ছাত্রসংগঠন গঠন করার সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি।’
ছাত্রশক্তির কমিটি ঘোষণার পর ওই দিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের হামলার শিকার হন আখতার হোসেনসহ কয়েকজন নেতা। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের অভিযোগ ছিল, আখতার ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।
হামলার ঘটনায় গত বছরের ৪ অক্টোবর ছাত্রশক্তির এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘উদ্বোধন কর্মসূচি ও পদযাত্রা থেকে ফেরার পথে পরমাণু শক্তি কমিশনের সামনে কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক আখতার হোসেন, যুগ্ম আহ্বায়ক লুত্ফর রহমান, যুগ্ম সদস্যসচিব নুসরাত তাবাসসুম, যুগ্ম সদস্যসচিব আসাদুল্লাহ আল গালিব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক ফয়সাল হাসান, নুসাইবা তাসনিম, যুগ্ম সদস্যসচিব আব্দুল হান্নান মাসুদ, সদস্য নিশিতা জামান নিহা, আবদুল্লাহ আল মাহমুদ, সুমনা শারমিন ও সাদিয়া ইয়াসমিনের ওপর ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকতের অনুসারী হিসেবে পরিচিত কিছু নেতাকর্মী একযোগে হামলা চালান।’
সেদিন হামলার শিকার ছাত্রশক্তির যুগ্ম সদস্যসচিব নুসরাত তাবাসসুম এখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক। তিনি মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন নাহার হলে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। গতকাল রবিবার ভোর ৫টায় মিরপুরের একটি বাসা থেকে নুসরাত তাবাসসুমকে নিরাপত্তা হেফাজতে নিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
ছাত্রশক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির সদস্য নিশিতা জামান নিহা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সহসমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব আসাদুল্লাহ আল গালিব বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। তিনি গত শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের নাম ‘শহীদ রুদ্র তোরণ’ ঘোষণা করে একটি কাগজ ঝুলিয়ে দিয়ে আসেন।
একাধিক সূত্র মতে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সহসমন্বয়ক আব্দুল্লাহ সালেহীন অয়ন, রিফাত রশীদ, হাসিব আল ইসলাম গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির সদস্য। আরেক সহসমন্বয়ক রাফিয়া রেহনুমা হৃদি গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তির যুগ্ম সদস্যসচিব। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কুয়েত মৈত্রী হলে আন্দোলন সমন্বয়ের দায়িত্বে আছেন।
গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি ছাড়াও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কমিটিতে আছেন আরো একাধিক ছাত্রসংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা। ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয় ছাত্র ফেডারেশনের সদস্যসচিব উমামা ফাতেমা দায়িত্ব পালন করছেন সুফিয়া কামাল হলের সমন্বয়ক হিসেবে। ছাত্র ফেডারেশন জোনায়েদ সাকির নেতৃত্বাধীন গণসংহতি আন্দোলনের ছাত্রসংগঠন। জোনায়েদ সাকি বর্তমানে বিএনপি জোটের সঙ্গে মিলে সরকারবিরোধী আন্দোলনে আছেন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতার মোবাইল নম্বরে কল দেওয়া হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। সংগঠনটির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বেশির ভাগই গ্রেপ্তার, পুলিশের হেফাজত বা আত্মগোপনে আছে বলে জানা গেছে।
সমন্বয়কের কথা
(Tales of coordinators)
১. সাক্ষাৎকারে নাহিদ ইসলাম:
ফ্যাসিস্ট কাঠামো বিলোপ হয়তো দ্বিতীয় গণঅভ্যুত্থানের প্রয়োজন হবে
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম। ছবি: সমকাল
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফারুক ওয়াসিফ
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৪ | ২২:১৭ | আপডেট: ২০ আগস্ট ২০২৪ | ০২:২২
অন্তর্বর্তী সরকার এখন কী করছে ও কী করবে, আন্দোলনের পরবর্তী ধাপ এবং নিজের রাজনৈতিক চিন্তা নিয়ে সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা নাহিদ ইসলাম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সমকালের পরিকল্পনা সম্পাদক ফারুক ওয়াসিফ।
সমকাল: আপনি রাজপথের নেতৃত্ব থেকে এখন রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে। আগের এবং বর্তমান ভূমিকার সমন্বয়ে কোনো সমস্যা বোধ করছেন কি না?
নাহিদ : এটা আমার জন্য একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা। আমরা মারাত্মক সব ঘটনাক্রমের মধ্যে দিয়ে এসেছি। পরিস্থিতিই এমন ছিল যে, যেহেতু নতুন সরকার হচ্ছে সেহেতু আমাদের এখানে থাকা প্রয়োজন। এটা সরকারের প্রতি আস্থা, বৈধতা, গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করবে।
সমকাল: কিন্তু পুরোনো প্রশাসনে নতুন ডিরেকশন কাজ করবে?
নাহিদ: কিছুটা তো অসুবিধা আছেই। পুরো কাঠামোটাই আগের। আমরা তো রাজনৈতিক দল নই। রাজনৈতিক দল হলে তার সেটআপ আগে থেকেই তৈরি থাকে। আমরা যে ধরনের নিরপেক্ষ দেশপ্রেমিক মানুষ চাইছি, সে ধরনের মানুষ খুঁজে বের করা এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করতেও সময় লাগছে। আবার যারা রাজপথে আছেন তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ আছে। প্রথম থেকেই আমাদের কথা ছিল রাজপথেও আমাদের শক্তি থাকবে, আবার সরকারের ভেতরেও থাকবে।
সমকাল: আপনারা কী ধরনের পদক্ষেপ নেবেন, সংস্কার করবেন, তা মানুষ জানতে চায়। যেমন আর কখনোই যাতে ইন্টারনেট বন্ধ করা সম্ভব না হয়, তার জন্য আপনারা কী ব্যবস্থা নিচ্ছেন?
নাহিদ: যেমন এনটিএমসি সংস্থা বা নজরদারি বন্ধের কথা আসছে। সামগ্রিকভাবে আমরা কাঠামোগত সংস্কার নিয়ে কাজ করছি যাতে দীর্ঘমেয়াদি সুফল আসে। যেমন তথ্য মন্ত্রণালয় ও ডিজিটাল সিকিউরিটি বিষয়ক আইনগুলো নিয়ে আমরা কাজ করবো।
সমকাল: সিএসএ/ডিএসএ আইন দিয়ে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল। বিজ্ঞাপন বন্ধ, বিভিন্ন সংস্থা থেকে ফোন করে ভয় দেখানোও ছিল। আবার গণমাধ্যমের মধ্যেও সেলফ সেন্সরশিপ ছিল যা স্বৈরাচারকে সাহায্য করেছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি দুটোই তো নিশ্চিত হওয়া দরকার?
নাহিদ: আমরা গণমাধ্যমের জন্য স্বাধীন কমিশনের কথা ভাবছি। যেন সরকারের কাছে দায়বদ্ধ না থেকে কমিশনের মাধ্যমে গণমাধ্যমের সমস্যা সমাধান করা যায়। আমরা গণমাধ্যমের সঙ্গে বসতে চাই, তাদেরও নিশ্চয়ই প্রস্তাবনা আছে। সেগুলো আমলে নিয়ে আমরা পদক্ষেপ নেব।
সমকাল: সরকার গঠনের পরে ১০ দিনের বেশি হয়ে গেল। গণহত্যার বিচার, অন্তর্বর্তী সরকারের রোডম্যাপ, দুর্নীতি বিষয়ে মানুষ শক্ত পদক্ষেপ চায়। অথচ এখনও পর্যন্ত এসব বিষয়ে আপনারা স্পষ্ট পদক্ষেপ নেননি?
নাহিদ: আমরা একটা বিষয়ে সচেতন থাকছি, ক্ষমতাকে ব্যবহার করে জবরদস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা যেন আমরা না নেই। আমরা প্রক্রিয়াগতভাবে স্বচ্ছ ও সঠিক থাকি, যাতে পরে এসব নিয়ে প্রশ্ন না ওঠে। সেজন্য আমরা নিয়মতান্ত্রিকভাবে এগোতে চাইছি। প্রশাসনের সব জায়গায় অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়ে গেছে। কর্মকর্তাদের তালিকা করা হচ্ছে, তাদের অতীত ভূমিকা দেখা হচ্ছে, তাদের সম্পত্তির হিসাব যাচাই করা হচ্ছে। অভিযোগ এলে আমরা প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেব। প্রশাসনের রদবদল বিষয়েও আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমার মন্ত্রণালয়েও কর্মকর্তাদের কার্যক্রম এবং সম্পদের পরিমাণ বিষয়ে তদন্ত করছি। গণহত্যা বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয় থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, জাতিসংঘের একটা দলও আসছে। অভিযুক্তদের মানবাধিকারও যেন লঙ্ঘিত না হয়, সে বিষয়েও আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। দ্রুত সময়ের মধ্যেই উদ্যোগগুলো মানুষের কাছে স্পষ্ট করা হবে। এটা তো এক দিনের বিষয় না। ১৫ বছরের দুর্নীতি-অনিয়ম-বিপর্যয়। পুরো ব্যবস্থাটিই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে আছে। কাজগুলো মুখের হুকুমে দ্রুত করা সম্ভব, পলক সাহেব করেছেন। তিনি মৌখিক নির্দেশেই আন্দোলনের সময়ে ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছেন। আমরা তেমন করতে চাই না। আমরা প্রক্রিয়া অনুসরণ করে চাই।
সমকাল: বাংলাদেশ নিয়ে বিশেষ করে ভারতীয় গণমাধ্যমে মনগড়া খবর প্রচার করা হচ্ছে। দুই দেশের জনগণের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের জন্যও এটা ক্ষতিকর। বাংলাদেশের জন্যও ক্ষতিকর। এ ব্যাপারে আপনারা কী করছেন?
নাহিদ: পররাষ্ট্র দপ্তর বিষয়ক বৈঠকে বিষয়টা আলোচিত হয়েছে। আমি নিজেও একাধিক ভারতীয় গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছি। প্রধান উপদেষ্টা একদিন আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি ভারতীয় সাংবাদিকদের কাছেও খোলা ডাক দিয়েছেন যে, আপনারা সরেজমিনে জেনে যান যে মাইনরিটির পরিস্থিতি কী।
সমকাল: গণমাধ্যমের মালিকানায় দুর্বৃত্তরাও কেউ কেউ বসে আছেন। আবার কালো টাকা সাদা করাসহ নানা অসাধু কাজে গণমাধ্যম ব্যবহৃত হয়েছে। এটা ঠেকানোয় আপনাদের কোনো উদ্যোগ আছে কি না?
নাহিদ: দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তো আলাদা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবেই। আমরা সার্বিকভাবে গণমাধ্যমের স্বচ্ছতা, স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা চাচ্ছি। গণমাধ্যমের কাছেও আহ্বান থাকবেন যে, তাদের জায়গা থেকেও যেন সচেতনতা আসে। গণমাধ্যমেও কিন্তু দলীয়করণ আছে, সাংবাদিক সংগঠনগুলোও দলীয়ভাবে বিভক্ত। গণমাধ্যমের কাছ থেকেও অভিযোগ ও সুপারিশ পেলে আমাদের জন্যও কাজ করায় সুবিধা হবে।
সমকাল: আপনারা এখনই রাজনৈতিক দল গঠনের চিন্তা করছেন না। তাহলে আন্দোলন ও জমায়েত ধরে রাখায় আপনাদের পরিকল্পনা কী?
নাহিদ: তার জন্য বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে সাংগঠনিক রূপ দেওয়ার কথা আমরা ভাবছি। জাতীয়ভাবে একটি নাগরিক সংগঠনের কথা ভাবছি। যারা আন্দোলনে আমাদের সঙ্গে ছিলেন এবং যারা অভ্যুত্থানের মূল স্পিরিট ধারণ করেন, তাদের নিয়ে এই প্ল্যাটফরম হবে। এসবের মাধ্যমে আমরা মাঠের জমায়েতকে ধরে রাখতে চাইবো।
সমকাল: বিগত সরকার এমন অনেক চুক্তি করেছে, যা সংসদে আলোচিত হয়নি, কখনো প্রকাশ্যে আসেনি। জাতীয় স্বার্থবিরোধী এই চুক্তিগুলো জনগণের সামনে প্রকাশের দাবি উঠেছে?
নাহিদ: বিগত সরকারের গোপন ও প্রকাশ্য সব ধরনের চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের চিন্তা আমাদের রয়েছে। যে চুক্তিগুলোতে জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হয়নি, সেসব অবশ্যই পুনর্বিবেচনা করতে হবে। আর তথ্যের যে অধিকার তা মৌলিক অধিকার। আমরা এসব অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। মানুষের জানার অধিকারের প্রতি আমাদের দায় রয়েছে। নিতান্তই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয় ছাড়া আমাদের সব বিষয়ই উন্মুক্ত থাকবে।
সমকাল: আন্দোলনের নেতা ও সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে আপনাদের সামনে প্রধান বাধা কী?
নাহিদ: আমরা ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থার পুরোপুরি বিলোপ করতে পারিনি, সেই কাঠামো এখনও রয়ে গেছে। সেটা বিলোপ করার জন্য আমাদের হয়তো একটা দ্বিতীয় অভ্যুত্থানের প্রয়োজন হবে। বিগত সরকার লুটপাট দুর্নীতির মধ্যে দিয়ে দেশকে ছোবড়া করে দিয়েছে, বিশেষ করে অর্থনীতি ধ্বংস করে দিয়েছে। এগুলো আবার দাঁড় করানো, সিস্টেমকে চালু করা আমাদের কাজ। দেখুন, আগে দেশ চলেছে এক ব্যক্তির জন্য এক ব্যক্তির নির্দেশে, এক ব্যক্তিকে ঘিরে। এমনকি এখনও প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের কাছে মানুষ দাবি-দাওয়া নিয়ে যাচ্ছে। তার মানে সেই একই মনস্তত্ত্ব রয়ে গেছে যে, একজন ব্যক্তিই সব সমাধান দিয়ে দেবে, তার কাছ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলেই হবে। এটা একটা সমস্যা। তো, একটা কাঠামো যদি আমরা তৈরি করতে না পারি, সমস্যাগুলো তো সমাধান করা যাবে না। এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ যে, আগের কাঠামো বিলোপ করে নতুন কাঠামো তৈরি করা। অর্থনীতিতে গতি নিয়ে আসা। নতুন জেনারেশনের মনে নতুন আদর্শ নতুন ভিশন নতুন স্বপ্ন জাগিয়ে দেওয়ার কাজ এখনও বাকি।
সমকাল: বাংলাদেশে পাল্টাপাল্টি দুই জাতীয়তাবাদ রয়েছে। এর বাইরে ডান ও বাম মতাদর্শ রয়েছে। আপনারা কী ধরনের আদর্শের কথা ভাবছেন। কোন রূপরেখা?
নাহিদ: আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে কিছু নীতি ও এথিকস উঠে এসেছে। আমরা ন্যায়বিচার বা জাস্টিসের কথা বলেছি, রেসপন্সিবিলিটির কথা বলেছি, মানবাধিকারের কথা বলেছি। এখন এসবের একটা রূপ দেওয়াটাই কাজ। বাংলাদেশের মানুষের চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, তার কথা বলছি। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, জাতীয়তাবাদের যুগ শেষ হয়ে আসছে। আমাদের জাতীয়তাবাদের নানা ধরনের সমালোচনা ও দুর্বলতা আছে। আমাদের একটা জাতীয় চরিত্র নির্মাণ করতে হবে। সংস্কৃতি বনাম ধর্মের বানোয়াট বিরোধ ভেঙে ফেলতে হবে। সমাজের সব মানুষের সব উপাদান নিয়ে জাতীয় চরিত্র নির্মাণ করতে হবে। এতদিন আমাদের ইতিহাসকে ৫২ থেকে ৭১ এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু এই দেশের আরও বড় যে ইতিহাস রয়েছে, সেসবের নির্মোহ মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। গোটা পৃথিবীই এখন সভ্যতাগত রাজনীতির দিকে আগাচ্ছে। ভারত ও চীনও কিন্তু সভ্যতাগত পরিচয় ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে পৃথিবীর বুকে দাঁড়াচ্ছে। সেই জায়গা থেকে আমাদেরও সভ্যতাগত পরিচয় অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
সমকাল: আপনাদের ঘিরে এক ধরনের জাতীয় ঐক্য আছে। এটা টিকিয়ে রাখতে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামসহ যেসব বাম ও ডানপন্থি গণতান্ত্রিক দল রয়েছে, যারা বিগত সরকারের বিরোধী ছিল, তাদের নিয়ে বড় কোনো জোট গঠনের কথা কী ভাবছেন?
নাহিদ: জাতীয় ঐক্যের বিষয়টাতেই আমরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। রাজনৈতিক দল গঠনের আলাপ এ জন্য এড়িয়ে যাচ্ছি। কারণ এই সময়ে রাজনৈতিক দলের চিন্তা করি বা কার্যক্রম শুরু করি, তাহলে আমরা এক ধরনের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে চলে যাব। একদম অহেতুক প্রতিযোগিতা হবে। যে জাতীয় ঐক্য আমাদের মাঝে তৈরি হয়েছে, সেটাকে আমরা রক্ষা করতে চাই। সবগুলো দলের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত আলাপ আলোচনা চলছে। বিভিন্ন ধরনের পেশাজীবী ও নাগরিকদের জায়গাকেই আমরা দলের থেকেও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। কারণ নাগরিক সমাজই আমাদের এই আন্দোলনে বড় ভূমিকা পালন করেছে। ঐক্য ধরে রাখার জন্যই আমরা নাগরিক সংগঠনের কথা ভাবছি।
সমকাল: আপনাদের আন্দোলনে ছাত্রদের পরে কিন্তু সবচেয়ে বেশি এসেছিল শ্রমজীবী মানুষ। এখন তো তাদের পাশে সরকারকে সবসময় পাওয়া যাচ্ছে না। শহীদ এবং আহত, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে থাকার জন্য আপনারা কোনো টাস্কফোর্স গঠন করছেন কি না। কোনো তহবিল বরাদ্দ হবে কি না:
নাহিদ: একটা ফাউন্ডেশন তৈরির কথা হয়েছে। এটা সম্ভবত আজ বা কালকে ঘোষণা করা হবে। নামটা জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন বা এমন কিছু হবে। নামটা এখনই জানাচ্ছি না। ড. ইউনূস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান থাকবেন এবং শহীদ পরিবারের সদস্যরা থাকবেন। এই ফাউন্ডেশন মূলত দেশে এবং বিদেশে চিকিৎসা ও সেবার জন্য তহবিল গঠন করবে এবং শহীদ ও আহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তাসহ দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ চালাবে। তাদের স্মৃতিগুলোকে ধরে রাখার জন্য এই ফাউন্ডেশনটা কাজ করবে।
সমকাল: একেবারে শেষ প্রশ্ন- আপনাদের আন্দোলন বিভিন্ন সময় পার করেছেন ভয়াবহ সব ঘটনা। তো এর ভেতরে কয়েকটা বা দুই-তিনটা মুহূর্তের কথা বলেন, যা আপনি কোনোদিন ভুলবেন না বা যা আপনাকে কাঁপিয়ে দিয়েছে?
নাহিদ: আন্দোলনটা যখন আমরা শুরু করি তখন কিন্তু আমরা তেমন সাড়া পাইনি। কারণ ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনের শেষ পরিণতিটা তত ভালো না। আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজও প্রাথমিকভাবে আমাদের এই আন্দোলনকে তেমন গুরুত্ব দেননি। কেউ কেউ বলেছেন, এটা সরকারেরই এক ধরনের ইস্যু তৈরির চেষ্টা আরকি। কিন্তু আমরা আমাদের জায়গা থেকে দেখেছিলাম যে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের প্রতি খুবই কমিটেড। কোটা সংস্কার আন্দোলন একেবারে তাদের নিজের জীবনের সঙ্গে জড়িত। এই আন্দোলনের আমার কাছে মনে হয় সবচেয়ে বড় একটা অংশ জুড়ে ছিল নারী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীরা কিন্তু ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। তারাই কিন্তু একটা পর্যায়ে এই আন্দোলনকে টেনে নিয়ে গেছে। প্রতিদিনই মেয়েরা আসতো। চেহারা দেখতে দেখতে পরিচিত হয়ে গিয়েছিল। তারা প্রতিদিন আসছে এবং সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বসে থাকছে। আমার কাছে মনে হয় যে শুরুতে একটা ভয় ছিল সবার ভেতরে। আস্তে আস্তে যখন ভয়টা ভাঙা শুরু করছে তখন এটা সবাইকে প্রভাবিত করেছে। আর আবু সাঈদের মৃত্যু অবশ্যই, বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে যে সাহসটা করছে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অভূতপূর্বভাবে যে সাড়া দিয়েছে— এসবই আন্দোলনের মুহূর্ত। এই আন্দোলন স্টুডেন্ট সলিডারিটি এবং একইসঙ্গে পিপলস সলিডারিটি। আন্দোলন কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয়। তারপর যেই হল ভ্যাকান্ট করা হলো, আমরা কিছুটা ব্যাকফুটে, তখন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে গেল। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় যখন ব্যাকফুটে তখন কিন্তু শ্রমিক-পেশাজীবী অন্যান্যরা এগিয়ে এসেছে। যেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের মেয়েদের ওপর হামলা হয়, ওটা একটা বাজে মুহূর্ত আমাদের কাছে। কারণ আমরা আমাদের বোনদের রক্ষা করতে পারিনি। ৩ আগস্ট আমার কাছে খুব স্মরণীয় একটা দিন ছিল। কারণ ১৯ জুলাইয়ের পর থেকে তো আমি আসলে রাজপথে ছিলাম না। আমাকে তুলে নেওয়া হয়েছিল, তারপর হাসপাতালে, তারপর ডিবি অফিসে। তো ৩ আগস্ট আমি প্রথমবারের মতো আবারও রাজপথে এসেছিলাম। খুবই অসুস্থ অবস্থায় এসে এক দফার ঘোষণাটা আমরা দিতে পেরেছিলাম। ওইটা আমার জন্য খুবই স্মরণীয় একটা মুহূর্ত ছিল। আমার ঘোষণার প্রয়োজন ছিল না আসলে। কেউ একজন ঘোষণায় আসার দরকার ছিল। ঘোষণার আগেই মানুষজনের মধ্যে দাবিটা তৈরি হয়েই ছিল। তো আমি এসে জিনিসটাকে জাস্ট একনলেজ (স্বীকার) করেছি। এই মুহূর্তগুলো খুবই স্পেশাল ছিল। স্টুডেন্ট সলিডারিটিটা আমার কাছে খুবই.. যে আমরা কেউ কাউকে চিনি না জানি না কিন্তু একসঙ্গে আন্দোলন করছি। আর ওই যে সহযোগিতা— ঢাকায় আন্দোলনটা ব্যাকফুটে গেলে হয়তো চট্টগ্রাম বা কুমিল্লায় উঠে দাঁড়াচ্ছে। আবার ঢাকায় শেষের দিকে স্পেস দিচ্ছিল কিন্তু বাইরে প্রচুর শহীদ এবং আহত হয়েছে। ৪ আগস্ট ঢাকার বাইরে প্রচুর হতাহত হয়েছে। অভিভাবকরা বিভিন্ন পেশাজীবীরা যেভাবে সহযোগিতা করেছে। এই পুরো সময় আমি একেক সময় একেক রাত একেক জায়গায় ছিলাম। যার বাসায় গিয়েছি সেইই সাপোর্ট দিয়েছে। আমার মনে আছে ৪ আগস্ট আমি আমার এক শিক্ষকের বাসায় ছিলাম আমার কাছে পোশাকও ছিল না। স্যারের শার্ট পরে আমি ৫ আগস্ট চলে আসছি। এ রকম অনেক স্মৃতি আছে হয়তো পরে একসময় বলা যাবে।
সমকাল: আপনি নিজেকে ৫ বছর পর বা ১০ বছর পর কোন ভূমিকায় দেখতে চান?
নাহিদ: আমরা একটা পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে একটা জায়গায় এসেছি। এখানে আমার ব্যক্তিসত্তার জায়গাটা খুবই কম। আমি কোনো ব্যক্তিগত জায়গা থেকে এখানে আসিনি। আমি জনগণের প্রতিনিধিত্বের জায়গা থেকে প্রশাসনের জায়গায় এসেছি। আমাদের আন্দোলনে অজস্র মানুষ শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন। আমি তাদের প্রতিনিধিত্ব করতেই সরকারে এসেছি। আমার ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া দিয়ে আমার সামনের ভূমিকা নির্ধারিত হবে না। আমরা মানুষের কাছে গিয়েছি, মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করছি, সেইসব মানুষের যে আকাঙ্ক্ষা সেটাই আমার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
সমকাল: ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমেই দেশ জাতীয় নেতা পেয়ে থাকে। আপনাদের আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে আমরা এক গুচ্ছ ছাত্রনেতা পেয়েছি। সেই জায়গা থেকে জাতীয় নেতা হিসেবেও আপনার কাজ থাকতে পারে, মানুষও সেটা চাইতে পারে?
নাহিদ: হয়তো আমাদের ২/৩ জনকে সামনে বেশি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আমরা কাজ করছি একটা সম্মিলিত শক্তি হিসেবে। সামনে যদি দেশ পুনর্গঠনের জন্য আমাদের সরাসরি রাজনীতিতে আসতে হয়, জনগণ চাইলে আমরা সেখানে আসবো। ৫ বছর ১০ বছর যাই হোক, মানুষের চাওয়া অনুযায়ী আমাদের ভবিষ্যৎ ঠিক হবে। আমরা তো জনগণের আকাঙ্ক্ষা ডাকে সাড়া দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি।
সমকাল: আপনাকে অভিনন্দন ও ধন্যবাদ।
নাহিদ: সমকালকেও ধন্যবাদ।
ডিবিতে আটক প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলামের মা
চিন্তা ছিল; আমার ছেলে তো নীতি থেকে একচুলও নড়বে না, ফলে তারা টর্চার করবেই
নেছার উদ্দিন, প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৪, ১০:৪১, গ্রাফিক্স: ইত্তেফাক
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের মধ্যে নাহিদ ইসলাম অন্যতম। সম্প্রতি নাহিদ ইসলাম অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পেয়েছেন। এই আন্দোলনে ছেলের সম্পৃক্ততা, আন্দোলন সফলে একাগ্রতা ও সামনের দিনে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন নাহিদ ইসলামের মা মমতাজ নাহারের সঙ্গে কথা বলেছেন- নেছার উদ্দিন।
ইত্তেফাক: আপনার ছেলে একটি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা। এই বিষয়টি আপনার কেমন লাগে?
মমতাজ নাহার: আমি অনেক আনন্দিত, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। আবার সে যখন আন্দোলন করছিল, তখনো যে কেমন লেগেছে, কত চিন্তা করেছি তার জন্য, তা বলে বোঝাতে পারব না।
ইত্তেফাক: নাহিদ শুরু থেকেই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তা আপনি জানতেন?
মমতাজ নাহার: হ্যাঁ, আমি শুরু থেকেই জানতাম সে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে।
ইত্তেফাক: আন্দোলনের সময় নাহিদে সঙ্গে আপনার নিয়মিত যোগাযোগ হতো?
মমতাজ নাহার: আন্দোলন যখন শুরু করে, তা যখন আরো তীব্র হতে থাকে। তখন এমন হতো যে, তার সঙ্গে আমায় কয়েকটি দিন সাক্ষাৎ নেই, কথা নেই। দুই- তিন দিন দিন পর এক এবার হোয়াটসঅ্যাপে টেক্সট দিতো, ‘ঠিক আছি’, এটুকুই।
ইত্তেফাক: ১৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হামলার পর আপনার ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে?
মমতাজ নাহার: ১৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঝামেলার পর ১৬, ১৭, ১৮ তারিখ তার সঙ্গে সেরকম যোগাযোগ ছিল না। ১৯ তারিখ ছঠাৎ করেই বনশ্রীর বাসায় আসে। গোসল করে খাওয়া-দাওয়া করে দুই ঘণ্টা ঘুমিয়েছে। সে এত ক্লান্ত ছিল, যা বলে বোঝাতে পারব না। ঘুম থেকে আবার উঠে চলে যেত লাগল। পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম ৭০০/৮০০ টাকার মতো আছে তার পকেটে। এরপর তাকে ৫ হাজার টাকা দিয়ে বললাম, তোর কাছে টাকা থাকলে সাহস থাকবে। যেখানেই থাকিস, যে কোনো কিছু কিনে খেতে পারবি। পুরো টাকা নিল না। সে আমায় ১ হাজার টাকা দিয়ে দিলো।
১৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঝামেলার পর ১৬, ১৭, ১৮ তারিখ তার সঙ্গে সেরকম যোগাযোগ ছিল না। ১৯ তারিখ ছঠাৎ করেই বনশ্রীর বাসায় আসে। গোসল করে খাওয়া-দাওয়া করে দুই ঘণ্টা ঘুমিয়েছে। সে এত ক্লান্ত ছিল, যা বলে বোঝাতে পারব না। ঘুম থেকে আবার উঠে চলে যেত লাগল। পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম ৭০০/৮০০ টাকার মতো আছে তার পকেটে। এরপর তাকে ৫ হাজার টাকা দিয়ে বললাম, তোর কাছে টাকা থাকলে সাহস থাকবে। যেখানেই থাকিস, যে কোনো কিছু কিনে খেতে পারবি। পুরো টাকা নিল না। সে আমায় ১ হাজার টাকা দিয়ে দিলো।
ইত্তেফাক: প্রথম বার যেদিন রাতে ডিবি পুলিশ তুলে নেয়, সেদিন কোনো কথা হয়েছে?
মমতাজ নাহার: আমার সঙ্গে কথা বলার এক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তার সঙ্গে বাকিরাসহ যারা ছিল, সবার নাম্বারে ফোন দিয়েছি, কাউকেই ফোনে পাইনি। কোনো পক্ষ থেকেই খবর পাচ্ছিলাম না। ২০ তারিখ দুপুরে বাকেরের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। সেদিনই আবার বাকেরকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ডিবিতে যোগাযোগ করা হলে অস্বীকার করে। আমার চিন্তা ছিল, আমার যে ছেলে সে কিন্তু তার নীতি থেকে একচুলও নড়বে না। ফলে তারা টর্চার করবেই। যেদিন ভোরবেলায় তাকে ফেলে যাওয়া হয়, সেদিন বাসায় দারোয়ানের নাম্বার থেকে আমাকে কল করেছে। এরপর তাকে ধানমন্ডির গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে ভর্তি করি।
আন্দোলনে নাহিদ ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত
ইত্তেফাক: গণস্বাস্থ্য হসপিটাল থেকে দ্বিতীয় বার যখন ডিবি তুলে নেয়, তখন আপনারা ডিবিতে গিয়েছেন। আপনার ছেলের সঙ্গে কোনো কথা হয়েছে সে সময়ে?
মমতাজ নাহার: আসিফের আম্মাসহ আমরা ডিবিতে গিয়েছি তাদের খোঁজে। আমি নাহিদকে বুঝিয়েছি, আসিফের মা আসিফকে বুঝিয়েছে। আমি যখন আমার ছেলেকে বলছিলাম- বাবা, তুমি পদত্যাগ করে চলে আসো, তখন সে আমাকে বলল, তুমি আমাকে নিয়ে ভাবো, কিন্তু এই আন্দোলনে যত হাজার স্টুডেন্ট মারা গেছে, তুমি তাদের কথা একবারও ভাবোনি? দেশ নিয়ে ভাবোনি? সবার আগে দেশ। আমার কাছে সবার আগে দেশ। পরে আসিফের আম্মু বলল, ভাবি কাজ হবে না। এরপর সেখান থেকে আমরা উঠে চলে আসি। ভেতরে ওদের চোখ-মুখের যে অবস্থা, মনে হচ্ছিল আগুন করছে। তারা তাদের জায়গা থেকে এত অটল ছিল যে, তারা কোনোভাবেই সরকারের সঙ্গে আপস করবে না।
তুমি আমাকে নিয়ে ভাবো, কিন্তু এই আন্দোলনে যত হাজার স্টুডেন্ট মারা গেছে, তুমি তাদের কথা একবারও ভাবোনি? দেশ নিয়ে ভাবোনি? সবার আগে দেশ। আমার কাছে সবার আগে দেশ।
ইত্তেফাক: আপনার ছেলে ভবিষ্যতে রাজনীতি করতে চাইলে আপনার সমর্থন থাকবে?
মমতাজ নাহার: ছেলে সামনে রাজনীতি করতে চাইলে আমি বাধা দিতে পারি না। সে যদি ভালো মনে করে, তবে তা-ই করবে। তবে, রাজনীতি আমার পছন্দ হয় না। বাংলাদেশের রাজনীতির কোনো সুন্দর কালচার নেই। আমাদের দেশের রাজনীতিতে এক বিশৃঙ্খল অবস্থা দেখি। কাকে মেরে কে খাবে, এমন পরিস্থিতি। আমি তাকে বলেছি, যাই করবি, সততার সঙ্গে করবি। আমার কাছে রক্ষনীতি মানে জনগণের সেবা। যদি তুমি সততার সঙ্গে জনগণের সেবা করতে পারো, তাহলে করো। তা তোমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমার ছেলের বিষয়ে যদি বলতে হয়। আমি বলব, আমার ছেলে খুব নীতিবান। কাজকর্মে খুব অ্যাক্টিভ। কাজকর্ম সে সততার সঙ্গে করে। সে যে কাজটাই করে, তা পুরো মনোযোগ দিয়ে করে।
ইত্তেফাক/এসজেড
আমরা যারা সম্মুখে ছিলাম সবার জীবন নাশের হুমকি ছিল : আবু বাকের মজুমদার
০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১৪:১৮, আপডেট: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৬:২২
সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার – ছবি : নয়া দিগন্ত
গণবিপ্লব ২৪–এর একজন অন্যতম সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার। তিনি সম্মুখে সারির একজন যোদ্ধা। এটি তার সাক্ষাৎকার। নয়া দিগন্তের সাথে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন নয়া দিগন্তের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার হারুন ইসলাম
কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হলো কিভাবে?
২০১৮ সালে আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারপূর্বক একটি পরিপত্র জারি করা হয়। উচ্চ আদালত কর্তৃক ৫ জুন ওই পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে শুরু হয় কোটা সংস্কার আন্দোলন।
*কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে এক দফার আন্দোলন কিভাবে শুরু হলো?
আসলে কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিল দেশের জনমানুষের আকাক্সক্ষার আন্দোলন। আন্দোলনটি প্রথম থেকেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্লাটফর্মে শুরু হয়। শিক্ষার্থী চাকরিপ্রত্যাশীরা ছাড়াও জনমানুষ ব্যাপক সাড়া দেয়। পরে গত ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় ছাত্রলীগ। হামলায় হাজারের উপরে শিক্ষার্থীরা আহত হয়। প্রতিবাদে সারা দেশে ছাত্রজনতা
রাস্তায় নেমে আসে। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের নির্দেশে পুলিশ অতর্কিত হামলা চালায়। বিশেষ করে ১৭, ১৮, ১৯ তারিখ বহু শিক্ষার্থী, সাধারণ জনতা শহীদ হয়। জনগণ নির্মম হত্যাযজ্ঞ মেনে না নিতে পেরে হত্যার হুকুমদাতাদের বিচার চাই, তারই পরিপ্রেক্ষিতে নয় দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। একপর্যায়ে তারা ফ্যাসিবাদে সরকার পতন চাই। এভাবেই কোটা আন্দোলন থেকে সরকার পতনের এক দফা দাবির আন্দোলনে পতিত হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম স্লোগান ছিল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, আগামীর বাংলাদেশে সেটার বাস্তবায়ন কিভাবে হবে?
আমরা এমন একটা বাংলাদেশ চাই যেখানে ছাত্র-জনতার মতামতের প্রতিধ্বনি ঘটবে। জনগণের জন্য সরকার। জনগণ যা চাই সেটার বাস্তবায়ন করতে সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে ন্যায়বিচারসহ রাষ্ট্রীয় সব সুযোগ-সুবিধা পাবে।
আন্দোলনের ভয়াবহ মুহূর্তগুলোর সমন্বয় কিভাবে হতো?
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আমরা যারা সম্মুখে ছিলাম সবারই জীবননাশের হুমকি ছিল। তবে আমাদের নৈতিক মনোবলের জায়গাটি শক্ত ছিল। যার কাছে ডিবি হেফাজত, আয়নাঘর তুচ্ছ। আপনারা জানেন আমাদেরকে দুইবার গুম করা হয়েছে, আমাকে ও নাহিদ ভাইকে পেটানো হয়েছে, আসিফ মাহমুদ ভাইকে ইনজেকশান পুশ করা হয়েছে। তাতে আমাদের নৈতিক কোনো অবক্ষয় ঘটেনি, আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম যে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন থামাব না। এমনকি কেউ যদি শহীদও বা গুম হয় তবুও বাকিরা আন্দোলন চালিয়ে যাবো।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সচিবালয় আওয়ামীপন্থী যারা রয়েছে তাদের রেখে কী রাষ্ট্র সংস্কার সম্ভব?
ফ্যাসিবাদী সিস্টেম বিলুপের জন্যই আমাদের এই আন্দোলন। পুনরায় যারা ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে চাইবে তাদের ছাত্রজনতা প্রতিহত করবে।
শোনা যাচ্ছে আপনারা নতুন দল গঠন করে যাচ্ছন, সেটা কতদূর এগিয়েছে?
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে জনতার সর্মথনে স্বৈরাচারী সরকারকে পতন ঘটিয়েছে। বর্তমানে যে সরকার রয়েছে সেটা ছাত্র নাগরিকের সরকার। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সেই সরকারের পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছে। তা ছাড়া শুরু থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ জনতার দাবির প্রতিফলন ঘটিয়েছে। এখন ছাত্রজনতা যদি চাই আমরা রাজনৈতিক দল গঠন করতে পারি। তবে আমরা এখন পর্যন্ত এমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।
ইন্ডিয়ার সাথে সীমান্ত থেকে শুরু করে পানি সমস্যাগুলোর সমাধানে কিভাবে ভূমিকা রাখবেন?
আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইন্ডিয়া। সীমান্ত থেকে শুরু করে নদীর পানির হিস্যা নিয়ে বেশ কিছু ঝামেলা রয়েছে। আমরা মনে করি সদ্য সাবেক সরকার ছিল তাদের কূটনৈতিক ব্যর্থতার কারণে এটা হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি বর্তমান যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রয়েছে তাদের যথেষ্ট গার্ডস আছে। তারা অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাবে। আমাদের দাবি পানি বণ্টন চুক্তির আন্তর্জাতিক যে নিয়মবিধি রয়েছে ভারত সেটি মেনে চলবে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়তে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন পাশে থাকবে।
আন্দোলন চলাকালীন গুলির মুখে থাকা একটা অভিজ্ঞতা বলুন?
আপনারা জানেন যে স্বৈরাচারী সরকার কী নির্মমভাবে নিরীহ ছাত্রজনতা, জনগণের ওপর গণহত্যা চালিয়েছে। আমরা সবাই প্রতিদিনই শহীদ হওয়ার ইচ্ছা নিয়ে মাঠে নামতাম। ১৭ কোটি মানুষেরই এই ইচ্ছাশক্তি ছিল।
যার কারণেই আমরা স্বৈরাচারকে হটাতে পেরেছি। গত ৫ আগস্ট সকালে চানখারপুলে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। আমি সামনের সারিতেই ছিলাম। আমার পাশে একটা ছেলের বুলেট বুকে এসে লাগল। সাথে সাথে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। আসলে আমার দেখা সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতি ছিল সেটা।
৩. আবদুল কাদেরের সাক্ষাৎকার: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দলনের নামে অপকর্ম করলে ব্যবস্থা
কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে বারবার ইন্টারনেট বন্ধ থাকার কারণে যখন যোগাযোগ সীমিত হয়ে পড়েছিল, তখন সাংবাদিকদের কাছে খুদে বার্তা পাঠিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচির তথ্য জানিয়ে আলোচনায় আসেন অন্যতম সমন্বয়ক আবদুল কাদের। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আসিফ হাওলাদার। আপডেট: ১১ আগস্ট ২০২৪, ১১: ১৩
প্রথম আলো: আপনাদের দুজন সমন্বয়ক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হলেন। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
আবদুল কাদের: ছাত্র-জনতা আমাদের কাছে রাষ্ট্র সংস্কারে ভূমিকা রাখার প্রত্যাশা করছে। সেই জায়গা থেকে গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে ছাত্র প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সর্বসম্মতভাবেই নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদকে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমাদের সামনের সারির একাধিক সমন্বয়ক সরকার পতনের এক দফার পক্ষে ছিলেন না। আন্দোলনের কারণে পরিচিতি পেলেও ওই সমন্বয়কদের কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নেই। সেই জায়গা থেকে তাঁরা সরকারে থাকতে চাননি।
প্রথম আলো: বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পর্যবেক্ষণ কী?
আবদুল কাদের: ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রের ইতিবাচক পরিবর্তনের সমূহ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এখন সমন্বয়ক টিমের নাম দিয়ে ঘৃণ্য সংস্কৃতি দেখা যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের পর আওয়ামী লীগ যেমন নিজেদের ব্যানারেই সবকিছু করতে চেয়েছিল, সেই সংস্কৃতিটাই এখন দেখা যাচ্ছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে বিভিন্ন জায়গায় কমিটি করে দিয়ে, যে যাঁর মতো টিম করে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে। অর্থাৎ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ব্যানারকে অপব্যবহার করে বিতর্কিত করা হচ্ছে। রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য যে কাজগুলো করা দরকার, তা আমরা আন্দোলনের মাঠের নেতাদের নেতৃত্বে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করব।
সুযোগসন্ধানী ও সুবিধাভোগীরা নামে-বেনামে আমাদের ব্যানার ব্যবহার করে আমাদের বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। আমরা হুঁশিয়ারি দিতে চাই, যারা এই কাজগুলো করছে, তাদের অবশ্যই সম্মুখে আনা হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রথম আলো: আপনাদের উদ্যোগে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের কোনো পরিকল্পনা আছে?
আবদুল কাদের: আমাদের রাজনৈতিক দল গঠনের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে এত বছর পর রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে চিন্তাভাবনার একটা জায়গা তৈরি হয়েছে। সেই জায়গা থেকে আমাদের (দল গঠনের বিষয়ে) চিন্তাভাবনা আছে। কিন্তু মাঠের পরিস্থিতি, জনগণ কী চায়, জনতা বিষয়টাকে কীভাবে নিচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে আপাতত দল গঠনের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেই।
প্রথম আলো: অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আপনাদের প্রত্যাশা কী?
আবদুল কাদের: আমরা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের বৈষম্যহীন বাংলাদেশের কথা বলে এসেছি। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আমাদের প্রথম প্রত্যাশা হচ্ছে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটিয়ে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। আন্দোলনে হতাহতের ঘটনা ঘটানোর পেছনের কারিগর ও মূল ক্রীড়নকদের অতি দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। টার্গেট করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর হামলা-ভাঙচুর করা হচ্ছে। অতি দ্রুত সংখ্যালঘু ভাইবোনদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের লাগাম টানতে হবে।
গত ১৫ বছরে দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভয়ানক দলীয়করণ করা হয়েছে। আমরা চাই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় কার্যকর করতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপের সংস্কৃতিকে বিদায় দিয়ে বিচার বিভাগকে মুক্ত করতে হবে।
প্রথম আলো:
রাজনৈতিক দলগুলো দ্রুত নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি তুলেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এ ক্ষেত্রে কী চাইছে?
আবদুল কাদের: ১৫ বছর ধরে রাষ্ট্রের অবস্থা ভঙ্গুর। আমরা দেখেছি, যে যায় লঙ্কায়, সে-ই হয় রাবণ। আমরা চাইছি, লঙ্কার যে ব্যবস্থা, সেটাকে পরিবর্তন করতে। এই পরিবর্তনের জন্য যে সময় লাগে, সেই সময়টা দিতে হবে। ব্যবস্থাটা ঠিক করতে হবে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমুন্নত করতে হবে। তারপর অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যেন নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।
প্রথম আলো: ছাত্ররাজনীতির বিষয়ে আপনাদের অবস্থান কী?
আবদুল কাদের: এটা একটা আলাপ-আলোচনার বিষয়। ছাত্র-শিক্ষক ও প্রশাসনের ত্রিমুখী আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করতে হবে ছাত্ররাজনীতি থাকবে কি না। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্রসংগঠনগুলো সাধারণত নিজ দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে ও লেজুড়বৃত্তি করে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বিবেচনা করার সুযোগ ও সময় তাদের হয় না। এসব সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে বেশির ভাগই অছাত্র। আমরা লেজুড়বৃত্তিক ও দখলদারত্বের ছাত্ররাজনীতি চাই না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নীতিনির্ধারণে শিক্ষার্থীদের কোনো প্রতিনিধি নেই। ক্যাম্পাসে আমরা ছাত্র সংসদভিত্তিক রাজনীতি চাই।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
আবদুল কাদের: আপনাকেও ধন্যবাদ।
৪. সারজিস আলম ও হাসনাত আব্দুল্লাহ: স্ট্যাটাস দেয়ার পর আইডি উধাও, কি লিখেছিলেন?
সারজিস আলম ও হাসনাত আব্দুল্লাহ, সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৪ | ২০:৪৬ | আপডেট: ০১ আগস্ট ২০২৪ | ২১:১০
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ক অবশেষে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ হেফাজত থেকে ছাড়া পেয়েছেন। নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে মাইক্রোবাসে তাদের বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়।
টানা ৩২ ঘণ্টা ডিবি কার্যালয়ে অনশনে ছিলেন বলে জানিয়েছেন সমন্বয়করা। ছাড়া পাওয়া সমন্বয়কেরা হলেন- নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদার, সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ ও নুসরাত তাবাসসুম। নুসরাতসহ ছয়জনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
ডিবি হেফাজত থেকে ছাড়া পেয়ে দুই সমন্বয়ক সারজিস ও হাসনাত তাদের ফেসবুক আইডিতে স্ট্যাটাস দেন। তবে স্ট্যাটাস দেওয়ার পর তাদের আইডি হ্যাক হয়ে যায়।
সারজিস তার ফেসবুক আইডিতে লিখেছেন, ‘কথা দিয়েছিলেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের থেকে কাউকে গ্রেপ্তার করবেন না, মামলা দিয়ে হয়রানি করবেন না। আপনারা কথা রাখেননি।’ তিনি আরও লিখেন, ‘৬ দিনের ডিবি হেফাজত দিয়ে ছয়জনকে আটকে রাখা যায়। কিন্তু এই বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে কিভাবে আটকে রাখবেন? দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থপাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার করে যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছেন, প্রতিনিয়ত সেগুলো কিভাবে নিবৃত করবেন?’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্দেশে সারজিস তার লেখেন, ‘আপনারা আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর আঘাত করেছেন। সারা দেশে আমার স্কুল কলেজের ভাইবোনদের ওপর লাঠিচার্জ করেছেন। যাকে ইচ্ছা তাকে জেলে পাঠিয়েছেন। আন্দোলনকারীকে খুঁজে না পেলে বাসা থেকে ভাইকে তুলে নিয়েছেন, বাবাকে হুমকি দিয়েছেন। মাশরুর তার উদাহরণ।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘যারা একটিবারের জন্যও এ আন্দোলনে এসেছে, তারা শান্তিতে ঘুমাতে পারে না, গ্রেপ্তারের ভয়ে থাকে। এমন অনেকে আছে, যাদের পরিবার এখনো তাদের খোঁজ পায়নি। এমন তো হওয়া উচিত ছিল না! রিকশা থেকে নামিয়ে প্রিজন ভ্যানে তুলছেন, বাসা থেকে তুলে নিয়ে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছেন। আমার বোনদের রাস্তায় ফেলে পিটিয়েছেন। কি ভাবছেন? এভাবেই সবকিছু শেষ হয়ে যাবে?
কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমন্বয়ক সারজিস আরও লিখেছেন, ‘এ পথ যেহেতু সত্যের পথ, ন্যায়ের পথ, তাই যে কোনো কিছু মোকাবিলা করতে আমরা বিন্দুমাত্র বিচলিত নই। যতদিন না এ বাংলাদেশ আন্দোলনকারীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠছে; গণগ্রেপ্তার, জুলুম, নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে; ততদিন এ লড়াই চলবে।’
আরেক সমন্বয়ক হাসনাত তার ফেসবুক আইডিতে লিখেছেন, ‘এই গণগ্রেপ্তার কেবল নিরপরাধ মানুষের অধিকার হরণ নয়; বরং আমাদের সমগ্র সমাজের উপর চাপিয়ে দেওয়া একটি নিষ্ঠুরতার প্রতিফলন। এটি মুক্তচিন্তা ও মানবাধিকারের প্রতি এক ভয়ানক আঘাত। আমাদের এই আন্দোলন শুধুমাত্র ব্যক্তির মুক্তির জন্য নয়; বরং বৈষম্য, নিপীড়ন, গণগ্রেপ্তার এবং ছাত্র নির্যাতনের বিরুদ্ধে।’
হাসনাত আব্দুল্লাহ আরও লিখেন, ‘এই আন্দোলনে গ্রেপ্তার হওয়া শেষ ব্যক্তিটি মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত আমরা কেউই মুক্ত নই। গণগ্রেপ্তার গণঘৃণার নামান্তর।’
সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহর মুক্তি চাইলেন ঢাবির ইংরেজি বিভাগের শিক্ষকেরা
ঢাবির ইংরেজি বিভাগের ছাত্র হাসনাত আব্দুল্লাহ (বাঁয়ে) ও শিক্ষকদের বিবৃতি। ছবি: সংগৃহীত
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক। প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৪ | ১৬:২৭ | আপডেট: ২৮ জুলাই ২০২৪ | ১৭:৩১
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের প্রাণহানি, গ্রেপ্তার এবং হয়রানির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষকবৃন্দ। তারা বিশেষ করে কোটা আন্দোলনের সমন্বয়ক ও ইংরেজি বিভাগের ছাত্র হাসনাত আব্দুল্লাহসহ সকল শিক্ষার্থীকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
রোববার ইংরেজি বিভাগের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক জেরিন আলম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ সব তথ্য জানানো হয়। এতে শিক্ষার্থীদের ‘ন্যায্য দাবি’ উল্লেখ করে এর প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেছেন তারা।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষকবৃন্দ বৈষম্যপূর্ণ নিয়োগ পদ্ধতিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে প্রাণহানির মত অপূরণীয় ক্ষতি, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে গ্রেপ্তার এবং হয়রানির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানাই।
এতে শিক্ষকবৃন্দ আরও উল্লেখ করেন, আমাদের শিক্ষার্থী কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক মো. আবুল হাসনাতের (হাসনাত আব্দুল্লাহ) গ্রেপ্তারের ঘটনায় আমরা বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। আমরা অবিলম্বে হাসনাত আব্দুল্লাহসহ আটক-গ্রেপ্তার সকল শিক্ষার্থীর মুক্তির দাবি জানাই। আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে সংযত এবং দায়িত্বশীল আচরণ প্রদর্শনের দাবি জানাই।
বিবৃতিতে তারা আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির প্রতি আমরা সমর্থন জ্ঞাপন করি এবং আলোচনার মাধ্যমে সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাধান হবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
৫. মাহফুজ আলম : পর্ব–১
এই গণ–অভ্যুত্থান নিজেই একটা বড় মীমাংসা
মাহফুজ আলম ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থান–পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী। অভ্যুত্থানের পরে ছাত্র, নাগরিক ও অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষার জন্য গঠিত লিয়াজোঁ কমিটির তিনি ছিলেন সমন্বয়ক। আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনশাস্ত্রের এই স্নাতক ছিলেন রাজনৈতিক–বুদ্ধিবৃত্তিক সহযোগীর দায়িত্বে। ‘গুরুবার আড্ডা’ নামে এক পাঠচক্রের তিনি সংগঠক এবং পূর্বপক্ষ, রণপা ও সিনেযোগ পত্রিকার সম্পাদক। ছাত্রদের আন্দোলন এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরে তাদের ভাবনা নিয়ে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ।
আপডেট: ০২ অক্টোবর ২০২৪, ১১: ৩২
প্রথম আলো:
আন্দোলন দিয়েই শুরু করি। ছাত্ররা যে এত বড় একটা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিল, তাদের মোর্চা দানা বাঁধল কী করে?
মাহফুজ আলম: ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে বেশ বড় দুটো আন্দোলন হয়েছিল—নিরাপদ সড়ক আর কোটা সংস্কার নিয়ে। আন্দোলন দুটিতে দেখা গেল, রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ করতে ছাত্র-তরুণদের একটা অংশ রাস্তায় নেমে পড়েছে।
২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপিসহ দেশের জনগণ আগেরবারের মতো আবারও প্রতারিত হলো। এর পরের দুই-তিন বছর নানা সংকটের কারণে ছাত্র-তরুণেরা আর উঠে দাঁড়াতে পারেনি।
প্রধানতম সংকট ছিল রাজনৈতিক অভিমুখের অভাব। ছাত্র-তরুণেরা রাজনীতিতে বড় কয়েকটি দাগে বিভাজিত ছিল। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, আর বামপন্থী রাজনীতির ক্ষীণ ধারার বাইরে তারা কিছু কল্পনা করতে পারছিল না।
আমাদের কাছে এটা স্পষ্ট ছিল যে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ও বিপক্ষ শক্তির যে বয়ান আওয়ামী লীগ তৈরি করেছে, সেটি টিকিয়ে রেখে আওয়ামী লীগকে কখনোই পরাজিত করা যাবে না।
মুক্তিযুদ্ধের পরে আওয়ামী লীগের কারণে জাতীয়ভাবে রিকনসিলিয়েশন (পুনর্মিলন) না হতে পারা একটা বড় ব্যর্থতা। আওয়ামী লীগ সব সময় জনগণের একটা উল্লেখযোগ্য অংশকে শত্রু বানিয়ে রেখেছে। খালি চোখে আমরা হয়তো কেবল জামায়াত–শিবিরকে দেখব, কিন্তু তাদের নামে সব সময় বড় একটা জনগোষ্ঠী নিপীড়িত হয়েছে।
আমাদের মনে কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। কেন কোটা সংস্কার আন্দোলনে এত হাজার হাজার শিক্ষার্থী এসেছে, অগ্রজরা এসেছেন? ডাকসুর নির্বাচনের সময় নারীরা কেন এসেছেন? নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর স্কুলের ছেলেমেয়েদের আর কেন পাওয়া গেল না? কেন তাদের কেউ আর রাজনীতিতে নেই? কেন তারা রাষ্ট্র নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারল না?
আমরা দেখতে পেলাম, ভাবাদর্শ আর সাংস্কৃতিক ফল্টলাইনে (বিভাজক রেখায়) বাংলাদেশকে বিভক্ত করে রাখা হয়েছে। এই বিভাজক রেখা নিয়ে বিভিন্ন ক্রীড়নকেরা ভূমিকা রাখছে। আমাদের তাই চিন্তা ছিল এই বিভাজক রেখাকে কীভাবে মুছে ফেলা যায়, কীভাবে এর মীমাংসা করা যায়। গত ৫০ বছরে এর মীমাংসা হয়নি, কিন্তু আমাদের চেষ্টা ছিল।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বাংলা ব্লকেড কর্মসূচি।ফাইল ছবি
প্রথম আলো:
আপনারা কী চেষ্টা করেছিলেন?
মাহফুজ আলম: আমরা কিছু পাঠচক্র ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করি। জোনাকি গলির কারখানার ব্যানারে ফিল্ম অ্যাকটিভিজিম করি। নাগরিক কমিটির বর্তমান আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সীমান্ত–হত্যা বন্ধের দাবিতে ৫৪ দিন একটানা রাজু ভাস্কর্যে অবস্থান করেছিলেন। সে অবস্থানের সমর্থনে আমরা পুস্তিকা আর পত্রিকা বের করেছি।
আবার আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে আটস্তম্ভ প্রস্তাব করেছিলাম। সেগুলোর ভাবার্থ ছিল নিছক ভারত–বিরোধিতা না করে কীভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
আমরা অনেকে মিলে পড়াশোনা করলাম, লেখালেখি করলাম, নানাজন নানা উদ্যোগ নিল, করোনাকালে অনলাইনে কিছু পাঠচক্র হলো। দেখলাম, এভাবে হচ্ছে না।
২০২১ সালে অক্টোবর মাসে আমরা ‘গুরুবার আড্ডা’ নামে পাঠচক্র শুরু করলাম। প্রথমে নাহিদ ইসলামসহ আমরা ছিলাম চারজন। পরে আবু বাকের মজুমদারসহ আরও তিনজন যুক্ত হলেন।
গুরুবার, মানে বৃহস্পতিবার আমাদের আড্ডাটা বসত। আমরা নানা প্রশ্ন নিয়ে ভাবতাম—রাষ্ট্র, সমাজ, দর্শন, ইতিহাস আর ধর্মতত্ত্ব, যেটা অনেকে বাদ দিয়ে যান। আমরা কামরুদ্দীন আহমেদের লেখা যেমন পড়েছি, তেমনই লেনিনের বা ইসলামি রাষ্ট্রভাবনার বাস্তবতা নিয়েও আলোচনা করেছি। রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, ইকবালকে নিয়ে আলোচনা করেছি।
এভাবে আমরা চিন্তা ও সাংস্কৃতিক রাজনীতির ব্যবধান যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার চেষ্টা করেছি। অনেকটা আড়ালেই এসব অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো। আমরা ছাত্রলীগের চক্ষুশূল হতে চাইনি। ছাত্রদের বিভিন্ন আন্দোলনে আমরা ছিলাম। আবার বড় বড় আন্দোলন হলে তার তাত্ত্বিক ভিত্তি দেওয়ারও চেষ্টা করেছি। পরবর্তী সময়ে ‘গুরুবার আড্ডা’র সূত্রে ছয়চক্র ও রসিক আড্ডাসহ বেশ কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন একই লক্ষ্যে কাজ করেছে।
প্রথম আলো:
আন্দোলন শুরু হলো কীভাবে? আপনারা কী করে তাতে সম্পৃক্ত হলেন?
মাহফুজ আলম: ২০২৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর আমরা পূর্বপক্ষ ম্যাগাজিনের পক্ষ থেকে একটা সেমিনারের আয়োজন করেছিলাম। পূর্বপক্ষ–এর পাটাতন থেকে আমরা বললাম, আমরা দায় ও দরদের সমাজ চাই।
অনেকে হয়তো মনে করছেন, আমরা হুটহাট করে এসব কথা বলছি। সেটা কিন্তু মোটেই নয়। রাষ্ট্রের সভ্যতাগত রূপান্তর ইত্যাদি নিয়ে আমরা গত বছরই লিখেছি। আমরা ততক্ষণে ৬০টির মতো আড্ডা দিয়ে ফেলেছি। সেসব আড্ডার ভিত্তিতে আমাদের মনে হলো, এসব তুলে ধরে আমরা একটা নতুন রাজনীতির প্রস্তাব করতে পারি। আমরা সমাজে হাজির হতে পারি।
এ সময় নুরুল হক নূরের সংগঠনের একধরনের সংকট দেখা দিল। তাঁর সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশটি লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে এসে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হলো। সেটা ছিল অনেকটা ভাবনা আর কর্মতৎপরতার মেলবন্ধন।
ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে ছিল ছাত্র অধিকার পরিষদ, আর বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরে ছিলাম আমরা। এই দুইয়ের সম্মিলনে গঠিত হলো গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি। আমরা ছাত্রশক্তির রাজনীতিতে যুক্ত না হয়ে বরং পূর্বপক্ষ, রণপা, সিনেযোগ পত্রিকা এবং ওই আড্ডাগুলোর মাধ্যমে চিন্তা ও সংস্কৃতির চর্চা করেছি। বুদ্ধিবৃত্তিক-সাংস্কৃতিক কার্যক্রম আর রাজনৈতিক কার্যক্রম আলাদা ছিল। আমরা রাজনৈতিক বয়ান নির্মাণ করতে নেপথ্যে লেখালেখি বা গবেষণা করতাম।
প্রথম আলো:
আন্দোলনের সূচনা হলো কোটা সংস্কার নিয়ে। একপর্যায়ে সেটা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফায় গিয়ে পৌঁছাল। ধাপে ধাপে আন্দোলনটা যে সেখানে গিয়ে পৌঁছাল, তার কি কোনো গোপন লক্ষ্য আগে থেকেই ছিল?
মাহফুজ আলম: আমাদের প্রাথমিক বাসনা ছিল সারা বাংলাদেশে ছাত্রশক্তিকে বিস্তৃত করা। ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে কোটা সংস্কার আন্দোলন হলে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই ছাত্র সংসদ নির্বাচনের সুযোগ তৈরি হবে। কিছু নেতৃত্বও তুলে আনা যাবে। তবে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যে সরকারের পতনের বিষয়টি তো ছিলই।
আমাদের ভাবনা ছিল ছাত্রশক্তি আগে শক্তিশালী হবে, তারপর আমরা রাজনৈতিকভাবে আবির্ভূত হব। সাংস্কৃতিক পরিসর, কলকারখানা, বিদ্যায়তন সবগুলো ক্ষেত্রেই আমরা সম্পৃক্ত হব।
আন্দোলনের ৫ জুন থেকে ১ জুলাই পর্যন্ত সময়টা ছাত্রশক্তির সদস্যরা সমগ্র বাংলাদেশে আন্দোলনের সাংগঠনিক বিস্তার ঘটালেন। ১ জুলাই থেকে ১৪ জুলাই পর্যন্ত আমরা সেই অর্থে কোনো রাজনৈতিক, এমনকি বুদ্ধিবৃত্তিক সমর্থনও পাইনি৷
নানা রাজনৈতিক দল আর বুদ্ধিজীবীর কাছে আমরা গিয়েছি। কেউই উৎসাহী ছিল না। ভেবেছিল, নিশ্চয়ই এর মধ্যে কোনো আঁতাত আছে। কিন্তু অভিনব কর্মসূচির কারণে দিনে দিনে ক্যাম্পাসে আর নগরাঞ্চলে আন্দোলনের শক্তি বেড়ে যাচ্ছিল।
আমরা ভাবছিলাম, একে বড় একটা ছাত্র-নাগরিক আন্দোলনে পরিণত করে তোলা যায় কি না। আমাদের লক্ষ্য ছিল ২০২৬ সাল, কিন্তু সুযোগ তৈরি হলে এখনই কেন নয়!
প্রথম আলো:
কোন সময়ে মনে হলো যে সুযোগটা চলে এসেছে?
মাহফুজ আলম: ৬ জুলাই বাংলা ব্লকেড ঘোষণা করার পরে। বাংলা ব্লকেড কর্মসূচিটা বিশ্লেষণ করলে দেখবেন, এতে অনেক বেশি জনসম্পৃক্ততা ঘটে গেছে। আমরা সবাই মিলে ছাত্রশক্তির একটা ধারণাপত্র লিখেছিলাম। শুরুতে এ অভ্যুত্থানকে আমরা বলেছিলাম ছাত্র-নাগরিক অভ্যুত্থান।
এর মূলে ছিল ছাত্রশক্তির ছাত্র-নাগরিক সংহতির ধারণা। সেই সংহতির পরিকল্পনা অনুযায়ী বাংলা ব্লকেড কর্মসূচি সাজানো হয়েছিল। কর্মসূচিটা বিশ্লেষণ করলে দেখবেন, ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে ছাত্ররা চলে গেল। নাগরিকেরা এসে যোগ দিল। গত ১৬ বছরে কিন্তু এটা সম্ভবপর হয়নি।
সরকারের বলপ্রয়োগের ফলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছাত্রজনতার আন্দোলনে রূপ নেয়।ফাইল ছবি
প্রথম আলো:
সাধারণ মানুষ যে আপনাদের সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করছে, সেটা আপনারা কখন উপলব্ধি করলেন?
মাহফুজ আলম: বাংলা ব্লকেডের পরের সপ্তাহজুড়ে আমরা এটি বুঝতে পারি৷ আমাদের পরিকল্পনা ছিল জনগণকে পক্ষে নিয়ে আসার। গত ১৫ বছরে রাজনৈতিক দলগুলোর জনমুখী সংযোগ আমরা ঘটাতে পারিনি।
বাংলা ব্লকেডের মাধ্যমে ঢাকা শহরের জনসমর্থন আদায় করতে সমর্থ হলাম। এত দিন যারা প্রতিবাদ করতে পারেনি, তারা প্রতিবাদ জানাতে শুরু করল। সরকার তখনো ছাত্রদের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারেনি। আমরা সেই সুযোগটা গ্রহণ করেছি।
আন্দোলনে বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের সংহতি তত দিনে বাড়তে শুরু করেছে। ছাত্রসংগঠনের সদস্যরা তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে এসে সমন্বয়ক ও কর্মী হিসেবে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করলেন। আমরাও চেয়েছি সবাই থাকুক, গণ–আন্দোলন হোক।
আমাদের আশঙ্কা ছিল, এ আন্দোলন ব্যর্থ হলে ছাত্রশক্তিই বা কীভাবে টিকে থাকবে! ফলে আন্দোলনের মধ্য দিয়েই আমরা স্লোগানগুলো বানাচ্ছিলাম। আমাদের পরিকল্পনা ছিল স্লোগানগুলোকে জাতীয় স্তরে গ্রহণযোগ্য করে তোলা। না হলে পরবর্তী সময়ে আমরা রাজনীতি করে টিকে থাকতে পারব না।
প্রথম আলো:
ছাত্র–জনতার আন্দোলনে নানা স্তরের মানুষ যুক্ত হয়েছিল—ছাত্র, শ্রমিক, পাহাড়ি, নারী—বিচিত্র ধরনের। একজন অংশগ্রহণকারী ও নাগরিক হিসেবে সেখান থেকে আপনি কী পাঠ করলেন?
মাহফুজ আলম: এই গণ–অভ্যুত্থানকে আমি অনেক কিছুর মীমাংসা আকারে দেখি। সাংস্কৃতিক প্রশ্নে মীমাংসা, আদর্শিক প্রশ্নে মীমাংসা। বড় একটা স্ফুরণ ঘটিয়ে মীমাংসাগুলো হয়তো নানা দিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গিয়েছে। তবে অভ্যুত্থান নিজেই একটা বড়সড় মীমাংসা বা বন্দোবস্ত ছিল।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলমছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলো:
প্রশ্নটা অন্যভাবে করি। যেকোনো অভ্যুত্থানে দুইটা দিক থাকে—একটা পতন, আরেকটা পত্তন। প্রথমটা অর্জিত হয়েছে। পত্তনের অর্থে এই আন্দোলনে তো নাগরিকদের নানা আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত হয়েছে। যদি জিজ্ঞেস করি, সব মিলিয়ে এই আন্দোলনের অলিখিত ইশতেহারটা কী, আপনি কী বলবেন?
মাহফুজ আলম: আকাঙ্ক্ষা যে সব সময় সোচ্চার ছিল, তা নয়। বহু আকাঙ্ক্ষা সুপ্তও ছিল। নতুন বাংলাদেশে অনেকেই অনেক কিছু দেখতে চায়। তরুণেরা প্রাথমিকভাবে চায় প্রতিনিধিত্ব। শুধু নির্বাচনে নয়, সবখানেই যেন তারা প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। তারা বাক্স্বাধীনতা চায়।
গণতান্ত্রিক শিল্পী-সাহিত্যিকেরা কথা বলতে চায়। দিনমজুর চায় তার প্রতিদিনের প্রাপ্য মজুরি। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীরও নিজস্ব আকাঙ্ক্ষা আছে। শুরুর দিকে না নামলেও পরের দিকে আলেমরা নেমে পড়ল। গোষ্ঠী আকারে গত ১৫ বছরে তারা নিপীড়িত হয়েছে।
আন্দোলনে যখন কমপ্লিট শাটডাউন চলছে, তখন শ্রমিকদের একটা বড় অংশকে আমরা দেখলাম। ১৫ বছর ধরে শ্রেণি আকারে তারা নিপীড়িত হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে চারজন শ্রমিককে মেরে ফেলা হয়। তাজরীন ফ্যাশন বা রানা প্লাজার ঘটনায় তারা বিক্ষুব্ধ ছিল। সবাই একটা চূড়ান্ত বদ্ধ দশা থেকে মুক্তি চাইছিল। নইলে কি কেউ মরার জন্য বুলেটের সামনে বুক পেতে দেয়?
এই আন্দোলনে মেয়েদের সম্পৃক্ততা ছিল বিরাট। এখন অনেকে ভুলে গেলেও এ কথাটা সত্য যে মেয়েরা না থাকলে এই আন্দোলন কোনোভাবেই সফল হতো না। ১০ শতাংশ কোটা থাকা সত্ত্বেও মেয়েরা এসে বলল, আমরা কোটা চাই না। কেন? কারণ তাদের আত্মমর্যাদায় লাগছিল। আত্মমর্যাদা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শেখ হাসিনা দেশের আপামর মানুষের আত্মমর্যাদা ভেঙে ফেলেছিল।
এই লড়াইটা আত্মমর্যাদাবোধেরও ছিল। আন্দোলনকারীরা যে নিজেদের ‘রাজাকার’ হিসেবে স্লোগান দিল, সেটা কিন্তু ‘রাজাকার’ বলে তাদের আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত দেওয়া হয়েছে বলেই। সুতরাং এ আন্দোলনকে আপনি মর্যাদাবোধের পুনরুদ্ধার প্রকল্প আর নানা শ্রেণি–আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিনিধিত্বের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও দেখতে পারেন।
প্রথম আলো:
নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা শোনা যাচ্ছে। অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে নাগরিকেরা কোন ধরনের রাষ্ট্র দেখতে চাইছে?
মাহফুজ আলম: রাষ্ট্রের একটা থাকে ওপরের দিক, আরেকটা অন্তস্তলের দিক। অন্তস্তলই ওপরের দিকটা ঠিক করে দেয়। তাই সেটা ঠিক না করে উপরিতল ঠিক করার অর্থ হলো পুরোনো ময়লার ওপর নতুন চাদর বিছিয়ে দেওয়া। মানুষ এটা চায় বলে মনে করি না। আমিও নই।
মানুষ বড় ধরনের পরিবর্তন চাইছে; কেবল ক্ষমতার পালাবদলের নয়, বরং ক্ষমতা–কাঠামোর পালাবদলের বন্দোবস্ত। তারা চায় আত্মসম্মান আর বৈষম্যহীনতা বা সমতা। সাংস্কৃতিক ও আদর্শগত জায়গায় বিভাজনের রাজনীতির একটা মীমাংসা তারা চায়। এমন এক পরিসর চায় যেখানে সবাই সবার কথা বলতে পারবে, প্রত্যেকের কণ্ঠস্বর শোনা যাবে। কোনো রকমের যদি আর কিন্তু ছাড়াই মৌলিক মানবাধিকার আর নাগরিক অধিকার তারা ভোগ করবে।
এগুলোই নাগরিকদের প্রত্যাশা। ভাবাদর্শিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক—মোটা দাগে আগের সরকারের এই চারটি বন্দোবস্তকে পরিপূর্ণভাবে ফেলে দিয়ে নতুন বন্দোবস্তের দিকে যেতে হবে।
ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানের পর দেশজুড়ে শিক্ষার্থীরা নেমে পড়ে গ্রাফিতি আঁকায়ফাইল ছবি
প্রথম আলো:
আপনারা বলছেন পুরোনো ব্যবস্থা বহাল রেখে নির্বাচনে গেলে অন্য দল এলেও তারা অগণতান্ত্রিক রূপ ধারণ করবে। এ অবস্থায় দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানকে আপনি কী চোখে দেখছেন?
মাহফুজ আলম: বিএনপি ও জামায়াত গত ১৫ বছরে অনেক নিপীড়নের শিকার হয়েছে। তারা এখন ক্ষমতার হিস্যা নিতে চাইবে, এটাই স্বাভাবিক। আবার যারা বাংলাদেশে নতুন রাজনীতির আকাঙ্ক্ষায় গণ–অভ্যুত্থান করেছে, তারাও যে আন্তদলীয় সংস্কার চাইবে, এটাও তো স্বাভাবিক।
প্রশ্ন হলো, আন্দোলনের বিন্যাসটা কী? কেউ কেউ এসে দাবি করছে, এই আন্দোলনে একমাত্র তারাই ছিল। কিন্তু একমাত্র বলে তো কেউই ছিল না। আন্দোলনটা ছিল প্রবহমান নদীর মতো। নানা স্রোত এসে তাতে মিশেছে। এখন যমুনা আর মেঘনার স্রোতোধারার সব আলাদা আলাদা হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু এর মধ্যেও তো একটা ঐক্য আছে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের পুরোনো অভ্যাস ও সংস্কৃতি বজায় রাখতে চাইবে। অথচ আমাদের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তন করতে হবে, দলগুলোতে তরুণদের প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে হবে।
তরুণেরা বাংলাদেশে প্রচলিত ক্লাব রাজনীতি চাইছে না। তাদের চাওয়া দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনীতি। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে কীভাবে রাজনৈতিক পরিসরে একত্রিত করা যায়, তারা সে কথা ভাবছে। আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষী ও সহযোদ্ধারা যদি রাজনৈতিক দল গঠন করে, তাহলে তারাসহ প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে আমরা আহ্বান জানাতে পারি, নিছক ক্ষমতার প্রতিযোগিতা ছেড়ে তারা যেন রাষ্ট্র গঠনের দৃষ্টিভঙ্গিটা নিয়ে আসে।
আগে প্রতিযোগিতা ছিল কে কার আগে ক্ষমতায় বসতে পারে, লুটপাট করতে পারে। এখন প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত দেশকে কে কোন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশকে সামনে রেখেই রাজনীতি গোছানো উচিত।
কেবল রাষ্ট্র সংস্কার করলেই তো হবে না। দলগুলোর ভেতরেও সংস্কার দরকার। রাজনৈতিক নেতৃত্ব কীভাবে নির্বাচিত হবে, তার প্রক্রিয়া সংস্কার করা উচিত। তাদের অর্থনৈতিক সংস্কারেরও প্রয়োজন। দলগুলোর বিশুদ্ধিকরণের জন্য সামাজিক চাপ তৈরি করতে হবে। পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি আর বদভ্যাস জিইয়ে রাখার জন্য তো এত মানুষ জীবন দেয়নি।
মাহফুজ আলম : পর্ব ২
‘মানুষ নতুন একটা রাজনৈতিক পরিসর খুঁজছে’
মাহফুজ আলম ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী। অভ্যুত্থানের পরে ছাত্র, নাগরিক ও অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষার জন্য গঠিত লিয়াজোঁ কমিটির তিনি ছিলেন সমন্বয়ক। আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনশাস্ত্রের এই স্নাতক ছিলেন রাজনৈতিক-বুদ্ধিবৃত্তিক সহযোগীর দায়িত্বে। ছাত্রদের আন্দোলন এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরে তাঁদের ভাবনা নিয়ে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ। দুই পর্বের এই সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্ব প্রকাশিত হয়েছিল গতকাল বুধবার। আজ প্রকাশিত হলো শেষ পর্ব।
আপডেট: ০৩ অক্টোবর ২০২৪, ১২: ১৫
প্রথম আলো:
আমরা এখন ইসলামপন্থী নানা দলের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। আপনি একে কীভাবে দেখছেন?
মাহফুজ আলম: বাংলাদেশে যত ধরনের ইসলামপন্থী চিন্তাধারা আছে, গত ৫০ বছর তাদের সঙ্গে কোনো সংলাপ না হওয়ায় সংক্ষুব্ধতার জন্ম হয়েছে। সংক্ষুব্ধতা মানুষকে প্রতিক্রিয়াশীল করে তোলে। যখন কেউ ভাবে যে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, তখন তার আর কী করার থাকে।
আমাদের শাসকগোষ্ঠীর বড় একটা অংশের পরিচয় ছিল সেক্যুলার (ধর্মনিরপেক্ষ), কিন্তু কখনোই তারা সেক্যুলার কাঠামোয় ছিল না। সমাজে একটা দরিদ্র ছেলে কীভাবে বড় হয়? রাষ্ট্র তো তাকে খাওয়ায় না, খাওয়ায় এতিমখানা।
রাষ্ট্র কখনোই তাদের দিকে দৃষ্টি দেয়নি। তাই তারা নিজেরাই নিজেদের জন্য এই পথ তৈরি করে নিয়েছে। এখন অনেকেই হাহুতাশ করে বলেন যে বাঙালি সংস্কৃতি কেন হলো না? হলো না, কারণ গ্রামে কিংবা মফস্সলে তো আপনি সে সংলাপে যাননি।
আপনি লালন আর হাসনদের সমাজ থেকে তুলে এনে রাষ্ট্রে বসিয়ে দিয়েছেন, অথচ সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার ভেতর দিয়েই কিন্তু লালন বা হাসন রাজারা হয়ে উঠেছেন।
গ্রামের মানুষ তো ঢাকা শহরকেই রাষ্ট্র হিসেবে দেখে। তারা বুঝতে পেরেছে, তাদের কেউ কিছু দেবে না। নিজেদের ব্যবস্থা তারা নিজেরাই করে নিয়েছে। নিজেদের একটা রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করেছে। সেখানে আধুনিক জামাকাপড় পরে কেউ গেলে তারা সন্দেহ আ বিদ্বেষের শিকার হয়। কারণ, গ্রামের মানুষ তাদের নিজেদের মতো সীমানা তৈরি করে নিয়েছে—তুমি ঢাকায় যা খুশি করো, এখানে করতে পারবে না।
একটা কথা কেউ জানে না, শাপলা চত্বরের ঘটনার পর বহু মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীর খাওয়ার সুযোগ চলে গিয়েছিল। আওয়ামী লীগের কারণে সেখানে কাউকে টাকা দিতে দেওয়া হতো না।
গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার পতনের পর শাহবাগে জনতার উল্লাস, ৫ আগস্ট ২০২৪ছবি: আশরাফুল আলম
প্রথম আলো:
মাজার তো গরিব মুসলমানের প্রতিষ্ঠান। এগুলো ভাঙল কারা?
মাহফুজ আলম: আমি বহু মাজার জিয়ারত করেছি। পীর-আউলিয়াদের প্রতি আমার ভালোবাসা আছে। ঐতিহাসিকভাবেও তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলায় ইসলাম প্রচারের ও বাঙালি মুসলমানের ঐতিহাসিক জনগোষ্ঠী হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সুফি সাধকদের ভূমিকা অসামান্য।
পাশাপাশি আবার এ কথাও সত্য, গত ১৫ বছর ইসলামিক ফাউন্ডেশন চালিয়েছে সুফিবাদের অনুসারী লোকেরা। তাদের বড় একটা অংশ আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেছে। ফলে মাজার ভাঙার ঘটনার পেছনে একটা রাজনৈতিক আক্রোশ আছে। এর মধ্যে ধর্মটা কেবল চোখে পড়েছে।
ধরুন, ফ্যাসিবাদের পক্ষে যদি লালনকে ব্যবহার করা হয়, তার জন্য তো লালন দায়ী নন। ফ্যাসিবাদের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রতীক ভেঙে ফেলা হয়েছে, সেটা একটা দিক। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি যেকোনো কিছু ভাঙার বিরুদ্ধে।
প্রথম আলো:
ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রক্ষণশীল থেকে উদার অংশ পর্যন্ত যে ভাগ আছে, তাদের মধ্যে কার শক্তি বেশি? কেউ কেউ তো খেলাফতের কথাও বলছেন?
মাহফুজ আলম: বাংলাদেশে খেলাফতের কথা প্রথম শুরু করেছেন হাফেজ্জী হুজুর। তাঁর দলের নামও ছিল খেলাফত আন্দোলন। তাঁর রাজনীতির একটা মজার পরিভাষা আছে—তওবার রাজনীতি। মানে, পূর্বেকার রাজনৈতিক ভুলগুলো থেকে তওবা করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে গড়ে তুলতে হবে। এই পরিভাষাটা রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বের। তাদের রাজনীতিটাও গণতান্ত্রিক নির্বাচনী রাজনীতিই।
খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবি নিয়ে অনেকেই কথা বলছেন। জামায়াতে ইসলামীও কিন্তু খেলাফতই চায়, কিন্তু কথা হলো কীভাবে? বুঝতে হবে যে বর্তমান যুগে রাষ্ট্র এমন একটা নিপীড়নমূলক প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে, যার সঙ্গে কোনো ধর্মই যায় না।
ছাত্রজনতার অভ্যুত্থান ও ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের মধ্য দিয়ে সমাজে রাজনীতির প্রতি তুমুল আগ্রহ এখন। একটি গ্রাফিতিতে সেটিই প্রকাশ পেয়েছে।
প্রথম আলো:
ধর্ম তো প্রাণবান ও চিন্তাশীল একজন মানুষের নিজের উপলব্ধির বিষয়। অথচ রাষ্ট্র একটা প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠান তো নিজের হয়ে কোনো ধর্ম বরণ করতে পারে না। সে ক্ষেত্রে আমার প্রশ্ন হলো, ইসলামের সঙ্গে মানুষের সংযোগ তাহলে কোন পরিসরে হবে?
মাহফুজ আলম: সমাজ, সংস্কৃতি, আচার আর অভ্যাস হলো ধর্মের পরিসর। ধর্ম থেকে রাষ্ট্রে কেবল একটা বিষয়ই আসতে পারে, সেটা নৈতিকতা। তবে ইসলাম এমন একটা ধর্ম, যার রাজনৈতিক প্রস্তাবনা আছে। তার কেবল হাইপোথিসিসই (প্রস্তাবনা) নেই, প্রোটোটাইপও (আদিরূপ) আছে, যেমন তিরিশ বছরের খেলাফতের ইতিহাস।
তিরিশ বছরের না ধরেও আমি নাহয় কেবল রাসুল (সা.)-এর মদিনার তেরো বছরই ধরলাম। কিন্তু আদিরূপ যেহেতু একটা আছে, তাই এর স্বপ্ন কেয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের তাড়িয়ে বেড়াবে।
কিন্তু রাষ্ট্র যদি ইসলামকে জায়গা করে দিতে চায়, তাহলে তো ইসলামই সীমিত ও নিপীড়নের অনুষঙ্গ হয়ে যাবে। ইসলামি উম্মাহর ধারণা তো বিশ্বজনীন। জাতিরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সেটা খাটে না। বিদ্যমান জাতিরাষ্ট্রের কাঠামোয় ইসলাম বা শরিয়াহ বাস্তবায়ন অসম্ভব। সে কারণে এ প্রশ্নের মীমাংসা করতে গিয়ে আলেমরা বলেছিলেন, শরিয়াহ মুখ্য নয়, প্রয়োজন হলো মাকাসিদ-উশ শরিয়াহ, যার মূল কথা জীবন-মালের হেফাজত করা। এবার তাহলে আপনি মানবাধিকারের আদিকল্পে প্রবেশ করলেন। মীমাংসাটা হতে হবে এখানেই।
যদি পুরোপুরি শরিয়াহর প্রশ্ন আসে, তাহলে শরিয়াহও পাওয়া যাবে না, রাষ্ট্রও না। রাষ্ট্র একটা ত্রিশঙ্কু দশায় পড়বে। এখানকার মুসলমানরা আরও খারাপ অবস্থার মধ্যে পড়ে যাবে। আলেমদের এটা বোঝা উচিত। রাষ্ট্রের ভেতরে ধর্মের মীমাংসা সেরে ফেলা উচিত।
প্রথম আলো:
যে রাষ্ট্রীয় পরিসরের কথা আপনি প্রস্তাব করছেন, সেখানে ধর্মীয় বা জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর সদস্যদের স্থানটা কেমন হবে?
মাহফুজ আলম: সে পরিসরে নাগরিক হিসেবে অবশ্যই সবার সমান হিস্যা থাকতে হবে। রাষ্ট্রীয় পরিসরের দিক থেকে মৌলিক যে নাগরিক অধিকার, তা তো একজন মুসলমানের জন্য যা, একজন আহমদিয়া, হিন্দু, বৌদ্ধ, চাকমা, সংশয়বাদী বা অবিশ্বাসীর জন্যও একই হতে হবে।
রাষ্ট্রের নৈতিকতার প্রশ্নেও বৈষম্যমূলক কোনো ধারা থাকা যাবে না। এটাই আমার পর্যবেক্ষণ। আমাদের ছাত্রশক্তির প্রস্তাবনায় একটা বিষয় ছিল, এখনো আছে। সেটি হলো, প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিজস্ব যেসব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রকাশ রয়েছে, তাতে রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে না।
প্রথম আলো:
আপনার নানা কথায় ইতিহাসের প্রসঙ্গ আসতে দেখছি। ১৯৪৭, ১৯৭১, ২০২৪—ইতিহাসের এই পর্বগুলোকে আপনি কোন দৃষ্টিতে দেখেন?
মাহফুজ আলম: ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায় এক শ বছর নানা লড়াই করেছে, নানা প্রশ্নের মীমাংসা করার চেষ্টা করেছে—ভাষার, সংস্কৃতির, সমাজের। সংগীতকে, নাট্যকলাকে, নৃত্যকলাকে, নারীকে কীভাবে দেখবে, সেসব প্রশ্নেরও।
বেগম রোকেয়ারও আগে মির্জা দেলোয়ার হোসেন নামের এক ব্যক্তি ইসলাম থেকেই যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন, নারীর শৃঙ্খলমুক্তি প্রয়োজন। মুতাজিলা নামে লেখালেখি করতেন বলে তাঁকে নাস্তিক বলে ঘোষণা করা হয়েছিল।
এসব কারণে ১৯৪৭ সালকে আমি দেখি বাঙালি মুসলমানের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় মুক্তির জায়গা থেকে। মার্ক্সীয় ধারণায় অনেকে একে দেখেন একটি দরিদ্র ভূখণ্ডবাসীর অর্থনৈতিক মুক্তির পথ হিসেবে। মুসলিম জাতীয়তাবাদীরা বলেন, ইসলামের জন্যই এটা করা হয়েছে। এর অনেক ব্যাখ্যাই থাকতে পারে।
১৯৪৭ সালকে আমি আরও দেখি বাঙালি মুসলমানের সঙ্গে নিম্নবর্গের হিন্দুদের মৈত্রী হিসেবেও। এই মৈত্রী ধর্মীয় নয়, নাম-পরিচয়ে মুসলমান সম্প্রদায়ের সঙ্গে জুলুম ও নিপীড়নের জায়গা থেকে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মৈত্রী।
দুর্ভাগ্যজনক হলো, মৈত্রীর এই সম্ভাবনা ১৯৫০ সালের দাঙ্গায় এলোমেলো হয়ে গেল। যোগেন মণ্ডল কলকাতায় চলে গেলেন। এটাও আমাদের ইতিহাসের আরেক গুরুত্বপূর্ণ বিভাজকরেখা।
১৯৭১ হয়েছিল বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায়ের দুটি বোঝাপড়া থেকে। ১৯৪৭ সালের আগপর্যন্ত ইসলামের সঙ্গে তার যে বোঝাপড়া ছিল, সেটা বদলে গিয়েছিল। তারা বুঝতে শুরু করল, বাংলার ইসলাম পাকিস্তানের ইসলামের সঙ্গে যায় না, এমনকি উত্তর ভারতের ইসলামের সঙ্গেও নয়। ফলে তারা পাকিস্তানি ইসলামের বিরুদ্ধে দাঁড়াল।
বিষয়টা বোঝার জন্য এ বি এম হাবিবুল্লাহ বা আবদুল করিমের মতো কিছু ইতিহাসবিদকে আমি গুরুত্বপূর্ণ মনে বলে করি। তাঁরা এ বয়ান তৈরি করেছেন যে আমরা যেমন ভারতীয় নই, তেমনি পাকিস্তানিও নই। এখানকার মুসলমান জনগোষ্ঠীর একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে, এখানে ইসলামেরও বিশিষ্ট একটা ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক রূপ আছে। এই জনগোষ্ঠীর এমন একটা ঐতিহাসিক সংগ্রাম আছে, পাকিস্তানিরা যা সমর্থন করছে না।
মহান মুক্তিযুদ্ধে তাদের লড়াইটা যেমন পাকিস্তানিদের কবল থেকে মুক্তির লড়াই, তেমনই ভারতের কাছ থেকেও। দ্বিজাতিতত্ত্বের দোষটা সব সময় পাকিস্তানের ঘাড়ে চাপানো হয়; কিন্তু মাওলানা আবুল কালাম আজাদের বইটির মৃত্যুপরবর্তী সংযোজনীতেই স্পষ্ট বোঝা গেল, ভারত কী চেয়েছিল, নেহরু-প্যাটেলইবা কী করেছিলেন।
তবে মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে মানুষের মুক্তির যে স্বপ্ন ছিল, সেটা নিছক কোনো ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর জন্য ছিল না। আমি কেবল বলতে চাইছি, মুক্তির এই ঐতিহাসিক সংগ্রামে নিপীড়িত বাঙালি মুসলমানরা কেন এত বড় ভূমিকা রাখল, সেটা আমাদের বোঝা দরকার।
প্রথম আলো:
আপনি কোথাও বলেছেন, ১৯৭১ আর ১৯৭২ এক নয়। কথাটা কি একটু ভেঙে বলবেন?
মাহফুজ আলম: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নগুলো ১৯৭২ সালের জগদ্দল পাথরে চাপা পড়েছিল। ১৯৭২ সালে জাতীয় মীমাংসাকে একরৈখিক করে ফেলা হলো।সেক্যুলারিজমের কথিত পরিসরের মধ্যে বৃহত্তর বাঙালি মুসলমান সমাজকে যুক্ত করার কোনো অবকাশই রাখা হলো না। ফলে ইসলামকে সামনে রেখে বিভিন্ন ধরনের রাজনীতি করার বিস্তর সুযোগ তৈরি হলো। রাষ্ট্রে রাখা হলো না কৃষক-শ্রমিকদেরও।
পাকিস্তানের শাসকশ্রেণির মতোই আরেকটা শাসকশ্রেণি চেপে বসল। রাষ্ট্রায়ত্তকরণের নামে প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করা হলো। আওয়ামী লীগের লোকদের হাতে রাষ্ট্রের সম্পদ তুলে দেওয়া হলো। এভাবে ধীরে ধীরে রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে দেওয়া হলো।
পুঁজিবাদের যে উত্থান ও বিস্তার এবং সম্পদের যে বিচলন ও বিতরণ বাংলাদেশে হয়েছে, তা এক বিপুল সংকট তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে বুর্জোয়া সমাজ বিকশিত হলো না কেন? রাষ্ট্র বা জাতিকে নিয়ে ভাববে—এমন একটা জাতীয় বুর্জোয়া সমাজ আমাদের কেন নেই? ১৯৭২ সাল থেকেই সেই আদর্শিক ফাঁদ তৈরি হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলমছবি: খালেদ সরকার
প্রথম আলো:
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের যোগসূত্র কোথায়?
মাহফুজ আলম: ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে ১৯৭১ সালে উন্মেষ ঘটা জাতির বাসনা পুনর্বিবেচনার নতুন সুযোগ তৈরি হলো। আমাদের পূর্বপুরুষের লড়াই এবং লাখ লাখ শহীদের আত্মদানের পেছনে যে বাসনা ছিল, সেটা আমরা আবার বাস্তবায়নের সুযোগ পেলাম। রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে মুজিববাদ ১৯৭১-এর বাসনাকে ভূলুণ্ঠিত করেছিল।
আওয়ামী লীগের চশমাটা সরে যাওয়ায় মুক্তিযুদ্ধকে আমরা এখন খোলাচোখে দেখার সুযোগ পাচ্ছি। শহীদ, বীরাঙ্গনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের উপলব্ধি করার মতো অনেক কাছাকাছি জায়গায় চলে এসেছি। কারণ, আমরা তাঁদের মতো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই গিয়েছি।
প্রথম আলো:
এবার নতুন বর্তমান আর ভবিষ্যতের প্রসঙ্গে আসি। আপনারা সরকারেও আছেন, নাগরিক কমিটিতেও আছেন। আপনারা কি রাজনৈতিক দল গঠন করতে চলেছেন?
মাহফুজ আলম: একজন ব্যক্তি বা একটা গোষ্ঠী চাইলেই কি একটা দল গঠন করে ফেলতে পারে? দল করার প্রশ্নটা তো মানুষের সমর্থনের ওপর নির্ভর করে।
প্রথম আলো:
এ রকম একটা দল হলে এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে যে এটা একটা কিংস পার্টি।
মাহফুজ আলম: কেন উঠবে? সরকারের কাছ থেকে কোনো অর্থ বা সহায়তা পেলে এমন প্রশ্ন উঠতে পারে। তা তো তাঁরা নিচ্ছেন না। হ্যাঁ, আমাদের কেউ কেউ সরকারে আছে। তবে এখানে একটা পার্থক্যও আছে। কিংস পার্টি কথাটা উঠেছিল ২০০৭-০৮ সালে। তখন ছিল সামরিক বাহিনীর সমর্থনপুষ্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তার থেকে এই অন্তর্বর্তী সরকার একেবারে আলাদা। সামরিক বাহিনীর অবস্থানও এবার সে রকম নেই। এই সরকার বানিয়েছে বাংলাদেশের আপামর জনগণের সবাই মিলে। যে সরকার সব দল ও জনগণের, তার কিংস পার্টি বানানোর প্রশ্ন ওঠে কোত্থেকে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আর নাগরিক কমিটি নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী যতটুকু সম্ভব জন-আকাঙ্ক্ষা ধরে রাখার চেষ্টা করছে। আমি তো মনে করি, সবাই-ই তাদের সমর্থন দেবে।
প্রথম আলো:
আপনি নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন, সম্প্রতি একটা জরিপে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে মানুষ ছাত্রদের প্রতি একটা রাজনৈতিক সমর্থন জানিয়েছে?
মাহফুজ আলম: ছাত্রদের প্রতি মানুষের একটা আগ্রহ জন্মেছে সত্যি। কারণ, রাজনীতিতে একটা শূন্যতা দেখা যাচ্ছে। বিএনপি বড় একটা দল, কিন্তু তারপর কারা? জামায়াত? জামায়াত নিজেও জানে, বেশি আসন তারা পাবে না। তার চেয়ে বড় কথা, একক কোনো দলের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার ভয় সবার মধ্যে জেঁকে বসেছে। না জানি বিজয়ী দল আবার আওয়ামী লীগের মতোই হয়ে ওঠে।
এই পরিস্থিতি থেকে মানুষের বেরিয়ে যাওয়ার একটা ব্যগ্রতা তৈরি হয়েছে। তারা নতুন একটা রাজনৈতিক পরিসর খুঁজছে। মানুষ চায়, বিএনপি পরিশুদ্ধ হয়ে আসুক। জামায়াত তার ঐতিহাসিক দায়ভার আর ফ্যাসিবাদী প্রবণতা ফেলে আসুক। আওয়ামী লীগও বিচার ও রিডেম্পশনের (দায়মোচন) পর তার উগ্র ফ্যাসিবাদ বা মুজিববাদ পরিত্যাগ করুক।
কিন্তু তাতেও আসল পরিস্থিতির মীমাংসা হবে না। বাংলাদেশে তরুণের সংখ্যা বিপুল। পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংস্কার না করলে, আদর্শের প্রশ্নে বড় সংস্কার না করলে মানুষ কেন তাদের ভোট দেবে? ‘না’ ভোটের বিকল্প থাকলে সে সংখ্যা বরং বেড়ে যাবে।
প্রথম আলো:
নাগরিক কমিটিতে বিচিত্র মত ও পথের লোক দেখা যাচ্ছে। বাম-ডান-মধ্যপন্থী, মুসলমান-হিন্দু-খ্রিষ্ট্রন, বাঙালি-পাহাড়ি। এই বৈচিত্র্যকে মিলিয়ে দেওয়ার সাধারণ ভিত্তিটা কী?
মাহফুজ আলম: তাদের দিকে খোলাচোখে তাকালে আপনি পুরো বাংলাদেশের একটা প্রতিচ্ছবি দেখতে পাবেন। এরাই বাংলাদেশ। ১৯৪৭, ১৯৭১ ও ২০২৪ সালও এই এখানে এসে মিলেছে।
প্রথম আলো:
সামনের দিকে তাকিয়ে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে আপনি কেমন দেখতে পাচ্ছেন?
মাহফুজ আলম: বাংলাদেশের নাগরিকদের আত্মমর্যাদা পেতে হবে। রাষ্ট্রকেও। আত্মমর্যাদা খুব জরুরি একটা অধিকার। বিভিন্ন রাষ্ট্রে দু-তিন শ বছরের উপনিবেশের পর অনেকের প্রশ্ন ছিল, উপনিবেশ কীভাবে সম্ভব হয়েছিল? অনেকে উত্তর দিয়েছিল, ইউরোপের শক্তি বেশি ছিল বলে। তখন কেউ কেউ বলেছিল, না, উপনিবেশ সম্ভব হয়েছিল নিজেদেরই কারণে। আমরা উপনিবেশিত হওয়ার মতো অবস্থায় ছিলাম। আমি এই মাত্রাটা নিয়েই কথা বলছি।
এই উপনিবেশিত হওয়ার দশা বদলাতে হলে আমাদের দরকার দায় ও দরদের রাজনীতি। দায় ও দরদের ভিত্তিতে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে যদি আত্মমর্যাদা গড়ে তোলা যায়, তাহলে কেউ আর তাকে অধীন করতে পারবে না। ভেবে দেখুন তো, এতগুলো মানুষ যদি মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়, তাহলে আমরা কোন জায়গায় চলে যেতে পারি। প্রথম আলো
যাপিত জীবন
(Livelyhood)
জুলাই–অভ্যুত্থান
কেন সেদিন ফাইয়াজের বদলে আমার মৃত্যু হলো না
মানজুর-আল-মতিন
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৪ | ০২:০৮
১৬ জুলাই ২০২৪। একটা নাম, একটা ভয়াবহ দৃশ্য, একটা মৃত্যুর সামনে আমার গোটা অস্তিত্বই থমকে গেল। এভাবে কেউ আমাকে পাল্টে দিতে পারে– তা আগে ভাবিনি। আমি কিংবা আমার স্ত্রী, আমরা কেউই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় ছিলাম না অনেক দিন ধরেই। একটা টকশো উপস্থাপনার প্রয়োজনে, আর খানিকটা পুরোনো অভ্যাসের কারণে খবরের কাগজ পড়া হয়।
একই প্রয়োজনে টিভি কিংবা অনলাইন সংবাদমাধ্যমও নজর এড়ায় না। সেই আমি দেখলাম গুলির সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো আবু সাঈকে। পড়লাম মৃত্যুর আগে তাঁর লিখে যাওয়া শেষ ফেসবুক স্ট্যাটাস। সেই শেষ বার্তা পড়ে হঠাৎ আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। বহু বছর নিদ্রিত আসহাবে কাহাফের ঘুম ভাঙল যেন। কে এই আবু সাঈদ! কোথায় পেল এমন করে আরেক ড. শামসুজ্জোহা হয়ে ওঠার শক্তি!
এর পর, অনেকটা বাধ্য হয়েই আবার ফেসবুকে আসা। নিউজ ফিডে বারবার ভেসে আসা কাজী নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার চরণের (বল বীর, বল উন্নত মম শির। শির নেহারি আমারি, নত শির ঐ শিখর হিমাদ্রির!) সঙ্গে এই সময়ের বিদ্রোহী বীর সাঈদের শেষ মুহূর্তগুলোর ছবি! সত্যিই সাঈদের গৌরবদীপ্ত মূর্তির সামনে হিমালয় মাথা নত করতে বাধ্য!
সাঈদের ছবির পাশাপাশি ভেসে আসতে থাকল আরও নানা প্রতিবাদের ডাক। অবাক হয়ে দেখলাম আমার বিদ্যাপীঠ– যেখানে কাটিয়েছি জীবনের সেরা ১০টি বছর, পিছিয়ে নেই কারও চেয়ে। পরদিন, ১৭ জুলাই ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের ছাত্ররা রাস্তায় নামবে। তাও আমার বাড়ির একেবারে কাছে। এর পর আর ঘরে বসে, মধ্যবিত্ত বাঙালির চিরন্তন বুলি ‘আমি কারও সাতে-পাঁচে থাকি না’ আওড়াবার সুযোগ থাকল না। ভোর রাত সাড়ে ৩টার দিকে যোগাযোগ করলাম স্কুলজীবনের অন্যতম গুরু এবং বড় ভাই আয়নুল হক রবিনের সঙ্গে। ‘ভাই আসছেন তো?’ ‘আসছি’। ব্যস, এতটুকুই যথেষ্ট। মনে বাজল, ‘বন্ধুর পথে চলিব আবার, বন্ধুরা এস ফিরে’। পরদিন সকালে যখন বাসা থেকে বের হচ্ছি, তখন আমার দু’পাশে দুই অভিন্ন-হৃদয় বন্ধু, জীবনসঙ্গী ডা. সারা আহমেদ সাবন্তী আর ড. স্নেহাদ্রী চক্রবর্ত্তী রিন্টু।
ধানমন্ডি ২৭-এর মোড়ে পৌঁছাতেই দেখা হলো রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল ও কলেজের ছেলেদের সঙ্গে। তারা একা নয়, এসেছে ধানমন্ডি-মোহাম্মদপুরের সব স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার ছেলেমেয়ে। ইংরেজি মাধ্যমের ছেলেমেয়েও কম নয় সেখানে। সবার মুখে শান্তিপূর্ণ অবস্থানের ডাক। বন্ধু রিন্টু মেয়েদের বিপুল উপস্থিতি দেখে আপ্লুত। বহু বছরের পোড় খাওয়া রাজনৈতিক কর্মী সে। বলল, একটা আন্দোলনের সফলতা নির্ভর করে তাতে নারীদের অংশগ্রহণের ওপর। ভুল বলেনি মোটেই!
ফারহান ফাইয়াজ
খানিক বাদে বাঁশ আর রামদা হাতে এই শিশুদের উচিত শিক্ষা দিতে ছুটে এলো আওয়ামী লীগ, যুবলীগ আর ছাত্রলীগের কর্মীরা। নিরস্ত্র, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের কণ্ঠ রোধ করার পুরোনো হাতিয়ার ব্যবহৃত হলো। আগেও ব্যবহার হয়েছে বারবার। কিন্তু এবার যে ভিন্ন ইতিহাস লিখবে জেন, জি!
মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ। তাই বাসায় ফিরে কিছু ছবি আপলোড করে আবার বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়। ততক্ষণে পুরো ধানমন্ডি ২৭ নম্বর ছাত্র-জনতার দখলে। মিরপুর রোডের দিক থেকে ছুটে আসছে টিয়ার গ্যাসের শেল। এক ছাত্রের সঙ্গে এসেছেন তার মা আর বোন। সে মাকে বলছে, ‘অনেক তো থাকলে, এবার বাড়ি যাও!’ মা নিরুত্তর। তিনি তাঁর কাজে ব্যস্ত। ওড়না ছিঁড়ে বানাচ্ছেন কাঁদানে গ্যাস মোকাবিলার ব্রহ্মাস্ত্র! যে লড়াইয়ে সন্তানের পাশে মা-বাবাও এসে দাঁড়ান, সে লড়াইয়ে হার নেই! আজ দ্বার থেকে দ্বারে আশ্রয় ভিক্ষা করে বেড়ানো শেখ হাসিনা যদি ১৭ জুলাই তারিখেও এ কথা উপলব্ধি করতেন, তাহলে হয়তো আজকের বিজয়ে এত প্রাণ হারানোর হাহাকার মিশে থাকত না।
দুপুরের পর টিয়ার গ্যাসের শেলের তীব্রতা বাড়ল। সে ধোঁয়া ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো খুনে দস্যুর দল। দুপুর রোদে তাদের হাতে ঝলমল করছে খুন পিয়াসী মারণাস্ত্র! এর মধ্যে রবিন ভাইও যোগ দিয়েছেন আমাদের সঙ্গে। আমি আমার ক্যামেরায় ছবি তুলে চলেছি। পেছনে ছাত্রছাত্রীরা খবরের কাগজে আগুন দিয়ে, মুখে টুথপেস্ট মেখে টিয়ার গ্যাসের অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টায় ব্যস্ত। আমরা গুলি থেকে বাঁচতে পিছিয়ে এসেছি ধানমন্ডি ২৮-এর গলিতে। আর একটু এগোলেই নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত কবি ভবন। গলায় চ্যানেলের আইডি ছিল, হাতে বেশ বড়সড় ডিএসএলআর ক্যামেরা। সবাই বলছিল, ‘ভাই, আমাদের দিকে গুলি করছে! সরাসরি গুলি করছে! আপনি যাবেন না! ছবি তুলুন!’ আমি পালাতে পারিনি। হয়তো পা বলছিল, পালাও, গুলি আসছে! কিন্তু হাত আর চোখ ক্যামেরা থেকে সরেনি। সে অবস্থাতেই হাঁটু গেড়ে আমার দিকে একজন গুলি করল। পেছনে রবিন ভাইয়ের চিৎকার, ‘তোকে দেখে ফেলেছে! সর! সরে যা!’
সে যাত্রায় গুলি আমার গায়ে লাগেনি। পরে খবর পেলাম, সেই দিনই এই ধানমন্ডি ২৭ নম্বর রাস্তাতে বুকে-মাথায় গুলি নিয়ে শহীদ হয়েছে আমার স্কুলের ছোট ভাই ফারহান ফাইয়াজ! মনে হলো, জীবনে ৪০টি বসন্ত দেখেছি। স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয়-পরিজন, পোষা প্রাণী, সবার ভালোবাসায় প্রতিদিন সিক্ত হয়েছি! ফারহান তো ‘ফোটার আগেই ঝরা মুকুল!’ কেন আমি বেঁচে থাকলাম, কেন ফারহান চলে গেল– সে প্রশ্নের উত্তর পাইনি। শুধু একটা কথা মনে হয়েছে, পুরোনো আমার, ভীরু আমার, কারও সাতে-পাঁচে না থাকা আমার যেন সেদিনই মৃত্যু হয়েছে। ১৭ জুলাই ২০২৪-এর পর আমার বেঁচে থাকা ফারহানের রক্তের বিনিময়ে, সাঈদের রক্তের বিনিময়ে, মুগ্ধের রক্তের বিনিময়ে, কিংবা বাবার কোলে চিরনিদ্রায় ঢলে পড়া ছোট্ট রিয়া গোপের রক্তের বিনিময়ে। আমাদের আজকের বেঁচে থাকা অজস্র শহীদের রক্তের বিনিময়ে!
শেখ হাসিনা পালিয়েছেন। তাঁর দোসররা একে একে ধরা পড়ছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে বাংলাদেশ আবারও ঘুরে দাঁড়াবে। এই খুনের, এই গণহত্যার, এই সীমাহীন নিপীড়নের বিচার এ দেশের মাটিতেই হবে। শুধু ফিরে আসবে না সাঈদ, ফারহান, মুগ্ধ কিংবা রিয়া! আমরা যারা বেঁচে আছি, তাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের শরীরে বহমান রক্ত শুধু আমাদের নয়! আমাদের প্রতিটি রক্তবিন্দুতে ঋণ আছে জুলাই অভ্যুত্থানে শত শত শহীদের।
জানি না ডা. জাফরুল্লাহ ভাইয়ের মতো বলতে পারব কিনা, ‘শেখ মুজিব কি আমাকে বলেছিল, জাফরুল্লাহ যুদ্ধে যাও, তুমি বেঁচে ফিরবা? আমরা তো মরতেই গিয়েছিলাম। এটা আমাদের বোনাস জীবন। এখন আর ভয় কীসের?’ হয়তো আবারও আমাদের মধ্যে ‘আমি কারও সাতে-পাঁচে থাকি না’ ভাবটা ফিরে আসতে চাইবে। তখন যেন আমাদের সাঈদের কথা মনে পড়ে। যেন মনে পড়ে আমাদের নীরবতা, আমাদের সহ্য করে নেওয়া, আমাদের ভীরুতার কারণেই সাঈদদের জীবন দিতে হয়েছে। ভীরুর জীবন নয়, আমরা যেন একেকজন ড. শামসুজ্জোহা, একেকজন আবু সাঈদ, একেকজন ফারহান ফাইয়াজ হয়ে উঠতে পারি। তবেই আমরা মাথা উঁচু করে বলতে পারব, শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না। তবেই রাষ্ট্র মেরামতের যে বিপুল কর্মযজ্ঞ আমাদের তরুণরা কাঁধে তুলে নিয়েছে, তার অংশীদার হওয়ার হক জন্মাবে আমাদের।
মানজুর-আল-মতিন: সাংবাদিক ও আইনজীবী
২. ৩০০টি ছররা গুলি শরীরে নিয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করছেন মজিদ
প্রথম আলো প্রতিনিধি,শেরপুর, বগুড়া, প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৯: ০৫
বাড়িতে ঢুকতেই একটি কক্ষে আবদুল মজিদকে শুয়ে থাকতে দেখা যায়। এ সময় মজিদের বড় ভাই রাকিব শেখ ভাইয়ের মাথায় হাত দিয়ে বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। রোববার দুপুরে বগুড়ার শেরপুরে। ছবি: প্রথম আলো
শরীরে অন্তত ৩০০টি ছররা গুলির চিহ্ন। গুলিগুলো শরীরের ভেতরে চামড়ার নিচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এসব গুলির যন্ত্রণায় ছটফট করে দিনাতিপাত করছেন আবদুল মজিদ (২২)। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। গত ৪ আগস্ট বিকেলে বগুড়ার শেরপুর থানার সামনে পুলিশের গুলিতে তিনি আহত হন। তাঁর শরীর থেকে ১৪টি ছররা গুলি অস্ত্রোপচার করে বের করা হলেও বাকিগুলো রয়ে গেছে।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ছররা গুলিতে আবদুল মজিদের শরীরের বাঁ পাশে অবশ হয়ে গেছে। এখন জরুরি ভিত্তিতে তাঁর উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন।
তবে উন্নত চিকিৎসার জন্য আর্থিক সামর্থ্য মজিদের পরিবারের নেই। মজিদ আগে দিনমজুরি করে চলতেন। শারীরিক অবস্থার কারণে এখন সে কাজও করতে পারছেন না।
শেরপুর পৌর শহরের খেজুরতলা এলাকায় দুই কক্ষের একটি টিনশেড ভাড়া বাড়িতে আবদুল মজিদের পরিবার বসবাস করে। তাঁর মা দীর্ঘদিন ধরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত। বড় ভাই রাকিব শেখ (২৬) দৈনিক মজুরিভিত্তিক লেদমিস্ত্রি। পরিবারটিতে আর আছে রাকিবের স্ত্রী।
রাকিব শেখ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা দিনমজুর পরিবার। নিজস্ব জমি-বাড়ি নেই। দুই ভাই সারা দিন পরিশ্রম করে যে টাকা আয় করেন, সেই টাকা দিয়ে সংসার চালান। ছোট ভাই মজিদ আহত থাকায় তাঁর উপার্জন বন্ধ হয়ে গেছে। মজিদের চিকিৎসার জন্য নিজেদের গচ্ছিত কয়েক হাজার টাকা, সঙ্গে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে অন্তত আরও ৪০ হাজার টাকা ধারদেনা করে এ পর্যন্ত চিকিৎসা করিয়েছেন। সরকারিভাবে সহযোগিতা ছাড়া তাঁর ভাইকে হয়তো বাঁচানো সম্ভব হবে না।
আহত আবদুল মজিদ বলেন, তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিক্ষোভ মিছিলে ছিলেন। ৪ আগস্ট বেলা তিনটায় তাঁদের একটি মিছিল থানার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় থানার ভেতর থেকে শটগানের গুলি ছোড়া হয়। সেই গুলিতে তাঁর সামনে এক যুবক আহত হয়ে সড়কের ওপর পড়ে যান। তিনি সেই যুবককে উদ্ধার করতে গেলে পুলিশ তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এ সময় তাঁর শরীরের পেছনে কোমর থেকে পিঠ পর্যন্ত গুলিবিদ্ধ হয়। তিনি সড়কে পড়ে যান। অন্যরা তাঁকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নেন। এরপর তাঁকে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
শরীরে অন্তত ৩০০টি ছররা গুলির চিহ্ন। গুলিগুলো শরীরের ভেতরে চামড়ার নিচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এসব গুলির যন্ত্রণায় ছটফট করে দিনাতিপাত করছেন আবদুল মজিদ। ছবি: প্রথম আলো
আবদুল মজিদের পরিবারের সদস্যরা বলেন, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪ থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত মজিদের চিকিৎসা চলে। এ সময় চিকিৎসক অস্ত্রোপচার করে তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে সাতটি ছররা গুলি বের করেন। একটু সুস্থ বোধ করায় ৭ আগস্ট তাঁরা মজিদকে বাড়ি নিয়ে আসেন। বাড়িতে আনার পর ওই দিন আবারও যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকেন মজিদ। সেদিনই আবার তাঁকে শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। এরপর ৮ থেকে ২১ আগস্ট পর্যন্ত শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আবদুল মজিদকে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এরপর মজিদকে নেওয়া হয় বগুড়ার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ)। এখানে শুরু হয় তাঁর চিকিৎসা। ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই হাসপাতালে মজিদের শরীরে আবারও অস্ত্রোপচার করে সাতটি গুলি বের করে চিকিৎসক দল। এরপর মজিদকে তাঁরা আবার বাড়িতে নিয়ে এসেছেন।
রাকিব শেখ বলেন, তাঁরা দরিদ্র। গুলিবিদ্ধ ভাইয়ের চিকিৎসা করার মতো সামর্থ্য তাঁদের নেই। তাঁর ভাই এভাবে পড়ে থাকলেও স্থানীয় রাজনৈতিক দলের কেউ তাঁকে দেখতে পর্যন্ত আসেননি। তিনি সরকারের কাছে তাঁর ভাইয়ের উন্নত চিকিৎসার দাবি জানান।
শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সাজিদ হাসান সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, গুলিবিদ্ধ আবদুল মজিদের শরীরের বাঁ পাশে অবশ হয়ে গেছে। জরুরি ভিত্তিতে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারলে ভালো হতো। প্রথম আলোর খবর
৩. ৬১৯ নম্বর রুমে আর ফিরবেন না ইয়ামিন, তাঁর বিছানায় বাংলাদেশের পতাকা ও ফুল
তানভীর রহমান, আপডেট: ২০ আগস্ট ২০২৪, ১২: ৩৯
ইয়ামিনের খাটের পাশের দেয়ালে একটি শোক ব্যানার ও বিছানার ওপরে বাংলাদেশের পতাকা রাখা হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
গত ১৮ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হন মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) শিক্ষার্থী শাইখ আসহাবুল ইয়ামিন। পুলিশের সাঁজোয়া যানের ওপর থেকে তাঁকে ফেলে দেওয়ার দৃশ্য নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হলে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। সেই ইয়ামিনের স্মরণে এবার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিল এমআইএসটি কর্তৃপক্ষ। তাঁর স্মৃতিতে জাতীয় পতাকা ও পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানিয়েছে তারা।
১৮ আগস্ট সকাল ৯টায় ওসমানী হলের ৬১৯ নম্বর কক্ষে (এ বছরের এপ্রিল থেকে এই ঘরেই থাকতেন ইয়ামিন) আসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একটি দল। ইয়ামিনের খাটের পাশের দেয়ালে একটি শোক ব্যানার ও বিছানার ওপরে বাংলাদেশের পতাকা আগে থেকেই রাখা ছিল। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় কমান্ড্যান্টসহ উপস্থিত দলটি ইয়ামিনের স্মৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে। তাঁর ব্যবহার্য জিনিসপত্র দেখে। রুমমেটদের কাছ থেকে ইয়ামিন সম্পর্কে জানে। সবাইকে সান্ত্বনা দেয়।
ইয়ামিনের রুমমেট শাহিনুর রহমান চৌধুরী বলেন, কমান্ড্যান্ট স্যার নিজেও তখন আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন। ইয়ামিনের আত্মত্যাগের স্মরণে সামনের দিনগুলোয় কী কী করা যেতে পারে, তা নিয়ে তিনি আলোচনা করেন। ঘরে একটা শোক বই রেখে যান। সেখানে ইয়ামিনকে নিয়ে লিখেছেন তিনি। আমরা বলেছি, ইয়ামিনের সিটটা যেন এ বছর কাউকে না দেওয়া হয়। এ বছর তো ওর স্নাতক শেষ হওয়ার কথা ছিল। এ বছরটা আমাদের সঙ্গে ও থাকুক। কর্তৃপক্ষ এ প্রস্তাবে রাজি হয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় নিহত হন এমআইএসটির এক প্রাক্তন শিক্ষার্থীও—যন্ত্রকৌশল বিভাগের রাকিব হাসান। নিহত দুজনের স্মরণে ১৮ আগস্ট সকাল সাড়ে নয়টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন
প্লাজায় আরেকটি অনুষ্ঠান হয়। সেখানে তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করা হয়।
৪. অনাগত সন্তানকে আদর করা হলো না সোহেলের, ধার করে লাশবাহী গাড়ির ভাড়া দিয়েছে পরিবার
আনোয়ার পারভেজ.
বগুড়া, প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৪, ০৯: ৩০
নিহত সোহেল রানা। ছবি: সংগৃহীত
স্ত্রী সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। প্রথমবারের মতো বাবা হবেন সোহেল রানা (৩০)। খুশিতে খুবই উচ্ছ্বসিত ছিলেন। ঢাকায় বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন তিনি। স্ত্রীকে নিয়েই ভাড়া বাসায় থাকতেন। তবে বাসায় একা থাকতে হয় দেখে স্ত্রীকে শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে দেন সোহেল। শেষবার যখন স্ত্রীর সঙ্গে সোহেল রানার মুঠোফোনে কথা হয়, তখন তিনি স্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘চিন্তা কোরো না, বাবুটা পৃথিবীতে যেদিন আসবে, তার আগেই সময়মতো আমি পৌঁছে যাব। তোমার আগেই আমার বাবুটাকে আমি কোলে নিয়ে আদর করব।’
সন্তানকে কোলে নিয়ে সেই আদর করার ইচ্ছাটুকু আর পূরণ হয়নি সোহেল রানার। সন্তান পৃথিবীতে আসার অগেই ৫ আগস্ট রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন তিনি। বগুড়া নন্দীগ্রাম উপজেলার ভাটগ্রাম ইউনিয়নের ভুস্কর দিনমজুর ফেরদৌস প্রামাণিকের ছেলে সোহেল। কাহালু ডিগ্রি কলেজ থেকে স্নাতক পাস করে তিনি রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন।
সোহেল রানার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছেলেকে হারিয়ে শোকে পাগলপ্রায় মা মাবিয়া বিবি। শোক কাটছেই না। কান্না করতে করতে তিনি বলেন, ‘ব্যাটার বউডা সাত মাসের পোয়াতি। এক দিন আগে বউ ডাক ব্যাটা ফোনে কচলো, “চিন্তা কইরো না, সময়মতো পৌঁছে যামো। সগলির আগে ছলডাক কোলত লিয়ে আদর করমো।” হামার বুকের ধনডাক ক্যান ওরা গুলি করে মারল? ব্যাটার বউডা সাত মাসের পোয়াতি। বউডার কী হবি, সংসারডা ক্যাংকা করে চলবি? প্যাটের ছলডা তো আর বাপ খুঁজে পাবি না। ছলডাক দেকপি বলে আসপার চাচলো, অ্যাসলো লিজেই লাশ হয়্যা।’
সোহেল রানার বড় ভাই শিহাব উদ্দিন প্রামাণিক প্রথম আলোকে বলেন, সোহেল রানা খুবই পরিশ্রমী ছিলেন। পড়ালেখার প্রতি তাঁর অন্য রকম ঝোঁক ছিল; কিন্তু সংসারে অভাব-অনটনের কারণে পড়ালেখা বন্ধ হয়। সংসারের হাল ধরতে ২০১৩ সালের দিকে ঢাকায় গিয়ে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে কাজ নেন। চাকরির পাশাপাশি পড়ালেখা চালিয়ে স্নাতক পাস করেন। স্নাতকোত্তরেও ভর্তি হন।
সোহেল রানার গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগে তাঁর মুঠোফোনে বেশ কিছু ভিডিও ধারণ করেন। ভাইয়ের মুঠোফোন থেকে সেই ভিডিও ফুটেজ দেখিয়ে শিহাব উদ্দিন প্রামাণিক বলেন, সেদিন রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে গণভবন অভিমুখে ছাত্র-জনতার সঙ্গে মিছিলে যোগ দেন সোহেল রানা। দুপুরের দিকে আন্দোলনকারীরা অবস্থান করছিলেন রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায়। একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে গুলিতে অনেকেই নিহত হন।
ভাইয়ের সঙ্গে শেষ কী কথা হয়েছিল, জানতে চাইলে সিহাব উদ্দিন বলেন, ‘খামারের গরু বিক্রি করে বিদেশ গিয়েছিলাম। কিছুদিন পর দেশে ফিরলেও পুঁজি ছিল না। ছোট ভাইটা নতুন করে খামার করার জন্য পুঁজি দিতে চেয়েছিল। ৩ আগস্ট ছোট ভাইকে ফোন দিই। বলল, “ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানো হয়েছে। সবাই মাঠে নেমেছে। এখন ঘরে বসে থাকার সময় নয়। সরকার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত ঘরে ফিরব না।” বাজার করার জন্য কিছু টাকা চাইলে বিকাশে তড়িঘড়ি করে টাকা পাঠিয়ে আন্দোলনে যায় সোহেল রানা।’
সিহাব উদ্দিন বলেন, ৫ আগস্ট বিকেলে শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবর শোনার পর বেলা তিনটার দিকে সোহেলকে ফোন দিয়েছিলেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে একজন ফোন ধরেন। তিনি বলেন, সোহেল রানা গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। এ খবর শুনে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। ঢাকায় থাকা চাচাতো ভাই মিথুনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। সোহেল রানার লাশ নিয়ে তিনি বাড়িতে আসেন। লাশ পরিবহনের অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার ২৫ হাজার টাকা ধার করে শোধ দিতে হয়েছে।
গুলি লাগার বিষয়ে সিহাব জানান, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। মৃত্যুসনদে ৫ আগস্ট বেলা পৌনে তিনটায় সোহেলের মৃত্যু হয় উল্লেখ করা হয়েছে। সোহেলের বুকে জাতীয় পতাকা ছাড়াও ছোট একটি ব্যাগ ছিল। গুলি ব্যাগ ভেদ করে তাঁর বুকে লেগেছে।
ভাই হত্যার মামলা করতে চান জানিয়ে শিহাব উদ্দিন বলেন, অভাবের সংসার। তিনবেলা ঠিকমতো খাবার জোটে না। ঢাকায় গিয়ে মামলা করার মতো সামর্থ্য নেই। আইনি সহায়তা পেলে গুলির নির্দেশদাতাসহ জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করতে চান। প্রথম আলো
৫. অফিস থেকে ছুটি নিয়ে আন্দোলনে, আর ফেরেননি সেলিম তালুকদার
প্রতিনিধি ঝালকাঠি, আপডেট: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৯: ৩৯
নিহত সেলিম তালুকদারছবি: সংগৃহীত
১৪ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৩১ জুলাই মারা যান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ সেলিম তালুকদার (৩২)। তাঁর স্ত্রী সুমি আক্তার (১৮) দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা। শুক্রবার ঝালকাঠি শহরের কবিরাজবাড়িতে গিয়ে কথা হয় সুমি আক্তারের সঙ্গে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, সেলিম বিজিএমই ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে দুই বছর আগে স্নাতক সম্পন্ন করে নারায়ণগঞ্জে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। ১৮ জুলাই ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে তিনি পুলিশের গুলিতে আহত হন। ১৪ দিন পর ৩১ জুলাই ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালের আইসিইউতে তাঁর মৃত্যু হয়। এর পর থেকেই বাবার বাড়ি থাকছেন সুমি। এক বছর আগে তাঁদের বিয়ে হয়েছে। বর্তমানে তিনি দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সুমি আক্তার বলেন, ‘সেলিম ১৭ জুলাই রাতেই বিজিএমই ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির পুরোনো পরিচয়পত্রটি আলমারি থেকে বের করে রাখে। তাকে জিজ্ঞেস করতেই জানায়, “অফিস থেকে ছুটি নিয়েছি। আগামীকাল আন্দোলনে যাব। এই পরিচয়পত্র তখন কাজে লাগবে।” পরদিন ১৮ জুলাই সকালে মধ্য বাড্ডা লিংকরোডের বাসা থেকে বের হয়ে আন্দোলনে যোগ দেয়। সকাল ১০টার দিকে তাকে ফোন দিলে আমি বুঝতে পারি, সে আন্দোলনে আছে। একটু পর আসবে বলে জানায়। সেলিমের আর বাসায় ফেরা হয়নি। বেলা ১১টার দিকে সেলিমের মুঠোফোন থেকে কল করে এক তরুণ গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা জানান। ছাত্ররা তাকে প্রথমে মুগদা হাসপাতালে নেন। খবর পেয়ে আমরা হাসপাতালে ছুটে যাই।’
সেলিম তালুকদারের স্ত্রী ও শ্বশুর মতিউর রহমান। ছবি: প্রথম আলো
সুমি আক্তার বলেন, ‘এক্স-রে ও সিটিস্ক্যানে সেলিমের মাথায় ১৮টি, বুক ও পিঠে ৫৭টি ছররা গুলি পাওয়া যায়। রোগীর অবস্থা খারাপ দেখে আমরা বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরেও আইসিইউ খালি পাইনি। একই সঙ্গে প্রশাসনিক হয়রানির ভয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগী ভর্তি নিতেও অস্বীকৃতি জানায়। অসহায় অবস্থায় ঘুরে ঘুরে ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করানো হয় সেলিমকে।’
মৃত্যুর পর সনদ নিতে গিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পড়ে সেলিমের পরিবার। সুমি বলেন, ১ আগস্ট হাসপাতাল থেকে মৃত্যুর সনদ নিতে গিয়ে পুলিশ সকাল থেকে বেলা সাড়ে তিনটা পর্যন্ত লাশ আটক রাখে। স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে মর্মে সেলিমের বাবার কাছ থেকে লিখিত নেয়। একপর্যায়ে ময়নাতদন্ত ছাড়াই সেলিমের লাশ নিয়ে আসতে হয়।
সুমি বলেন, ‘আমি দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা। আমাকে সরকারিভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ দিলে অনাগত সন্তানকে নিয়ে ভালোভাবে বেঁচে থাকাতে পারতাম। আমি আমার স্বামী হত্যার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচার চাই।’
সেলিমের শ্বশুর মতিউর রহমান বলেন, ‘আমার মেয়েটা অল্প বয়সে বিধবা হয়ে গেল। গর্ভে সেলিমের অনাগত সন্তান। আমার মেয়ে এইচএসসি পরীক্ষার্থী। এখন ওর যদি কোনো কর্মসংস্থান হয়, তবে অনাগত সন্তানকে নিয়ে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারবে।’
এদিকে একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে সেলিমের মা-বাবা শোকাহত। সেলিমের বাবা সুলতান তালুকদারের সঙ্গে সুমিদের বাসায় বসে মুঠোফোনে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে আমরা এখন দিশেহারা। অনাগত সন্তানের মাঝে ওর স্মৃতি ধরে রাখতে চাই। এখন সরকারের কাছে আমাদের দাবি, আমার ছেলে যেন শহীদের তালিকায় স্থান পায়।’ প্রথম আলো
৬.ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে নিহত
আহনাফের আর পরীক্ষা দিতে আসা হয়নি, শূন্য আসনে ফুল
নাজনীন আখতার,ঢাকা, আপডেট: ১৮ আগস্ট ২০২৪, ২০: ০৬
বিএএফ শাহীন কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী শাফিক উদ্দিন আহমেদ আহনাফের (১৭) শূন্য আসনে ফুল রেখে শিক্ষকদের শ্রদ্ধা। ছবি: শিক্ষকদের সৌজন্যে
রাজধানীর বিএএফ শাহীন কলেজের একাদশ শ্রেণির স্থগিত পরীক্ষা আজ রোববার আবার শুরু হয়েছে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা এসেছে। শুধু একটি আসন ফাঁকা। সেখানে রাখা একটি ফুলের তোড়া।
আসনটি শাফিক উদ্দিন আহমেদ আহনাফের (১৭)। সে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ৪ আগস্ট নিহত হয়েছে। মিরপুর-১০ নম্বরে সে গুলিবিদ্ধ হয়। গুলি তার বুকের ডান দিক দিয়ে ঢুকে অপর পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়।
আহনাফ একাদশ শ্রেণির ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও পরে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সহিংসতায় অন্তত ৬২৬ জন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে ৬৮ জন শিশু ও কিশোর। আহনাফ তাদেরই একজন।
কলেজের পরীক্ষা হলে শূন্য আসনটিতে এক তোড়া ফুল রাখার মধ্য দিয়ে আহনাফের শিক্ষকেরা তাকে স্মরণ করলেন। তোড়াটির পাশে সাদা কাগজে লেখা ছিল আহনাফের নাম।
শিক্ষকেরা জানান, গত ২ জুলাই কলেজে একাদশ শ্রেণির চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হয়। তিনটি পরীক্ষা হওয়ার পর কোটা সংস্কার আন্দোলন ও পরবর্তী সময়ে বিক্ষোভ-সংঘাতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরীক্ষা স্থগিত হয়ে যায়। স্থগিত পরীক্ষা আজ নেওয়া শুরু হয়েছে।
বিএএফ শাহীন কলেজের উপাধ্যক্ষ শাকিলা নার্গিস প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষকদের মনে হয়েছে, আহনাফের স্মরণে কিছু করা দরকার। তার প্রতি ভালোবাসা থেকে শূন্য আসনটিতে কলেজের পক্ষ থেকে ফুল রাখা হয়েছে। তিনি জানান, গত সপ্তাহে কলেজের প্রাত্যহিক সমাবেশে (অ্যাসেম্বলি) আহনাফের কথা স্মরণ করে দোয়া পাঠ করা হয়। কলেজের ফটকেও তার নামে ব্যানার ঝোলানো হয়েছে।
শাকিলা নার্গিস আরও বলেন, নিহত আহনাফসহ এই কলেজের যেসব শিক্ষার্থী আন্দোলনে অংশ নিয়ে আহত হয়েছে, তাদের জন্য ২০ আগস্ট কলেজে স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।
আহনাফের পরিবার রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরের কাছে মধ্য পাইকপাড়া এলাকায় বাস করে। পরিবার সূত্রে জানা যায়, সে স্থানীয় মডেল একাডেমি স্কুলে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিল। এরপর মিরপুর আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে বিএএফ শাহীন কলেজে ভর্তি হয়। আহনাফ নিহত হওয়ার পর মডেল একাডেমি স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের খেলার মাঠটিকে ‘শহীদ আহনাফ খেলার মাঠ’ হিসেবে নামকরণ করেছে।
আহনাফের বাবা নাসির উদ্দিন আহমেদ ও মা সাফাক সিদ্দিকী। তাঁদের দুই ছেলের মধ্যে আহনাফ ছিল বড়। ছোট ছেলে ইফতেখার উদ্দিন আহমেদ ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে।
আহনাফের বাবা নাসির উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তাঁর ছেলের শূন্য আসনে ফুলের তোড়ার ছবিটি অনেকে ‘শেয়ার’ করেছেন। আহনাফের মা সে কথা তাঁকে জানান। এর পর থেকে আহনাফের মা শুধুই কাঁদছেন। বারবারই বলছেন, ‘আজ আমার ছেলেটার পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল।’
শাফিক উদ্দিন আহমেদ আহনাফ। ছবি: সংগৃহীত
আহনাফ নিহত হওয়ার দিনের কথা বলতে গিয়ে নাসির উদ্দিন বলেন, সে সব সময় বলত, বড় হয়ে এমন কিছু করবে, যার জন্য পরিবারের সদস্যরা গর্ব করবেন। সে ছাত্র আন্দোলনের শুরু থেকেই সোচ্চার ছিল। অন্যান্য দিনের মতোই ৪ আগস্ট মিরপুর-১০ নম্বরে বিক্ষোভে চলে যায় সে। ছেলের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর তাঁরা জানতেন না। সন্ধ্যার সময় খবর পেয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে আহনাফের মরদেহ পান।
আহনাফ যেদিন নিহত হয়, সেদিন (৪ আগস্ট) বিক্ষোভ ঠেকাতে আওয়ামী লীগ তার রাজনৈতিক শক্তিকে মাঠে নামিয়েছিল। মিরপুর-১০ নম্বরে নেমেছিলেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। তাঁদের কারও কারও হাতে ছিল আগ্নেয়াস্ত্র। যদিও ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের মুখে তাঁরা কয়েক ঘণ্টা পর মাঠছাড়া হন।
৪ আগস্ট সারা দেশে অন্তত ১১১ জন নিহত হন। সেদিন মিরপুরে কয়েকজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। তাঁদের একজন আহনাফ।
প্রথম আলো ১ আগস্ট পর্যন্ত নিহত ২১২ জনের মধ্যে ১৭৫ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করেছিল। তাতে দেখা গিয়েছিল, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ৪৬ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। আজ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পুরোদমে পাঠদান ও পরীক্ষা শুরু হলে আহনাফরা আর ফেরেনি।
আহনাফের শূন্য আসনের একটি ছবি প্রথম আলোকে দিয়েছেন বিএএফ শাহীন কলেজের ফিন্যান্স বিভাগের প্রভাষক বোরহান উদ্দিন। ছবিতে দেখা যায়, পরীক্ষাকেন্দ্রের চতুর্থ সারিতে বাঁ পাশে আহনাফের আসনে বেঞ্চের ওপর ফুলের তোড়াটি রাখা।
আহনাফ ও তার মা সাফাক সিদ্দিকীর জন্মতারিখ একই দিনে, ১৩ অক্টোবর। আহনাফের বাবা নাসির উদ্দিন বলছিলেন, ‘আসছে অক্টোবরে ১৮ বছরে পড়বে বলে আহনাফের অনেক উচ্ছ্বাস ছিল। খালি বলত, “এবার আমি জাতীয় পরিচয়পত্র পাব।”’
কথাটি বলতে গিয়ে কাঁদতে শুরু করেন নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘কথা ছিল ছেলের জাতীয় পরিচয়পত্র নিতে যাব। আর আমি নিয়ে এলাম ছেলের মৃত্যুসনদ!’
৭. ‘একটা কথা বলবি না, কথা বললেই মেরে ফেলব’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় কিছু ছবি ঘুরেফিরে এসেছে বারবার। মোবাইলে, দেয়ালে এসব ছবিই হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের ভাষা, প্রতিরোধের প্রতীক, জুগিয়েছে আন্দোলনের ইন্ধন। পড়ুন এমন একটি ছবির পেছনের গল্প।
তানভীর রহমান
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৪, ১৪: ০০
নাহিদুলের এই ছবিটিই ছড়িয়ে পড়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ছবি: সংগৃহীত
শুরু থেকেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ঢাকার নিউ মডেল ডিগ্রি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাহিদুল ইসলাম। বিভিন্ন কর্মসূচিতে সরাসরি অংশ নিয়েছেন। ৩১ জুলাই ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচিতে রাস্তায় নামলে হয়রানির শিকার হন তিনি। নাহিদুল জানালেন, সেদিন শতাধিক মানুষের র্যালি নিয়ে এগোচ্ছিলেন তাঁরা। হাইকোর্টের ঈদগাহ গেটের সামনে এলে পুলিশ তাঁদের পথরোধ করে। কয়েকজনকে আটকও করা হয়। শিক্ষার্থীদের ধীরে ধীরে মৎস্য ভবনের কাছে নিয়ে আসে পুলিশ। তখনো স্লোগান দিচ্ছিলেন নাহিদুল। এ সময় দুজন পুলিশ সদস্য নাহিদুলকে টেনে নিয়ে যেতে থাকেন, গালাগাল করতে থাকেন। একজন পুলিশ নাহিদুলের মুখও চেপে ধরেন। মুখ চেপে ধরা ছবিটিই পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা।
নাহিদুল বলেন, ‘আমি তাঁকে “স্যার” সম্বোধন করে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু তিনি কোনো কথাই শুনছিলেন না। বলছিলেন, “তোমাদের ব্রেইন ওয়াশ হয়ে গেছে। তোমাদের ওপর জামায়াতের প্রেতাত্মা ভর করেছে।” আমি বলেছি, “কোনো প্রমাণ ছাড়া আপনি আমাকে ব্লেইম দিতে পারেন না।” একপর্যায়ে তিনি ভীষণ রেগে যান। বলেন, “একটা কথা বলবি না, কথা বললেই মেরে ফেলব।” তখনই আমার মুখ চেপে ধরেন।’
নাহিদুল অভিযোগ করেন, ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় পেছন থেকে তাঁকে কিল, ঘুষি, লাথি মারা হয়। পরে আইনজীবী মাহবুব উদ্দিনসহ কয়েকজন মানবাধিকারকর্মী শিক্ষার্থীদের আটকের প্রতিবাদ জানালে চাপের মুখে নাহিদুল ও অন্যদের ছেড়ে দেওয়া হয়। ঘণ্টাখানেক পুলিশের হেফাজতে ছিলেন তিনি।
তবে মুক্তি পেলেও রেহাই মেলেনি। পরের ঝড় তাঁর পরিবারকে সহ্য করতে হয়েছে। নাহিদুল বলেন, ‘এলাকার স্থানীয় নেতারা আমার বাবাকে, ভাইদেরকে হুমকি দিতে শুরু করে। বলে, “ছেলেকে ঢাকায় পড়াশোনার নামে মাস্তানি করতে পাঠাইছিস।” তুইতোকারি করে কথা বলতে থাকে। আমার জন্য বাবাকে কখনো গালি শুনতে হয়নি। যেটা ২০২৪-এ এসে আমার পরিবারের সঙ্গে হলো। তাও ন্যায়ের পক্ষে কথা বলার অপরাধে।’
নাহিদুলে ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই এই ছবি দেখে অনুপ্রাণিত হন। নাহিদ বলেন, ‘একজন স্বৈরাচারী শাসককে ক্ষমতাচ্যুত করতে হলে কাউকে না কাউকে সামনে এগিয়ে আসতে হয়। শহীদ আবু সাঈদ ভাইকেই দেখেন। আমিও তাঁর মতো হতে চেয়েছি। স্বৈরাচার তো ক্ষমতার অপব্যবহার করবেই। কিন্তু আমরা ঠিকই প্রতিবাদ করব—এমন ইচ্ছাশক্তি নিয়েই মাঠে নেমেছিলাম।’ প্রথম আলো
৮. একবার মা ডাক শোনার আক্ষেপ আসিফের মায়ের
মো. মুজাহিদুল ইসলাম, সাতক্ষীরা
১৯ আগস্ট ২০২৪, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ
নর্দার্ন ইউনিভার্সিটির ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী সাতক্ষীরা দেবহাটার আসিফ হাসানের কলেজ শেষ করে ১৮ জুলাই গ্রামের বাড়িতে মায়ের কাছে আসার কথা ছিল। এর মধ্যেই ঢাকাতে কোটা সংস্কার আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করলে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন আসিফ। মাকে দেওয়া কথা অনুযায়ী তিনি ১৮ জুলাই বাড়ি ফেরেন ঠিকই, তবে লাশ হয়ে। পরদিন শুক্রবার ভোরে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় তাকে।
‘আমার আব্বাকে কোথায় গেলে পাব। মারা যাওয়ার আগে আমাকে একটিবার মা বলে ডাকতে পারল না। কত কষ্ট পেয়ে আমার বুকের ধন এভাবে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নিল। একটিবার আমাকে মা বলে ডাক আসিফ বাবা। আমার আব্বা ছোট থেকে শান্তশিষ্ট। আব্বাকে নিষেধ করলাম। বললাম, ও আব্বা, আব্বা তুমি যেন এসব কাজে যেও না। আমার আব্বা বৃহস্পতিবার রাতে বাড়ি আসতে চেয়েছিল। কিন্তু কারা যেন তাকে রুম থেকে ডেকে নিয়ে যায় মিছিলে। তাকে বাড়ি আসতে দেয়নি। তবে আব্বা ঠিকই বাড়ি ফিরল ঝাঁঝরা বুক নিয়ে ঘুমন্ত অবস্থায়। এখন আব্বা ওই গাছের ছায়ায় শুয়ে আছে।’
কথাগুলো বলছিলেন কোটা আন্দোলনের সংঘর্ষে পুলিশের গুলিতে নিহত আসিফের শোকে বিহ্বল মা শিরিন বেগম। আসিফ রাজধানীর উত্তরায় কোটা আন্দোলন চলাকালে সংঘর্ষে গুলিতে ১৮ জুলাই নিহত হন। তিনি নর্দান ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের অনার্স ২য় বর্ষের ছাত্র।
আসিফের মৃত্যুর খবরে এলাকাবাসী তার বাড়িতে ভিড় করেন। শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো এলাকায়।
তিন মেয়ের পর আসিফ ও রাকিব নামে যমজ দুই ছেলে শিরিন বেগমের। যমজ ভাই রাকিবকে ফেলে চলে গেলেন আসিফ। রাকিব সাতক্ষীরা সরকারি কলেজে অনার্স পড়ছেন। ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায় মা বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন, আর বিলাপ করে কাঁদছিলেন।
৯. এবার শহীদ হব, নয়তো সরকার পতন করেই ঘরে ফিরব’, বলেছিলেন নিহত সজল
ফয়সাল হোসেন, মুন্সিগঞ্জ, প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৪, ০৮: ৩০
৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সংঘর্ষে মুন্সিগঞ্জ শহরের সুপারমার্কেট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন সজল মোল্লা (খাকি শার্ট)। ছবি: সংগৃহীত
‘খুব সকালে দুই ভাই আন্দোলনে (বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন) গিয়েছিলাম। সেখান থেকে আমাদের ঘরের দূরত্ব দুই মিনিটের পথ। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দুজনেই ঘরে ভাত খেতে এসেছিলাম। সজল ভাই খেতে পারছিল না। কয়েক লোকমা খেয়ে আবারও আন্দোলনে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় সে বলেছিল, “এবার শহীদ হব, নয়তো সরকার পতন করেই ঘরে ফিরব।” শেষ পর্যন্ত দেশ মুক্ত হয়েছে। কিন্তু আমার ভাই দেখে যেতে পারল না।’
কথাগুলো বলছিলেন শিক্ষার্থী–জনতার অভ্যুত্থানে নিহত সজল মোল্লার (৩০) ভাই সাইফুল ইসলাম। তাঁদের বাড়ি মুন্সিগঞ্জ শহরের উত্তর ইসলামপুর এলাকায়। তাঁদের বাবার নাম আলী আকবর মোল্লা; মা কয়েক মাস আগে মারা গেছেন।
সজল মোল্লা ও সাইফুল ইসলাম দিনমজুরের কাজ করতেন। সময়–সুযোগ পেলেই তাঁরা ছাত্র আন্দোলনে যোগ দিতেন। ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সংঘর্ষে মুন্সিগঞ্জ শহরের সুপারমার্কেট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন সজল মোল্লা। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
সোমবার মুন্সিগঞ্জ শহরের উত্তর ইসলামপুর এলাকায় নিহত সজল মোল্লার বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ ছোট্ট একটি টিনের ঘর। এ ঘরেই থাকতেন সজল, তাঁর ভাই সাইফুল ও বাবা আলী আকবর মোল্লা।
সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সেদিন (৪ আগস্ট) আমরা সুপারমার্কেট এলাকায় আন্দোলন করছিলাম। শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করতে চেয়েছিলাম। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা পুলিশের উপস্থিতে অস্ত্র নিয়ে আমাদের ওপর হামলা চালায়। সজল ভাই ছিল সামনে। বেলা সোয়া ১১টার দিকে আমরা দৌড়ে উত্তর ইসলামপুর ঢুকতে থাকি। ওই সময় আমাদের দিকে গুলি করা শুরু করে তারা। সজল ভাই এক মিনিট পরে দৌড়ে আমার কাছে আসে। পেট দেখিয়ে বলতে থাকে, “ভাই, গুলি খেয়েছি।” প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো ছররা গুলি লেগেছে; কিচ্ছু হবে না। মুহূর্তেই দেখলাম রক্ত বেরিয়ে আসছে। তখন বুঝলাম বড় গুলি লেগেছে।’
হাতে নিহত ছেলের ছবি; দৃষ্টি আকাশের দিকে—এভাবেই হত্যার বিচার চাইলেন বাবা আলী আকবর মোল্লা। সোমবার মুন্সিগঞ্জ শহরের উত্তর ইসলামপুর এলাকায়। ছবি: প্রথম আলো
সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, ‘কোনোরকমে একটা গামছা পেঁচিয়ে ভাইকে (সজল) হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করি। সুপারমার্কেট এলাকায় আওয়ামী লীগের লোকজন বাধা দেয়। অনেক কষ্টে শহরের ভেতরের গলি দিয়ে ঢাকার দিকে ছুটছিলাম। টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বেতকা যখন পৌঁছাই, তখন ভাই মারা যায়।’
৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সংঘর্ষে মুন্সিগঞ্জ শহরে তিনজন নিহত হন। ওই দিন সজল মোল্লা ছাড়াও রিয়াজুল ফরাজী (৪৫) ও নুর মোহাম্মদ সরদার (১৯) নামের দুজন দিনমজুর গুলিতে মারা যান।
সজল মোল্লার লাশ বাড়িতে আনার পর বিপাকে পড়েছিলেন পরিবারের সদস্যরা। ওই দিনের (৪ আগস্ট) বর্ণনা দেন নিহত সজলের মামাতো ভাই আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেন, বিকেলে সজলের লাশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই বাড়িতে আনা হয়। সেদিন সন্ধ্যায় পুলিশ ও আওয়া লীগের লোকজন উত্তর ইসলামপুর আসেন; এলাকা ঘিরে রাখেন। আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি দিতে থাকেন তাঁরা। সবাই ভয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যান। বাড়িতে সজলের লাশ। তাঁরা পাঁচ থেকে ছয়জন পুরুষ বাড়িতে ছিলেন। লাশের সামনে থেকে পুলিশ তাঁদের তুলে নিয়ে যেতে চেয়েছিল।
আশরাফুল আক্ষেপ করে বলেন, ‘সজল ভাইয়ের লাশের খাট তোলার জন্য মানুষ ছিল না। ক্লান্ত শরীরে আমরা ছয়জন গোরস্তানে যাই। রাতের মধ্যেই অনেকটা তড়িঘড়ি করে দাফন করি।’
যুবক ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ আলী আকবর মোল্লা। ছেলের স্মৃতিচারণ করে তিনি ছেলে হত্যার বিচার চান। প্রথম আলো
১০. গুলি করে মানুষ মারার গল্পে ভাইরাল কে এই ইকবাল
‘মরে একটা। একটাই যায় স্যার, বাকিডি যায় না’
মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন
বকুল আহমেদ, প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৪ | ০১:২০ | আপডেট: ২১ আগস্ট ২০২৪ | ০৬:০৩
দেয়ালে দেয়ালে শোভা পাচ্ছে গ্রাফিতি– ‘গুলি করি, মরে একটা। একটাই যায় স্যার। বাকিডি যায় না।’ ফেসবুকও সয়লাব এই দেয়ালচিত্রে। এর মাধ্যমে আবারও আলোচনায় গুলি করে মানুষ হত্যার নৃশংসতা!
কোটা সংস্কারের ছাত্র আন্দোলন ঘিরে মানুষ মেরে ফেলার মতো কঠিন কাজ করেও বাক্যগুলো যিনি অবলীলায় বলেছেন, তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ওয়ারী বিভাগের সদ্য সাবেক উপকমিশনার মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন।
ছাত্র আন্দোলনে গুলি চালানোর একটি ভিডিও দেখিয়ে সদ্য সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে ওপরের কথাগুলো বলেছিলেন ইকবাল। সে সময় মন্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে আগ্রহ নিয়ে এটি দেখেন সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব জাহাংগীর আলম ও সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে ইকবালকে বলতে শোনা যায়, ‘গুলি করে করে লাশ নামানো লাগছে স্যার। গুলি করলে মরে একটা, আহত হয় একটা। একটাই যায় স্যার, বাকিডি যায় না। এইটা হলো স্যার সবচেয়ে বড় আতঙ্কের এবং দুশ্চিন্তার বিষয়।’ মোবাইল ফোনে থাকা ভিডিওতে লাশ দেখিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘এই যে ডেডবডিটা নামাইছি স্যার। কোমরে বেল্ট আর নিচে প্যান্ট ছিল।’
মানুষ হত্যার ঘটনার বর্ণনার সময়ও ইকবালের চেহারায় বিন্দুমাত্র অস্বস্তি দেখা যায়নি। অঙ্গভঙ্গিও ছিল যেন জীবজন্তু শিকার করছেন! ইকবালের ব্যাচমেটসহ পুলিশের বিভিন্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছে সমকাল। একাধিক কর্মকর্তা জানান, ২৭তম বিসিএসের পুলিশ কর্মকর্তা ইকবাল সদ্য সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের আশীর্বাদপুষ্ট ছিলেন।
কক্সবাজারের টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ সড়কে তল্লাশি চৌকিতে পুলিশের গুলিতে ২০২০ সালের জুলাইয়ে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। সে সময় ইকবাল কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ছিলেন। এ ঘটনায় জেলার পুলিশ সুপারসহ অন্যদের সঙ্গে তাঁকে বদলি করা হয়।
ইকবাল ১৯৮১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর মনোহরদী থানার খিদিরপুর ইউনিয়নের পীরপুরে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষক বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা শওকত আলী আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেন।
ইকবাল গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্যানতত্ত্বে স্নাতকোত্তর করেন। মৌলভীবাজার জেলায় বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি শুরু করেন ইকবাল। ২০০৮ সালে তিনি ২৭তম বিসিএসে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হন। শুরুতে ডিএমপির কন্ট্রোল রুমে সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে যোগ দেন। পরে হাবিবুর রহমানের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। সিলেট মহানগর পুলিশেও এসি ছিলেন ইকবাল। ২০১৬ সালে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদোন্নতি পেয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বদলি হন। প্রায় দুই বছর পর কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে বদলি হন। পুলিশে দক্ষতা ও সাহসিকতার স্বীকৃতি বিপিএম (সেবা) পদক পেয়েছেন তিনি। ২০০১ সালে পুলিশ সুপার পদোন্নতি পান এবং ডিবির স্পেশাল অ্যান্ড সাইবার ক্রাইম ইউনিটের (দক্ষিণ) উপকমিশনার হিসেবে যোগদান করেন। তবে হাবিবুর রহমান ডিএমপি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর গত বছরের ৯ নভেম্বর ইকবাল ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) হন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ঢাকার যেসব স্থানে বড় জমায়েত হয়, তার মধ্যে অন্যতম ওয়ারী বিভাগের আওতাধীন যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া ও কদমতলী। আন্দোলন দমাতে প্রাণপণ চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে ডিসি ইকবালের বিরুদ্ধে। এসব এলাকায় সহিংসতা ও পুলিশের গুলিতে বহু প্রাণহানি হয়। ইকবালের ব্যাচমেট, নিম্ন পদবি ও ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আন্দোলন দমনে ডিএমপির যেসব কর্মকর্তা ‘অতি বল প্রয়োগ’ করেছেন, তাদের অন্যতম ইকবাল। গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন না হলে তিনি হয়ে উঠতেন আরও ক্ষমতাধর। ৫ আগস্টের ঘটনায় ইকবালকে খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়।
ইকবালের বক্তব্যের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ‘মানুষ মারার গল্প-২০২৪’ শিরোনামে তাঁর ছবি দিয়ে অনেকেই ফেসবুকে দেন। ইকবালকে গত সোমবার রাতে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয় এবং মঙ্গলবার দিনভর আটকের খবর আলোচনায় ছিল। তবে পুলিশের কাছ থেকে তাঁকে হেফাজত কিংবা আটকের বিষয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ইকবালের ব্যক্তিগত ফোনও বন্ধ।
ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ডিবি, দক্ষিণ) আমিনুল ইসলাম সমকালকে জানান, ইকবাল তাদের হেফাজতে নেই। আটকের বিষয়েও কিছু জানেন না।
১১. ছররা গুলিতে দুই চোখের আলো নিভে গেল বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্র মিরাজের
শাহ আলম, চুয়াডাঙ্গা, প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৪, ০৮: ৩০
গুলিতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চোখে দেখতে পাচ্ছেন না চুয়াডাঙ্গার বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্র আল-মিরাজ। মুখে তুলে ভাত খাওয়াচ্ছেন মা বিলকিছ খাতুন। ছবি: প্রথম আলো
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচি চলাকালে ছররা গুলিতে দুই চোখের আলো নিভে গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্র আল-মিরাজের। ঢাকায় টানা দুই সপ্তাহের চিকিৎসা শেষে চক্ষুবিশেষজ্ঞরা এমনটিই জানিয়েছেন বলে মিরাজের পরিবার জানিয়েছে। তবে রেটিনা ও কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে অন্তত একটি চোখে দৃষ্টিশক্তি ফেরার আশার কথাও জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
আল-মিরাজ চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার চণ্ডীপুর গ্রামের কৃষক দম্পতি শুকুর আলী ও বিলকিছ খাতুনের একমাত্র ছেলে। তিনি ঢাকার উত্তরায় অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির এমবিএর শিক্ষার্থী। সহপাঠীদের সঙ্গে বাসাবোতে বাসা ভাড়া নিয়ে তিনি থাকতেন। তাঁর একমাত্র বোন রাবেয়া শোভা কুড়ুলগাছি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
আল-মিরাজের মা বিলকিছ খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, নিজেরা অনেক কষ্ট করে ছেলেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। খরচ জোগাতে গিয়ে অনেক ধারদেনা করতে হয়েছে। তাঁর ছেলে এমবিএ পড়ার পাশাপাশি চাকরির চেষ্টা করছিলেন। তাঁকে নিয়ে পরিবারের সবার অনেক স্বপ্ন ছিল। সেই ছেলে ছররা গুলিতে দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন।
বাবা শুকুর আলী বলেন, ‘আমার ছেলেডা সারা জীবনই যেকোনো অন্যায় দেকেচে, সেকেনেই পতিবাদ কইরেচে। ঢাকায় ছাত্রদের আন্দোলনে গিয়ে গুলিতে চোখ হারিয়েচে। আমরা এদ্দিন নিজিরাই চিকিসসা খরজ করলাম। ঢাকার ডাক্তাররা বলেচে, এ দেশে হবে না। বাইরের দেশে পাঠাব, খরচ নিয়ে চিন্তিত। বুলতি পারচি না কী করব?’
শনিবার দুপুরে চণ্ডীপুর গ্রামে আল-মিরাজদের বাড়িতে গিয়ে নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশীদের ভিড় চোখে পড়ে। ঘরের ভেতরে খাটের ওপর কালো চশমা পরে বসে ছিলেন মিরাজ। ঢাকায় আন্দোলনে অংশ নেওয়া ও তাঁর গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা বলে যাচ্ছিলেন সবাইকে। মা হাতে করে দুপুরের খাবার খাওয়ান। বোন ওষুধ দিলেন। বাবা হাত ধরে ঘর থেকে বাইরে ও শৌচাগারে নিয়ে গেলেন। চোখের আলো হারিয়ে মিরাজ এখন অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
আল-মিরাজ বলেন, তিনি ১৯ জুলাই দুপুর থেকে আরামবাগ ও ফকিরাপুল এলাকায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আন্দোলনে অংশ নেন। সেখানে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুলিশের সঙ্গে তাঁদের দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। ওই দিন সন্ধ্যার দিকে পল্টন এলাকায় বিক্ষোভকালে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ছররা গুলি ছোড়ে। এতে তাঁর দুই চোখ, বুক, পেট ও পিঠে মোট ৩৫টি গুলি লাগে। বাঁ চোখের কোনায় একটি এবং ডান চোখে দুটি গুলি লাগে। গুলিতে আহত হওয়ার পর সঙ্গে থাকা বন্ধুরা ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে নেন। এরপর আরও তিনটি প্রতিষ্ঠানে টানা ১৬ দিন ধরে চিকিৎসা চলে।
আল–মিরাজ আহত হওয়ার খবরে হাসপাতালে গিয়েছিলেন তাঁর খালাতো বোন ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা রেক্সোনা রেবা। তিনি মুঠোফোনে বলেন, ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে গিয়ে আল-মিরাজকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পান। সেখানে শরীর থেকে বুলেট অপসারণ করার পর চিকিৎসকেরা তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে বলেন। সেখানে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা তাঁকে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। সেখানে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে দুই চোখ থেকে একটি করে গুলি অপসারণ করেন। অবস্থানগত জটিলতার কারণে ডান চোখের একটি গুলি অপসারণ করা যায়নি।
আল-মিরাজের মামা হাবিবুর রহমান বলেন, মিরাজকে চক্ষুবিশেষজ্ঞ নিয়াজ আবদুর রহমানের কাছে নেওয়া হয়। চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাঁদের জানিয়েছেন, মিরাজ বাঁ চোখে সারা জীবনই ঝাপসা দেখবেন। তবে ডান চোখে রেটিনা ও কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করতে পারলে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড বা ভারতে চিকিৎসা করাতে হবে তাঁর। বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করানোর মতো আর্থিক সংগতি মিরাজের পরিবারের নেই। তিনি সরকারি সহযোগিতা চান।প্রথম আলো
১২. ঝুলে থাকা অবস্থায় পুলিশের ছয় গুলি, সেই তরুণ বেঁচে আছেন
নুরুল আমিন, ঢাকা, আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০২৪, ১১: ১৯
নির্মাণাধীন ভবনে ঝুলে থাকা তরুণকে লক্ষ্য করে পুলিশের গুলি করার ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
নির্মাণাধীন একটি ভবনের চারতলার রড ধরে ঝুলে আছেন একজন তরুণ; তাঁকে লক্ষ্য করে পুলিশ গুলি করছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এমন একটি ভিডিও ভাইরাল (ছড়িয়ে পড়া) হয়েছে।
সেই তরুণ বেঁচে আছেন। তাঁর নাম আমির হোসেন (১৮)। তিনি প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘ঘুমের মধ্যে এখনো স্বপ্নে দেখি, পুলিশ আমাকে গুলি করছে।’
নির্মাণাধীন ভবনটি রামপুরার মেরাদিয়ার। গত ১৯ জুলাই সেখানে গুলিবিদ্ধ হন আমির। তিনি জানান, একজন শিক্ষার্থী ও দুজন চিকিৎসক তাঁকে উদ্ধার করেন। তারপর স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে তিন দিন চিকিৎসা নিয়ে তিনি বাসায় ফেরেন।
আমিরের ভাষ্য, একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া করে পুলিশ ভবনটির চারতলায় উঠে যায়। সেখানে তাঁকে পেয়ে যায়। পুলিশের সদস্যরা তাঁর দিকে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে বারবার নিচে লাফ দিতে বলেন। একজন পুলিশ সদস্য তাঁকে ভয় দেখাতে কয়েকটি গুলিও করেন। একপর্যায়ে ভয়ে তিনি লাফ দিয়ে নির্মাণাধীন ভবনটির রড ধরে ঝুলে থাকেন।
আমিরের দুই পায়ে মোট ছয়টি গুলি করেছে পুলিশ। গুলিগুলো এক পাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। এখন তাঁকে বিছানায় পড়ে থাকতে হচ্ছে। রোববার মেরাদিয়ায় নয়াপাড়ায় আমিরের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, দুই পায়ের নিচে বালিশ দিয়ে শুয়ে আছেন তিনি।
আমিরের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে। ছয়-সাত বছর আগে মাকে হারিয়ে তাঁরা তিন ভাই-বোন ঢাকায় চলে আসেন। বাবা বিল্লাল মিয়া গ্রামে অটোরিকশা চালান। নয়াপাড়ায় একটি টিনশেড বাসায় তিন ভাই-বোন থাকেন।
আমিরের বাসাটি এখন মেরাদিয়া এলাকার অনেকেই চেনেন। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মেরাদিয়ায় গিয়ে পাঁচজন রিকশাচালক ও দোকানদারের কাছে জানতে চাওয়া হয়, ঝুলে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হওয়া লোকটির বাসা কোথায়। তিনজন আমিরের ঘটনাটি জানেন। তাঁর বাসা কোথায়, তা-ও জানান।
চাকরি না করে কীভাবে নিজের চিকিৎসা করাবেন, সংসার চলবে কীভাবে, সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।
আমির হোসেন বলেন তিনি ঘুমের মধ্যে এখনো পুলিশের গুলি করার স্বপ্ন দেখেন। ছবি: নুরুল আমিন
গিয়ে দেখা যায়, একটি আধা পাকা বাড়ির দুটি কক্ষ নিয়ে থাকেন আমির ও তাঁর ভাই-বোন। আমির আফতাবনগরে একটি দোকানের কর্মী হিসেবে চাকরি করতেন। তাঁর বড় ভাই নয়ন মিয়া পোশাক কারখানায় কাজ করেন। আমির ও তাঁর ভাইয়ের আয়ে তিনজনের সংসার চলে। বোন সবার ছোট। তার নাম হাসনা (১৬)।
১৯ জুলাই কী ঘটেছিল, জানতে চাইলে আমির হোসেন বলেন, বিক্ষোভের কারণে দোকান বন্ধ ছিল। সেদিন ছিল শুক্রবার। তিনি জুমার নামাজ পড়ে বাসায় ফিরছিলেন। বাসার কাছেই পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার মধ্যে পড়ে যান তিনি। পুলিশ গুলি শুরু করে। তিনি দৌড়ে নির্মাণাধীন ভবনটির চারতলায় গিয়ে আশ্রয় নেন।
আমিরের ভাষ্য, একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া করে পুলিশ ভবনটির চারতলায় উঠে যায়। সেখানে তাঁকে পেয়ে যায়। পুলিশের সদস্যরা তাঁর দিকে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে বারবার নিচে লাফ দিতে বলেন। একজন পুলিশ সদস্য তাঁকে ভয় দেখাতে কয়েকটি গুলিও করেন। একপর্যায়ে ভয়ে তিনি লাফ দিয়ে নির্মাণাধীন ভবনটির রড ধরে ঝুলে থাকেন।
গুলিগুলো আমিরুলের দুই পায়ে লাগে। ছবি: নুরুল আমিন
আমির বলেন, তিনি যখন ঝুলে ছিলেন, তখন তৃতীয় তলা থেকে একজন পুলিশ সদস্য তাঁকে লক্ষ্য করে ছয়টি গুলি করেন। গুলিগুলো তাঁর দুই পায়ে লাগে। একপর্যায়ে পুলিশ চলে যায়, তিনি ঝুলে ছিলেন। পরে তিনি ঝাঁপ দিয়ে কোনোরকমে তৃতীয় তলায় পড়েন। সেখানে দুই পা দিয়ে রক্ত ঝরছিল। প্রায় তিন ঘণ্টা পর তাঁকে উদ্ধার করেন একজন শিক্ষার্থী ও দুই চিকিৎসক।
চিকিৎসক দুজন স্থানীয় ফেমাস স্পেশালাইজড হাসপাতালের। তাঁদের ডেকে এনেছিলেন ওই শিক্ষার্থী। আমির তাঁদের নাম জানেন না। তিনি বলেন, চিকিৎসকেরা প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। ঢাকা মেডিকেল থেকে তিন মাসের ওষুধ লিখে দিয়ে তাঁকে বাসায় পাঠানো হয়।
আমির বলেন, তিনি এখন অন্যের সাহায্য ছাড়া শৌচাগারেও যেতে পারেন না। দিনের বেলায় পায়ে তেমন ব্যথা থাকে না। তবে রাতে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। ব্যথার কারণে ঘুম তেমন একটা হয় না। তিনি আরও বলেন, চিকিৎসকেরা তাঁকে তিন মাস বিশ্রামে থাকতে বলেছেন। কিন্তু চাকরি না করে কীভাবে নিজের চিকিৎসা করাবেন, সংসার চলবে কীভাবে, সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।
গুলিগুলো আমিরুলের পায়ের এক পাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। ছবি: নুরুল আমিন
আমির বলেন, তিনি আর কখনো আগের মতো হাঁটাচলা করতে পারবেন কি না, সেটা নিশ্চিত নন।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনে প্রথম মৃত্যুর খবর পাওয়া যায় গত ১৬ জুলাই। ১৮, ১৯ ও ২০ জুলাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্ষোভ ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। কোটা সংস্কার, সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে আন্দোলন এবং ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর এখন পর্যন্ত মোট ৬২৬ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
কত মানুষ আহত হয়েছেন, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। স্বাস্থ্য বিভাগের ধারণা, সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বর্তমানে পাঁচ শতাধিক রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শুক্রবার পর্যন্ত রাজধানীর সাতটি সরকারি হাসপাতালে ৪৩৯ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। তাঁদের ১০ জনের পা কাটা গেছে, ১ জনের এক হাত কাটা গেছে। অনেকের হাতে, পায়ে বা শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর ক্ষত আছে। ৩২ জনের চোখে আছে ছররা গুলির আঘাত।
সরকার আহত ব্যক্তিদের বিনা খরচে চিকিৎসা দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। তবে অনেকে আগেই নিজ খরচে চিকিৎসা নিয়ে বাড়িতে ফিরে গেছেন। এখন ওষুধ ও পথ্য কিনতে হচ্ছে। তাঁরা কাজ করতে পারছেন না। সব মিলিয়ে নিম্ন আয়ের আহত মানুষের জীবনে দুর্দশা নেমে এসেছে।
আমিরের বড় ভাই নয়ন মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, দুই ভাইয়ের উপার্জনের টাকায় খুব কষ্টে সংসার চলে তাঁদের। ছোট ভাই গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর চিকিৎসায় অনেক টাকা খরচ করতে হচ্ছে। তাঁর একার উপার্জনের টাকায় ছোট ভাইয়ের চিকিৎসা ও সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
১৩. বাবা আমার লাশটা নিয়া যাইও, আমি মইরা যামু
লুৎফুজ্জামান লিটন, টঙ্গীপূর্ব (গাজীপুর) প্রতিনিধি
০৭ আগস্ট ২০২৪, ১১:০৭ পিএম | অনলাইন সংস্করণ
নাফিসা হোসেন মারওয়া।
সতেরো বছরের নাফিসা হোসেন মারওয়া। চলতি বছর টঙ্গীর শাহাজ উদ্দিন সরকার স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছিল ।
নাফিসার বাবা আবুল হোসেন পেশায় একজন চা দোকানি। নাফিসা ও তার ছোট বোন রাইসাকে নিয়ে বাবা আবুল হোসেন থাকতেন টঙ্গীর এরশাদনগর বস্তি এলাকার আট নাম্বার ব্লকে একটি ভাড়া বাড়িতে। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে নাফিসার মা কুলসুম বিদেশে পাড়ি জমান কয়েক বছর আগে।
এরই মধ্যে শুরু হয় কোটা সংস্কার আন্দোলন। নাফিসা রাজধানীর উত্তরায় আন্দোলনে যোগ দেয়। বাবা বিষয়টি জানতে পেরে নাফিসাকে নিষেধ করেন। গত ১ আগস্ট নাফিসা চলে যায় ঢাকা জেলার সাভারের বক্তারপুর এলাকার মামার বাড়িতে। সেখান থেকে ফের যোগ দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে।
গত ৫ আগস্ট দুপুর ২টার দিকে বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয় নাফিসা। অন্যান্য শিক্ষার্থীরা তাকে উদ্ধার করে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে খবর পেয়ে তার বাবা হাসপাতাল থেকে লাশ নিয়ে আসেন টঙ্গীর এরশাদনগর এলাকায়। রাতেই লাশ দাফন করা হয় এলাকার স্থানীয় গোরস্থানে।
নাফিসার মৃত্যুর পর বাবা আবুল হোসেন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বসে থাকেন কবরের পাশে। মেয়ের প্রিয় জবা ফুল এনে জড়ো করছেন কবরের পাশেই। কখনো কখনো চিৎকার করে কেঁদে উঠেন।
বাবা আবুল হোসেনের সঙ্গে কথা হয় যুগান্তর প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, আমার ২টা মেয়ে। নাফিসা বড়। আমি গরিব। কষ্ট করে মেয়েদের লেখাপড়া চালাইতাম। ওদের মা বিদেশে গেছে। আমার কোনো জমি নাই। দুইটা মেয়েই আমার সম্বল ছিল। আন্দোলন তো থামল। আমার মেয়ে তো আইলো না। গুলি লাগার পর আমার মা (নাফিসা) ফোনে আমারে বলছে- বাবা আমার লাশটা নিয়া যাইও, আমি মইরা যামু।
১৪. পুলিশ ভ্যানের সামনে একা দাঁড়িয়ে নুসরাত বলেছিলেন, ‘আমার ওপর দিয়ে চালান’
তানভীর রহমান, প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৪, ০৮: ০০
একাই পুলিশ ভ্যানের পথ রোধ করে দাঁড়িয়েছিলেন নুসরাত। ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ
পুলিশ ভ্যানের পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে আছেন একা এক তরুণী। চোখে চশমা, কাঁধে ব্যাগ। ছবিটা অনেকের হৃদয়েই নাড়া দিয়েছিল। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেদিন যিনি এই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তাঁর নাম নুসরাত জাহান। ঢাকার স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির এই শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম আমরা। জানতে চেয়েছিলাম, সেদিন ঠিক কী হয়েছিল?
দিনটা ছিল ৩১ জুলাই। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচিতে অংশ নিতে বের হয়েছিল ঢাকার স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ছোট্ট একটা দল। এই দলে ছিলেন আইন বিভাগের নূর আলম হাসান ও অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের নুসরাত জাহান। পথে তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হন ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের আরও দুই শিক্ষার্থী।
যেহেতু সংখ্যায় তাঁরা খুবই কম, তাই গ্রেপ্তার এড়াতে দুজন দুজন ভাগ হয়ে দূরত্ব রেখে এগোচ্ছিলেন। একপর্যায়ে হাইকোর্টের মাজার গেট থেকে কিছুটা দূরে অবস্থান নেন তাঁরা। সেখানে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষার্থী আগে থেকেই ছিলেন। কিছুক্ষণ পর পুলিশের একটি দল শিক্ষার্থীদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছেলেদের আটক করতে শুরু করে। নুসরাত বলেন, ‘ওই সময় নূর ভাই আমার পাশেই ছিল। পুলিশ যখন নূর ভাইয়াকে নিয়ে যাচ্ছিল, আমি হাত ধরে রাখি। এ রকম অন্যায়ভাবে কাউকে তারা আটক করতে পারে না, তাই বাধা দিচ্ছিলাম। পরে একজন পুলিশ আমার হাতে আঘাত করে, ভাইয়াকে নিয়ে যায়।’
পুলিশের হাত থেকে নূরকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছিলেন নুসরাত। ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ
নুসরাত হাল ছাড়েননি। পেছন থেকে ছুটে এসে ভাইকে জাপটে ধরেন। তিনজন নারী পুলিশ তখন তাঁকে ছাড়িয়ে নেন। কোনো উপায়ান্তর না পেয়ে নুসরাত এবার গাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ান। একা। ভয় করেনি? নুসরাত বলেন, ‘ওই সময় আমার মাথায় একটা জিনিসই ঘুরছিল—যেকোনো কিছুর বিনিময়ে হোক, ভাইয়াকে নিয়ে যেতে দেব না। যেহেতু আমাকে সাহায্য করার মতো কেউ সেখানে ছিল না, তাই গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পড়া ছাড়া অন্য কোনো পথও ছিল না। এরপর পুলিশ আমাকে গাড়ির সামনে থেকে সরানোর চেষ্টা করে। ব্যর্থ হলে মহিলা পুলিশ ডাকে। তিনজন এসে আমাকে টেনে নিয়ে যায়। টানাহেঁচড়ার সময় আমার হাত সামান্য কেটে যায়।’
এক মায়ের পেটে না জন্মেও নুসরাত–নূরের সম্পর্ক আপন ভাই-বোনের মতো। বোনের সাহসী হয়ে ওঠার বাকি গল্পটা শোনালেন ভাই নূর আলম, ‘এই ঘটনার কয়েক দিন আগে নুসরাতের এক বন্ধুকে আন্দোলনস্থল থেকে পুলিশ আটক করে। সেদিন নুসরাত প্রতিজ্ঞা করেছিল, তার সামনে থেকে কাউকে আটক হতে দেবে না। আসলে ছাত্র থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের ওপর চলা অত্যাচার ওকে এত নাড়া দিয়েছিল যে মন থেকে ভয়ডর চলে গিয়েছিল। এমনকি পুলিশ ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়েও ও বলছিল, “আমার ওপর দিয়ে চালান।” এখন হয়তো কথাটা খুব সহজ মনে হবে। কিন্তু তখনকার সময়ে এই প্রতিরোধের মানে অনেক বড়।’
নুসরাত বলছিলেন, ‘আমার ওপর দিয়ে চালান’। ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ
সেদিন নূরকে আটক করে প্রথমে রমনা থানায় নেওয়া হয়। হাজতে রাখা হয়। আন্দাজ দুই ঘণ্টা পর তাঁর শিক্ষক, অগ্রজ-অনুজ, বন্ধু ও আত্মীয়রা থানায় আসেন। পরে তাঁকে শাহবাগ থানায় পাঠানো হয়। সেখান থেকে মুক্তি পান।
পরে পুলিশ টেনে নুসরাতকে সরিয়ে নেয়ছ। বি: শুভ্র কান্তি দাশ
ওই ঘটনার পর অনেক মানুষের ভালোবাসা ও সম্মান পেয়েছেন বলে জানালেন নুসরাত। বলছিলেন, ‘কেউ কেউ আমাকে বলেছেন “২৪-এর প্রীতিলতা”। আবার অনেকে বলেছেন, ওই ৩১ জুলাইয়ের পরই তাঁরা নতুন করে সাহস পেয়েছেন। এমন অনেক শিক্ষার্থীও পথে নেমেছেন, যাঁরা আগে আন্দোলনে যোগ দেননি।’প্রথম আলো
১৫.পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান পুলিশ কর্মকর্তার ছেলে
মানসুরা হোসাইন, ঢাকা, আপডেট: ২০ আগস্ট ২০২৪, ১৩: ৩১
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, পুলিশ গুলি করার সময় এক বন্ধু ইমাম হাসান ভূঁইয়া তাইমেকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছে। ছবি: সংগৃহীত
‘পুলিশের ছেলে পুলিশেরই গুলিতে মরল, আমার স্বামী এই প্রতিদান পাইল? আমার ছেলেরে কতগুলা গুলি দিছে, ছেলে তো চোর-সন্ত্রাসী ছিল না। যে মারল, তার একটুও মায়া লাগে নাই? মারতে কয়টা গুলি লাগে? …আমি সঠিক বিচারটা চাই।’ ক্ষোভের সঙ্গে কথাগুলো বললেন ইমাম হাসান ভূঁইয়া তাইমের (১৯) মা পারভীন আক্তার।
রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের জ্যেষ্ঠ উপপরিদর্শক মো. ময়নাল হোসেন ভূঁইয়ার ছেলে ইমাম হাসান। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুলিশের গুলিতে গত ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা পদচারী–সেতুর কাছে মারা যান ইমাম হাসান।
২৭ বছর ধরে পুলিশে কর্মরত ময়নাল হোসেন ছেলের মৃত্যুর পর থেকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তিনি প্রথম আলোর সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে রাজি হলেন না। ইমাম হাসান নারায়ণগঞ্জের সরকারি আদমজী নগর এমডব্লিউ কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন।
ইমাম হাসানকে পুলিশ গুলি করে। সে সময় এক বন্ধু তাঁকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ ঘটনাই ছবিতে তুলে ধরেছেন কেউ। ছবি: সংগৃহীত
কাজলা পদচারী–সেতুর বিপরীত পাশে পূর্ব রসুলপুরে তাঁদের ভাড়া বাসা ছিল। সে বাসায় ছেলের স্মৃতি তাড়া করছিল। তাই সবুজবাগ থানার মাদারটেকে নতুন ভাড়া বাসায় এসে ওঠে পরিবারটি। গত শুক্রবার সকালে সে বাসায় বসে কথা হয় ইমাম হাসানের মা, বড় ভাই সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া রবিউল আউয়াল এবং খালা শাহিদা আক্তারের সঙ্গে। আরেক ভাই জাহিদ হাসান মস্কো সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটিতে পড়ছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজও দেখেছেন পারভীন আক্তার। সে ফুটেজে ছেলেকে একদম কাছ থেকে পুলিশ গুলি করছে, এক বন্ধু ছেলেকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছে। একপর্যায়ে ওই বন্ধুও উপায় নেই দেখে ছেলেকে ছেড়ে দিয়ে দৌড়াচ্ছে, আর পুলিশ তখনো গুলি করছে। সে সময়ও জীবিত ছিল ছেলেটা।
ছেলের স্মৃতি হাতড়ে বেড়ান মা। ছবি: সংগৃহীত
গত ১৯ জুলাই থেকে সারা দেশে কারফিউ জারি করে সরকার। ২০ জুলাই দুপুর ১২টা থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল ছিল। টানা আন্দোলনে যখন উত্তাল যাত্রাবাড়ী, তখন ইমাম হাসান সে আন্দোলনে অংশ নেন। যদি কিছু হয়, সেই ভয় থেকে তিন–চার দিন এমন পরিস্থিতির মধ্যেও ছেলের ব্যাগ কোলে নিয়ে মা ফুটপাতে বা একটু নিরাপদ জায়গায় বসে থেকেছেন। ঘটনার দিন দুপুর ১২টার পর ইমাম হাসান বন্ধুদের সঙ্গে পদচারী–সেতুর পাশে লিটন স্টোরে গিয়েছিলেন চা খেতে। বাসা থেকে বের হওয়ার আগে মায়ের কাছে রুটি খেতে চেয়েছিলেন। দুটো রুটি আর ভাজি ছিল তাঁর শেষ খাওয়া।
পারভীন আক্তার বললেন, ছেলে বের হওয়ার আধঘণ্টার মধ্যেই গুলি লাগার খবর আসে। বাসা থেকে ঘটনাস্থল খুব কাছে হলেও ঘুরে ঘটনাস্থলে পৌঁছে শুধু রক্ত দেখেছেন, ছেলের লাশ পাননি।
পারভীন আক্তারকে ছেলে মারা যাওয়ার খবর জানানো হয় রাতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজও দেখেছেন পারভীন আক্তার। সে ফুটেজে ছেলেকে একদম কাছ থেকে পুলিশ গুলি করছে, এক বন্ধু ছেলেকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছে। একপর্যায়ে ওই বন্ধুও উপায় নেই দেখে ছেলেকে ছেড়ে দিয়ে দৌড়াচ্ছে, আর পুলিশ তখনো গুলি করছে। সে সময়ও জীবিত ছিল ছেলেটা।
ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার–এর এক প্রতিবেদন বলছে, গত ২০ জুলাই মর্গে গিয়ে লাশ খুঁজে পাওয়ার পর ময়নাল হোসেন তাঁর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ফোনে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘একজনকে মারতে কতগুলো গুলি লাগে, স্যার?’
ইমাম হাসান। ছবি: সংগৃহীত
‘গুলি লেখা যাবে না’
ইমাম হাসানের সুরতহাল প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, ‘ডান হাতের কনুইয়ের নিচে কবজি পর্যন্ত চারটি ছিদ্র…মাথা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত প্রায় ১০০টি কালো ছিদ্র ও জখম…।’
সুরতহাল প্রতিবেদনে মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে সুরতহাল প্রস্তুতকারী কর্মকর্তা মন্তব্যের ঘরে মৃতের বাবা ময়নাল হোসেনের ভাষ্য হিসেবে লিখেছেন, ভিকটিমকে কোটা আন্দোলনকারীরা মারপিট ও গুলি করে জখম করে।
তবে এ বিষয়ে ময়নাল হোসেন মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, সেখানে দায়িত্বরতরাই নিজেদের ‘মনমতো’ এ কথা লিখেছেন। সরাসরি গুলি লেখা যাবে না, ছিদ্র লিখতে হবে—ওপর থেকে এমন নির্দেশ আছে বলে তাঁকে জানানো হয়েছিল।
ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার–এর এক প্রতিবেদন বলছে, গত ২০ জুলাই মর্গে গিয়ে লাশ খুঁজে পাওয়ার পর ময়নাল হোসেন তাঁর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ফোনে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘একজনকে মারতে কতগুলো গুলি লাগে, স্যার?’
চলছে মামলার প্রস্তুতি
ইমাম হাসানের বড় ভাই রবিউল আউয়াল প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভিডিও ফুটেজ হাতে পাওয়ার পর বুঝতে পারছি, যে পুলিশ গুলি করেছেন, তিনিই বারবার বাবাকে ফোন করে নানা তথ্য জানতে চেয়েছেন। বাবার সঙ্গে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে গিয়েছি। তাঁরা সমবেদনা জানালেও আইনি ব্যবস্থা নিতে কোনো পরামর্শ দেননি। বরং বাবার কোনো কিছু করার দরকার নেই, পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে এমন কথাও বলেছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।’
ভাইয়ের হত্যাকাণ্ডের বিচার পেতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানালেন রবিউল আউয়াল। বললেন, ‘আমার দাদা আবদুল কাদের ভূঁইয়া পুলিশে চাকরি করেছেন। চাচা জয়নাল আবেদীন সেনাবাহিনীতে ছিলেন। বাবা পুলিশে কর্মরত। আমার ভাই ইমাম হাসানও পুলিশ হতে চায় বলে মাঝে মাঝে বলত। ভাইকে গুলি করে যারা হত্যা করল, তাদের বিচার চাই।’
গুলি লাগলেও ওকে ছেড়ে দিইনি। পেছন দিকে টানতে থাকি। আমার পায়ে যন্ত্রণা শুরু হয়। তখন ও (ইমাম হাসান) বলছিল, “ভাই আমার শরীরে শক্তি নাই, তুমি ছেড়ে দাও। রাহাত।
বন্ধুকে বাঁচাতে পারলেন না
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে নীল রঙের টি–শার্ট গায়ে যে তরুণ গুলি লাগা ইমাম হাসানকে পেছন থেকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, তিনি মো. রাহাত হোসাইন। শুক্রবার তাঁর সঙ্গে কথা হয় কাজলা এলাকায় লিটন স্টোরের সামনে। রাহাত জানালেন, তিনি, ইমাম হাসান, শাহরিয়ার আজাদ এখানে বসে চা খাচ্ছিলেন। কয়েকজন পুলিশ এসে চায়ের দোকান থেকে তাঁদের তিনজনকে বের করে প্রথমে মারধর করেন। পরে ইমাম হাসানকে লক্ষ্য করে গুলি চালান এক পুলিশ। পেছন থেকে তিনি (রাহাত) যখন ইমাম হাসান টেনে নিচ্ছিলেন, তখনো পুলিশ গুলি করছিল। তাঁর পায়েও গুলি লাগে।
রাহাত বলেন, ‘গুলি লাগলেও ওকে ছেড়ে দিইনি। পেছন দিকে টানতে থাকি। আমার পায়ে যন্ত্রণা শুরু হয়। তখন ও (ইমাম হাসান) বলছিল, “ভাই আমার শরীরে শক্তি নাই, তুমি ছেড়ে দাও।” তখনো সে জীবিত ছিল। দুদিন পর জানতে পারি ও মারা গেছে।’
রাহাত এখনো সোজা হয়ে হাঁটতে পারেন না। বললেন, বন্ধুকে বাঁচাতে না পারার আক্ষেপ থাকবে সারা জীবন। তাঁকেও পুলিশ ধরতে এসেছিল। বাড়িওয়ালার সহায়তায় সে যাত্রায় বেঁচে যান। পালিয়ে থাকেন কয়েক দিন।
‘পুলিশদের কাছে বলি, ও (ইমাম হাসান) পুলিশের ছেলে, ওকে বাঁচান। তখন একজন বলেন, বাঁচাইতাছি, তুমি আগে এইখান থেকে যাও, না হলে তুমিও গুলি খাবা। শাহরিয়ার আজাদ।
অপর একটি ভিডিওতে দেখা যায়, খালি গায়ে শাহরিয়ার আজাদ এবং লিটন স্টোরের লিটন মিলে ইমাম হাসানকে তোলার চেষ্টা করেও তুলতে পারেননি। ইমাম হাসানের বন্ধু শাহরিয়ার আজাদের বাবাও (বাবার নাম প্রকাশ করতে চাননি) পুলিশে কর্মরত। সেদিন শাহরিয়ারের গায়ে ছিল পুলিশের লোগোসহ তাঁর বাবার একটি টি–শার্ট। পুলিশ প্রথমে শাহরিয়ারকেও মারধর করে।
শাহরিয়ার আজাদ বলেন, ‘পুলিশদের কাছে বলি, ও (ইমাম হাসান) পুলিশের ছেলে, ওকে বাঁচান। তখন একজন বলেন, বাঁচাইতাছি, তুমি আগে এইখান থেকে যাও, না হলে তুমিও গুলি খাবা।’ এরপর শাহরিয়ার ঘটনাস্থল থেকে দৌড়ে ইমাম হাসানের বাসা পর্যন্ত খবরটা পৌঁছাতে দিতে পেরেছিলেন। প্রথম আলো
১৬. বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন
হাসিখুশি কাজল এখন জীবন–মৃত্যুর মাঝখানে
রাবেয়া বেবী, প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৪, ০৬:৩০
কাজল ছিলেন অসম্ভব মেধাবী। অষ্টম শ্রেণিতে কাজল পুরো গোপালগঞ্জে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পান। এসএসসি, এইচএসসিতে তার জিপিএ-ফাইভ ছিল। ২০১৬-১৭ সেশনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হন (৪৪ সমাবর্তনে)। বিশ্ববিদ্যালয়েরই বিভিন্ন পরিকল্পনায় কাজ করছিলেন কাজল। পাশাপাশি চাকরি খুঁজছিলেন। স্ত্রীসহ থাকতেন সাভারের গেরুয়াতে। এলএলবি সম্পন্ন করা স্ত্রী সিনথিয়া আক্তার নিশি জানান, তাদের ১৩ বছরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তার পরিবার কাজলের সঙ্গে বিয়েতে রাজি ছিল না। অন্যত্র তার আংটি বদলও হয়। তার পরও কাজলের বাবা গিয়ে তাকে নিয়ে আসেন। গত ১ আগস্ট তাদের প্রথম বিবাহবার্ষিকী ছিল। যাত্রাবাড়ীতে বড় ভাশুরের বাসায় বিবাহবার্ষিকী উদযাপন করতে যান তারা। সেখানেই ৫ আগস্ট কাজলের মাথায় গুলি লাগে। দৈনিক ইত্তেফাক
২৭ বছরের কাজল এখন রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে লাইফসাপোর্টে আছেন। গতকাল সোমবার হাসপাতালের আইসিইউয়ের সামনে কথা হয় সিনথিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের তীব্রতা বাড়ছিল বলে তারা বাড়ি ফেরেননি। ছোটবেলা থেকেই সত্যের পক্ষে লড়ে চলেছেন কাজল। সত্যের জন্য সকলের বিপরীতে গিয়ে একা দাঁড়াতেও পিছপা হননি কখনো। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক, ছোট-বড় শিক্ষার্থী সবার প্রিয়জন ছিলেন কাজল। সবার বিপদে পাশে থেকেছেন। সিনথিয়া জানান, পরিবারের অমতে বিয়ে করেছেন বলে তাদের সঙ্গে এতদিন যোগাযোগ ছিল না। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ নেই বলে আমার সঙ্গে সঙ্গে কাজলেরও মন খারাপ হতো। তবে এখন কাজলকে হাসপাতালে দেখতে আসেন সিনথিয়ার মা-ভাই। হাসপাতালে শ্বশুর, ভাশুর, দেবরের সঙ্গে সারা দিন থাকেন। আইসিইউয়ের পাশেই বেশি সময় কাটে তার।
কাজলের মৃত্যুর আগের ঘটনাবলি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সকালে ফজরের নামাজ পড়ে নাশতা করেন কাজল। আমি একটি ডিম ভেজে দেই। কখনই নিজে পুরোটা খেতেন না। অর্ধেক ডিম আমাকে খাওয়ান। স্বামী হিসেবে একশতে তাকে একশরও বেশি দেব। সব সময় আমার ভালোমন্দের গুরুত্ব দিতেন। আমার যেন কোনো অসুবিধা না হয় সেদিকে সম্পূর্ণ নজর থাকত তার।’ অশ্রুসজল চোখে তিনি বলেন, ‘ঐদিন আমিই তাকে যেতে বলি। না করিনি। বেলা ১টা পর্যন্ত আমার সঙ্গে ফোনে কথা হয় তার। ২টার দিকে গুলি লাগে। আশপাশের লোকজন তাকে মাতুয়াইল স্পেশালাইজড মেডিক্যাল কেয়ার হাসপাতালে নিয়ে যায়, সেখানে তার ওয়ালেটে জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে গোপালগঞ্জের ঠিকানা পাওয়া যায়। সেই হাসপাতালের এক কর্মী বাড়িতে ফোন দেন। আড়াইটার দিকে আমরা ফোন পাই। মাতুয়াইল হাসপাতাল থেকে বিকালে এখানে আনা হয়। এখানে ৬ আগস্ট তার মাথায় অস্ত্রোপচার করা হয়। এখন পর্যন্ত আছেন লাইফসাপোর্টে।’ ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী দীন মোহাম্মদ জানান, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ৫০০ আহত রোগী ঐ হাসপাতালে চিকিত্সা নেন। ১৩২ জন ভর্তি হন। ২৪ জন মারা যান। তিন জনকে মৃত অবস্থায় আনা হয়। বর্তমানে বিভিন্ন বিভাগে ১১ জন আহত রোগী চিকিৎসাধীন আছেন। তাদের মধ্যে তিন জন আইসিইউতে আছেন। তাদের অবস্থা গুরুতর।
ইত্তেফাক/এমএএম
১৭.মৃত্যুর আগে সাদেকুর বলেছিলেন, ‘আমার বাচ্চাগুলো দেইখ্যা রাইখো’
ময়মনসিংহ অফিস, প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৯: ১৮
সাদিকুর রহমানের কবরের পাশে স্বজনেরা। ছবি: সংগৃহীত
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিতে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় সাদেকুর রহমানকে (২৬) নিষেধ করেছিলেন স্ত্রী। কিন্তু স্ত্রীর কথা তিনি শোনেননি। আন্দোলনে যোগ দিয়ে গুলিবিদ্ধ হন সাদেকুর। দুদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তাঁর মৃত্যু হয়। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর শেষবারের মতো সাদেকুর কথা বলেন তাঁর বড় ভাইয়ের সঙ্গে। বলে যান, ‘আমার বাচ্চাগুলো দেইখ্যা রাইখো, আমার জন্য দোয়া কইরো।’
সাদেকুর রহমানের বাড়ি ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার দক্ষিণ মাইজপাড়া ইউনিয়নের কালিকাবাড়ি গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের আবুল লতিফের ছেলে। মা ফাতেমা খাতুন মারা গেছেন আগেই। চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন সাদেকুর। সাভারে একটি তৈরি পোশাক কারখানায় মসজিদের ইমামতি করতেন।পাশাপাশি কারখানায় কাজও করতেন। স্ত্রী শাহিদা খাতুনকে নিয়ে সাভার এলাকাতেই বসবাস করতেন। পাঁচ বছর বয়সী রুহামা রহমান ও আড়াই বছর বয়সী তাসনোভা তাসনিম নামে দুই মেয়ের বাবা ছিলেন তিনি। দুই বছর ধরে সাভারে বাস করছিলেন সাদেকুর। আগে এলাকায় মাদ্রাসায় চাকরি করতেন।
স্বজনেরা জানান, কোটা সংস্কার আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন সাদেকুর রহমান। ৫ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে সন্তানদের সঙ্গে নাশতা খেয়ে বের হয়ে যান। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে পরিবারের কাছে খবর আসে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন সাদেকুর। সাভারের বাইপাইল এলাকায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের সময় গুলি লাগে সাদেকুরের পেটে। তাঁর পেটে গুলি লেগে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যায়। সেদিন সাদেকুর রহমানের সঙ্গে খালাতো ভাই মিলন ও হাবিবও সঙ্গে ছিলেন। গোলাগুলির এক পর্যায়ে গুলিবিদ্ধ সাদেকুরকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান দুই খালাতো ভাই। সাভারের এনাম মেডিকেলে ভর্তি করা হলে ৭ আগস্ট বেলা একটার দিকে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে ৮ আগস্ট ময়নাতদন্ত ছাড়াই বাড়িতে দাফন করা হয়।
সাদিকুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত
হাসপাতালে নেওয়ার পথে সাদেকুর রহমানের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল বড় ভাই সাদ্দাম হুসাইনের। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, গুলি লাগার পর মুঠোফোনে মাত্র দুটি কথা বলেছিল সাদেকুর। বলেছিল, ‘আমার বাচ্চাগুলো দেইখ্যা রাইখো। আমার জন্য দোয়া কইরো।’ তখন তাকে কালেমা পড়তে বলছিলাম। তারপর পরিবারের আর কেউ তার সঙ্গে কথা বলতে পারেনি। আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। তিনি আরও বলেন, মৃত্যুর পর তার মুঠোফোনে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার ভিডিও দেখেছি।’
সাদেকুরের মৃত্যুতে মর্মাহত বাবা আবদুল লতিফ। বাবার চোখের পানি যেন শুকায় না। সব সময় কান্না করেন। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে এভাবে হারাতে হবে কখনো ভাবিনি। বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ যে কত ভারী তা আমি বুঝেছি।’
সাদেকুর মারা যাওয়ার পর দুই সন্তানকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন স্ত্রী শাহিদা খাতুন। আন্দোলনে যেতে নিষেধ করেও ফেরাতে পারেননি স্বামীকে। শাহিদা জানান, সেদিন বাসা থেকে বের হওয়ার আগে তিনি (সাদেকুর) বাচ্চাদের সঙ্গে নাশতা করেন, খেলা করেন। পরে দ্রুত বের হয়ে যান। সেদিন যাওয়ার সময় নিষেধ করেছিলাম, কারণ বাইরে বেশি গন্ডগোল ছিল। কিন্তু তিনি তাঁর কথা শোনেননি।
শাহিদা আরও বলেন, ‘তিনি (সাদেকুর) আমাকে বলেন, দেশের মেধাবী ছাত্রদের মেরে ফেলা হচ্ছে। দেশের জন্য যাচ্ছি। বলে যান, “আমি যেন শহীদ হয়ে আসতে পারি, দেশকে স্বাধীন করে আসতে পারি।” তখন আমি বলেছিলাম, যাঁরা আন্দোলনে যাচ্ছেন, তাঁদের তো স্বজন আছে, কিন্তু আমার তো তুমি ছাড়া কেউ নেই। যদি কিছু হয়ে যায়, তখন আমাদের কী হবে? তখন আমাকে বলেন, “আল্লায় দেখবে।” সেদিন মোবাইলও নিয়ে যাননি। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে খবর পাই আমার স্বামীর গায়ে গুলি লেগেছে। অথই সাগরে ভাসিয়ে চলে গেলেন তিনি। দুইটা বাচ্চার কী হবে—এই দুশ্চিন্তায় এখন দিন কাটে।’প্রথম আলো
১৮. রক্তে ভেজা টি–শার্টটা অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে
স্বপ্ন নিয়ে ডেস্ক, প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৯: ০০
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহত হয়েছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের ছাত্র মাহবুবুর রহমান। লিখেছেন তাঁর অভিজ্ঞতা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের ছাত্র মাহবুবুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত
১৫ জুলাই সকাল থেকেই মেসের বন্ধু ও রুমমেটদের মধ্যে একটা চাপা শঙ্কা টের পাচ্ছিলাম। সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ততক্ষণে বলে দিয়েছেন—আন্দোলনকারীদের দমনে ছাত্রলীগই যথেষ্ট। অতএব বুঝতে পারছিলাম, আজ আমাদের ওপর আক্রমণ হবে। কিন্তু তাই বলে ঘরে তো বসে থাকতে পারি না। যদি অধিকার আদায়ে সোচ্চার না হই, পরের প্রজন্মের কাছে কী জবাব দেব! আরেকটি বিষয়ও আমাকে খুব অনুপ্রাণিত করছিল, সেটা হলো আমাদের নারীসমাজ। সামনে থেকে দেখেছি, আন্দোলনে মেয়েরা কতটা অগ্রগামী। একজন বোন যদি হাজারো প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে আন্দোলনে আসতে পারে, আমি কেন পারব না!
সেদিন আমাদের কর্মসূচি ছিল শহরে। সেই উদ্দেশ্যে দুপুর আড়াইটার শাটল ট্রেনে উঠি। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের পরও সেদিন শাটল ছাড়ছিল না। বাইরে বের হতেই দেখি ছাত্রলীগের সিনিয়র নেতারা চট্টগ্রামের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক খান তালাত মাহমুদ রাফিকে জোর করে প্রক্টর অফিসে নিয়ে যাচ্ছে—তাঁর ছাত্রত্ব বাতিল ও আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ানোর মুচলেকা আদায়ের জন্য।
তখন আমরা, শাটলে থাকা সাধারণ শিক্ষার্থীরা মিলে ক্যাম্পাসেই আন্দোলন গড়ে তুলি। রাফিকে উদ্ধার করতে প্রক্টর অফিসের দিকে রওনা হই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের কাছাকাছি আসার পর আমাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় ছাত্রলীগ। মিছিলের একেবারে সামনে থাকায় তাদের সব হিংস্রতা যেন আমার ওপর নেমে আসে। উপর্যুপরি আঘাতে মাথা ফেটে আমার সারা শরীর রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায়। ধূসর রঙের টি-শার্ট খয়েরি বর্ণ ধারণ করে। রক্তক্ষরণ কোনোভাবেই বন্ধ হচ্ছিল না! ভেবেছিলাম, এটাই হয়তো জীবনের শেষ মুহূর্ত। উপস্থিত একজন রিকশায় করে বিশ্ববিদ্যালয়ের হাসপাতালে নিয়ে যায়। কর্তব্যরত চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালে যেতে বলেন। আমার মাথায় পাঁচটি সেলাই পড়ে। মনে আছে, তখন রথযাত্রার সময় ছিল। আমার অনুষদের ড. রূদ্রপ্রতাপ দেবনাথ স্যার রথযাত্রার সেই ব্যস্ত সময়ের মধ্যেও আমাকে দেখতে এসেছিলেন। ওই রাতেই আমার মেজ ভাই চট্টগ্রামে আসেন। পরদিন আমাকে লক্ষ্মীপুরে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়।
রক্তে ভেজা টি–শার্টটা স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণ করতে চান মাহবুবুর রহমানছবি: সংগৃহীত
বাড়িতে এসেও শান্তিতে থাকতে পারিনি। স্কুলের অনুজেরা আমাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখলে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা–কর্মীদের রোষে পড়ি। তারা আমাকে ‘নব্য রাজাকার’ আখ্যায়িত করে। শুনেছিলাম, আওয়ামী লীগের নেতারা আমার নাম তালিকাভুক্ত করেছে—যেকোনো সময় গ্রেপ্তার বা সন্ত্রাসী হামলার শিকার হতে পারি। এই আতঙ্কে নিজের ঘরে ঘুমাতে পর্যন্ত পারতাম না। বেশির ভাগ রাত নির্ঘুম কেটেছে। তবু দমে যাইনি। কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর আবার আন্দোলনে যাওয়া শুরু করি। মৃত্যুর ভয় তখন একেবারে কেটে গিয়েছিল।
৫ আগস্ট—সব কষ্ট যেন নিমেষে উধাও হয়ে গিয়েছিল। রক্তে ভেজা আমার টি–শার্ট এখনো স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণ করে রেখেছি। পরবর্তী প্রজন্মকে যেন বলতে পারি, তার পূর্বপুরুষ কাপুরুষ ছিল না। এই টি-শার্ট অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে আজীবন অনুপ্রেরণা জোগাবে।
১৯.‘স্বপ্নগুলো এখন শুধুই সাদা আর কালো’
দৃষ্টি হারালেন রাকিবুল ইসলাম
মোরশেদা ইয়াসমিন পিউ, প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০২৪, ০৮:০০
‘স্বপ্নগুলো এখন শুধুই সাদা আর কালো…।’ বলছিলেন বৈষম্যবিরোধী কোটা আন্দোলনে ছররা গুলির আঘাতে দুই চোখের দৃষ্টি প্রায় হারিয়ে ফেলা রাকিবুল ইসলাম। চোখে কালো চশমা পড়ে ২৪ বছর বয়সি এই যুবকের বিষণ্ন দিন কাটছে হাসপাতালের বিছানায়।
আগারগাঁও জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের বিছানায় বসে কথা হয় রাকিবুলের সঙ্গে। তিনি বলেন, লাইটের আলোতে সবকিছু সাদা দেখায়, যা চোখে খুব অস্বস্তি দেয়, তবে কালো চশমাটা চোখে দিয়ে সবকিছু কালো দেখা গেলেও, সেটাই চোখকে একটু প্রশান্তি দেয়। ‘সেই ১৮ জুলাই থেকেই আছি এই হাসপাতালে, চোখের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। চিকিৎসক বলেছেন, এক চোখে হয়তো ২০ থেকে ২৫ ভাগ দৃষ্টি ফিরে পাব। এখন দেখা যাক, ভাগ্যে কি লিখেছেন সৃষ্টিকর্তা।’
কথাগুলো বলতে বলতে বিমর্ষ হয়ে পড়েন রাকিবুল। বলেন, ‘স্বপ্ন ছিল দেশেই ভালো একটা কিছু করব, পরিবারের সবাইকে নিয়ে সুন্দর একটা শান্তির ঘর হবে আমাদের। কিন্তু ১৮ জুলাইয়ের পর থেকে স্বপ্নগুলো শুধুই সাদা আর কালোতে রূপান্তরিত হয়েছে।’
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী রাকিবুল বলেন, ‘১৮ জুলাই উত্তরা বিএনএস ওভারব্রিজের নিচ থেকে আন্দোলন শুরু হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আমাদের প্রথমে সরে যেতে বলে, এর তিন চার মিনিটের মধ্যেই তারা আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে টিয়ারসেল, রাবার বুলেট এবং ছররা গুলি ছোঁড়ে। ঐ দিন তাদের টার্গেট ছিল আন্দোলনকারীদের চোখ, মুখ, বুক আর মাথা। একদিকে পুলিশ, অন্যদিকে উত্তরা পূর্ব থানার সামনে থেকে র্যাব একসঙ্গে যেভাবে গুলি ছুঁড়েছে, যা বলে বোঝানো যাবে না। ওদের ভেতরে কোনো মানবিকতা ছিল না। একেক জন মানুষকে মনে হয়েছে যেন গুলি ছোঁড়ার যন্ত্র। সেই সময় আন্দোলনরত সবার সঙ্গে আমিও ছিলাম। সেখানে আনুমানিক বেলা পৌনে ১১টার দিকে আমি গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হই। বন্ধুরা আমাকে প্রথম উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেয়, সেখানে থেকে বাংলাদেশ আই হসপিটাল, এরপর আগারগাঁওয়ে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইসস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালে নিয়ে আসে। ৫ আগস্ট পর্যন্ত হাসপাতাল এবং বাসায় আসা-যাওয়ার মধ্যে ছিলাম, এরপর ৬ আগস্ট হাসপাতালে ভর্তি হই।’
রাকিবুলের বা চোখে অস্ত্রোপচার হয়েছে। জানালেন, এই চোখে এখন ঝাপসা দেখছেন, চিকিৎসক বলেছেন ২০ থেকে ২৫ শতাংশ হয়তো দেখতে পারবেন। আর ডান চোখে বুধবার অপারেশন হওয়ার কথা রয়েছে। রাকিবুল বলেন, ‘লেখাপড়া শেষ করে কতকিছুই তো করার ইচ্ছে ছিল। এখন আর সামনে কোনো স্বপ্ন দেখতে পারছি না। যত ভাবি, ততোবার কেবলই শিহরিত হই। এক মুহূর্তে কি হয়ে গেল জীবনের! যতদিন বেঁচে থাকব এই অন্ধকার নিয়েই বাঁচতে হবে।’
মা রেশমা আক্তার বলেন, আমার তিন ছেলে এক মেয়ে, রাকিবুল বড় ছেলে। বড় মেয়েকে মাস্টার্স পাশ করিয়ে বিয়ে দিয়েছি। ছোট দুই ছেলের একজন অটো চালানোর কাজ শিখছে। বড় ছেলেকে লেখাপড়া করাচ্ছিলাম, তাকে ঘিরেই ছিল আমাদের যত আশা। ওর বাবা গাড়ির মিস্ত্রী।
রাকিবুল ইসলাম লেখাপড়ার খরচ চালাতে ছোট একটা চাকরি করতেন। তার চোখের চিকিত্সায় বর্তমানে এই হাসপাতালে কোন খরচ লাগছে না। তবে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগেই ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা ব্যয় হয়ে যায়।
জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফা ইত্তেফাককে বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সৃষ্ট সহিংসতার সময় চোখে আঘাত পেয়ে এখনো বেশ কজন ভর্তি আছেন। তাদের প্রয়োজন মতো অস্ত্রোপচার চলছে। অনেকের অভিযোগ, তাদের চোখে অপারেশন করতে দেরি হচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে চোখকে অপারেশনের জন্য প্রস্তত করতে যতটুকু সময় লাগে ততটুকু সময়ই নেওয়া হচ্ছে। এখন যারা ভর্তি আছেন, তাদের বেশির ভাগ বয়সে তরুণ, বয়স ২০ থেকে ৩০ বছর। চার থেকে ছয় মাস পরে বোঝা যাবে তাদের চোখের দৃষ্টি কতটুকু আছে বা থাকবে। ইত্তেফাক/এমএএম
২০. মুগ্ধের ভাই স্নিগ্ধ
কোটা সংস্কার আন্দোলনে নিহত ফ্রিল্যান্সার মুগ্ধকে নিয়ে ফাইভআরের শোক বার্তা
রাহিতুল ইসলাম, ঢাকা
আপডেট: ৩১ জুলাই ২০২৪, ২২: ০৩
উত্তরায় কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান মীর মাহফুজুর রহমান (মুগ্ধ)সংগৃহীত
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে রাজধানীর উত্তরার আজমপুরে সংঘর্ষ চলাকালে ১৮ জুলাই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। মেধাবী মুগ্ধ পড়াশোনার পাশাপাশি জনপ্রিয় অনলাইন মার্কেটপ্লেস (আউটসোর্সিংয়ের কাজ দেয়া–নেয়ার ওয়েবসাইট) ফাইভআরে বিভিন্ন কাজ করতেন। সফল এই ফ্রিল্যান্সারের মৃত্যুতে আজ বুধবার সন্ধ্যায় নিজেদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক শোকবার্তা প্রকাশ করেছে ফাইভআর কর্তৃপক্ষ।
ফ্রিল্যান্সার মুগ্ধকে নিয়ে ফাইভআরের শোক বার্তা। স্ক্রিনশট
ফাইভআরের বার্তায় বলা হয়েছে, আমরা দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমাদের ফাইভআর পরিবারের একটি ক্ষতির কথা জানতে পেরেছি। গত সপ্তাহে মা-বাবা ও দুই ভাইকে রেখে মারা গেছেন মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। মীর একজন প্রতিভাবান বিপণনকর্মী ছিলেন, যিনি এসইও (সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন) ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর দক্ষতার মাধ্যমে ফাইভআরে একটি সফল ব্যবসা গড়ে তুলেছিলেন। তার চেয়েও বেশি, তিনি ছিলেন একজন উৎসুক ভ্রমণকারী, মেধাবী ফুটবলার, স্কাউট ও সত্যিকারের মানবিক ব্যক্তি।
ফাইভআরের এশিয়া অঞ্চলের বাংলাদেশ ফাইভআর কমিউনিটির প্রধান মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মীর মাহফুজুর রহমান ছিলেন একজন সফল ফ্রিল্যান্সার। ফাইভআরে তিনি এক হাজারের বেশি কাজ করেছেন। তিনি একজন রেমিট্যান্স–যোদ্ধা। ফাইভআরে তিনি সফলভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিপণনের কাজ করতেন। কোটা সংস্কার আন্দোলনে তিনি শুধু অংশ নেননি, গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পানি পান করিয়েছেন। মুগ্ধ আমাদের ফ্রিল্যান্সার কমিউনিটির হিরো। তাঁর মৃত্যুতে আমরা শোকাহত। আর তাই মুগ্ধর মৃত্যুতে ফাইভআর দুঃখ প্রকাশ করেছে। তিনি আমাদের কমিউনিটিতে একজন হিরো হিসেবেই বেঁচে থাকবেন।’
পড়াশোনার পাশাপাশি একজন ফুটবল খেলোয়াড়, গায়ক, গিটারবাদক ও দক্ষ সংগঠক হিসেবে বেশ সুনাম ছিল মুগ্ধর। তিনি ছিলেন স্কাউটের ইউনিট লিডার। শ্রেষ্ঠ সংগঠক হিসেবে বাংলাদেশ স্কাউটস থেকে ‘ন্যাশনাল সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড’ও পেয়েছিলেন মুগ্ধ। প্রথম আলো
আবু সাঈদ, মুগ্ধদের মৃত্যু আমাকে তাড়া করে বেড়ায়
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ। ছবি: সমকাল
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ বলেছেন, ‘সবাই বলতো আমার আর মুগ্ধর হাসি নাকি খুব সুন্দর। কিন্তু আমি আর হাসতে পারি না। ১৮ জুলাইয়ের পর আমি এখন হাসতে ভুলে গেছি। আবু সাঈদ, মুগ্ধসহ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহতদের করুণ মৃত্যু প্রতিটি মুহূর্তে আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। আমি ঘুমাতে পারি না।
শনিবার কুমিল্লার লাকসাম পৌর মিলনায়তনে লাকসামের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান ‘সুরক্ষা সিটি’র আয়োজনে এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনে’র সাধারণ সম্পাদক স্নিগ্ধ।
তিনি বলেন, যে হারিয়েছে, সেই বোঝে হারানোর যন্ত্রণা কত নির্মম ও কষ্টের। তবে আমরা সব কষ্ট ভুলে যাবো, যদি একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে পারি। আমার ভাইবোনদের একটি মাত্র উদ্দেশ্য ছিল সেটি হলো, শোষণ এবং অন্যায়, অত্যাচার ও দুর্নীতিমুক্ত সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার। তাদের সেই স্বপ্ন পূরণে আমরা এখন কাজ করছি। আন্দোলনে নিহত এবং আহতরা আমাদেরকে একটি স্বৈরাচার সরকারের হাত থেকে স্বাধীন করে দিয়েছে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, তাদের রক্তে অর্জিত সেই স্বাধীনতা আমাদেরকে রক্ষা করতে হবে।
স্নিগ্ধ আরও বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহতদের পরিবার এবং আহতদের আমরা খোঁজখবর রাখছি। তাদের সহযোগিতা করার জন্য ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন’ তৈরি করেছি। সবাই মিলে সহযোগিতা করলে এটি আরও ব্যাপকভাবে প্রসারিত হবে।
এ সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে নিহত কুমিল্লার লাকসাম পৌর এলাকার জিসানের বাবা বাবুল মিয়া, আহত আবুল কাসেম এবং কুমিল্লায় আহত শুভর সঙ্গে কথা বলে সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।
সুরক্ষা সিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মু. আসাদুজ্জামান ভুট্টোর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল হাই সিদ্দিকী, সুরক্ষা সিটির পরিচালক মু. শাহ আলম, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক সাদিক আল আরমান, সাবেক পৌর মেয়র মফিজুর রহমান, জামায়াতে ইসলামী কুমিল্লার দক্ষিণ জেলা সেক্রেটারি সৈয়দ সরওয়ার উদ্দিন সিদ্দিকী, লাকসাম পৌরসভার আমীর মু. জয়নাল আবেদীন পাটোয়ারী। কুমিল্লা প্রতিনিধি, দৈনিক সমকাল। প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ | ২২:৩৮
বিশেষ সাক্ষাৎকার: পর্ব ১
জেলে না গিয়ে বঙ্গভবনে শপথ নিলাম: ড. ইউনূস
শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়েছেন। দেশের অভাবনীয় এক পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের বিশেষ অনুরোধে তিনি এই দায়িত্ব নেন। নতুন বাংলাদেশ নিয়ে মানুষের স্বপ্ন, গুরুত্বপূর্ণ নানা খাতে সংস্কারের মাধ্যমে সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন, গণতন্ত্রে উত্তরণ এবং চলমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন এই অর্থনীতিবিদ। গত বুধবার প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান ও কূটনৈতিক প্রতিবেদক রাহীদ এজাজ।
আপডেট: ০৭ অক্টোবর ২০২৪, ০১: ৩৯
প্রথম আলো:
ড. মুহাম্মদ ইউনূস আপনাকে শুভেচ্ছা। দুই মাস হয়নি আপনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়েছেন। একদম নতুন সময়, একদম নতুন দায়িত্ব, যেটা হয়তো আগে কখনো ভাবেননি। এই দায়িত্ব আপনার কেমন লাগছে? আপনি কেমন আছেন?
ড. মুহাম্মদ ইউনূস: আছি। ভালো আছি। একটা নতুন দায়িত্ব। বড় দায়িত্ব। দায়িত্ব সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছি। হঠাৎ করে যে একটা দায়িত্ব এল, সেটা বহন করার মতো যোগ্যতা অর্জন করা, সেটাকে কাজে পরিণত করতে সচেষ্ট আছি।
প্রথম আলো:
আমরা জানি যে দুই দশক ধরে আপনাকে অনেক গালাগাল শুনতে হয়েছে। আদালতের বারান্দায় বারান্দায় ঘুরতে হয়েছে। পদ্মার পানিতে আপনাকে চুবানোর কথাও হয়েছে। আপনার তো জেলে যাওয়ার কথা, হয়তো এ সময় আপনার জেলে থাকার কথা ছিল। হঠাৎ করে সবকিছু বদলে গেল। আপনিই এখন রাষ্ট্র পরিচালনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। একটা অবাক করা, অদ্ভুত ও বিস্ময়কর পরিবর্তন। এমন কিছু যে হতে পারে, আপনি কি কখনো ভেবেছিলেন?
ড. ইউনূস: এটা একটা নতুন অভিজ্ঞতার মতো। আমি দুদিন আগে জেলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আদালতের দরজায় দরজায় ঘুরছিলাম। হঠাৎ করে জেলে না গিয়ে আমি বঙ্গভবনে গিয়ে শপথ গ্রহণ করলাম। একেবারে উল্টো একটা অবাক চিত্র। অতীতেও এ রকম আহ্বান জানানো হয়েছিল আমাকে। সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য। মাফ চেয়েছি বরাবর। এটা কোনো দিন সিরিয়াসলি ভাবিনি যে দায়িত্ব নিতে হবে। এবার ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতি। এ জন্য দায়িত্বও নিয়েছি।
প্রথম আলো:
আপনি কীভাবে এই বিরাট পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হলেন। ছাত্রনেতাদের সঙ্গে আপনার যোগাযোগটা কীভাবে হলো? আপনি কোন পর্যায়ে এসে সম্মতি দিলেন?
ড. ইউনূস: ছাত্রনেতাদের সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ ছিল না। পত্রিকায় টেলিভিশনের নিউজে তাঁদের দেখছিলাম। বরাবর যেভাবে আন্দোলন হয়, এভাবেই দেখছিলাম। আমি তখন বিদেশে ছিলাম যখন এই আন্দোলন ঘনীভূত হচ্ছিল। প্যারিস অলিম্পিকে একটা দায়িত্ব পালন করছিলাম। ওটার ডিজাইনিংয়ে আমি ইনভলভড ছিলাম। এ সময়ে আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। সেই সময় প্যারিসের একটা রাস্তার নাম আমার নামে নামকরণ করা হয়েছিল, সেটার উদ্বোধন করেছিলাম। কাজেই আমি এদিকে দেখছি, ওই দিকেও দেখছি, দূরের দৃশ্য হিসেবে।
আমার অফিস থেকে আমার সঙ্গে যারা যোগাযোগ রাখে তারা বলছিল: ‘স্যার এখন ফিরবেন না, এখন অবস্থা ভালো না। এলেই বোধ হয় আপনাকে জেলে নিয়ে যাবে। আপনি একটু দূরে থাকেন। পরিস্থিতি বুঝে আপনাকে বলব, কখন আসতে হবে।’ কাজেই আমি পরিকল্পনা করছিলাম বার্লিনে যাব, বার্লিনের পর রোমে যাব। তারপর ব্রাজিল যাব ইত্যাদি। দেশে ফিরে আসব এবং এ রকম একটা দায়িত্ব নিতে হবে, এটা একদম মাথায় ছিল না। এ সময় ছাত্রদের একজন আমার অফিসকে জানাল যে আমার সঙ্গে আলাপ করতে চায়। ছাত্রদের কথা এই প্রথম শুনলাম। জানতে চাইলাম, কী আলাপ করতে চায়। তখন আমাকে জানানো হলো, আপনাকে সরকারের দায়িত্ব নিতে হবে। আমি বললাম, এটা তো ভিন্ন কথা। তাকে বললাম, তোমার সঙ্গে আলাপ হয়েছে? সে জানাল, আলাপ হয়েছে। আমি বললাম, ঠিক আছে আমিও আলাপ করি, কী বলে দেখি। সে যোগাযোগ করিয়ে দিল, আমি আলাপ করলাম। তাদের বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে আমাকে এই দায়িত্ব দিয়ো না। বরাবরই আমি এই দায়িত্ব থেকে দূরে সরে থেকেছি। এই দায়িত্ব নেওয়া ঠিক হবে না। তোমরা অন্য একজনকে ভালো করে খুঁজে দেখো। তারা বলল, না স্যার আর কেউ নেই। আপনাকেই দায়িত্ব নিতে হবে। আমি তাদের আবার বললাম, তোমরা খোঁজ করো। খোঁজ করার পর আমাকে বলো, কী দাঁড়াল। তখন সে আমাকে জানাল, ঠিক আছে স্যার, কাল আপনাকে জানাব। পরদিন আবার সে ফোন করল। সে জানাল, স্যার, উপায় নেই। আপনাকেই আসতে হবে। আপনাকে দায়িত্ব নিতে হবে। অবিলম্বে আসতে হবে।
অতীতে আমরা সংস্কারের দিকে যাইনি। শুধু এক সরকার থেকে আরেক সরকারে চলে গিয়েছি। এবার সংস্কারের একটা বিষয় এসেছে এবং সেটাকে আমরা সামনে রেখেছি।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধান উপদেষ্টা
আমি তখন জানালাম, আমি তো এখন হাসপাতালে। আমি তো অত তাড়াতাড়ি আসতে পারছি না। আমি ডাক্তারের সঙ্গে আলাপ করে দেখি, কী বলেন উনি। তবে তোমরা যখন এত প্রাণ দিয়েছ এবং বলছ যে আমাকে দায়িত্ব নিতে হবে, যতই আমার আপত্তি থাকুক, আমি এ ব্যাপারে সম্মতি দিলাম। তবে আমি ডাক্তারের সঙ্গে আলাপ করে বলতে পারব, আমি কখন আসতে পারব। সে বলল, না স্যার, আপনাকে তাড়াতাড়ি আসতে হবে। আমি হাসপাতালে ডাক্তারের সঙ্গে আলাপ করলাম। ডাক্তার বললেন, আপনার তো আগামী দিনও হাসপাতালে থাকার কথা। আমরা চেষ্টা করি আপনাকে আগামীকাল ছেড়ে দিতে পারি কি না। পরদিন সকালে ওঠার পর ডাক্তার বললেন যে আপনি চাইলে চলে যেতে পারেন। ডাক্তার ছেড়ে দিলেন। আমি দেশে চলে এলাম।
প্রথম আলোর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গত বুধবার প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়েছবি: জাহিদুল করিম
প্রথম আলো:
এই সিদ্ধান্ত তো আপনি নিলেন। ছাত্রনেতারা ছাড়া বাইরের আর কারও সঙ্গে কি আপনার পরামর্শ করার সুযোগ হয়েছিল?
ড. ইউনূস: আর কে যে আছে, তা–ও তো আমি জানি না। আমার কিছু জানা ছিল না।
প্রথম আলো:
ছাত্রনেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক…
ড. ইউনূস: এদের কারও সঙ্গে কোনো রকম সম্পর্ক ছিল না। তারা কারা, ঢাকায় এসে তাদের চেহারা আমি দেখেছি। তাদের সঙ্গে কথা হলো। এয়ারপোর্টে তারা ছিল। তখন তাদের সঙ্গে পরিচয় হলো।
প্রথম আলো:
আপনি দেশের একটা সংকটময় পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়েছিলেন, দুই মাস আগে। সময়টা ছিল যথেষ্ট ঘটনাবহুল। সময়টা কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
ড. ইউনূস: একেবারে দ্রুতগতিতে সবকিছু ঘটেছে। আমি ফিরে এলাম। সেদিন রাতেই শপথ গ্রহণ করলাম। সব ওলট–পালট। দেশে ফিরে এসে কোথায় জেলে যাব, এখন অন্য দিকে চলে গেলাম! কী করতে হবে? এরা কারা? শপথ গ্রহণে কারা কারা থাকবে? সবকিছুই নতুন! সবকিছু ভিন্ন পরিস্থিতি। তবু মনে করলাম দায়িত্ব যখন তারা নিতে বলেছে, আমি রাজি হয়েছি, কাজেই আমি সে দায়িত্ব পালন করব। এভাবেই একটা অপরিচিত জগতের মধ্যে অপরিচিত সঙ্গী নিয়ে আমার যাত্রা শুরু হলো।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসছবি: জাহিদুল করিম
প্রথম আলো:
আপনি ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। এরপর আপনার কখনো বঙ্গভবনে, গণভবনে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। নাকি গিয়েছেন?
ড. ইউনূস: আমি গিয়েছি যদ্দিন আওয়ামী লীগের বাইরের সরকার ছিল, তারা আমাকে আমন্ত্রণ করেছে। আওয়ামী লীগের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানেও আমি দাওয়াত পেয়েছিলাম এবং সেখানে আমি উপস্থিত ছিলাম।
প্রথম আলো:
এবার আপনি আবার জাতিসংঘ অধিবেশনেও যোগ দিয়ে এলেন। সব প্রথা ভেঙে জো বাইডেনের সঙ্গে আপনার বৈঠক হলো। তারপর বিল ক্লিনটন। এর বাইরেও আরও অনেক রাষ্ট্রনেতা। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করলেন। আমরা দেখলাম, অনেক উৎসাহ–উদ্দীপনা বাংলাদেশের পরিবর্তনে এবং সেটা আপনাকে কেন্দ্র করে। আপনার উপস্থিতি, আপনার পরিচিতি অনেক কাজে লেগেছে। অনেক পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলো। অনেক অনুষ্ঠানে অংশ নিলেন। সব মিলিয়ে কেমন প্রতিক্রিয়া পেলেন নতুন বাংলাদেশ নিয়ে?
ড. ইউনূস: একটা হলো, তাদের সবার মনে উৎসাহ জেগেছে। উৎসাহ জেগেছে যে এই দেশটা আবার নতুন করে দাঁড়াতে পারবে। দেশের যে গতিপ্রকৃতি তারা দেখছিল, তাতে তারা উৎসাহ বোধ করছিল না। এই পরিবর্তনের ফলে এবং আমাকে সামনে পেয়ে এদের অনেকেই খুব উৎসাহ বোধ করেছে। এদের অনেকেই ছিল আমার পরিচিত মুখ ও বন্ধু, যাদের সঙ্গে আমার আগে থেকে ঘনিষ্ঠতা ছিল। কাজেই আমাকে কাছে পেয়ে তারা খুব উৎসাহ বোধ করেছে। এবং সেই উৎসাহ তারা নানাভাবে প্রকাশ করেছে।
আমরা আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছি। কিন্তু আনুষ্ঠানিক বৈঠক বন্ধুদের বৈঠকে পরিণত হয়েছে। আলাপ হয়েছে, কী দরকার তোমরা বলো, সেভাবে আমরা ব্যবস্থা নেব। সত্যি সত্যি তারা তাদের লোকজন নিয়ে এসেছে। অফিসারদের অনেকে আমাকে চেনে, যেহেতু নানা কাজে নানা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। সেভাবেই তারা গ্রহণ করেছে এবং খুব উৎসাহসহকারে করেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাদের সাহায্য–সহযোগিতা কী দরকার আমাদের। আমিও একেবারে পরিষ্কারভাবে বলেছি যে অতীতের মতো করে দেখলে হবে না। নতুন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এবং নতুন ভঙ্গিতে চিন্তা করতে হবে। আগের ক্যালকুলেশন বাদ দিতে হবে। অনেক বড় স্তরের ক্যালকুলেশন দিতে হবে। আমরা বড় জাম্পে যেতে চাই। এবং আগে অনেক শর্ত দিয়ে যেভাবে রাখছিল, সেভাবে না। যার সঙ্গেই আলাপ হচ্ছিল, এই একটা বিষয়ে জোর দিচ্ছিলাম। তারাও অ্যাপ্রিশিয়েট করছিল। সঙ্গে সঙ্গে একজন তো ওখান থেকে ফোন করে নির্দেশ দিয়ে দিচ্ছিল, ওইটা করে দাও।
আমরা কথা বলছি আর ফাঁকে ফাঁকে নির্দেশও চলে যাচ্ছে। তো খুব উৎসাহ বোধ করলাম। আমি বললাম, শুধু টাকার অঙ্ক বাড়ালে হবে না, এটার যে গতি…আমরা এখানে চুক্তি সই করলাম, ওই টাকা আসতে আসতে বহু বছর লেগে যায়, শেষ পর্যন্ত ওটা কাজে লাগে না। আমি বলেছি, আমাদের দ্রুতগতিতে দরকার। এই পরিবর্তনে আশু পরিবর্তন দরকার। কাজেই সব রকমের আয়োজনের যে ব্যবস্থা তোমাদের আছে, তা সংক্ষিপ্ত করে আমরা যাতে কাজে লেগে যেতে পারি, সেটা তাৎক্ষণিকভাবে করো। সবাই অ্যাপ্রিশিয়েট করে বলল: আমরা বিষয়টা বুঝেছি। দ্রুতগতিতে যাতে হয়, আমরা সেটার ব্যবস্থা করব।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাক্ষাৎকার নেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানছবি: জাহিদুল করিম
প্রথম আলো:
তারা দ্রুতগতিতে করল। আপনাকেও তো সবাইকে নিয়ে দেশে কিছু করার বিষয়টি দেখতে হবে। সে জন্য সংস্কারের যে উদ্যোগগুলো আপনি নিয়েছেন, সেগুলো জরুরি।
ড. ইউনূস: অবশ্যই। আমাদের জোর ছিল সংস্কারে। আমাদের যদি সংস্কার করতে হয়, দ্রুতগতিতে করতে হবে। ধীরে–সুস্থে সংস্কার করার সুযোগ আমাদের নেই। কাজেই সেই সংস্কারগুলো আমাদের এখন থেকে শুরু করতে হবে। একটা বিধ্বস্ত কাঠামোর ওপর আমরা শুরু করেছি।
প্রথম আলো:
আমি এখানটায় আসছিলাম। আপনি তো বাইরে থেকে সরকারের ভেতরটা অতটা জানতেন না। সাধারণভাবে জানতেন অন্যায়, অবিচার, রাজনীতিকরণ, দুর্নীতি ইত্যাদি। তো আপনি এসে কী দেখলেন? কী পেলেন?
ড. ইউনূস: ভাঙা হাট। কোনো জিনিস ফাংশন করে না। একটা অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ স্ট্রাকচার আছে, এক ব্যক্তিপূজার জন্য যা যা লাগে, সে ব্যবস্থাগুলো আছে। ওনার হুকুমে কী কী হয়, ওনার ইচ্ছাপূরণের জন্য সব ব্যবস্থা। রাষ্ট্রের ইচ্ছাপূরণের জন্য তাদের কোনো ব্যস্ততা নেই। কাজেই এ রকম একটা ভাঙাচোরা জনপ্রশাসন নিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু করতে হয়েছে।
প্রথম আলো:
আপনাদের যাত্রা তো অনেক কঠিন…।
ড. ইউনূস: অত্যন্ত কঠিন।
প্রথম আলো:
আপনি আসার আগে এতটা বুঝেছেন কি?
ড. ইউনূস: ভেতরে ঢুকে পরিষ্কারভাবে বোঝা গেল। আগে আবছা আবছা বুঝতাম যে এটা এ রকম। কিন্তু এটা যে এত ভাঙা, তা বাইরে থেকে বোঝা মুশকিল। নির্দেশ কী উদ্দেশ্যে দিয়েছিল, কী করেছিল এবং টাকাটা কীভাবে খরচ হয়েছিল, চুক্তিটা কেন হয়েছিল, নানা রকম বিষয়। কাজেই টাকার বণ্টন কীভাবে হয়েছিল? সবকিছুর উদ্দেশ্য ছিল, যে যেখানে পারো নিয়ে নাও, এই হলো সুযোগ। এভাবেই চলেছে। সেই পরিস্থিতি থেকে নিয়মশৃঙ্খলায় আসা, আমাদের তো আর কোনো রাস্তা নেই। কাজেই এটাকে পরিষ্কার করে নিয়ে আসা খুব কঠিন কাজ।
প্রথম আলো:
কাজটা কঠিন আবার সময়সাপেক্ষ। গত ৮ আগস্ট বিমানবন্দরে নেমেই বলেছিলেন, আপনার প্রথম কাজ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা। পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক করা। এ ক্ষেত্রে আপনারা কতটুকু সফল হলেন?
ড. ইউনূস: চেষ্টা করছি। এখনো সফল হইনি। এখনো তো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। নানা রকম ব্যাখ্যা আছে। ব্যাখ্যার মধ্যে যেতে চাই না। কিন্তু এখনো উন্নতি হয়নি। কিঞ্চিৎ হয়েছে হয়তো। কিন্তু যে পর্যায়ে আসার কথা, সেই লেভেলে হয়নি। কাজেই আমাদের সার্বিক চেষ্টা হবে, ওটাকে আগে স্থির করা। এটা প্রথম কাজ। এটা না করলে তো বাকি জিনিস করতে পারছি না।
প্রথম আলো:
অবশ্য কাজটা এত সহজও নয়। পুলিশ বাহিনী ভেঙে পড়েছে। এখন মানুষকে আশ্বস্ত করবেন কী দিয়ে? আপনি কি প্রশাসন থেকে সহযোগিতা পাচ্ছেন?
ড. ইউনূস: ওপর থেকে তো সব সহযোগিতা আছে। কিন্তু গুঞ্জন শুনি, এখানে গোপনে বসে আছে। আমরা এগুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছি না। এগুলো শুনলে কিন্তু কোনো কাজ করা যাবে না। যেভাবে আছে, সেভাবেই আমরা চলছি। যেহেতু পুলিশের পুরোপুরি সার্ভিসটা আমরা পাচ্ছিলাম না, সে জন্য আমরা সেনাবাহিনীকে অনুরোধ করেছি, তারা যেন এগিয়ে আসে। তারা এগিয়ে এল। তারপর বলল, আমাদের তো কাজ করার কোনো সুযোগ নেই। এ জন্য তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়ার প্রসঙ্গটি উঠল। আমরাও রাজি হলাম। প্রাথমিকভাবে তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দুই মাসের জন্য দিলাম। যাতে করে তারা মাঠে নামতে পারে।
প্রথম আলো:
দুই মাস সময়টা কি আপনি যথেষ্ট মনে করছেন?
ড. ইউনূস: আমরা মনে করলাম, প্রথম দুই মাস দিয়ে দেখি। যদি মনে হয় কাজ হচ্ছে, তাহলে তো তা বাড়াতে হবে। আশা করি, তারাও সম্মত হবে। এটা নিয়ে আমরা অগ্রসর হতে চাইছি। তবে দুই মাস পরীক্ষামূলক বিষয়। নানা রকমের দুশ্চিন্তাও আসে। এটাতে ক্ষমতার অপব্যবহার হয় কি না। একজন না বুঝে ক্ষমতার একটা অপব্যবহার করে ফেলল, তাহলে তো সেনাবাহিনীকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। সেনাবাহিনীর একজন সদস্য, অফিসার যদি তা করে, এটার দুর্নাম সেনাবাহিনীর ওপর আসবে। আমাদের ওপরও আসবে, কেন আপনি এটা দিলেন। আমরা সেটাও দেখতে চাইছি, তারাও সুন্দরভাবে করার চেষ্টা করছে।
প্রথম আলো:
আপনি বর্তমান উপদেষ্টা পরিষদকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করছেন। কাজের যা অগ্রগতি, তাতে কি আপনি সন্তুষ্ট?
ড. ইউনূস: এটা নির্ভর করে আপনি কি এক্সপেক্ট করেন। সরকার একটা মহা–ইঞ্জিন। এই মহা–ইঞ্জিন আমরা চালু করার চেষ্টা করছি। প্রথমে আমরা ফার্স্ট গিয়ার দিয়ে চেষ্টা করছি, চালানো যায় কি না। এটা নড়লে আমরা সেকেন্ড গিয়ার, থার্ড গিয়ারের দিকে যাব। এটা হলো বিষয়। আমরা এক ধাপে থার্ড গিয়ারে চলে গেলাম, ফুল স্পিডে চলে গেলাম, এটা সম্ভব না। কাজেই ওই গতিটা আমাদের অ্যাডজাস্ট করতে হবে। তারপর যেন পুরো স্পিডে যেতে পারি। এটা কিন্তু বেশি সময় দিলে তা–ও হচ্ছে না। আমাদের তো কাজের মধ্যে নামতে হবে। কাজ তো অনেক, অফুরন্ত কাজ আছে।
প্রথম আলো:
আপনি যে গতির কথা বললেন, মানুষের একটা আকাঙ্ক্ষা যে দৃশ্যমান উদ্যোগ, গতি যেন তারা দেখতে পায়, বুঝতে পারে। এ রকম একটা অবস্থা। এসব নিয়ে মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে।
ড. ইউনূস: আমাদেরও মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে। যেটা হচ্ছে তাতে আমরাও তো খুব খুশি না। এটা ঠক্কর ঠক্কর করে চলা তো কারও ইচ্ছা না। দেখেন যত দ্রুত আমরা চালু করে ফেলতে পারি, অগ্রসর হতে পারি নরমাল স্পিডে, সেটাই আমাদের চেষ্টা।
মুখে যে যা–ই বলুক না কেন, ভেতরে সবাই সংস্কার চায়। এ ছাড়া গত্যন্তর নেই। আপনি পার পেয়ে যাবেন, আপনার ছেলেমেয়ে আটকে যাবে। এই গর্তের মধ্যে আবার পড়তে হবে। যেই গর্ত থেকে আমরা বেরিয়ে এলাম। যেই ধ্বংসস্তূপ থেকে আমরা বের হয়ে এলাম, সেই ধ্বংসস্তূপ আবার সৃষ্টি হবে।
প্রথম আলো:
এটাও তো বাস্তবতা যে এত পুঞ্জীভূত সমস্যার দ্রুত সমাধান করে ফেলা সম্ভব নয়। কিন্তু মানুষ তারপরও দেখতে চায় যে আপনারা চেষ্টা করছেন।
ড. ইউনূস: কিছু ভালো হচ্ছে। যেমন সবাই বলছেন ব্যাংকিং সেক্টরে কিছু ভালো হচ্ছে। আবার এদিকে বলে যে পুঁজিবাজারে গোলমাল হচ্ছে। কাজেই একটা ভালো হয় তো আরেকটা খারাপ হয়। একটা শুধরে আসি তো আরেকটা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্য থেকে আমাদের আসল কাজগুলো করে ফেলতে হবে। আমাদের নিয়মের মধ্য নিয়ে আসতে হবে সবকিছু। নিয়মটা যেন আমরা পালন করতে পারি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অচল ছিল, সেগুলো সচল করা ছাত্রদের নিয়ে আসা, ভিসি নিয়োগ করা। অফুরন্ত কাজ। কাজের কোনো শেষ নেই। যেদিকে দেখবেন, এগুলো খালি। অনেক বড় কাজ। এর মধ্যেই গতি সঞ্চার করা। একটা হলো কাজটা শুরু করা।
গুরুত্বপূর্ণ নানা খাতে সংস্কারের মাধ্যমে মানুষের স্বপ্নের বাস্তবায়ন নিয়ে কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসছবি: জাহিদুল করিম
প্রথম আলো:
আপনার এই বড় মেশিনে কাজ চালু করার জন্য আরও কোনো উদ্যোগ নেবেন। নতুন কোনো সদস্য উপদেষ্টা পরিষদে যোগ করবেন? আরও কিছু কমিশন করবেন?
ড. ইউনূস: কমিশনটা আমি অন্যভাবে দেখছি। যন্ত্রটার কথা বলি। যন্ত্রটা চালু করার জন্য মাঝেমধ্যে আলাপ হয়েছে যে আরও কয়েকজন সদস্য নিলে ভালো হয়। এ ব্যাপারে পাকা কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টা খোলা আছে। এ অবস্থাতেই আমরা আছি। তবে আমরা উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্যসংখ্যা খুব একটা বাড়াতেও চাই না। এতেও একটা বড় রকমের সমস্যার সৃষ্টি হয়।
প্রথম আলো:
আপনি জানেন যে বিগত সরকারগুলোর আমলে মন্ত্রিসভার সদস্যসংখ্যা ৬০–৭০ ছিল…
ড. ইউনূস: আমরা ওই ধরনের চিন্তা করছি না। আমরা খুব ছোট আকারে যেতে চাইছি। দেখা যাক আমরা কত দূর পারি। সমস্যা হলো কি, টিম যত বড় হয়, তাতে ইশারা এবং একজনের সঙ্গে অন্যজনের সংগতিপূর্ণ কাজ করাটা মুশকিলের হয়ে যায়। ছোট টিমেও সমস্যা। নতুনভাবে সবাই সবার পরিচিত নয়। কাজেই টিম গঠন করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার, সেটা দ্রুত করতে পারি না। চেষ্টার কমতি নেই। কিন্তু সফল হয়েছি, এ কথা বলার সময় আসেনি।
প্রথম আলো:
শিক্ষার্থীদের সমন্বয়কদের সরকার পরিচালনার অংশ করেছেন। তাঁরা উপদেষ্টা পরিষদেও আছেন। এটা একেবারেই নতুন এক অধ্যায়। আপনার অভিজ্ঞতা কেমন?
ড. ইউনূস: একটা হলো আমার অভিজ্ঞতা। একটা হলো আমার ধারণা। আমি বরাবরই বলে এসেছি যে তরুণদের হাতে পৃথিবী ছেড়ে দেওয়া দরকার। তারা আরেক জগতের মানুষ। আমরা তাদের আটকে রেখেছি। আমরা যারা বয়স্ক, তারা পুরোনো চিন্তা, পুরোনো ধারণা, পুরোনো কাঠামো নিয়ে তাদের আটকে রেখেছি। নতুনেরা তাদের নতুন ধারণা, নতুন চিন্তা, নতুন কাঠামো নিয়ে অগ্রসর হবে। এ পথ ছেড়ে দিতে হবে। কাজেই আমরা বলছি যে যত তাড়াতাড়ি পারি সব দায়িত্ব তাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া। আমাদের দায়িত্ব বাহবা দেওয়া। এটা আমার বক্তব্য ছিল। এখানে এসে সেই সুযোগ পেলাম। ওরা রাজি আমিও রাজি যে ঠিক আছে, আমরা কাজটা করি। যাঁরা উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আছেন, তাঁদের চেয়ে এই ছাত্র দুজন কোনো অংশে কম কেউ বলতে পারবেন না। শুধু আমাদের উপদেষ্টামণ্ডলীর মধ্যে না, অতীতেরও উপদেষ্টামণ্ডলীর সঙ্গে যদি তুলনা করেন, কেউ বলতে পারবে না, এঁরা তাঁদের চেয়ে দুর্বল। তাঁরা অনেক সজাগ, সতর্ক। অনেক চিন্তাভাবনা করে কাজ করছেন।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত বুধবার তাঁর কার্যালয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেনছবি: জাহিদুল করিম
প্রথম আলো:
এটাও তো আমাদের দেশের জন্য একটা নতুন ধারণা। ’৫২, ’৬২, ’৬৯, ’৯০—এই আন্দোলনগুলো মূলত ছাত্রদের নেতৃত্বেই হয়েছিল। কিন্তু পরে দেশ পরিচালনা বা এটাকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ছাত্ররা সেই সুযোগটা পায়নি। কাজেই এটা তো আমাদের জন্য একদমই নতুন।
ড. ইউনূস: আমাদের দেশের জন্য নতুন। অন্য দেশে তরুণদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। অন্য দেশে তরুণেরা প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেছেন। ৩০–৩৫ বছরে প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট। কাজেই তরুণদের অবহেলা করার কোনো কারণ নেই।
প্রথম আলো:
সেটা তো শুধু জুলাই–আগস্ট নয়, কয়েক বছর ধরে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সেটা তারা প্রমাণ করেছে। নতুন চিন্তা, নতুন ভাবনা নতুন ধরনের নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
ড. ইউনূস: অবশ্যই।
প্রথম আলো:
১/১১–এর সরকারকে সেনাবাহিনীর সরকার বলা হয়ে থাকে। পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে সেনাবাহিনী ছিল, সামনে কয়েকজন ছিলেন বেসামরিক ব্যক্তি। এখন সেনাবাহিনী আপনার সঙ্গে আছে, উদ্যোগ নিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করছে। বিশেষ করে জুলাইয়ের শেষ দিনগুলো, আগস্টের প্রায় দুই সপ্তাহ। মোটামুটি প্রক্রিয়াটাকে একটা জায়গা নিয়ে যাওয়ার একটা চেষ্টা তাদের ছিল। এখন নির্বাচন পর্যন্ত সেনাবাহিনীর ভূমিকা আপনি কী দেখেন? কী চান? বা কী মনে করেন?
ড. ইউনূস: আমি যেটা মনে করি, সেনাবাহিনীও সেটা বোঝে। একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সেনাবাহিনীর যে ভূমিকা হওয়া উচিত, সে ভূমিকা পালন করবে। সেটা সরকারের যেসব নির্দেশ থাকবে, সেটা তারা পালন করে যাবে। সেটাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নমুনা। শুরুতেই যদি আমরা সেই ভূমিকাগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলি, তাহলে তো গণতন্ত্র আর এগিয়ে যেতে পারল না। এখানেই শেষ হয়ে গেল। তো সেখানে আমাদের আর থাকারই–বা দরকার কী! যেখানে গণতন্ত্র নেই, সেখানে আমাদের কোনো ভূমিকাও নেই।
প্রথম আলো:
এবার কিন্তু আমরা ১/১১–এর চেয়ে অন্য রকম দেখি। সেনাবাহিনী সামনে আসছে না। এটা হয়তো আপনাদের প্রতি তাদের বিশ্বাস, আস্থা। এটাও একটা বড় কারণ।
ড. ইউনূস: আমিও সে কথাই বলছি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সেনাবাহিনীর যে ভূমিকা হওয়া উচিত, সে ভূমিকাই তারা পালন করছে এবং করে যাবে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সেনাবাহিনীর যে ভূমিকা হওয়া উচিত, সে ভূমিকাই তারা পালন করছে এবং করে যাবে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধান উপদেষ্টা
প্রথম আলো:
সেখানে আপনি তাদের সব সহযোগিতা পাচ্ছেন?
ড. ইউনূস: আমাদের তো এ পর্যন্ত কোনো কমপ্লেইন করার সুযোগ হয়নি। বরং আমি বাহবা দিয়ে এসেছি। বাহবা দিয়েছি এ জন্য যে পরিবর্তনটা হলো, সেনাবাহিনী যদি এগিয়ে না আসত, এটা তো রক্তারক্তি কাণ্ড হয়ে যেতে পারত। কাজেই তারা এগিয়ে এসেছে। ঠান্ডা মাথায় কাজটা করেছে এবং ছাত্রদের সামনে রেখে। বলেনি যে তোমরা সরো, এবার আমরা নিয়ে নিলাম। বলেনি তারা।
প্রথম আলো:
অনেক রক্তারক্তির মধ্যে তারা এসেছে। পরে এসে তারা এটাকে সামাল দিয়েছে। প্রক্রিয়াটাকে অগ্রসর করে দিয়েছে।
ড. ইউনূস: না হলে তো আরও রক্তারক্তি হতে পারত। যদি সেটা তারা সে সময় না করত; ভয়ংকর ব্যাপার হতো।
প্রথম আলো:
বিশেষ করে ৩ আগস্ট তাদের সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল, জনগণের বিরুদ্ধে তারা গুলি ছুড়বে না।
ড. ইউনূস: এটা মস্ত বড় একটা সিদ্ধান্ত।
প্রথম আলো:
আমরা দেখছি যে আপনাদের কিছু কিছু সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হয়েছে। সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে এটা হয়, হওয়া উচিত। কমিটি গঠন, পুনর্গঠন, কোনো সিদ্ধান্ত—এতে মানুষের মধ্যে কিছু প্রতিক্রিয়া আছে। এটা সরকারের দুর্বলতা প্রকাশ কি না, সেটাও আলোচিত হয়। আবার কখনো মনে হয় সমন্বয়হীনতা। এ রকম কিছু সমস্যা কি আপনি দেখেন?
ড. ইউনূস: একেকজন একেকভাবে দেখতে পারে। আমি বলব, সরকারের একটা স্ট্রং পয়েন্ট হচ্ছে, আমরা ভুল করলে শুধরে নিচ্ছি। আমরা গোঁয়ার্তুমি করে ধরে রাখলাম না। আমি সরকার বলে ফেলেছি, এটা আর পাল্টানো যাবে না, যা হওয়ার হবে। এ রকম তো আমরা করছি না। পরে আমরা দেখলাম, এভাবে না করে অন্যভাবে করলে ভালো হয়, পরে সেটা করে দিয়েছি। আমাদের এটা সবলতা মনে করি। আমাদের পুনর্চিন্তা করার শক্তি আছে। ভুল মনে করলে সংশোধন করছি। আরও ভালো করার চেষ্টা করছি। যেটা যথাযথ, সেটাই করছি।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসছবি: জাহিদুল করিম
প্রথম আলো:
একটা বড় পরিবর্তন হয়ে গেল। সুযোগ আগেও এসেছিল। ’৯০–এর এরশাদ পতন, কয়েকটা ভালো নির্বাচন, ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন ইত্যাদি। তারপরও তো তেমন পরিবর্তন হয়নি। চরম স্বৈরতান্ত্রিক একটা সরকার পেলাম আমরা। আমরা তো শিক্ষা নিই না। এবার কি আমরা শিক্ষা নেব? আপনি কতটুকু আশাবাদী?
ড. ইউনূস: আমি এভাবে দেখি। মস্ত বড় একটা সুযোগ এসেছে আমাদের জাতির জীবনে। এ রকম সুযোগ অতীতের যত বর্ণনা দিলেন, কোনোকালেই আসেনি। ছাত্ররা একটা সুন্দর বাক্য ব্যবহার করেছে এবং আমরা সবাই সেটা গ্রহণ করি। সেটা হলো সংস্কার। অতীতে আমরা সংস্কারের দিকে যাইনি। শুধু এক সরকার থেকে আরেক সরকারে চলে গিয়েছি। এবার সংস্কারের একটা বিষয় এসেছে এবং সেটাকে আমরা সামনে রেখেছি। এই হলো মুখ্য বিষয়।
এই অন্তর্বর্তী সরকারের বড় বিষয় হলো সংস্কার। নির্বাচন তো যেকোনো সময় যে কেউ দিতে পারে। আছে নিয়মমাফিক দিলাম, কেউ ভোট চুরি করল, দখল করলাম। কিন্তু এবার হলো সংস্কার। সংস্কার মানে হলো অতীতে যা যা ঘটেছে, আমরা সেগুলোর পুনরাবৃত্তি হতে দেব না। এটার জন্য আমাদের বুদ্ধিতে যতটুকু কুলায় ১০০ ভাগ হয়তো হবে না, তবে কাছাকাছি যতটা যাওয়া যায়, সারা জাতিকে একত্র করে করতে হবে। গায়ের জোরে নয়। অন্তর্বর্তী সরকার বসে কিছু করবে না। সবাইকে নিয়ে করবে। আপনারা বলেন, কী হলে সে জিনিসগুলো ভবিষ্যতে হবে না, সে জিনিসগুলো দিন। আমরা সবাইকে বোঝাই, রাজনৈতিক দলগুলোকে বোঝাই, বলেন আপনারা কী কী সংস্কার করতে চান। এ সুযোগ কিন্তু আপনারা আর পাবেন না। নির্বাচিত সরকার এসে গেলে এ সুযোগ আর পাবেন না। সম্ভব হবে না। আইনতই সম্ভব হবে না। আমাদের দিয়ে সেটা করিয়ে নিতে পারেন। যেমন সংবিধান সংশোধন। পারবেন না। এটা আমাদের দিয়ে করিয়ে নিতে পারবেন। আপনাদের কাজটাই আমরা করে দেব। আমরা একটা খসড়া বানিয়ে দিচ্ছি আপনাদের। কাজের সুবিধার জন্য। এটা ছিঁড়ে ফেলে দিন। আরেকটা বানিয়ে নিন। আমাদের আরেকটা দিন। আপনাদের নিয়ে করি।
আমি বরাবরই বলে এসেছি যে তরুণদের হাতে পৃথিবী ছেড়ে দেওয়া দরকার। তারা আরেক জগতের মানুষ। আমরা তাদের আটকে রেখেছি। আমরা যারা বয়স্ক, তারা পুরোনো চিন্তা, পুরোনা ধারণা, পুরোনো কাঠামো নিয়ে তাদের আটকে রেখেছি।
প্রথম আলো:
এই সংস্কারের কাজে আপনার এক–দুই–তিন লক্ষ্য কী?
ড. ইউনূস: প্রথম হলো সংবিধান, মস্ত বড় বিষয়। সংবিধান সংশোধন করতে হবে। জুডিশিয়ারি সংশোধন করতে হবে। ছয়টা যে কমিশন করলাম, এর প্রতিটিই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আরও কমিশন নিয়ে আসছি। কয়েক দিনের মধ্যে এগুলো পেয়ে যাবেন। সেগুলো আসলে দেখবেন যে অনেকগুলো বিষয় আমরা দিচ্ছি। মনের মধ্যে অনেক কথা জমে আছে। লেখালেখি আপনারা অনেক করেছেন। শুধু একটা কাগজ সামনে রেখে সবাইকে একমত করে বলেন, কত দূর যেতে চান। আপনারা যেভাবে ঠিক করে দেবেন, সেভাবেই হবে। আমাদের কাজ শুধু ফেসিলিটেট করা। এ সুযোগটা এখন আছে আমাদের কাছে। আপনারাই এটা সৃষ্টি করেছেন। আমরা সৃষ্টি করিনি।
মানুষের স্বপ্নের বাস্তবায়ন, গণতন্ত্রে উত্তরণ এবং চলমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসছবি: জাহিদুল করিম
প্রথম আলো:
এখন চারপাশে যা দেখেন, এতে কি আপনি আশাবাদী? রাজনৈতিক দলসহ সবাইকে নিয়ে কমিশনের উদ্যোগে আপনারা কত দূর পর্যন্ত করে যেতে পারবেন?
ড. ইউনূস: আমি এক শ ভাগ আশাবাদী। কারণ, সবাই সংস্কার চায়। মুখে যে যা–ই বলুক না কেন, ভেতরে সবাই সংস্কার চায়। এ ছাড়া গত্যন্তর নেই। আপনি পার পেয়ে যাবেন, আপনার ছেলেমেয়ে আটকে যাবে। এই গর্তের মধ্যে আবার পড়তে হবে। যেই গর্ত থেকে আমরা বেরিয়ে এলাম। যেই ধ্বংসস্তূপ থেকে আমরা বের হয়ে এলাম, সেই ধ্বংসস্তূপ আবার সৃষ্টি হবে। কাজেই সংশোধনের দায়িত্ব আপনাদের, আমরা শুধু ফেসিলিটেট করে যাচ্ছি।
পর্ব-০২
সংস্কারের জন্য সবাই ঐক্যবদ্ধ হোন, এই সুযোগ আর আসবে না: ড. ইউনূস
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নতুন বাংলাদেশ নিয়ে মানুষের স্বপ্ন, গুরুত্বপূর্ণ নানা খাতে সংস্কারের মাধ্যমে সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন, গণতন্ত্রের উত্তরণ ও চলমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন। ২ অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে এই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান ও কূটনৈতিক প্রতিবেদক রাহীদ এজাজ। আজ পড়ুন শেষ পর্ব।
আপডেট: ০৮ অক্টোবর ২০২৪, ০০: ০৮
প্রথম আলো:
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় অনেক হত্যাকাণ্ড হয়েছে, বিচার সবাই চাইছেন। অনেক কথা বলা হচ্ছে, আপনি বলছেন। শেখ হাসিনার বিচার চাওয়া হচ্ছে। তিনি এখন ভারতে অবস্থান করছেন। তাঁর বিচারটা বা তাঁর প্রত্যর্পণ নিয়ে, তাঁকে ফিরে পাওয়ার কথাটাও বলা হচ্ছে। এই বিচার বা শেখ হাসিনার বিচার, তাঁকে ফিরে পাওয়া—এ বিষয়ে কোনো চিন্তা আপনার বা আপনাদের আছে?
ড. ইউনূস: এ সবে আমাদের থাকার দরকার নেই। আমরা বিচারব্যবস্থা সংস্কারে বসেছি। বিচারব্যবস্থার সংস্কার করলে সংস্কারের ভেতর দিয়ে কার বিচার করবেন, কীভাবে বিচার করবেন, কে বিচার করবে, সবকিছু আসবে। এখন আমরা তো পলিটিক্যাল ডিসিশন দিতে যাচ্ছি না। আমরা শুধু পরিমণ্ডলটা সৃষ্টি করতে যাচ্ছি। এই পরিমণ্ডল দিয়ে যেভাবে অগ্রসর হতে চান, সেভাবে হবে। আপনারাই বানিয়ে দিয়েছেন আমরা শুধু ফেসিলিটেট করে দেব।
প্রথম আলো:
কিন্তু এসব অন্যায়-অবিচারের পেছনে একটি সরকার, সরকারপ্রধান, মন্ত্রিপরিষদ বা নেতৃবৃন্দ ছিলেন, তাঁদের ব্যাপারে তো আলোচনা বা দাবি এসেছে…
ড. ইউনূস: সে জন্য তাঁদের যেখানে পাওয়া যাচ্ছে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, জেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সবকিছু হচ্ছে। বিচার করছি না কিন্তু। বিচারটা আগে ঠিক করেন, কীভাবে বিচারপ্রক্রিয়া হবে। সেই বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিচার করবেন।
প্রথম আলো:
এই গ্রেপ্তারগুলো নিয়ে বা মামলা দেওয়ার বিষয়ে বেশ সমালোচনা হচ্ছে। কতটুকু সত্য বা কতটুকু অভিযোগ প্রমাণ করা যাবে। বা মামলা করে এই বিচারকে কতটুকু এগিয়ে নেওয়া যাবে। এসব প্রশ্ন মানুষের মনে আছে। সন্দেহ দাঁড়িয়ে গেছে। অনেকে বলতে চায় যে, অতীতের মতোই মামলাগুলো হচ্ছে, গায়েবি মামলা। এ দায় তো আপনাদের ওপর এসে পড়ছে, যদিও সরকার মামলা করছে না। এ দায় তো আপনি এড়াতে পারছেন না।
ড. ইউনূস: সে জন্যই জুডিশিয়ারির সংস্কার দরকার। আমি একা বলে দিলে তো হবে না। এটা তো তাহলে বিচার হলো না। এটা আইনের ভেতর দিয়ে আইনমতো হচ্ছে। কিন্তু আইনটা ভালো না। এ আইনগুলো পাল্টানো দরকার। কাজেই সেভাবেই আসতে হবে। আমরা এককভাবে একটা ঘোষণা দিয়ে দিলাম, তাহলে তো আবার আমরা একনায়কতন্ত্রের দিকে চলে গেলাম। আমরা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আসতে চাচ্ছি। ধীরে আসতে চাচ্ছি। বিচারপ্রক্রিয়া এমন জিনিস, এখানে যে ভুল হচ্ছে না, তা না। ভুল হচ্ছে। ভুলটা ধরিয়ে দিলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে সংশোধন করার চেষ্টা করছি। আবার বলছেন আপনারা সিদ্ধান্ত পাল্টান। এ জন্যই আমাদের ভুল ধরিয়ে দিলে আমরা সিদ্ধান্ত পাল্টাই।
প্রথম আলো:
এর মধ্যে সমাজে হানাহানি-বিদ্বেষ এগুলো খুব দেখা যায়। ‘মব জাস্টিস’ বলে একটা জিনিস চালু হয়ে গেছে। বেশ কিছু মানুষ মারা গেছেন। সমাজের মধ্যে একটা অস্থিরতা এসে গেছে। এটাকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন?
ড. ইউনূস: ওই যে, ল অ্যান্ড অর্ডার স্টাবলিশ করা। এগুলো হলো ল অ্যান্ড অর্ডার সিচুয়েশনের বিষয়। এখানে কোনো রাজনৈতিক বিষয় নেই। এখানে যে হত্যাকাণ্ড, মব জাস্টিস হচ্ছে, এগুলো হচ্ছে ল অ্যান্ড অর্ডারের বিষয়। ল অ্যান্ড অর্ডার শক্ত করতে পারলে এ জিনিসগুলো হবে না। সামাজিক তৎপরতা যদি বাড়াই, মানুষ মানুষের প্রতি যত্ন নেয়, তাহলে এগুলো হবে না। সরকার গিয়ে মারামারি থামাতে পারবে না। মারামারি করলে শাস্তি হবে, এটুকু আমরা বলতে পারি। আমরা বারবার বলছি, আমরা একটি পরিবার। আমাদের মতের ভিন্নতা থাকতে পারে। এ জন্য কেউ কারও শত্রু নই। এ জিনিসটা যেন আমরা পরিষ্কার রাখি।
প্রথম আলোর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ২ অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়েছবি: জাহিদুল করিম
প্রথম আলো:
আরেকটা বড় দাবি এসে যাচ্ছে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা, বেআইনি করা হোক। তাদের রাজনৈতিক তৎপরতা করতে দেওয়া না হোক; সে যাতে নির্বাচনে যোগ দিতে না পারে। এ বিষয়ে কী বলবেন?
ড. ইউনূস: এটাও আমাদের কোনো সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। কাজেই যখন রাজনৈতিক দলগুলো বসবে, তারা সিদ্ধান্ত নেবে। যত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আছে, সেগুলো আমরা রাজনীতিবিদদের কাছে নিয়ে যাব। তাঁরা যেভাবে সিদ্ধান্ত দেন।
প্রথম আলো:
কিন্তু আপনাদের একটা অবস্থান তো থাকবে। সেটা তাহলে কমিশনের মাধ্যমে আসবে?
ড. ইউনূস: কমিশন যদি মনে করে যে দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে, যখন নির্বাচনের বিষয় আসবে, সেখানে আলাপ হবে। অতএব ওটাও আবার রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে যাবে। ওটা খসড়া করবে তারা। কমিশন করলেই যে সেটা চূড়ান্ত হয়ে গেল, তা কিন্তু নয়। কমিশনের সুপারিশ রাজনৈতিক দলের কাছে যাবে। রাজনৈতিক দল নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করে, আলাপ-আলোচনা করে এটার সিদ্ধান্ত দেবে, কোন দিকে আমরা অগ্রসর হব।
প্রথম আলো:
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বহুল আলোচিত বিষয়। বিগত সরকারের আমলে এবং এর আগেও এটা নানাভাবে ব্যাহত হয়েছে। আমরা নানাভাবে নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছি। আপনি আমাদের কীভাবে আশ্বস্ত করবেন যে আগামীতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সত্য বলা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অব্যাহত থাকবে?
ড. ইউনূস: আপনি ১৫ বছর পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ঢুকতে পেরেছেন। এই ১৫ বছরে আপনাকে ঢোকার সুযোগ আগের সরকার দেয়নি। এই যে সরকারের কাছে যেতে পারাটা, এটা হিমালয় পর্বত অতিক্রমের মতো। এখন অতিক্রম হয়ে গেছে। এখন তো কোনো বাধা আপনার জন্য নেই। আপনি কখন আসবেন, কখন যাবেন, কখন চাইবেন, সেটা আপনার ওপর নির্ভর করবে। আমাদের এটার ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। প্রথম আলো পত্রিকা কার কাছে যেতে পারবে, কার কাছে যেতে পারবে না, সেই নির্দেশ দেওয়ার মালিক তো আমি নই। কারা বিজ্ঞাপন পাবেন, আর কারা বিজ্ঞাপন পাবেন না, সেটা বলার কোনো ক্ষমতা আমার নেই। আমরা এই ক্ষমতা চাই না। কেন আমরা সেই ক্ষমতা নিতে যাব। আপনারা মন খুলে লেখেন। সমালোচনা করেন। না লিখলে আমরা জানব কী করে যে কী হচ্ছে আর কী হচ্ছে না। আমরা তো ফেরেশতা নই যে সবকিছু ঠিকমতো হয়ে যাচ্ছে। কাজেই আপনারা বললে আমরা একটু সতর্ক হই।
আরও পড়ুন
জেলে না গিয়ে বঙ্গভবনে শপথ নিলাম: ড. ইউনূস
প্রথম আলো:
তারপরও তো কতগুলো আইনকানুনের ব্যাপার আছে। বিধিমালা-নীতিমালা রয়েছে। পুরোনো আইন আছে, যেগুলো ক্ষতিকর মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য।
ড. ইউনূস: সে জন্য আমরা মিডিয়া কমিশনের কথা বলেছি। মিডিয়া কমিশন আমাদের ধরিয়ে দেবে, হয় আইনগুলো পাল্টানো দরকার, না হলে বাতিল করে দেওয়া দরকার। আমরা এখানে কোনো আইনের জন্য লড়াই করছি না। আমাদের তো কোনো স্বার্থ নেই; যাতে পরবর্তী সময়ে কোনো প্রজন্ম এই অভিযোগ আমাদের দিতে না পারে যে এরা বাধার সৃষ্টি করে গেছে।
# বিচারব্যবস্থার সংস্কার করলে সংস্কারের ভেতর দিয়ে কার বিচার করবেন, কীভাবে বিচার করবেন, কে বিচার করবে, সবকিছু আসবে। এখন আমরা তো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দিতে যাচ্ছি না।
# আমরা এককভাবে একটা ঘোষণা দিয়ে দিলাম, তাহলে তো আবার আমরা একনায়কতন্ত্রের দিকে চলে গেলাম।
# যত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আছে, সেগুলো আমরা রাজনীতিবিদদের কাছে নিয়ে যাব। তাঁরা যেভাবে সিদ্ধান্ত দেন, সেভাবে কাজ হবে।
প্রথম আলো:
একটা প্রশ্ন আছে, আপনারা কত দিন দায়িত্বে থাকবেন? নির্বাচন কবে দেবেন? কথা এসেছে দেড় বছর, দুই বছর। অনেকে আবার বলেন তিন বছর। এমন কোনো সময়সীমা নির্ধারণের সুযোগ আপনার হয়েছে?
ড. ইউনূস: আমরা নিজেদের মধ্যে এ বিষয়ে আলাপ করি। আমাদের কাছে কাজটা তো পরিষ্কার। এ কাজটা হলো নির্বাচনের প্রস্তুতি। এই কাজটা আমাদের শুরু করে দিতে হবে। কাজেই নির্বাচনের প্রস্তুতির একটা স্টিম চলতে থাকবে। তার সঙ্গে সংস্কারের কাজ। দুটি একসঙ্গে যাবে। এটি কোনো আলাদা জিনিস নয়। একটা শেষ করে আরেকটা ধরব। নির্বাচনের প্রস্তুতি দিয়ে নির্বাচন চলবে। কখন, কোথায় কী করা যায়, কত দূর যাব। আবার সংস্কার। কারণ, সংস্কার হলো আমাদের কেন্দ্রবিন্দু। এই নির্বাচনটা হচ্ছে সংস্কারকে এস্টাবলিশ করার জন্য। কাজেই যখন দেখা যাবে নির্বাচনের প্রস্তুতিও হয়ে গেছে, সংস্কারের কাজ গোছানো হয়ে গেছে। এক্সিকিউট করা হয়নি। তখন প্রশ্ন উঠবে, সংস্কারটা করে যাবেন নাকি নির্বাচনে চলে যাবেন। এটা আপনাদের বিষয়। আমরা প্রস্তুতিটা চালিয়ে যাব। আপনারা দেখবেন আমরা কোনটাতে কত দিন খাটাচ্ছি। এটা আপনাদের দৃষ্টিতে থাকবে। কাজেই সময় বেঁধে দিলাম এর মধ্যে দেব। এর মধ্যে যা পান দিয়ে যান, এ রকম তো বিষয়টা না। বিষয়টা হলো দুটি প্রস্তুতি থাকবে। যদি বলেন যে নির্বাচন দিন। নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত তো আমরা আছি। আগে নির্বাচন হলে সেটা ভুল কাজ হবে। আরেকটা হতে পারে আগে সংস্কারটা করে দেন। নির্বাচনটা পেছনে রেখে এসেছি, যাতে আমরা সময়টা পাই। আমরা নির্বাচন এবং সংস্কার একই গতিতে যাব। এক জায়গাতে গিয়ে নির্বাচনের কাজ সমাপ্ত হয়ে যাবে। যেকোনো তারিখ ঘোষণা করলে নির্বাচন হয়ে যাবে। বলব যে আমরা কি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করব নাকি আরেকটু এগিয়ে যাব। সেভাবেই সময় নির্ধারণ হবে।
প্রথম আলো:
তার মানে নির্বাচনের সময়সীমার বিষয়টি সংস্কারের ওপর নির্ভর করছে?
ড. ইউনূস: অনেকটা নির্ভর করে। পুরো জিনিসটা হচ্ছে আপনারা কী চান, সেটার ওপর নির্ভর করছে। তারিখ ঘোষণা করে আমার কী লাভ। যদি কেউ মনে করে ওদের একটা অভিসন্ধি আছে। বহুদিন ধরে থাকতে চায়। আপনি তাঁদের (উপদেষ্টাদের) চেহারাগুলো দেখেন। সব বন্দীর মতো রয়েছে, আমাদের ছেড়ে দিন আমরা যাই। কেউ কেউ বলে যে আমি তো ছেলেমেয়ে নিয়ে বাঁচতে পারব না। আমাকে যে বেতন দেন, আমি একটা ছেলেকে বিদেশে পাঠাই। খরচ দিতে হয়, আমি কোথা থেকে দেব। তাড়াতাড়ি শেষ করে দেই আমরা—এই হলো আমাদের অবস্থা। আমরা কেউ থাকার দিকে নই। আমরা চাই বিষয়গুলো যেন সঠিক হয়। সেটাই আমাদের লক্ষ্য। বারবার যে কথাটা বলছি, এ জাতির জীবনে এই সুযোগ আর আসবে না। এই সুযোগ তো এখন আছে। সুযোগটা পুরোপুরি ব্যবহার করুন। আমাদের উপলক্ষ করে কাজটা আপনারা করেন। যেন আমরা সবাই মিলে বলতে পারি আমাদের সুযোগ এসেছিল, আমরা সেই সুযোগটা গ্রহণ করেছিলাম। কেউ যেন না বলে সুযোগ এসেছিল, আমরা সেই সুযোগ গ্রহণ করিনি। তোমরা পারোনি।
শুধু যদি গত ১৫ বছরই ধরি, আমরা তো শুধু দলাদলি শিখেছি, বিভক্তি শিখেছি, দূরত্বই শিখেছি। কে কাকে মারবে, কাটবে, কেড়ে নেবে, কাকে কত দূরে সরাবে, কাজেই সে সংস্কৃতি থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধান উপদেষ্টা
প্রথম আলো:
সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব—এটাই আমাদের পররাষ্ট্রনীতি। এবং এই নীতি নিয়েই আমরা চলি। আমাদের দেশের ভৌগোলিক এবং ভূরাজনৈতিক কারণে নানা দেশের সঙ্গে নানা অবস্থান আমাদের নিতে হয়। ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী। অতি সম্প্রতি দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। কথায়, আচরণে, ব্যবহারে তার প্রকাশ ঘটছে। এই অবস্থার পরিবর্তন, দুই দেশের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক হয় এবং তা যেন ভারসাম্যমূলক হয়, এ জন্য কী কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
ড. ইউনূস: আমাদের দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কটা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হতে হবে। এর কোনো ব্যত্যয় নেই। এটা তাদেরও দরকার, আমাদেরও দরকার। এটা অর্থনীতি, নিরাপত্তা, পানির প্রবাহ—যে দিক থেকেই চিন্তা করুন না কেন। একে অপরকে ছাড়া চলা তো আমাদের জন্য মুশকিল হয়ে যাবে। কাজেই এটা স্বাভাবিক যে আমাদের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ হতে হবে, সুসম্পর্ক হতে হবে সবকিছুতেই। কারও মনে যাতে এমন ধারণা না হয় যে কেউ কারও ওপর কিছু চাপিয়ে দিচ্ছে। সার্বভৌম দুটি দেশের মধ্যে যে ধরনের সুসম্পর্ক হয়, সে ধরনের সম্পর্ক এটা। এটা আমরা সব সময় চেষ্টা করে যাব। হয়তো ভারত মনঃক্ষুণ্ন হয়েছে যে সমস্ত ঘটনা বাংলাদেশে ঘটেছে তাতে। তারা এই পরিবর্তনগুলো পছন্দ করেনি। এটা তাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে, সারা পৃথিবী যখন আমাদের গ্রহণ করছে, তারা আমাদের গ্রহণ না করে কোথায় যাবে। যেহেতু তাকে সুসম্পর্কে আসতে হবে এটা এমন নয় যে আমরা তাকে বাধ্য করছি। এটা তার নিজের কারণেই প্রয়োজন। আমাদের প্রয়োজনে যেমন তাদের দরকার, তেমনি তাদের প্রয়োজনে আমাদের দরকার। কাজেই সাময়িক বিষয়গুলো আমাদের ভুলে যেতে হবে। কে কার সম্পর্কে কী বলল, কটু মন্তব্য করল, এগুলো বলে লাভ নেই। এগুলো কথার ফুলঝুড়ি। মূল জিনিসটা হলো আমাদের সুসম্পর্ক করতে হবে। সেজন্য যা কিছু দরকার, সেটা নিয়ে আমাদের অগ্রসর হতে হবে।
আমি বারে বারে সার্কের কথা বলে এসেছি। এবারও বলেছি। উৎসাহ ছিল। সার্কের সরকারপ্রধানেরা আমার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। কিন্তু শুধু ভারতের সঙ্গে আমার বৈঠকটা হলো না। না হলে সবার সঙ্গে আমার বৈঠক হয়েছে। শ্রীলঙ্কা আসতে পারেনি। কারণ, মাত্র সে প্রেসিডেন্ট হয়েছে। আসলে তার সঙ্গেও বৈঠক হতো। কাজেই আমরা চেষ্টা করছি অন্তত আনুষ্ঠানিকতার খাতিরে হলেও সার্কের দেশগুলো দাঁড়িয়ে একটা ছবি তুললাম, এই সার্কের সঙ্গে আমরা একত্রে আছি।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নানা বিষয়ে কথা বলেন প্রথম আলোর সঙ্গেছবি: জাহিদুল করিম
প্রথম আলো:
তার মানে আপনারা পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কটাকে ভারসাম্য করার ওপর প্রাধান্য দিচ্ছেন?
ড. ইউনূস: সম্পর্কটাকে অত্যন্ত মজবুত করা এবং একই সঙ্গে সার্ককে জোরদার করা।
প্রথম আলো:
সার্ককে আপনি অনেকটা সামনে নিয়ে এসেছেন। এক দশক ধরে সার্কের কার্যকারিতা নেই।
ড. ইউনূস: সার্কের জন্ম থেকে আমি এটার পেছনে আছি। আমি মনে করি যে এটাই আমাদের ভবিষ্যৎ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি এত ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব–বিভেদ থাকা সত্ত্বেও জোট করে ঘনিষ্ঠভাবে চলতে পারে, আমাদের তো ওই রকম দ্বন্দ্বের কোনো ইতিহাস নেই। আমরা কেন পারব না? একত্রে হলে আমাদের কত সুযোগ-সুবিধা বেড়ে যেত। সার্কে আমাদের ঘুরেফিরে আসতে হবে, সেটা আমরা সবাইকে আহ্বান জানাচ্ছি। আমার সঙ্গে যাদের দেখা হয়েছে, তারা সবাই বলেছে আমরা সার্ক চাই।
প্রথম আলো:
কিন্তু প্রধান সমস্যা তো ভারত আর পাকিস্তানের সম্পর্কটা?
ড. ইউনূস: ওটা তো সমাধান করা যায়। সমস্যা হলেই যে রাখতে হবে বলে তো কথা নেই। এটার সমাধান আছে তো। আমি সার্ক রাখব এবং এই সমস্যা জিইয়ে রাখব, ওটা তো হবে না। সমস্যার যে শেষ সমাধান হতে হবে, তা না। একটা মোটামুটি সমাধান সার্ক চলার মতো আমরা করতে পারি। যে সমস্ত বিষয় আপনি স্থগিত রাখতে চান, পাকিস্তানের সঙ্গে সেগুলো রেখেও তো এগোনো যায়। কাজেই এটা আমার একটা বড় নীতি থাকবে, আমি চেষ্টা করব।
আরেকটা হলো আসিয়ান। আসিয়ানের সদস্যপদ আমরা যেন পাই। তাহলে সার্ক একদিকে আর আসিয়ান একদিকে, মাঝখানে বাংলাদেশ। দুই জোটের সঙ্গে একত্রে থাকলাম। তাহলে আমরা একটা বৃহত্তর অবস্থানে থাকলাম।
প্রথম আলো :
আসিয়ানে যোগ দেওয়ার বিষয়ের সঙ্গে কি অর্থনৈতিক, ব্যবসায়িক, কূটনৈতিক নাকি অন্য কোন দিক আছে?
ড. ইউনূস: মূলত অর্থনৈতিক। বিরাট বাজার, এই বাজারের সঙ্গে আমরা সংযুক্ত হলাম। ইন্দোনেশিয়া বলে যে একটা দেশ আছে, বাংলাদেশের মানুষ তো খবরই রাখে না। বিশাল এক দেশ আসিয়ানের অন্তর্ভুক্ত। এখন আমরা তাকে অবহেলা করে ফেলে রেখেছি। অথচ আমাদের দরকার ছিল তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা। তাদের সুযোগ–সুবিধা আমাদের গ্রহণ করা। আমাদের জগৎটাকে বৃহত্তর পরিমণ্ডলে নিয়ে আসা।
প্রথম আলো:
আপনার একটা বিখ্যাত বক্তৃতা শুনেছিলাম অনেক বছর আগে, গ্রোয়িং আপ উইথ টু জায়ান্টস, ইন্ডিয়া অ্যান্ড চায়না? ভারতের পর চীনের সঙ্গে সম্পর্কটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
ড. ইউনূস: বহু বছর আগে আমি বলেছিলাম এটা আমাদের একটা বড় সুবিধা। আমরা যে দুই বিশাল অর্থনীতির মাঝখানে আছি, এটা আমাদের দুর্বলতা নয়, সবলতা। দুই দেশের কাছ থেকে আমরা শিখব। দুই দেশ আমাদের বাজার হবে। দুই দেশই আমাদের কাছে আসবে। এই দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেই আমাদের চলতে হবে। এটা আমাদের সুযোগ।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাক্ষাৎকার নেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানছবি: জাহিদুল করিম
প্রথম আলো:
এরই মধ্যে তো চীনের সঙ্গে আমাদের একটা বড় ধরনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তাদের কাছ থেকে এখন কী আশা করেন?
ড. ইউনূস: চীনের শক্তি আর সামর্থ্য তো ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। ক্রমাগতভাবে দেশটিতে সায়েন্টিফিক ডেভেলপমেন্ট হচ্ছে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট হচ্ছে। কাজেই তার সঙ্গে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যে বহু সুযোগ আছে। বহু জিনিস তার দরকার নেই, সেগুলো আমরা নিয়ে নিতে পারি। আমাদের দেশে সেগুলো আসতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত একটি বিষয়। আমি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছি, তিনিও সম্মতি দিয়েছেন। এ সমস্ত জিনিস তাদের লাগছে না। তাদের বাজার সংকুচিত হয়ে গেছে, আমেরিকানরা তাদের জিনিস কিনবে না। নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। কাজেই আমি বললাম যে তোমাদের ওই শিল্পগুলো এখানে রিলোকেট করো। এখানে দাও। আমরা উৎপাদন করে সারা দুনিয়ায় বিক্রি করি। সোলার এনার্জির সুযোগ তো ক্রমাগত বাড়বে, কমবে না। কাজেই আমরা সেই সুযোগটা গ্রহণ করি। এবার জাতিসংঘে গিয়ে সবার কাছে বলেছি, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আমরা এক নম্বর হতে চাই। কে কত রিনিউএবেল এনার্জি দেবে, কোন কোন সূত্রে দেবে…নেপালের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার সময় তিনি বললেন, আপনার যত হাইড্রো এনার্জি দরকার নিয়ে যান। আপনার যত বিদ্যুৎ দরকার আমরা দেব। টাকারও অসুবিধা নেই। শুধু বিষয়টি হচ্ছে ভারতের মাঝখান দিয়ে ট্রান্সমিশন লাইনটা। এটা আমরা ভারতের সঙ্গে আলাপ করে করব।
আমার একটাই কথা—সংস্কার, সংস্কার, সংস্কার। সংস্কারের জন্য সবাই ঐক্যবদ্ধ হোন। এই সুযোগ আর আসবে না। প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান মুহূর্ত।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধান উপদেষ্টা
প্রথম আলো:
আপনি যে ভারতের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার কথা বলছেন, এখানে তো মাঝে মাঝে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়।
ড. ইউনূস: অন্তত হাইড্রো ইলেকট্রিসিটি আনা বা সোলার এনার্জি করার ব্যাপারে চীনের সঙ্গে ভারতের দ্বন্দ্ব হবে বলে মনে হয় না। এটা তো কারও বিপক্ষে যাচ্ছে না।
প্রথম আলো:
বাংলাদেশের তো একটা স্ট্র্যাটেজিক লোকেশন আছে। ভূরাজনীতির একটা বিষয় তো আছেই। সেখানে তারা একে অন্যকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে। এ জায়গায় নিজেদের প্রভাববলয়টা রাখতে চায়।
ড. ইউনূস: চিন্তাগুলো পরিষ্কার করতে হবে, নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে। সেখানেও সংস্কার দরকার। আগের মতো করে একই ভঙ্গিতে চিন্তা করলে তো হবে না। আমরা ভারত থেকে বিদ্যুৎ আনছি না! তাহলে নেপাল থেকে আনলে সমস্যা কোথায়! এবং সেটা হাইড্রো। যেটার জন্য আমাদের পৃথিবী সর্বনাশ হয়ে যাবে!
আমি বারবার বলে যাচ্ছি, আমাদের তিন শূন্যের পৃথিবী গড়তে হবে। তিন শূন্যের পৃথিবী হলো সমাধান, এর আগে–পরে কোনো সমাধান নেই। জিরো নেট কার্বন এমিশন, জিরো ওয়েলথ কনজাম্পশন, জিরো আনএমপ্লয়মেন্ট। এই তিনটাকে সামনে রেখে আমাদের সব চিন্তাভাবনাকে সামনে আনতে হবে। আমাদের শুধু উন্নয়নের পেছনে ঘুরলে তো হবে না। আমাদের এটাকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে ফেলতে হবে। এটা উন্নয়নের মহাসড়ক নয়, এটা সামাজিক সমঝোতার মহাসড়ক। এই সামাজিক সমঝোতা এবং আবহাওয়ার সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত হবে না। এ জন্য নেট কার্বন এমিশন নাম্বার ওয়ানে। তারপর হবে জিরো ওয়েলথ কনজাম্পশন। সম্পদের সদ্ব্যবহার।
# আপনারা মন খুলে লেখেন। সমালোচনা করেন। না লিখলে আমরা জানব কী করে যে কী হচ্ছে আর কী হচ্ছে না।
# কাজেই নির্বাচনের প্রস্তুতির একটা ধারা চলতে থাকবে। তার সঙ্গে সংস্কারের কাজ। দুটি একসঙ্গে যাবে। এটা কোনো আলাদা জিনিস নয়।
# হয়তো ভারত মনঃক্ষুণ্ন হয়েছে যে সমস্ত ঘটনা বাংলাদেশে ঘটেছে তাতে। তারা তো এই পরিবর্তনগুলো পছন্দ করেনি।
প্রথম আলো:
জো বাইডেন প্রথার বাইরে গিয়ে আপনার সঙ্গে বৈঠক করলেন। তারপর ব্লিঙ্কেনের সঙ্গে আপনার আলোচনা হলো। তাঁদের সঙ্গে তো আপনার অনেক কথা হলো। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কী বার্তা পেলেন আপনি?
ড. ইউনূস: বার্তা হচ্ছে, তারা খুশি। আমি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে গিয়েছি। নতুন যে বাংলাদেশ হবে, সে ব্যাপারে তারা আনন্দিত। দুর্নীতিমুক্ত একটা দেশ হবে। সামাজিক দিক থেকে উন্নত একটা দেশ হবে। আমরা বলে এসেছি যে পরিবর্তন হবে, সংস্কার হবে। এই বার্তাগুলো তারা গ্রহণ করেছে। তারা বলেছে, তোমাদের যা যা সাহায্য করতে পারি, আমরা করব। কাজেই এটা একটা আশ্বাস পাওয়া গেছে। এবং দেখলাম যে এ ব্যাপারে তারা আগ্রহী। এটা এমন নয় যে কথাবার্তা বলে, দেওয়ার বেলায় কিছু পাইনি। আমরা দুটো বিষয়ে এমফেসাইজ করেছি জাতিসংঘে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা—যাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে, তাদের সবার সঙ্গেই। আমাদের বাংলাদেশের সঙ্গে আগে যেভাবে লেনদেন হতো, সেটার চিন্তা থেকে বের হয়ে যেতে হবে। এখন আমরা বড় আকারে যেতে চাই, বড় চিন্তার মধ্যে যেতে চাই। আমাদের আদান-প্রদান সেই প্ল্যাটফর্মের ওপর হতে হবে। প্রথমত চিন্তাটা ভিন্ন করতে হবে। অতীতের চিন্তা, অতীতের ক্রমধারায় করলে হবে না। দ্বিতীয়ত দ্রুত করতে হবে। আমরা অন্তর্বর্তী সরকার যদি কাজ দেখাতে না পারি, তাহলে মানুষ উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে। কাজেই তুমি যদি দিতে দিতে এমন সময় লাগালে অন্তর্বর্তী সরকার চলে গেল, আরেকটা সরকার এসে কয়েক বছর কাটিয়ে গেল, তারপর এটা দেওয়া শুরু হলো। তখন এটা হয়তো কাজে লাগবে না। অতীত হয়ে গেছে। কাজেই মানুষের মাঝে উৎসাহ থাকতে থাকতে টাকাটা দাও। যাতে করে আমরা কাজগুলো করতে পারি। বর্তমানে আমাদের অর্থনীতির অবস্থা ভালো না। কাজেই এটাকে সবল করতে হলে তোমাদের সাহায্য দরকার। কাজেই যে অর্থনীতি আছে, এটা ভাঙাচোরা আর লুটপাট করা অর্থনীতি। এই লুটপাট করা অর্থনীতিকে সোজা করতে হলে আমাদের সাহায্য দরকার। সেই জিনিসগুলো আমরা বারবার বলেছি।
প্রথম আলো:
আপনি বৈঠকের পর তো বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ সবার কাছ থেকে সহযোগিতার নতুন নতুন আশ্বাসও পেয়েছেন।
ড. ইউনূস: সবার কাছ থেকে। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ সবাই।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসছবি: জাহিদুল করিম
প্রথম আলো:
সবকিছু নিশ্চয় আপনাকে নতুন করে আশাবাদী করে তুলেছে?
ড. ইউনূস: নিশ্চয়। জাতিসংঘে যে রকম উৎসাহ আমি দেখেছি, শুধু বড় রাষ্ট্রই নয়, ছোট রাষ্ট্র; আমাদের সার্কভুক্ত রাষ্ট্রগুলো প্রত্যেকের উৎসাহ। প্রত্যেকে বলেছে, আমরা আছি। কী করতে হবে আমাদের বলেন। ইতালির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বললাম, কানাডার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বললাম, সবাই উৎসাহী।
ইতালির প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা হলো। ইতালির প্রধানমন্ত্রী বললেন, তোমরা তো বাংলাদেশের মানুষ যথেষ্ট আসো, আমাদের কোন আপত্তি নেই। আমর লিগাল ওয়েতে কীভাবে আনতে পারি সেটার জন্য চেস্টা করি। ইতালির রাষ্ট্রদূত আজ আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন, তিনিও বিষয়টি কীভাবে লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্কে নিয়ে আসা যায়, সে বিষয়ে কথা বলেছেন।
প্রথম আলো:
আপনি সব সময় জাতীয় ঐক্য, জাতীয় সমঝোতার কথা বলেন। এটাও ঠিক যে আমাদের দেশে রাষ্ট্রের যে মূলনীতিগুলো, সেখানে যদি ঐকমত্য তৈরি করতে না পারি, তাহলে চলা খুব মুশকিলের। আমরা চারপাশে বিভক্তি দেখি। দলাদলি দেখি। এ থেকে বের হবেন কী করে? সেখানে আমাদের সম্মিলিত প্রয়াসটা কী হওয়া উচিত?
ড. ইউনূস: শুধু যদি গত ১৫ বছরই ধরি, আমরা তো শুধু দলাদলি শিখেছি, বিভক্তি শিখেছি, দূরত্বই শিখেছি। কে কাকে মারবে, কাটবে, কেড়ে নেবে, কাকে কত দূরে সরাবে, কাজেই সে সংস্কৃতি থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।
মিডিয়ার অধিকার রক্ষা করতে বলছেন, একইভাবে মানুষের অধিকার রক্ষার কথা বলব। মানুষ যেন কথা বলতে পারে। বলার অধিকার তার কাছ থেকে কে কেড়ে নেবে? মত ভিন্ন হতে পারে। ওই যে বললাম, আমরা একটি পরিবার। আমাদের মতের বিভেদ থাকতে পারে, আমরা কেউ কারও শত্রু নই। এই কথাটা যদি আমরা মনে রাখি, আমরা শত্রু নই।
আমরা যেকোনো উপলক্ষ বানিয়ে শত্রু বানিয়ে ফেলি। কীভাবে শত্রু বানাতে হয়, শত্রু বানানোর প্রক্রিয়াটাকে আমাদের আগের সরকার ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছে। আপনাকে শত্রু বানিয়েছে, আমাকে শত্রু বানিয়েছে, এখানে কতজনকে শত্রু বানিয়েছে, আপনি দেখেন। খালি শত্রু, শত্রু যে কঠিন শত্রু। এমন যে সে দেশের শত্রু, শুধু আমার শত্রু না। ওই ভঙ্গিতে নিয়ে গেছে। কাজেই ওই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। আজকে সংস্কারের জন্য আমরা গলা ফাটাচ্ছি কেন? সেই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
প্রথম আলো:
আপনি যে কথাটি বললেন, স্বপ্নের কথাটা। একটা জাতীয় ঐক্য। এ ধরনের কোনো উদ্যোগ নেওয়ার বাস্তবতা কি আছে?
ড. ইউনূস: আপনারা বলেন, আপনারা পত্রিকায় লেখেন। শুরু করেন, কথা বলেন। যদি এটা কাজে লাগে, একত্র করা, সবাই একমত হওয়া। একমত হওয়ার কাজে। একমত হতে হবে না, একত্র হতে হবে। মত যার যার হতে পারে। নানা মত থাকবে। বাপে ছেলের মতে বা মেয়ের মতে একমত হয় না, দেশের একমত কেমনে হবে? মত থাকবে কিন্তু আমরা একমত হব।
# আমরা একটি পরিবার। আমাদের মতের বিভেদ থাকতে পারে, আমরা কেউ কারও শত্রু নই।
# আমরা যদি এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারি, দেখবেন বাকি কাজটা সহজ হয়ে যাবে।
# সংস্কার না করে যেন নির্বাচন না করি। এটা আপনাদের সবার কাছে আমার আবেদন। এই সুযোগ হারাবেন না।
প্রথম আলো:
আপনি যে কমিশনগুলো করলেন, সে কমিশনগুলোর মধ্য দিয়েও তো আলোচনা আসতে পারে।
ড. ইউনূস: আসতে পারে। আপনারা তাদের উৎসাহিত করুন।
প্রথম আলো:
শেষ পর্যন্ত আমরা সংস্কার করি, নির্বাচন করি, সরকার করি, ভবিষ্যতে যদি এগোয় সেখানে যদি সমঝোতা না হয়, তাহলে তো এগুলো অগ্রসর করে নেওয়া কঠিন। তো সেখানে আমি মনে করি আপনার একটা বড় ভূমিকা নেওয়ার জায়গা আছে, উপদেষ্টামণ্ডলীর প্রধান হিসেবে, ব্যক্তি হিসেবে। আমাদের জন্য বর্তমানে এই ঐক্য সমঝোতাটা খুবই জরুরি হয়ে গেছে।
ড. ইউনূস: ঐক্যের জন্য একটা বিষয় লাগে। কী নিয়ে ঐক্যটা সৃষ্টি হবে, সবাই যাতে মানে এ জন্য আসে। অন্তর্বর্তী সরকারের ঐক্যটা আসলো সংস্কার থেকে। সংস্কার বিষয়ে যদি একমত হই, সেটা কিন্তু একটা মস্ত বড় ঐক্য। যে যত মত আছে, আমরা সংস্কারে একমত।
প্রথম আলো:
সংস্কার মানে পরিবর্তন?
ড. ইউনূস: পরিবর্তন, আমরা অতীতে ফিরে যেতে চাই না, এটার চেয়ে বড় ঐক্য আর হতে পারে না। আমরা যদি এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারি, দেখবেন বাকি কাজটা সহজ হয়ে যাবে। ঠুনকো সংস্কার না, লোক দেখানো সংস্কার না, একদম ফান্ডামেন্টাল সংস্কার। এটা এমনভাবে করব আর কেউ পাল্টাতে পারবে না।
প্রথম আলো:
আর এই ঐক্যটা তো আমরা দেখলাম জুলাই-আগস্টে।…
ড. ইউনূস: কী সুন্দর একটা ঐক্য হঠাৎ করে জমেছিল! পাথরের মতো সব বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ করে সব চুরমার হয়ে গেল। বলে যে আমরা এক।
শান্তিতে নোবেল পুরস্কারজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেনছবি: জাহিদুল করিম
প্রথম আলো:
তার অর্থ হলো, ঐক্য সম্ভব।
ড. ইউনূস: অসম্ভব নয় তো! গত দুই মাস আগের ঘটনা তো। ঐক্য হলো তো। সারা দেশ এক হয়ে গেল। কোনো বিভেদ ছিল না। যে যত কথা বলে, ধর্মীয় পার্টি বলেন, বাম বলেন, ডান বলেন, মাঝ বলেন—সব এক। একটা ব্যাপারে একমত, আমরা এটা চাই না, পুরোনো অতীত শেষ।
প্রথম আলো:
শিশু, কিশোর, তরুণ…
ড. ইউনূস: সব, কেউই বাদ যায়নি। এই শক্তিটা যেন আমরা ভুলে না যাই। আমরা নানা কথার মধ্যে এগুলো ভুলে যাই। এই দুই মাসের মধ্যে আমরা ভুলে যেতে আরম্ভ করেছি। এটা যেন না হয়। এই সময়টাকে আমরা যেন রক্ষা করতে পারি। এই পিরিয়ডের ঐক্যটা এমনভাবে করব, যাতে তা স্থায়ী হয়ে যায়। যাতে করে ওই সংস্কারগুলোর মাধ্যমে একটা কাঠামোর রূপ আমরা দিতে পারি।
প্রথম আলো:
কী বার্তা দেবেন দেশের মানুষের জন্য?
ড. ইউনূস: আমার একটাই কথা—সংস্কার, সংস্কার, সংস্কার। সংস্কারের জন্য সবাই ঐক্যবদ্ধ হোন। এই সুযোগ আর আসবে না। প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান মুহূর্ত। কাজেই এটা নিয়ে দ্বন্দ্বের মধ্যে যাবেন না। সংস্কারে কী কী বিষয় হবে, সেটা নিয়ে বাগ্বিতণ্ডা করেন। কিন্তু সংস্কার, এটা করে যেতে হবে। দুই দিন পর যদি বলেন সংস্কার বাদ দেন, আমরা নির্বাচন করে চলে যাই, ওটা যেন না হয়। সংস্কার না করে যেন নির্বাচন না করি। এটা আপনাদের সবার কাছে আমার আবেদন। এই সুযোগ হারাবেন না।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
ড. ইউনূস: আপনাকেও ধন্যবাদ।
(রচনা ও সংকলন: মো: বাবুল হোসেন)